ব্যাকগ্রাউন্ড

ফেইসবুকে!

সাধারণের মাঝে অসাধারণ একজন......

আমার খুব মনে পড়ে সেইসময়ের কথা। একানব্বই সালের শেষ দিক। সামনেই নবম শ্রেণির বার্ষীক পরীক্ষা শুরু হবে। পড়াশুনার আয়োজন শিকেয় তুলে মনের আনন্দে খেলাধুলা আর শীতকালীন ফুল ফোটানোর ব্যস্ততা নিয়েই কাটছে সময়। মনের ভেতর শুধু সুখ আর সুখ। কারণ পরীক্ষা শেষ হলেই মামা বা খালা এসে আমাকে বেড়াতে নিয়ে যান কক্সবাজার কিংবা রাঙামাটি। কিছুদিন পরই ছোটোমামা আসবেন কক্সবাজার নিয়ে যেতে। সেখানে আমার নানু থাকেন তার ছেলেমেয়ে নিয়ে। আমার মনে ঈদের আনন্দ খেলে যাচ্ছে।

এমনই ভরপুর আনন্দ নিয়ে একদিন বিকেলবেলা বাড়ির উঠোনে যখন এক্কাদোক্কা খেলছি সে সময় আমাদের বাড়িতে একজন ভদ্রমহিলা এলেন। সাথে ছিলেন উনার কলেজপড়ুয়া কন্যা। আমার আব্বা সেই ভদ্রমহিলার সাথে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিলেন। উনি নাকি সম্পর্কে আমার ফুপু হন। আব্বার আপন ফুফাতো বোন। উনার নাম বকুল। মুক্তাগাছায় থাকেন উনারা। অনেকদিন পর গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে এসেছেন। কোনো এক বিচিত্র কারণে উনাদের সাথে যোগাযোগ ছিলো না। আমার সাথে এটাই প্রথম দেখা। এই গ্রামে আমার সেই ফুপুর আরো বেশকিছু আত্মীয়স্বজন আছেন। সবার সাথে দেখা করাই নাকি উনার উদ্দেশ্য।

আমি তাদের কথাবার্তায় যারপরনাই মুগ্ধ। আমার মুগ্ধতার প্রধান কারণ ছিলো সেই মানুষদুটো আমাকে বিশেষ গুরত্ব দিয়ে কথা বলেছিলেন যা এর আগে কারোর কাছ থেকেই ওমনটি পাইনি! উনারা আমাদের পরিবারের সবার সাথেই অনেকটা সময় কাটিয়ে শেষমেষ বিদায় নিলেন। এরমাঝেই একদিন রাঙা ভাই এলেন। উনি হচ্ছেন বকুল ফুপুর চতুর্থ ছেলে। নতুন করে পরিচিত হলাম আমরা। যতক্ষণ ছিলেন শুধু কথাই বলে গেলেন। মুখভরা শুধু হাসি আর হাসি। হাসলে আবার দু’গালে গভীর টোল পড়ে। উনি গল্প করতেন আর উনাকে ঘিরে আমরা পরিবারের সবাই।

এরপর প্রায়ই নাকি তিনি গ্রামে আসতেন কিন্তু আমার সাথে দেখা হতো কম। কারণ তিনি যখন আসতেন তখন আমি চরকির মতো এ জায়গা ও জায়গা ঘুরে বেড়াচ্ছি। তখন তো আর মোবাইল ফোনের সুযোগ ছিলো না। এরপর যখন আমার অনার্স প্রথম বর্ষ চলছে তখন সেই বকুলফুপু আবার এলেন আমাদের বাড়িতে। বরাবরেরমতোই হাসিখুশিমুখ, কথার জাদুকর বলা যায়। যে কোনো বিষয়ই উনি বেশ সাবলীলভাবে বলে যেতেন। উনি ছিলেন অসাাধারণ একজন বক্তা। আব্বার সাথে জমিয়ে আলাপ করতেন। কি কথা হতো জানতাম না। পরে জেনেছি, উনার চতুর্থ ছেলের জন্য আমাকে উনার বিশেষ পছন্দ। সেই শুরুতেই নাকি তার পছন্দের বিষয়টি নিজের ভেতর পুষে রেখেছিলেন।

