ব্যাকগ্রাউন্ড

ফেইসবুকে!

ধারাবাহিক উপন্যাসঃ চোরকুঠুরি (Life Left Behind) - পর্ব-১

মানুষের মনের গভীরে জমে থাকে রঙ বেরঙের স্মৃতির ফসিল। চুরি যাওয়া শৈশবের ছোট ছোট সুখ-দুঃখ, ভালোলাগা কিংবা বিরক্তিকর অনুভূতিগুলো নিজের অজান্তেই কখনও কখনও চোখের সামনে ভেসে ওঠে। মনোজগতের সেই বিচিত্র সব অনুভূতি অনেককেই তাড়িয়ে বেড়ায়। একান্নবর্তী পরিবারে প্রত্যেকটি মানুষ একে অন্যের সাথে সম্পর্কযুক্ত। কেউ মানসিকভাবে, কেউ শারীরিক, সামাজিক, আর্থিক কিংবা কখনও কখনও সম্পদ অধিকারের ভিত্তিতে। সময়ের সাথে সাথে যে ছেলেটি কিংবা মেয়েটি বড় হয়ে যায়, তারও শিশুবেলা কিংবা কিশোর বেলার অনেক স্মৃতি জমে থাকে একান্নবর্তী পরিবারের ঘুলি-ঘুপচিতে। প্রত্যেকটি মানুষের মনের অলিতে গলিতে ঘুরে বেড়ায় দেখা না দেখা অনেক কামনা-বাসনা, ঘটনা দুর্ঘটনার জীবম্মৃত কঙ্কাল। একান্ত অবসরে যখন সে নিজের ভেতরে ডুব দেয়, মনের ছোট্ট চোরকুঠুরিতে আঁতিপাঁতি করে খুঁজে ফেরে সেইসব ফেলে আসা দিনের স্মৃতি।
চলমান বর্তমান, আর অতীত জীবনের ফেলে আসা দিনগুলোর নানা ঘাত-প্রতিঘাত নিয়েই এগিয়ে যায় উপন্যাস- চোরকুঠুরি।

