ব্যাকগ্রাউন্ড

ফেইসবুকে!

গোয়েন্দা-গল্প: গোয়েন্দা লালভাই: অধ্যাপক-খুনের রহস্য (শেষপর্ব)



গোয়েন্দা-গল্প: গোয়েন্দা লালভাই
অধ্যাপক-খুনের রহস্য (শেষপর্ব)
সাইয়িদ রফিকুল হক

 
আজকে আমরা সরকারবাড়ির কাছে এসে দেখি, সেই পুলিশপ্রহরা আর নাই! এমনকি সেখানে কোনো দারোয়ান পর্যন্ত নাই! আমরা খুব অবাক আর বিস্মিত হলাম। এমনটি তো হওয়ার কথা নয়! শেষমেশ বুঝতে পারলাম, ওদের গ্রেফতারের খবর হয়তো ওসি গোলাম মওলা জেনে গিয়েছে। সে এখন হয়তো নিজে বাঁচার জন্য অন্য কোনো ধান্দা করছে।
 
বাসভবনের কাছে এসে আমরা কলিংবেল চাপতেই গেইটের কাছে এসে দাঁড়ালো শাহীনা বেগম। আজ তার হাবভাব একেবারে অন্যরকম। যেন আমরা তার ভীষণ শত্রু। তবে গতকালের সাংবাদিক-পরিচয়ের মানুষ হিসাবে আমাদের সে চিনতে পারেনি। প্রথম দিনের মতো আজও সে আমাদের কোনো পাত্তা দিলো না। আমরা গোয়েন্দা শুনে সে আবারও ভয়ানক ক্রুদ্ধ হয়ে উঠলো। আর গোয়েন্দা লালভাইয়ের নাম শুনে গতকালের মতো আজও তার হৃদকম্প যেন বেড়ে গিয়েছে।
লালভাই তাকে বাড়ির গেইট খোলার অনুরোধ জানালেন। কিন্তু সে গেইট খোলা তো দূরে থাক গেইট খোলার কোনো আগ্রহও দেখালো না। এতে লালভাই হাল ছাড়লেন না। তিনি তদন্তের স্বার্থে ভিতরে ঢোকার জন্য তাকে বারবার অনুরোধ করলেন। শাহীনা বেগম গেইটের কাছে অনড়ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে রইলো। আর তার চোখ দিয়ে যেন আগুন ঠিকরে বেরুচ্ছে। তাকে এইমুহূর্তে আমাদের বারুদের স্তূপ মনে হচ্ছে।
 
কিছুক্ষণ পরে শাহীনা বেগম বললো, “ভিতরে ঢুকতে চাইলে ওসিসাহেবের সঙ্গে কথা বলেন।”
লালভাই কিছুক্ষণ চিন্তাভাবনা করে শেষে ওসিকে ফোন করলেন। কিন্তু ওসি ফোন ধরছে না। মনে হলো: ওসি যেন বাংলাদেশে নাই!
 