বয়স কম ছিলো বলে বিষয়টি তুলতে পারেননি। এখন তো প্রস্তাব দেয়া যেতেই পারে তাই সরাসরি আব্বার কাছে সরল স্বীকারোক্তি দিলেন – "দ্যাখো ভাই, তুমি আমার বারো বছরের ছোটো। অনেকদিন ধরে এই গ্রামের সাথে, পরিবারের সাথে সম্পর্কটা ঢিলেঢালা ছিলো। এটাকে বেশ মজবুত করতে চাইছি। আমার ছেলের জন্য তোমার মেয়েটিকে আমার চাই। তুমি কিন্তু না করতে পারবে না। কোনো চিন্তা করোনা , ওর পড়াশুনার কোনো ক্ষতি হবেনা । এ নিয়ে তুমি নিশ্চিত থাকো।" আব্বা কিছুটা রাজি হলেও আম্মা বেকে বসলেন। আম্মার একই কথা – "মাফ করবেন বুজি। মেয়ে আমাদের এখনও ছোটো। সংসারের কিছুই বোঝেনা সে। আর পড়াশুনা মাত্র শুরু বলা যায়। এছাড়া অভিভাবক হিসেবে আমরা বাবা-মা ছাড়াও ওর মামারা আছেন । উনাদের সাথে কথা না বলে আমি কিছু বলতে পারবো না বুজি।"

শেষমেষ আমার সেই বকুল ফুপুর জাদুকরী কথার স্রোতে সবাই ভাসলেন । যু্ক্তিতর্ক শেষে এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ । ১৯৯৭ সালের ২৬ শে ফেব্রুয়ারি । রচিত হলো আমার জীবনের অন্যরকম একটি অধ্যায়। বিয়ের পর অচেনা পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নিতে একটু্ও বেগ পেতে হয়নি। মুক্তাগাছার ‘শখের কুটিরে‘ আমি বেশ সহজেই অভ্যস্ত হয়ে গেলাম। আমার শাশুড়িকে আমরা সব ছেলের বৌয়েরা মা বলে ডাকতাম। এই ডাকটি উনার আব্দারও ছিলো আর বিশেষ কাঙ্খিতও ছিলো। উনিও বৌদের নামধরে ’তুই’ বলে সম্বোধন করতেন। খুব অল্পসময়েই আমার কাছে সবাইকে খুব আপন মনে হলো। কারণ আমার চারপাশজুড়ে ছিলো অনেকগুলো ভালোবাসার হাত। সবাই আমাকে ভালোবাসার বন্ধনে জড়িয়ে রাখলো ।

আমার বরের খুব ইচ্ছে ছিলো আমি যেনো বছরদুয়েক সময় মুক্তাগাছায় আমার শ্বশুর শাশুড়ির সাথে থাকি। ইচ্ছেটি যখন আমাকে প্রস্তাব আকারে জানানো হলো তখন আমি এককথায় রাজি হয়ে গেলাম। সেসময় শুধু মনে হয়েছে এমন মানুষদের সঙ্গ আমার আনন্দগুলোকে বাড়াবে বৈ কমাবে না। আমি মুক্তাগাছায় শহীদ স্মৃতি সরকারী কলেজে বিএসএস ভর্তি হলাম। বাড়ি থেকে খুব কাছেই ছিলো কলেজ। বাড়ির একপাশ থেকে কলেজের শানবাঁধানো পুকুরঘাট আর আঙিনা অনেকটাই দেখা যেতো। আমার শাশুড়ি রোজ আমাকে বিদায় দেয়ার সময় বাড়ির একপাশে ঠায় দাড়িয়ে থাকতেন। যে পর্যন্ত দৃষ্টি যেতো সে পর্যন্ত উনি তাকিয়েই থাকতেন। আমিও পেছন ফিরে ফিরে মা’কে দেখতাম।

আমাদের মা অসম্ভব পরিশ্রমী ছিলেন। এখনকার সময়ের মতো তখন গ্যাসের চুলা ছিলো না। লাকড়ি দিয়ে জ্বাল দিতে হতো। উনার গায়ের ব্লাউজ সবসময়ই ঘেমে লেপ্টে থাকতো। তবু্ও মুখভরা আদিগন্ত হাসি আর হাসি। হাসিতে মায়ের নাকে ফিরোজারঙা নাকফুলটি চিকমিক করে উঠতো।বাড়িতে একজন সহকারী ছিলেন। উনি রোজ ভোরে এসে সন্ধ্যায় চলে যেতেন। উঠোন ঝাঁট দেয়া, ঘর মোছাসহ তরকারি কাটাকুটি অনেক কাজই করে দিতেন। রান্নাটা মা নিজহাতে করতেন। আমি হয়তো পড়ছি এমন সময় নিঃশব্দে এসে আমার পড়ার টেবিলে বাটিভর্তি সবজি, চামুচসহ রেখে যেতেন। তিনি জানতেন আমি সবজি পছন্দ করি। তাই রান্নাকরা সবজি চুলা থেকিই সরাসরি নিয়ে আসতেন। অনেক সময় চা করে আনতেন। গ্লাসভর্তি গরম দুধও বাদ ছিলো না। আর মাথায় পড়তো নরম আদুরে স্পর্শ। আমার ভেতর কখনও মনে হয়নি আমি একজন বৌ। কেবলই মনে হয়েছে আমি ও বাড়ির আরও একটি মেয়ে।