পর্বঃ এক
 
ভাটির টানে নেমে যাওয়া পানির স্তরের উপরিভাগে, থকথকে কাদার মধ্যে হাঁটু গেড়ে দাঁড়িয়ে বাইন মাছটার ঠিক মাথার কাছটায় শক্ত করে খামচি দিয়ে ধরে, একগাল হেসে কাজল বলে উঠলো, ‘ধরছি, এইবার ব্যাটারে ঠিকই ধরছি’। তারপর গ্রীবা উঁচু করে রাস্তার দিকে একবার তাকিয়ে দেখলো। কাছেপিঠে কেউ নেই। মাছটার কানশার ভেতরে একটা শক্ত লতা দিয়ে বেঁধে আবার বিড়বিড় করে বললো, ‘এতক্ষণ অনেক জ্বালিয়েছো, এবার যাবে কোথায় বাছাধন!’ মাছটাকে নদীর পাড়ে একটা গাছের ডালে ঝুলিয়ে রেখে নিজেকে পরিষ্কার করার কাজে লেগে পড়লো। ওকে এই অবস্থায় দেখলে মা ভীষণ বকবেন।
এখন এপ্রিল মাস। চৈত্র যাই যাই করছে। এরই মধ্যে ভীষণ গরম পড়েছে। সূর্য অনেক আগেই পশ্চিম আকাশে হেলে পড়েছে। তবুও রোদের তেজ যেন একটুও কমেনি। আজ আকাশে একফোঁটা মেঘও নেই, চারিদিকে লু হাওয়া বইছে। নদীর জলের ছোঁয়া মুখে লাগতেই দারুণ এক প্রশান্তিতে ভরে গেলো কাজলের মন। ইচ্ছে করছে গোসল করে নেয় আবার। কিন্তু একবার গোসল করেছে, আবার মাথা ভেজা দেখলে মা আর আস্ত রাখবে না। নদীতে গোসলের কথা শুনলে নির্ঘাৎ এক সপ্তাহ কথা বন্ধ। মাছ ধরেছে দেখলেই কতটা রেগে যায় তাই নিয়ে সে শঙ্কিত।
ডানহাতে মাছটা ঝুলিয়ে, বড়রাস্তা থেকে নেমে খালপাড়ের সরু মেঠোপথ ধরে ছোট ছোট পা ফেলে, হনহন করে হেঁটে চলেছে কাজল। মুখ জুড়ে তার তৃপ্তির হাসি। ভাগ্যে মায়ের বকুনি আছে নিশ্চিত জেনেও ও আজ ভীষণ খুশি। এই প্রথম মাছ ধরলো কাজল। মাছ ধরতে পারে না বলে টিপু ভাই প্রায়ই টিপ্পনি কাটে। আজ ওকে একহাত দেখিয়ে দেবে, সেও কম কীসে!পথটির দু’ধারে সারি সারি খেজুর গাছ। শীতের সন্ধ্যায় এ গাছগুলোয় মাটির হাড়ি ঝুলতে দেখা যায়। কাজলের ছোটমামা সাজেদ আলী প্রতিদিন এগুলো কাটে। সাজেদ আলী অবশ্য কাজলের আপন মামা নয়, ওর মায়ের চাচাতো ভাই।
 এই পথটা খালের পাড় ধরে কাজী বাড়ির সদর দরজায় গিয়ে যেখানে শেষ হয়েছে, ঠিক সেখানটায় কুমারী খালে কাজীদের গোসলের ঘাট।  বাড়ির সব পুরুষ ও কিশোর-যুবারা এ ঘাটেই গোসল করে।  তবে বাড়ির মহিলাদের এ ঘাটে আসা বারণ। কাজল ঘাটের কাছে পৌঁছে দেখলো টিপু তালগাছের সিঁড়ির ধাপ বেয়ে উপরে উঠে আসছে। ও ওখানেই থামলো। টিপুর দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসলো, তারপর মাছটা একটু উঁচু করে ওর সামনে কয়েকবার ঝুলিয়ে বাড়ির ভেতরে চলে গেলো। কাজলের হাতে ঝুলন্ত মাছটার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো টিপু। নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছে না।  কাজল আজ এতবড় মাছ ধরেছে!
উঠোনের কোণে কাছারিঘরের পাশে এসে থমকে দাঁড়ালো কাজল। ঘরের দরোজায় দাঁড়ানো মায়ের রুদ্রমূর্তি দেখে ওর পা আটকে গেছে যেন। মুখ থেকে হাসি মুছে গেলো কাজলের।  কিছুক্ষণ গম্ভীরভাবে দরোজায় দাঁড়িয়ে থেকে মা ভেতরে চলে গেলো। মাকে খুব ভালোভাবে চেনে কাজল। ওর ওপর বেশিক্ষণ রাগ করে থাকতে পারে না।  বেশি রেগে গেলে মা কথা বলা বন্ধ করে দেয়। কাজল চট করে এক দৌড়ে ঘরের দরোজার সামনে গিয়ে ভেতরে উঁকি দিয়ে দেখলো একবার। এই মুহূর্তে মা ঘরে নেই।  চুপি চুপি মূল ঘরে ঢুকে কাজল ময়নাকে খুঁজলো। দেখতে পেলো না কোথাও। পিছনের দরোজায় উঁকি দিয়ে দেখলো মা খোলা জায়গাটা ঝাঁট দিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে, এখানে মাঝে মধ্যেই রান্নাবান্নার কাজটা সেরে নেয় সে। কাজল বুঝলো মা এখন ইচ্ছে করেই ওর থেকে দূরে থাকতে চাইছে। নিঃশব্দে রান্নাঘরে ঢুকে মাছটা ঢেকে রেখে দিলো। মা পুরোটাই দেখলো, তবে কিছু বললো না।