লালভাই অন্তত আরও ত্রিশবার ওসিকে ফোন করে তাকে পেলেন না। শেষমেশ তিনি বিরক্ত হয়ে আমার দিকে চেয়ে বললেন, “তুই কি সাহসের সঙ্গে আজ একটা কাজ করতে পারবি?”
আমি বললাম, “কেন পারবো না লালভাই। অবশ্যই পারবো। আপনি শুধু আমাকে একবার বলে দেখেন।”
লালভাই এবার আমার কাছে এসে বললেন, “কেসটায় খুবই ঘাপলা রে! আর রাঘব বোয়ালরা জড়িত। এর সাধারণ তদন্ত করে কোনো লাভ হবে না। এরা সাধারণ সাক্ষীটাক্ষী একেবারে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিবে। এদের বিরুদ্ধে চাই জলজ্যান্ত স্পষ্ট কিছু। তোকে এখনই এই দোতলা বাড়িটার ভিতরে ঢুকতে হবে। আর ভিতরে ঢুকে ওই মহিলার বেডরুমে এই ছোট্ট ক্যামেরাটা সংগোপনে একটা গোপন-জায়গায় এমনভাবে লাগাতে হবে যে, ওদের কারও নজরে যেন তা না পড়ে। আমার মনে হয়: এতে আমাদের বিরাট সুবিধা হবে। আর মহিলার ছেলে-মেয়ে কেউই এখন বাড়ি নাই। ওদের মনে হয় খুনের আগে-পরে অন্য কোথাও পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। ওরা হয়তো খুনের বিষয়ে কিছু জানতে পারে। তাই, ওদের ব্যাপারে এতসব সতর্কতা। আর এসবকিছুর পিছনে এই ওসি ব্যাটা হয়তো সাহায্য করছে। কারণ, সেই তো আসল খুনী। তাকে ধরতে চাই আরও বড়সড় প্রমাণ। এছাড়া আমাদের হাতে আর কোনো বুদ্ধি নাই।”
লালভাই আমাকে বুদ্ধি শিখিয়ে দিলেন এই দোতলা বাড়িটার ছাদে ওঠার। বাড়ির পিছনদিকটায় বিল্ডিংয়ের গা-ঘেঁষে একটা বড়সড় কাঁঠালগাছ রয়েছে। সেটি মই হিসাবে কাজ করবে। তাছাড়া, আমি গাছে উঠতে পারদর্শী। শিশুকাল থেকে এই বিদ্যা শিখেছি।
লালভাই আবার মূলভবনের গেটের কাছে গিয়ে কলিংবেল চাপলেন। শাহীনা বেগম এবার কাজের মেয়েটাকে সঙ্গে করে আবার গেইটের কাছে এলো। লালভাই এবার শাহীনাকে দীর্ঘসময় এখানে আটকিয়ে রাখার জেরা শুরু করলেন। এরই ফাঁকে আমি লেগে গেলাম নিজের কাজে। আর যে-করেই হোক, বাড়িটার ভিতরে আমাকে ঢুকতেই হবে।
 
গাছে উঠতে আমার কোনো বেগ পেতে হয়নি। ছোটবেলা থেকে আমি গাছে ওঠায় খুব পটু ছিলাম। তাই, দ্রুত গাছ বেয়ে দোতলা ভবনের ছাদে উঠে এর দরজাটা খুলে সিঁড়ি বেয়ে খুব সাহসের সঙ্গে নিচে নেমে এলাম। তারপর অনুমানে বুঝে নিলাম কোনটি মহিলার বেডরুম। এখন শীতকাল। এসি ছাড়ার সম্ভাবনা খুব কম। তাই, এসির পানি-অপসারণের পাইপটার সঙ্গে ছাই রঙের ছোট্ট ক্যামেরাটা বেঁধে দিলাম। পাইপটার সঙ্গে এর রঙটা মিলে যাওয়ায় এটি অন্তত সাতদিন কারও চোখে পড়বে না। কিন্তু আমাদের দরকার আজকের রাতটা। কাজটা দ্রুত শেষ করে আবার উঠে পড়লাম ছাদে। তারপর খুব ধীরেসুস্থে নেমে এলাম ভবনটার পিছনে। একসময় কেউ কিছু বুঝার আগেই দাঁড়ালাম লালভাইয়ের পাশে।
এসে দেখি, লালভাই শাহীনাকে জেরায়-জেরায় একেবারে কাহিল করে ছেড়েছেন।
 