আমাদের মা ফাঁক পেলেই পড়তেন। গল্প, উপন্যাস, কবিতাসহ আরো অনেককিছু। বাড়িতে নিয়মিত পত্রিকা আসতো। সেই পত্রিকার আপাদমস্তক মা পড়তেন। যে বিষয় মনে ধরতো সেটি আমাকে শোনাতেন একাধিকবার। মা ডায়েরি লিখতেন। হাতের লেখা ছিলো মুক্তার মতো। লেখার ধরনও গতানুগতিক ছিলো না। ডায়েরি পড়লে কল্পনায় সবকিছু উঠে আসতো আমার চোখে। অদ্ভুত এক আনন্দ খেলে যেতো তখন। আমাদের সময়গুলো চমৎকার কাটতো। দুপুরের ভাতঘুম ছিলো না বলা যায়। সেই অলস সময়ে মা তার নাতি নাতনিদের নিয়ে দারুণ দারুণ ছড়া,কবিতা লিখতেন। আমি গল্পের বইয়ে ডুবে থাকতাম। বিকেল গড়িয়ে এলে আমরা দু'জন প্রায় প্রতিদিনের মতো পাড়া বেড়াতে যেতাম। আত্মীয় স্বজন খুঁজে বের করা এবং যোগাযোগ রক্ষা করার গভীর এক তাগিদ অনুভব করেছি মা'র ভেতর।

বাড়ির উঠোনে ফুলগাছ লাগাতাম আমরা। মা চাইতেন, পুরো বাড়ি যেনো ফুলে ফুলে ভরপুর থাকে। গাঁদা, কসমস, ডালিয়া, গোলাপসহ নানান ফুলগাছ। মূল গেইটের সামনে বেশকিছু দোলনচাঁপা লাগানো হলো। গাছগুলো আমি ওখানকার এক নার্সারি থেকে এনেছিলাম। এই ফুলের ঘ্রাণ মা খুব পছন্দ করতেন। প্রথম যখন থোকায় থোকায় দোলনচাঁপা হেসে উঠলো তখন আমাদের আনন্দ দেখে কে! আমাদের 'মা' মুক্তাগাছা মহিলা সংস্থার চেয়ারম্যান ছিলেন। ঘরের কাজকর্ম গুছিয়ে নিজের প্রতি নিজের যত্নশীল থাকা বেশ কঠিন ছিলো বলা যায়। তবুও চটপট কী সুন্দর করেই না সবটা সামলাতেন তিনি! আগেই বলেছি, মা ছিলেন কথার জাদুকর। কথায় যুক্তি ছিলো, শেখার মতো অনেককিছু ছিলো। তিনি যেখানেই যেতেন সেখানেই একভিড় আনন্দ তৈরি হতো।

বাড়িতে প্রায় সবসময়ই লোকজনের সমাগম ঘটতো। চায়ের আয়োজনের পাশাপাশি চলতো গল্প, কবিতা আবৃত্তি আর পুরনোকে নতুন করে স্মৃতিচারণ। কথার ফাঁকে মা আবেগপ্রবণ হয়ে উঠতেন। চশমার পাশ দিয়ে গড়িয়ে পড়তো নোনাজল। কণ্ঠও কেমন ভারী হয়ে আসতো। আমরা সবাই অদ্ভুত এক ঘোরের মাঝে থাকতাম। এখনও চোখ বুজলে সেই দৃশ্যগুলো বড় বেশি জীবন্ত হয়ে ধরা দেয় চোখের সামনে! এক দুপুরে মা হাসতে হাসতে বাড়ি এলেন। হাতে একটা ফুলের চারাগাছ। মা বললেন - "উপহার পেলাম রে। এখন আমরা দোলনচাঁপার পাশাপাশি রঙ্গনের থোকাও দেখবো"। ঘরের কাছাকাছি জায়গায় আমি গাছটি লাগালাম। আমাদের নিয়মিত যত্নে অল্পদিনেই খুব দ্রুত গাছটি বড়সড় হয়ে উঠলো। এক ফুটফুটে সকালে থোকায় থোকায় কলি দৃষ্টিগোচর হলো। চার পাপড়িতে হেসে উঠতে তেমন আর সময় লাগলো না তাদের। আমাদের আনন্দের ঝুড়ি আরো ভরে উঠলো।