পড়ন্ত বিকেল। আর কিছুক্ষণ পরই সূর্য অস্ত যাবে। কাজল মনে মনে বললো, আজ আর মাকে কোনোভাবেই রাগানো যাবে না। ও হাতমুখ ধুয়ে পড়ার টেবিল গোছগাছে লেগে পড়লো। জানালার ওপাশে উঠোনজুড়ে মিষ্টি রোদ হাসছে। কাছারিঘরের টিনের চালের মাথায় দুই প্রান্তে টিনের তৈরি দু’টি ময়ূরের আকৃতি, রোদ পড়ে এখন চিকচিক করছে। কাজল দেখলো একটা ময়ূরের পাশেই কয়েকটি পায়রা উড়ে এসে বসলো। সেদিকে তাকিয়ে একগাল হেসে কাজল বলে উঠলো, ‘কি রে, তোরা এখন রোদ পোহাচ্ছিস?’ ঘরের সামনে, ঠিক জানালা ঘেঁসেই ছোট্ট শরিফা গাছটায় কয়েকটা টুনটুনি লাফালাফি করছে আর কিচিরমিচির ডাকছে। কাজল জানালার কাছে গিয়ে ফিসফিস করে বললো, ‘অ্যাই, তোরা এত ডাকাডাকি করিস কেন রে?’ নিজে নিজেই একগাল হেসে গাছটার মগডালে শেষ বিকেলের হলুদাভ আলোর লুকোচুরি দেখে আরেকবার বলে উঠলো, ‘ইস! কী সুন্দর!’
এই গাছটায় বড় বড় শরিফা হয়।  খেতে ভারী মিষ্টি। এখন নতুন ফুল ধরেছে।  শরিফা বড় হয়ে পাকতে কয়েকমাস লাগবে। দরোজার অন্যপাশে একটা পেয়ারা গাছ। বড় বড় ডাঁসা পেয়ারা ধরে। এই গাছগুলো নানী লাগিয়েছিলেন। ঘরের আশপাশের অনেক ফলের গাছই তাঁর হাতে লাগানো। এখন মা যত্ন নেয়। উঠোনের ঠিক মাঝ বরাবর দক্ষিন পাশ ঘেঁষে, কাছারিঘরের পেছনে একটি ডালিম গাছ। অসংখ্য লাল রঙের ফুলে ছেয়ে আছে গাছটি। আরও কিছুদিনের মধ্যেই ফল ধরবে। প্রচুর ডালিম ফলে। প্রায় সারা বছরই কম বেশি ডালিম থাকে গাছটিতে। আগে এটি দুই পরিবারের এজমালি জায়গায় ছিলো, তবে বাড়ি ভাগাভাগির পর এখন এন্তাজ আলী কাজীর ভাগে পড়েছে। আগে কিছু ডালিম রূপার ঘরে আসলেও এখন আর তেমন আসে না। মাঝে মধ্যে অবশ্য মেজো মামী মাকে দু’একটা দিয়ে যায়। কাজল মাকে বলেছিলো ওদের ঘরের সামনে একটি ডালিম গাছ লাগাতে। রূপা গত বছর ঘরের সামনে পেয়ারা গাছটার পাশে একটি ডালিম গাছ লাগিয়েছে তবে এখনও ছোট। আরও দু-এক বছর লাগবে ফল ধরতে।
ঘরের পেছনের খোলা চত্তরে নানা জাতের ফলের গাছ লাগিয়েছিলেন নানী। আম, জাম, কাঠাল, লেবু, নারিকেল, জামরুল, জাম্বুরা, সফেদা, বড়ই, কামরাঙা আরও বেশ কিছু গাছ। এই গাছগুলোয় প্রচুর ফলন হয়। ওদের মা-ছেলের জন্য তো যথেষ্ট। মা অবশ্য এ বাড়ির অন্যদেরও দেন।  নানীর সাজানো গোছানো ছোট্ট বাগানটির শেষ প্রান্তেই একটি পুকুর। ভাগাভাগিতে এটি কাজলের মা পেয়েছে। এই পুকুরে মা গোসল, কাপড় আর হাড়ি-পাতিল ধোয়ার কাজটি সারেন। গত বছর কয়েক জাতের মাছের পোনা ছাড়া হয়েছে।  রুই, কাতল, তেলাপিয়া, চিংড়ি। মাঝে মাঝে ফজলুকে দিয়ে এই পুকুর থেকে মাছ ধরানো হয়।