শাহীনা সিংহদ্বারের ওপাশে দাঁড়িয়ে বিরক্তির সঙ্গে লালভাইয়ের সব প্রশ্নের জবাব দিচ্ছেন।
লালভাই বললেন, “অধ্যাপকসাহেবের জমিজমা, টাকাপয়সার হিসাব কে রাখতেন?”
মহিলা মুখভার করে বললো, “কে আবার, ওই খুনীটা। আজাদ কালাম।”
লালভাই হঠাৎ প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে বললেন, “ওসিসাহেবের সঙ্গে আপনাদের পারিবারিক কিংবা ব্যক্তিগত কোনো ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে কিনা?”
একথা শোনামাত্র মহিলা তেলেবেগুনে জ্বলে উঠে বললো, “আপনার কথাবার্তা ভয়ানক নোংরা। আমি এখনই ওসিসাহেবকে সব জানাচ্ছি। এবার বুঝবেন ঠ্যালা।”
কথাটা শেষ করে মহিলা সীমাহীন ক্রোধে ভিতরে গেল।
আমার মনে হলো: গতকালের খামারবাড়ির ঘটনাটা এই বেকুব মহিলার হয়তো জানা নাই। তার একটুখানি জানতে পারলে এই সোনার শরীরে এত রাগ আর থাকতো না।
 
শাহীনা বেগমের অগ্নিমূর্তি দেখে আমরা বোকার মতো সেখানেই কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম।
 
লালভাই একটা গাছের নিচে ঘাসের ওপর বসে পড়লেন। তিনি খুব ভাবছেন। একটু পরে আমাদের দিকে চেয়ে বললেন, “কেসটা খুব জটিল নয়। কিন্তু এ-কে ইচ্ছাকৃতভাবে জটিল করে তোলা হয়েছে। সব দোষ আজাদ কালামের ওপর চাপানোর অপচেষ্টা চলছে। শুধু মরিয়মের সাক্ষীর ওপর ভিত্তি করে কালামকে বাঁচানো যাবে না। আমাদের হাতে আরও কিছু প্রমাণ চাই। আর মনে রাখতে হবে: এই কেসে আসামী একটা থানার ওসি।”
আমরা দুজন তার কথাবার্তা কিছুই বুঝতে পারলাম না। আমাদের মনে হয়েছিল, গতকালের ঘটনার পর আমরা মামলা সমাধান করে ফেলেছি। কিন্তু এখন দেখছি রাঘব বোয়ালকে শায়েস্তা করতে আরও প্রমাণাদি চাই।
 
এমন সময় গেটের বাইরে পুলিশের গাড়ির আওয়াজ পেলাম। আমরা কেউই উঠলাম না। আগের মতো গাছের নিচে বসে রইলাম।
গাড়িটা এসে আমাদের কাছে থামলো। একটা হৃষ্টপুষ্ট পুলিশ-অফিসার গাড়ি থেকে নেমে আমাদের সামনে এসে বললো, “তোদের মধ্যে গোয়েন্দা লালভাই কে রে?”
 
আমি সভয়ে লালভাইয়ের মুখের দিকে তাকালাম। দেখি, তার মুখে কোনো ভয়ডর বলতে কোনোকিছু নাই। তিনি যেন ভাবলেশহীন একজন মানুষ। তিনি চোখের ইশারায় আমাদের এখানে বসতে বলে নিজে উঠে দাঁড়ালেন। তারপর ওসির সামনে দাঁড়িয়ে বললেন, “আপনি বুঝি ওসি গোলাম মওলা।”
লোকটা হিংস্র শুয়োরের মতো গোঁ-গোঁ করতে-করতে বললো, “হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছিস। এবার বল গোয়েন্দা লালভাই কে?”
আমাদের লালভাই একটু হেসে বললেন, “আমি।”
কথাটা শুনে ওসির হিংস্রতা যেন আরও বেড়ে গেল। সে ক্ষুধার্ত নেকড়ের মতো দাঁতমুখ খিঁচিয়ে লালভাইয়ের মুখের কাছে ঘুষি পাকিয়ে বললো, “শোন্ শুয়োরের বাচ্চা, তুই কোথাকার কোন গোয়েন্দারে? আমার কেসের ব্যাপারে বেশি নাক গলাবি না। আমি এই কেসের তদন্ত প্রায় শেষ করে ফেলেছি। আর আসামীও ধরা পড়েছে। তবুও তোর এত মাথাব্যথা কেন? আর যদি তোদের এই বাড়িতে কিংবা এর আশেপাশে তোদের দেখি তাহলে সবক’টাকে একরাতে ক্রসফায়ারে দিবো। বুঝলি শালা?”
লালভাই এবার আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, “তোমরা এসো। আমাদের বাড়ি ফিরতে হবে।”
 