মা ছিলেন দারুণ অতিথিপরায়ণ। মানুষজন নিয়ে থাকতে পছন্দ করতেন। আমার এখনও মনে পড়ে সেই ঘটনা। মা তার অফিসের এক পিয়নের ছোটো বোনের বিয়েতে নেমন্তন্ন পেলেন। আমাকে ছাড়া মা যেতে চাইলেন না। আমাদের বাড়ি থেকে খানিকটা দূরে, রিক্সা নিয়েই সুন্দর যাওয়া যায়। আমি আর মা উপহার নিয়ে বিয়েতে উপস্থিত হলাম। বিয়ের অনুষ্ঠান শেষ করে আমরা যখন প্রায় চলে এসেছি তখন সন্ধ্যা নামি নামি।
আচমকাই চোখে পড়লো প্রধান সড়কের একপাশে বরপক্ষের একটি মাইক্রোবাস চাকা নষ্ট হওয়ায় থেমে আছে। বিষয়টি দেখে মা আমাদের রিক্সা থামিয়ে চালকের মাধ্যমে জানলেন, চাকা ঠিকঠাক করার জন্য সময় লাগবে। রাতের মধ্যে ঠিক হয় কি-না বলা মুশকিল। গাড়ির কয়েকজন মুখ বেশ পরিচিত ছিলো। বিয়েতে দেখা হয়েছে। মা তখন সবাইকে বললেন- "কনের বাবা আমার বিশেষ পছন্দের মানুষ। আমিও সেই বিয়ের অনুষ্ঠান থেকে ফিরলাম। আপনাদের আপত্তি না থাকলে আমাদের বাড়িতে আজকের রাতটা কাটালে খুব খুশী হব।"

মাইক্রোতে চালক ছাড়া মোট এগারোজন যাত্রী ছিলেন। ইতিমধ্যে ঝুপ করে আঁধারও নেমে এসেছে। মায়ের এই প্রস্তাবকে তারা শুরুতে একটু দোনামোনা করলেও শেষমেষ রাজি হলেন। বাড়িতে এসেই মা ফ্রিজ থেকে মাছ মাংস ভেজালেন। অতিথিদের জন্য মুড়ি ভাজা, বিস্কুট চা খেতে দিলেন। আমি সবগুলো ঘরে মশারী পেতে দিলাম। এরপর নানানরকম গল্পটল্প করে রাত প্রায় সাড়ে দশটার দিকে উনারা সবাই খেয়েদেয়ে ঘুমিয়ে পড়লেন। পরদিন সকালে নাস্তা খেয়েই অতিথিদের চলে যাওয়ার কথা। কারণ গাড়ির চাকা রাতেই ঠিকঠাক হয়েছে। কিন্তু মায়ের আব্দার রাখতে যেয়ে শেষ পর্যন্ত তারা মধ্যাহ্নভোজ শেষ করে বিকেলের চায়ের আয়োজন সম্পন্ন করে তারপর একপ্রকার জোর করেই বিদায় নিলেন সবাই। যাওয়ার সময় সে কি প্রশংসা! তাদের স্বস্তি আর আনন্দিত মুখ আজো ভুলিনি। মা যেনো বড় প্রশান্তি পেয়েছিলেন তাদের আপ্যায়িত করার সুযোগ পেয়ে।

আমাদের বাড়ি থেকে কেউ না খেয়ে বিদায় নিতে পারতো না। উঠোন দিয়ে কেউ যখন যেতো তখন মা নিজ থেকেই কথা বলতেন, গল্প করতেন। আগেই বলেছি, মা'র লেখার হাত ছিলো দারুণ। লেখার চাইতে পড়তেন বেশি। নিত্যদিনের ডায়েরি লেখা ছাড়াও উনি আলাদা একটি খাতায় আপনমনে লিখে যেতেন। পরবর্তী সময়ে সেই লেখাগুলোই 'শিল্পতরু প্রকাশনী' থেকে ২০০৮ সালে বই আকারে প্রকাশিত হয় "এক সাধারণ মহিলার আত্মজীবনী" এই বইটির দ্বিতীয় সংস্করণ হয় ২০১০ সালে। আত্মীয় স্বজন থেকে শুরু করে সবার কাছেই বইটি যথেষ্ট সমাদৃত হয়।
কিছু সমালোচনাও ছিলো কিন্তু আমাদের মা সেসবকে হেসে উড়িয়ে দিতেন। তিনি বলতেন- ‘সবকিছু তো আর লিখিনি। লিখলে মানুষ বিশ্বাসই করবে না। ‘ এটি শতভাগ সত্য। কারণ বইয়ের লেখাগুলো যখন আমি কম্পোজ করছিলাম তখন মাঝেমাঝে চোখ ঝাপসা হয়ে এসেছে। এমন অনেক জায়গা ছিলো যেখানে আমি থেমেই থাকতাম। আঙ্গুল নাড়াতে পারতাম না। কী যে কষ্ট ! একজন মানুষ কি করে এতোটা সংগ্রামী হতে পারে ! কিছু কিছু ঘটনা আছে যা লিখতে গেলেই পীড়িত হয়েছি আর বাস্তব জীবনের ভেতর দিয়ে যাওয়া মানুষটির কেমন অনুভূতি ছিলো তা কিছুটা হলেও অনুমান করত কষ্ট হয়না।