কাজলের মনে পড়ে নানী ওকে ভীষণ আদর করতেন। ভাত দেখলেই কাজল দৌড়ে পালাতো, আর নানী ওর পিছু পিছু সারা বাড়ি ছুটতেন। উঠোনের এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্তে, বড় নানাদের ঘরে, পুকুর পাড়- সব জায়গায়। নানী আজ নেই। দু’বছরের বেশি সময় পার হলো নানী মারা গিয়েছেন। নানা তো আরও আগেই চলে গেছেন। নানী যেদিন মারা গেলেন, মা সেদিন অনেক কেঁদেছিল। কাজল মাকে কখনও এতটা কাঁদতে দেখেনি। তারপর অনেকদিন এই ঘরটা খালিই ছিলো। কাজলকে নিয়ে মা মাঝে মধ্যে এসে কয়েকদিন থেকে যেতেন। ঘরবাড়ি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে আবার ফিরে যেতেন কাজলের বাবার বাড়ি।
শীতের সময়টায় মা প্রায়ই নানাবাড়ি আসতেন। তখন ধান তোলার সময়। নানী একা পারতেন না। মা দাদাবাড়ির কাজ অনেকটা সামলে নিয়ে এখানে চলে আসতেন। নানীকে সাহায্য করার জন্য। খালপাড়ের সারি সারি খেজুর গাছ থেকে অনেকগুলো হাড়ি ভর্তি রস নামতো প্রতিদিন। নানী সেগুলো জাল দিয়ে গুড় বানিয়ে ফেলতেন। নানী যখন বেঁচে ছিলেন সে সময়টা অদ্ভুত মায়াময় ছিলো। কাজল যেন স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে সে দিনগুলো।
সন্ধ্যে হতেই উঠোন জুড়ে হিম নামে। দখিণের চত্বরে তাফালের পর তাফাল ধান সিদ্ধ হয়। ফজলু খড়কুটো জ্বেলে আগুনটা সচল রাখে। কাজল একছুটে উঠোন পেরিয়ে নানীর কোলের মধ্যে লুকিয়ে পড়তেই এক সমুদ্র ওম। নানীও ওকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রাখে। মা ডাকলেও কাজল সাড়া দেয় না। নানী নেই, তাই কাজলকে বুকের মধ্যে বসিয়ে বুকের সবটুকু ওম দিয়ে এখন আর জড়িয়ে নেয় না কেউ। একজন অবশ্য ওকে বুকে নেয়ার জন্য তীর্থের কাকের মতো অপেক্ষার প্রহর গুণে চলে। মির্জা জালালউদ্দীন। কাজলের দাদা। একমাত্র নাতিটিকে কাছে না পাওয়ায় তার তৃষ্ণার্ত বুকে রাজ্যের হাহাকার ওঠে।
কাজলের বাবার বাড়ি এখান থেকে অনেক দূরের গ্রাম নাছিরাবাদে। ওখান থেকে আসতে হলে প্রথমে নৌকা, তারপর গাড়ি, এরপর রিকশায় চড়ে আসতে হয়। সকালে রওনা দিলে পৌঁছুতে দুপুর গড়িয়ে যায়। তবুও মা দু’দিকই সামলে রাখতেন। তারপর একদিন কী যে হলো! মা রাগ করে বাবার বাড়ি ছেড়ে একেবারেই এখানে চলে এলেন। দাদু সেদিন বাবাকে খুব বকেছিলেন। এমনকি লাঠি দিয়ে মারতে পর্যন্ত গিয়েছিলেন। কাজলের খুব হাসি পাচ্ছিলো। এতবড় লোককে কেউ মারে! কাজলের মনে আছে দাদু সেদিন বাবাকে বলেছিলেন, ‘তোকে আমার কোনো সম্পত্তিই দেবো না। আমার সম্পত্তির একমাত্র মালিক আমার দাদু কাজল।’ বাবা সেদিন কিচ্ছু বলেনি। কাজল জানে ওর বাবা ব্যাংকের একজন বড় অফিসার, কিন্তু দাদুর সামনে যেন চুপসে ছিলেন। বাবা কিছুক্ষণ উঠোনে দাঁড়িয়ে থেকে চলে গিয়েছিলেন। সেই থেকে মায়ের কি যে হলো কাজল আজও বুঝতে পারেনি। তবে সেদিনের পর থেকে মাকে আর হাসতে দেখেনি। বাবার বাড়ি থেকে চলে আসার পর থেকেই মায়ের মুখের হাসি যেন হারিয়ে গেলো।

চলবে... (যদি পাঠক চায়  )

ছবি
সেকশনঃ গল্প
লিখেছেনঃ নিভৃত স্বপ্নচারী তারিখঃ 11/05/2022
সর্বমোট 1371 বার পঠিত
ফেসবুকের মাধ্যমে কমেন্ট করুণ

সার্চ

সর্বোচ্চ মন্তব্যকৃত

এই তালিকায় একজন লেখকের সর্বোচ্চ ২ টি ও গত ৩ মাসের লেখা দেখানো হয়েছে। সব সময়ের সেরাগুলো দেখার জন্য এখানে ক্লিক করুন