আমরা দুজন প্রায় টলতে-টলতে বাড়ির বাইরে চলে এলাম। লালভাই এবার ধীরপদক্ষেপে আমাদের পিছনে গেইট পার হলেন। তিনি এখনও শান্ত আর ধীরস্থির। তার চেহারায় পরাজয়ের কোনো আশংকা নাই।
 
আমরা হেঁটেই ধামরাই-বাসস্ট্যান্ডে এলাম। আবার গাড়ি ধরতে হবে। কিন্তু ফিরতি গাড়িতে চড়লাম মাত্র দুজন। আমি আর আতিক ভাই। লালভাই আমাদের গাড়িতে তুলে দিয়ে মহূর্তের মধ্যে কোথায় যেন হাওয়া হয়ে গেলেন।
সারারাস্তা আমরা দুজন লালভাইয়ের চিন্তায় কত কী ভাবতে লাগলাম। আমরা বাসায় ফিরলাম ঠিক দুপুরে। আর তখনও আমাদের লালভাইয়ের জন্য খুব চিন্তা হচ্ছিলো।
বিকালে কয়েকবার লালভাইয়ের বাড়িতে গিয়ে দেখি তখনও তিনি আসেননি। দুশ্চিন্তা যেন আরও বেড়ে গেল। খানিকক্ষণ পরে দেখি লালভাইয়ের চিন্তায় আতিক ভাইও এসে উপস্থিত হয়েছেন।
তিনি আমার পাশে বসে বললেন, “তোমার ভাইটা খুব সাহসী। কিন্তু কোথায় যে গেল!”
কী জবাব দিবো তাকে? আমিও তা-ই ভাবছি।
 
আমরা যখন ভাবনাসাগরে একেবারে হাবুডুবু খাচ্ছিলাম—তখন এলেন আমাদের লালভাই। দেখি, তার মুখে বিজয়ের হাসি। আমরা দুজন একসঙ্গে বললাম, “কেসটার এবার সমাধান হলো নাকি?”
লালভাই মুচকি হেসে বললেন, “না এখনও হয়নি। তবে কাল সকালে সব রহস্যের সমাধান হয়ে যাবে। তোরা এখন ভাবনাচিন্তা রেখে যার-যার বাড়ি ফিরে যা। কাল ভোরে আমার এখানে চলে আসবি। আগামীকাল একসঙ্গে আমরা আবার সরকারবাড়িতে যাবো।”
আতিক ভাই যেন আঁতকে উঠে বললেন, “তাইলে তো ক্রসফায়ারে যেতে হবে!”
লালভাই বললেন, “সে ভয় আর নাই। আমি সারাদিনে এর একটা ব্যবস্থা করে এসেছি। আজ আর শুনে কাজ নাই।”
আমরা দুজন লালভাইয়ের বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলাম। এখন আমাদের অনেক ভালো লাগছে।
 