বৌদের প্রতি মা'র বেশকিছু পরামর্শ ছিলো। একটি হলো- 'সব ঈদ শ্বশুরবাড়িতে করবে না। একটা বাবার বাড়ি আর একটা শ্বশুরবাড়ি। আমার মতো বৌদের মা বাবারও তো ইচ্ছে করে একসাথে তাদের মেয়েকে নিয়ে ঈদ করতে।' কোনো এক ঈদে মা'র খুব শখ হলো তার ছয় বৌকে রূপার নূপুর উপহার দেবেন। সবগুলেতে ছিলো কয়েক লাইন কথা। আমারটিতে লেখা ছিলো - 'যূথী, আধা যুগ আগে তোকে দেখেছিলাম, চেয়েছিলাম নিজের করে নিতে, পেয়েছিও। পাছে হারিয়ে যাস! তাই নূপুর পরালাম হারানোর ভয়ে। ' একদিন আমার খুব শখ হলো সাইকেল চালানোর। মা কীভাবে যেনো ব্যবস্থা করে ফেললেন! বাড়ির উঠোনে আমি শুরু করলাম চালানো। কতবার যে পড়লাম! হাতে পায়ে চোটও পেলাম বেশ। মা বললেন - 'কোনো শিক্ষাই সহজ না। তবে একবার শিখে ফেললে জীবনে ভুলবি না।' আমি নব উদ্যোমে ফের শুরু করলাম। মনে মনে মা'র ওপর কৃতজ্ঞ হলাম। কারণ খুব দ্রুতই আমি একা একাই সারাটা উঠোন চক্কর দিয়ে ফেলেছি কোনোপ্রকার পড়াপড়ি ছাড়াই!

রমজান মাস এলে মা আমাকে নিয়ে 'মধ্যহিস্যা বড়বাজারে' যেতেন। গরীব আত্মীয় স্বজনদের মাঝে কাপড়চোপড় বিলি করার জন্য আগে থেকেই একটি তালিকা করা থাকতো। সেই অনুযায়ী যা যা দরকার সবই কিনতেন এবং চেষ্টা করতেন নিজহাতে তাদের কাছে পৌঁছে দিতে। শাড়ির সাথে বেশকিছু ব্লাউজ, পেটিকোট নিজের সেলাই মেশিনে নিজেই সেলাই করে রাখতেন। এ কাজ করে তিনি বিশেষ তৃপ্তি পেতেন। মা'র সেলাই করার হাত ছিলো দুর্দান্ত। আমার কতকিছুই না উনি সেলাই করে দিয়েছেন! আমি মুগ্ধ হয়ে শুধু মা'কে দেখতাম। একজন মানুষের কত গুণ থাকতে পারে!

আমার মায়ের আট সন্তানের মাঝে ছয় ছেলে এবং দুই মেয়ে। আমি চতুর্থ বৌ। ছেলেপুলেদের সবার বিবাহ শেষ শুধু দুই ছেলে বাকি। একমাত্র ননাস তখন ময়মনসিংহ থাকেন পরিবারসহ। তিনি বয়সে প্রায় আমার মায়ের বয়সী। আর একমাত্র ননদ ইটালি প্রবাসী। ছেলেরা কেউ কেউ দেশে আর কেউ কেউ বিদেশে। এই আট সন্তান ছাড়াও মা তার নিজের ভাইয়ের এক ছেলেকে তার কাছে নিয়ে এসেছেন পিচ্চি বয়স থেকে। তাকে লেখাপড়া করিয়েছেন, বিয়ে দিয়েছেন। এছাড়া একজন এতিম শিশুকেও পেলেপুষে বড় করেছেন। লেখাপড়া করে চাকরি বিয়ে সবই সুন্দরভাবে সম্পন্ন করেছেন।

মা ছিলেন মানুষপ্রিয়। প্রতিবেশীদের সাথে চমৎকার সম্পর্ক বজায় রাখতেন তিনি। কারোর কোনো সমস্যা হলে দৌড়ে যেতেন। টাকা-পয়সা,বুদ্ধি- পরামর্শ সবটা দিয়েই সাহায্য করার চেষ্টা করতেন তিনি। শিক্ষার প্রতি জোর দিতেন খুব। টাকার অভাবে কেউ বই কিনতে না পারলে বা চিকিৎসা করাতে না পারলে মা নিজের উদ্যোগে সব ব্যবস্থা করতেন। মা কখনো বাহুল্য খরচ পছন্দ করতেন না। যখন যেখানে যতটা দরকার তার প্রায় সবই করতেন। এখানে কোনো কার্পণ্যতা লক্ষ্য করিনি। আমার শ্বশুর ছিলেন অসম্ভব শিশুমনা একজন। প্রতি ভোরে ঘুম থেকে উঠেই ছোট্ট নোটবুক সামনে রেখে প্রায় সকল স্বজনদের সাথে ফোনে সামাজিকতা সারতেন। এই কাজটি করে তিনি ব্যাপক আনন্দ পেতেন। এজন্য প্রতিমাসে বিল আসতো চোখে পড়ার মতো। মা এটি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারতেন না। মা বলতেন- ‘প্রতিদিন তো একই আলাপ করেন। রোজ রোজ এত আলাপের কি আছে!‘ বাবা তখন একদম চুপ হয়ে যেতেন। নতুন ভোরে ফের শুরু হতো বাবার একই আলাপ। একসময় মা হাল ছেড়ে দিতেন।

এক দুপুরে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের 'প্রথম আলো'র প্রথম খন্ড পড়ছি। বই প্রায় শেষের দিকে। দ্বিতীয় পর্ব বাড়িতে নেই, কিনতে হবে। ভাবছিলাম, বইটি তো আজই শেষ হয়ে যাবে কিন্তু দ্বিতীয়টি কবে কিনবো আর কবেই বা পড়বো! মুক্তাগাছার গুটিকয়েক লাইব্রেরিগুলোতে সব বই সবসময় পাওয়া যায় না। আমার উশখুশভাব 'মা' মনে হয় আঁচ করতে পারলেন। এর তিনদিন পর এলো ২রা জানুয়ারি, আমার জন্মদিন। মা প্রতিবেশীদের বাড়ি যেয়ে যেয়ে সবাইকে নিজ মুখে চা চক্রের নেমন্তন্ন করে এলেন। ওখানকার সবচেয়ে সেরা কনফেকশনারির দোকান থেকে একটি কেক নিয়ে এসেছেন। কেকের ওপর লেখা - 'শুভ জন্মদিন যূথী'। এরপর বিকেলে নিজহাতে দশ রকমের নাস্তা, আর টি-পটভরা চা নিয়ে মা এলেন সাজানো ড্রয়িংরুমে। কতরকম গল্পই হলো সে বিকেলে। গান, কবিতাসহ কত কি আয়োজন! মা প্রায় সবার ভেতরের সুপ্ত প্রতিভাকে জাগিয়ে তুললেন বলা যায়। নিজেও কয়েকটি কবিতা আবৃত্তি করে শোনালেন। একটা সময় আমার হাতে তুলে দিলেন হৃষ্টপুষ্ট প্যাকেট। আমি খুব দ্রুত প্যাকেট খুলতে পারি।

প্যাকেটটি খুলেই বিহ্বল হয়ে গেলাম। 'প্রথম আলো' দ্বিতীয় পর্ব! সেখানে লেখা -'যূথী, তোর ভালোলাগার জিনিসগুলো আমারও। তাই তো আমাদের ভালোলাগার অনেক মিল খুঁজে পাই। এজন্য আমার ভালোলাগার এই ছোট্ট প্রয়াস।' বইটি ময়মনসিংহ 'সংলাপ' লাইব্রেরী থেকে 'মা' কিনেছিলেন। কখন কোন ফাঁকে তিনি এটি করেছিলেন বুঝিনি। 'মা' ছিলেন এমনই। মানুষের ভেতরে ঢুকতে পারতেন, বুঝতে চেষ্টা করতেন। আমার পড়াশুনা সংক্রান্ত কারণে মুক্তাগাছা এবং ময়মনসিংহে অনেকটা সময় কেটেছে। এরপর পড়ার পাঠ চুকিয়ে শুরু করলাম ঢাকাবাস। মা'র সাথে দেখা করতে যেতাম প্রায়ই। ২০০০ সালের ১৭ই ফেব্রুয়ারিতে আমার শ্বশুর হুট করেই না ফেরার দেশে চলে যাওয়ার পর মায়ের বয়সটা যেনো নিমিষেই বেড়ে গেলো। উনি নিজ বাড়ি ছেড়ে কোথাও বেশিদিন থাকতে চাইতেন না।