পরদিন সকালে সরকারবাড়িতে গিয়ে দেখি বাড়ির সামনে র‌্যাবের একটা গাড়ি লালভাইয়ের জন্য অপেক্ষা করছে।
লালভাইকে দেখামাত্র মেজরসাহেব গাড়ি থেকে নেমে বললেন, “আসুন গোয়েন্দাসাহেব, এবার বাড়ির ভিতরে যাওয়া যাক।”
আমরা আজ বিনাবাধায় বাড়ির ভিতরে ঢুকলাম। আর সেই মহিলা আজ সহজে গেইটও খুলে দিল। আমরা বাড়ির ভিতরে ঢুকলাম। এরপর লালভাই আমাকে শাহীনা বেগমের বেডরুমে ঢুকে সেই ক্যামেরাটা নিয়ে আসতে বললেন।
আমি মহিলার বেডরুমে ঢুকে দেখি, ক্যামেরাটা আগের মতোই রয়েছে। সেটা সাবধানে খুলে এনে লালভাইয়ের হাতে দিলাম।
মেজরসাহেব হাসিমুখে লালভাইয়ের হাত থেকে ক্যামেরাটা গ্রহণ করে এদের বাড়ির ড্রইংরুমে সবাইকে নিয়ে বসলেন। তারপর বড় টিভিটার সঙ্গে ক্যামেরার সংযোগ ঘটালেন। আর তখনই ভেসে উঠলো অধ্যাপক আবুল হাসানের পুত্রবধূ ও ওসি গোলাম মওলার পরকীয়ার গোপন ও বীভৎস দৃশ্য। আর তাদের গতরাতের গোপন-শলাপরামর্শও। তারাই অধ্যাপকসাহেবকে খুন করেছে গলাকেটে। এবার প্রমাণ মিলেছে একেবারে হাতেনাতে।
 
র‌্যাব-মেজর দ্রুত ওসিকে গ্রেফতারের নির্দেশ দিলেন। মেজরসাহেবের নির্দেশে র‌্যাব-সদস্যরা কাজে নেমে পড়লো। তারা ধামরাই-থানা থেকে ওসি গোলাম মওলাকে ধরে আনতে গেলেন।
 
আমরা ভিডিও দেখে বুঝলাম, অধ্যাপকসাহেবকে হত্যা করেছে তারই পুত্রবধূ শাহীনা বেগম ও তার পরকীয়া প্রেমিক ওসি গোলাম মওলা। আর এ দুজন নিজেদের স্বার্থের জন্য বলির পাঁঠা বানাতে চেয়েছিল তাদের পরকীয়ায় বাধাদানকারী তরুণ আজাদ কালামকে। বিদেশে থেকে অধ্যাপকসাহেবের একমাত্র পুত্র আবুল বাশার সরকার যেন আর কখনো দেশে ফিরতে না পেরে সেজন্য তাকেও এই খুনের মামলার আসামী করা হয়েছিল। ঠিক একইভাবে মামার বিষয়সম্পদ থেকে চিরতরে দূরে সরিয়ে দেওয়ার জন্য আজাদ কালামের ছোটভাই আজাদ রায়হানকেও খুনের আসামী বানানো হয়েছিল। ছেলে-মেয়ে দুটোকে সরিয়ে রাখা হয়েছে। তাদের পরকীয়ার সুখের জন্য এতসব ঘটনা ঘটেছে। প্রমাণিত হলো—মরহুম অধ্যাপকসাহেবও তাদের এই অনৈতিক সম্পর্ক মেনে নিতে পারেনি। তাই, প্রতিহিংসাবশত তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। ওসি গোলাম মওলা খামারবাড়িসহ সবকিছু গ্রাস করতে চেয়েছিল। 