আমেরিকায় উনার দুই ছেলে ছাড়াও অনেক আত্মীয় স্বজন আছেন কিন্তু প্রথমবার দীর্ঘ সময় ওখানে কাটালেও দ্বিতীয়বার খুব দ্রুতই ফিরে এসেছিলেন। ঢাকায় কোনো ছেলের বাসায় একটানা অনেকদিন থাকতে চাননি। মুক্তাগাছার খোলা উঠোনের বাড়িটিতেই মা থাকতে স্বাচ্ছন্দবোধ করতেন। আমরা কেউ উনাকে জোর করতাম না। ‘চা‘ ছিলো মায়ের পছন্দের পানীয়। চা পানের সময় বলতেন - 'আমার চায়ে চিনি একটু বেশি দিস আর কাপটা ভরে দিস।' এখানে উল্লেখ্য যে, মা'র ডায়াবেটিস ছিলো। নিয়মিত ওষুধ চলতো তবে ইনসুলিন নিতে হতো না। মা হাঁটাহাঁটি করতেন, পরিমিত খেতেন। ডায়াবেটিস সবসময় নিয়ন্ত্রণেই থাকতো।

২০১২ সালের শেষদিক। সেসময় আমি 'মুক্তচিন্তা' ব্লগে টুকটাক লিখতাম। মা'কে বললাম লিখতে। তিনি গভীর আগ্রহ দেখালেন। 'মাসউদা মঈন' নামে আইডি তৈরি হলো। আমি নিজে মা'র লেখা গদ্য কিংবা পদ্য টাইপ করে পোস্ট দিতাম উনার আইডি তে। মা পাশে বসে দেখতেন। একটু পর পর জানতে চাইতেন কেউ কোনো মন্তব্য করেছে কি-না। কেউ মন্তব্য করলে রিপ্লাই দিতে কার্পণ্য করতেন না। তিনি যা বলতেন তার হুবহু লিখে তাকে দেখিয়ে তারপর রিপ্লাই দেয়া হতো। এভাবে মা দারুণ মজা পেয়ে গেলেন। সময়ও কাটতে লাগলো বেশ আনন্দে।
ঢাকায় তিনি তার সন্তানদের সাথে পাকাপাকিভাবে থাকতে চাইতেন না। তিনি বেড়াতে আসতেন। একমাস কিংবা পনেরো দিন থাকার পর অস্থির হয়ে যেতেন বাড়ির জন্য। খোলা উঠোনের বাড়ি, থোকায় থোকায় ফুলেদের বাড়ি তাকে খুব টানতো। কাজেই, মাকে জোর না করে উনার ইচ্ছেকেই গুরুত্ব দিতাম সবাই। আমরাই দলে দলে মার কাছে যেতাম। ঈদ করতাম একসাথে। এছাড়া যে যখন ছুটি পেতো তখনই ছুটে যেতো মায়ের কাছে। সবাইকে পেয়ে মায়ের আনন্দ যেনো আর ধরেনা। আমাদের জন্য টেবিলে ফুলের থোকা শোভা পেতো। নিজহাতে কতকিছুই না করার চেষ্টা করতেন তিনি!

এরপরের সময়গুলো কষ্টের। কষ্টের সময়গুলো টেনে আনা আরো কষ্টের। সময়ের সাথে সাথে আমাদের মা শারীরিক এবং মানসিকভাবে খুব দ্রুতই বুড়িয়ে যেতে থাকলেন। বই পড়ার প্রতি আগ্রহটি একরকম হারিয়েই ফেললেন তিনি। স্মৃতিশক্তি ঢেউয়ের মতো আসা যাওয়া, চায়ের কাপ বা গ্লাস হাতে নিলে ঝড়ের মতো হাতকাপা, চলাফেরায় ধীরগতি, লেখালেখিতে অনাগ্রহ সবই কেমন দ্রুত ঘটে গেলো! শেষমেষ যা ঘটলো তা হচ্ছে ভয়াবহ বিষয়। ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসের এক সকালে মা স্ট্রোক করলেন। এ্যাম্বুলেন্সে করে সরাসরি ঢাকায় নিউরো হাসপাতালে ভর্তি করানো হলো। ওখানে থাকলেন বেশ কয়েকদিন।
 
হাসপাতাল থেকে বাসায় আসার পর বিছানাই হলো তার নিত্যসঙ্গি। যন্ত্রপাতির মাঝেই থাকতেন তিন। নল দিয়ে তরলজাতীয় খাবার এবং প্রস্রাব পায়খানা সবই বিছানায়। তার উজ্জ্বল চোখজোড়া ক্রমশ যেনো ঘোলাটে হয়ে গেলো।  তিনি আমাদের কাউকেই ঠিক চিনতে পারতেন না। কেবল ফ্যালফ্যাল করে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতেন। দিনের পর দিন শুয়ে থাকতে থাকতে মা’র শরীরের বিভিন্ন স্থানে বেডসোর হয়ে গেলো। মা সারাজীবন বলেছেন – ‘তোরা সবাই দোয়া করিস আমি যেনো সুস্থ শরীরে মরতে পারি। ভুগে ভুগে মৃত্যু যেনো আমার না হয়। সু্স্থ থাকতেই আল্লাহ যেনো আমাকে নিয়ে যান।’ অথচ আমাদের মা সেই কষ্টের মাঝেই পড়লেন। উনার দেহে প্রাণ থাকলেও উনি ছিলেন প্রাণহীন। একজোড়া চোখ মরা নদীর মতো। যে চোখে কোনো গল্প আর অবশিষ্ট নেই!
 