অনেক কর্মব্যস্ততা-শেষে লালভাই আমাদের দুজনকে নিয়ে ‘সরকার-মঞ্জিলে’র বড় বকুলগাছটার নিচে দাঁড়ালেন। তারপর তিনি ধীরে ধীরে বলতে লাগলেন, “শুরুতে আমি তোমাদের বলেছিলাম যে, এই কেসটাতে দুইজন মহিলা ও একজন পুরুষ জড়িত। তা ছিল গোরস্থানের পাশে রক্তমাখা কাপড়চোপড় পাওয়ার পর ধারণা থেকে। কিন্তু যখন দেখলাম, মহিলা একজন উধাও—তখন ধারণা পাল্টালাম। একজন মহিলাই জড়িত। মামলাটাকে অনেক জটিল করার চেষ্টা করেছিল ওসি গোলাম মওলা। কিন্তু পারেনি। গোরস্থান থেকে রক্তমাখা এতসব কাপড়চোপড় পাওয়ার পর আমি বুঝতে পারলাম, কালাম আজাদ সম্পূর্ণ নির্দোষ। তার কারণ, কালাম যদি অপরাধী হতো—তাহলে, সে ধরা পড়ার পর কীভাবে এতসব আলামত গোরস্থানের পাশে ফেলে রাখবে? আর তার দুজন মহিলা সঙ্গীর প্রয়োজন হতো। কিন্তু তার কোনো আত্মীয় মহিলা এখানে বসবাস করতো না। এগুলো যে শাহীনার—তা আমার দেখেই মনে হয়েছিল। তবুও সবকিছুর প্রমাণ প্রয়োজন। এজন্য আজ আমি শাহীনার কথিত সাক্ষাৎকার নেওয়ার সময় সাজিদকে ড্রইংরুমে বসিয়ে রেখে খুব কৌশলে দুই-দুইবার শাহীনার বেডরুমে ঢুকে পড়েছিলাম। তার আশেপাশেও ভালোমতো ঢুঁ মেরেছি। আর সবজায়গায় মিলিয়ে দেখেছি, গোরস্থানে প্রাপ্ত একসেট কাপড়চোপড়ের সঙ্গে শাহীনার পোশাক সম্পূর্ণ মিলে যাচ্ছে। শুধু বুঝতে পারিনি, ওই সময় শাহীনার বেডরুমের পাশের রুমটাতে কে ছিল! সে তার ছেলে-মেয়ের কথা বলে এতবড় একটা সত্য আড়াল করতে চেয়েছিল। আমার এখনও মনে হয়: তখন গোলাম মওলা ভিতরেই ছিল। আমরা এত সকালে এসে পড়ায়—সে ভিতরে আটকা পড়ে যায়। তারপর আমরা যখন খামারবাড়ি-অপারেশনে যাই—তখন সে আলগোছে সেখান থেকে বেরিয়ে থানায় হাজির হয়। আর গোলাম মওলাই কেসটাকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার জন্য শুরু থেকে এ কয়েকদিন এতসব অপচেষ্টা করেছিল। আর সে-ই সমস্ত আলামত বিনষ্ট করে মরহুম অধ্যাপকসাহেবের লাশ তড়িঘড়ি করে দাফন করেছিল। এবার সে ও তার পরকীয়ার দোসর শাহীনা পাপের শাস্তি পাবে।”
আতিক ভাই একটু হেসে লালভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, “প্রোফেসর, একটা বিষয়ে এখনও আমার মনে খটকা লেগে আছে!”
লালভাই একটু গম্ভীর ও উদ্বিগ্ন হয়ে বললেন, “বল তো কী বিষয়?”
আতিক ভাই বললেন, “অধ্যাপকসাহেব যে-ঘরটাতে খুন হয়েছেন—ওরা সে-ই ঘরটা তালাবদ্ধ করে রেখেছিল কেন? আর তা আমাদের দেখতেই বা দেয়নি কেন? আর কী আছে ওর ভিতরে?”
লালভাই এবার হেসে বললেন, “ও এই ব্যাপার! আমি ভেবেছিলাম আরও জটিল কিছু। আরে, সেখানে এখনও অনেক আলামত আছে। অধিকাংশ আলামত ওরা তড়িঘড়ি করে গোরস্থানের কাছে ওই জঙ্গলটাতে ফেলে রেখেছিল। বাকি আলামতসমূহ এখনও ওই ঘরের ভিতরেই রয়েছে। বোঝ না কেন—একটা জলজ্যান্ত মানুষখুন হয়েছেন—তার কত আলামত থাকে। সবটা ওরা হয়তো ধুয়েমুছে সাফ করে ফেলতে পারেনি। এজন্য প্রচুর সময়ের প্রয়োজন। কিন্তু ওরা একটা রাতের মধ্যে অনেককিছু—আলামত গুছিয়ে কবরস্থানের কাছে জঙ্গলে ফেলেছে। তারপর রুমটা হয়তো ধোয়ামোছাও করেছে। তারপরও অনেককিছু রয়ে গিয়েছে। ওই একরাতের মধ্যে ওরা নিজেদের পোষা-ডাক্তারের দ্বারা অধ্যাপকসাহেবের দেহ-ময়নাতদন্ত করে তা নিজেদের হেফাজতে রেখেছে। আর সবকিছু শেষ করে দেওয়ার জন্য খুব সকালে অধ্যাপকসাহেবকে তারই বাড়ির পাশে তারই জায়গার কবরস্থানে দাফন করেছে। ওরা ভেবেছিল, এভাবেই সব ওদের নিয়ন্ত্রণে থাকবে। কিন্তু বিধি বাম। কেসটা আমাদের হাতে চলে আসে। আর তুমি যে-তালাবদ্ধঘরটার কথা বলছো—সেটা এখন র‌্যাবের হেফাজতে। তোমার যদি ঘরটা দেখতে ইচ্ছে করে তো—আমরা নাহয় একদিন র‌্যাব-মেজর সাহেবের সঙ্গে দেখা করে তা দেখবো। কিন্তু আজ এই ঝামেলার মধ্যে আর নয়।” 
আতিক ভাই একথা শুনে হেসে ফেললেন আর বললেন, “তার আর দরকার হবে না। আমার মনের খটকা দূর হয়েছে। এবার যা করার র‌্যাবই করবে। ওদের দফারফা আশা করি শেষ হয়ে যাবে।”
 