এরপর এলো ১১ই জানুয়ারি ২০২০। শরীর আরো খারাপ হওয়ায় রাজধানীর কমফোর্ট হাসপাতালে ভর্তি করানো হলো মা’কে। টানা ছয়দিন আইসিউতে থাকার পর মা আমাদের পুরোপুরিই প্রাণহীন হয়ে গেলেন। রাতের শেষদিকে আমরা সবাই হাসপাতাল থেকে মায়ের নিথর দেহটাকে নিয়ে মুক্তাগাছার উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। ভোরে যখন আমরা মুক্তাগাছায় পৌছলাম তখন চারদিকে কুয়াশা। । শীতের কামড়কে উপেক্ষা করেই মাকে এক নজর দেখার জন্য শত শত মানুষের ভিড়। গেইটের কাছে দোলনচাপা নতজানু হয়ে আছে। পুরো উঠোনজুড়ে অদ্ভুত এক বিষাদ নেমে এসেছে। কত মানুষ ! অথচ কী ভয়ঙ্কর শূন্যতা। এ্যাম্বুলেন্স থেকে মা’কে উঠোনে রাখা হলো। প্রথম এবং শেষবারের মতো রঙ্গনতলায় গোসল করানো হলো মা’কে। ঘুমন্ত মুখের ওপর যেনো কনেদেখা রোদ্দুর আছড়ে পড়েছে। এতো সুন্দর আলোকিত মুখ আর দেখিনি।
 
রঙ্গনের থোকায় থোকায় তখনও কুয়াশা টুপটাপ ঝরছে। ওগুলো কি সত্যিই কুয়াশা ছিলো নাকি কান্না! জলপাইয়ের লালপাতায় চাপা আর্তনাদ। বেলা বাড়ছে কিন্তু সূর্যের দেখা নেই! সূর্যও বুঝি মুখ লুকিয়েছে মেঘের চাদরে। চুপিচুপি ছুয়ে গেছে মা’কে শেষবারের মতো মায়ের কপালে হাত রাখলাম। সাদা ধবধবে কাপড়ে মায়ের সারা শরীর আবৃত। পুরো বাড়িটি যেমন স্থির ঠিক তেমনি আমাদের মায়ের শরীরও স্থির। আমার চোখে মহাসাগর আছে। কান্না আমার ফুরোয় না। এ কান্না ফুরোবার নয়। একসময় সবকিছু অদৃশ্য হয়ে যায়। বড়বেশী হাহাকার বুকজুড়ে খুবলে খেতে থাকে। তবুও চোখ বুজলে ভেসে ওঠে সেই মুখ। চায়ের কাপে ব্যস্ত মায়ের মুখ। গল্পের আসরে হাস্যমুখী মায়ের মুখ। মুক্ত উঠোনে একপিঠ খোলাচুলে লিখতে থাকা মায়ের মুখ। স্মৃতিচারণ করতে যেয়ে আবেগাপ্লুত মায়ের মুখ। এমন অসংখ্য মুখ আমি রোজ দেখি। আমার গলার কাছে কেমন এক কষ্টের দলা আটকে থাকে। যেদিকে তাকাই সবই শুধু ঝাপসা লাগে।
 
এক বছর হতে যাচ্ছে, মা আমাদের মাঝে শারীরিকভাবে নেই। মৃত্যু মানুষকে কতটা অসহায় করে দেয়, তা বুঝতে পারছি। যতই বলি – মা শারীরিকভাবে নেই কিন্তু মানসিকভাবে আছেন। এই বিষয়টি এখন নিজের কাছেই বিরক্তিকর ঠেকে। মা’কে জড়িয়ে ধরতে পারি না। কণ্ঠস্বর শুনতে পারি না। একসাথে চায়ের আসর জমাতে পারি না। কোনো  অভিমানও করতে পারি না। এতকিছুর অভাব বারবার তাড়িয়ে বেড়ায় আমাকে। ভালোবাসার মহাকাশজুড়ে মা আছেন। স্বর্গীয় সেই ভালোবাসা। মা আমাদের ভালো থাকবেন নিশ্চয়ই।

ছবি
সেকশনঃ সাধারণ পোস্ট
লিখেছেনঃ স্বপ্নের কারিগর তারিখঃ 10/01/2021
সর্বমোট 128 বার পঠিত
ফেসবুকের মাধ্যমে কমেন্ট করুণ

সার্চ