ঘণ্টাখানেক পরে র‌্যাব-সদস্যদের তত্ত্বাবধানে ওসি গোলাম মওলা ও তার দোসর শাহীনা বেগমকে কোমরে দড়ি বেঁধে জেলহাজতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আর এই ঘটনা দেখতে সরকার-মঞ্জিলের সামনে জড়ো হয়েছে হাজারখানেক এলাকাবাসী।
থানা থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে আজাদ কালামকে। তার মুখে বিশাল সন্তুষ্টির ছাপ। সে আমাদের লালভাইকে প্রথমে কদমবুসি করে তারপর তাকে বুকে জড়িয়ে ধরলো। তার চোখে আনন্দাশ্রু।
আমরা এবার বুঝতে পারলাম, গতকাল আমাদের লালভাই একাই র‌্যাবের সঙ্গে সুপরামর্শ করে সবকিছু ঠিকঠাক করে রেখেছিলেন। আর তার বুকপকেটে রাখা ক্যামেরায় ধারণকৃত ওসির ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণের ভিডিও র‌্যাবকে দেখিয়ে তাকে খুব সহজে ব্যাকফুটে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। জয় আমাদের লালভাইয়ের। জয় বাঙালির।
 
আমরা প্রশান্ত মনে ফিরে এলাম সাভারে। আবার প্রহর গুনতে হবে নতুন কোনো কেসের। আবার জমজমাট হয়ে উঠবে লালভাইয়ের গোয়েন্দা-অফিস।
 
 
সাইয়িদ রফিকুল হক
মিরপুর, ঢাকা, বাংলাদেশ।
 ১০/০৬/২০১৯

ছবি
সেকশনঃ গল্প
লিখেছেনঃ সাইয়িদ রফিকুল হক১ তারিখঃ 04/11/2019 07:23 AM
সর্বমোট 130 বার পঠিত
ফেসবুকের মাধ্যমে কমেন্ট করুণ

সার্চ