ব্যাকগ্রাউন্ড

ফেইসবুকে!

হাটহাজারী-মাদ্রাসার ছাত্রদের মন্দির-রক্ষার হাস্যকর ছবি ও কিছু ভণ্ডামি




হাটহাজারী-মাদ্রাসার ছাত্রদের মন্দির-রক্ষার হাস্যকর ছবি ও কিছু ভণ্ডামি
সাইয়িদ রফিকুল হক

 
এই ছবিটা ফেসবুকের ওয়ালে-ওয়ালে ঘুরতে দেখে প্রথমেই আমার সন্দেহ হয়েছিল যে, এটি একটি মেলোড্রামা বা অতি-নাটক। এখানে, হাটহাজারী-মাদ্রাসাসহ দেশের সর্বস্তরের মাদ্রাসার ভাবমূর্তিবৃদ্ধি করতে এবং মাদ্রাসাশিক্ষার পক্ষে প্রচার-প্রসারের জন্য দেশের কিছুসংখ্যক স্বার্থানেষ্বীমহল এই ছবিটা উদ্দেশ্যমূলকভাবে ‘রাজনীতির বাজারে’ ছেড়েছে। আর এটি সম্পূর্ণ ভুয়া ছবি। এই ভুয়া ছবিতে দেখা যাচ্ছে: হাটহাজারী-মাদ্রাসার কয়েকটা ছাত্র মাদ্রাসার পাশে অবস্থিত একটা মন্দিরের সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে—এদের কয়েকটাকে আবার হাতধরাধরি করা অবস্থায়ও দেখা যাচ্ছে। প্রচার করা হয়েছে: এরা নাকি উক্ত মন্দির-রক্ষার জন্য সোচ্চার। খবরটা যে কতবড় ভণ্ডামির চিত্র তাতে কোনো সন্দেহ নাই। ২০-এ অক্টোবর ভোলার বোরহানউদ্দিনে একজন হিন্দু-যুবক বিপ্লব চন্দ্র শুভ’র ফেসবুক-আইডি ‘হ্যাক’ করে তাকে ফাঁসাতে গিয়ে ধরা পড়েছে দুই মুসলমান যুবক। এদের নাম মো. শরীফ ও মো. ইমন। এরা যে জন্মগতভাবে মুসলমান তাতে কোনো সন্দেহ নাই। আর এই দুইটা নরপশু ইসলামীছাত্রশিবিরের সক্রিয় কর্মী। বিপ্লব চন্দ্রের আইডি ‘হ্যাক’ করে ‘মহানবী’র নামে নানারকম আজেবাজে কথাবার্তা পোস্ট করা হয়েছে। আর এই মিথ্যা-ঘটনা ও মিথ্যা-রটনার বিরুদ্ধে মাঠে নেমেছে মাদ্রাসার ছাত্রসহ সর্বস্তরের দেশবিরোধী ‘তৌহিদী জনতা’ নামের কতকগুলো হিংস্র প্রাণি। এরা সবকিছু তছনছ করে ফেলতে উদ্যত হয়েছিল। ইতোমধ্যে এরা অনেক নাশকতাও করেছে। তারা হিন্দুদের ওপর হামলারও মহাপরিকল্পনা করেছিল। পুলিশকে পিটিয়ে মারতে চেয়েছিল (এসবকথার ভিডিও-প্রমাণ রয়েছে)। ইতোমধ্যে এরা ভোলার কয়েকটি হিন্দুবাড়িতে হামলা ও লুটপাট করেছে, মন্দিরে ঢুকে ভাংচুরও করেছে। এদের তাণ্ডবের কারণে দেশের বিভিন্নস্থানে মন্দির ভাংচুরসহ হিন্দুদের ওপর হামলাও হয়েছে। আর সেই সময় একটি ছবিতে দেখানো হয়েছে: চট্টগ্রামের কুখ্যাত ‘হাটহাজারী-মাদ্রাসা’র ছাত্ররা নাকি তাদের মাদ্রাসার পার্শ্ববর্তী একটি ‘মন্দির-রক্ষা’র জন্য পাহারা দিচ্ছে! অথচ, ‘হাটহাজারী-মাদ্রাসা’র কিছুসংখ্যক ছাত্রও ভোলার এই অপআন্দোলনে শরিক হয়েছে (যারা দ্রুত ঘটনাস্থলে যেতে পেরেছে তারাই শামিল হয়েছে)। ইতঃপূর্বে হাটহাজারী-মাদ্রাসার ছাত্রদের দ্বারা হিন্দুদের মন্দির ভাংচুরসহ হিন্দুনির্যাতনের নানারকম ভয়াবহ চিত্র প্রকাশিত হয়েছে। আর এরাই কিনা এখন করবে মন্দির-রক্ষা?





এই সেই ভুয়া ছবি। যাকে ভোলার সাম্প্রদায়িক-ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে হাটহাজারী-মাদ্রাসাছাত্রদের কথিত সম্প্রীতির দৃষ্টান্ত বলে অপপ্রচার চালানো হয়েছিল।

 
১৯৭১ সালে, এই ‘হাটহাজারী-মাদ্রাসা’ ছিল পাকিস্তানী-আর্মিদের অন্যতম বৃহৎ ক্যাম্প। এখানে, গড়ে উঠেছিল বাংলাদেশবিরোধী সর্বস্তরের ‘রাজাকার-তৈরি’র খামার। এখানে, মুক্তিযোদ্ধাদের ধরে এনে হত্যা করা হতো। এটি ছিল ‘পাকবাহিনী ও রাজাকারদের’ বৃহৎ নির্যাতন-ক্যাম্প। মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে জড়িত সকল মানুষের খবরাখবর পাকবাহিনীর কাছে পৌঁছে দিতো এই হাটহাজারী-মাদ্রাসার ছাত্ররা। এটি ছিল নারীধর্ষণের ক্যাম্প। পাক-আর্মিদের জন্য এটি ছিল বেহেশতো। ২০১৩ সালের ৫ই মে ‘হেফাজতে শয়তানে’র তাণ্ডবলীলার কথা আমাদের মনে আছে—বাংলাদেশবিরোধী এই কুখ্যাত ‘হেফাজতে শয়তানে’র জন্মই হয়েছে এই হাটহাজারী-মাদ্রাসায়। ২০১৩ সালের ৫ই মে তারা বাংলাদেশটাকে ধ্বংস করার জন্য সর্বগ্রাসী হাঙ্গরের মতো কী তাণ্ডবলীলাই না চালিয়েছিল! ১৯৯০ সালে ভারতে ‘বাবরী-মসজিদ’ ভাঙ্গাকে কেন্দ্র করে এই ‘হাটহাজারী-মাদ্রাসা’র ছাত্ররা বাংলাদেশের হিন্দুসম্প্রদায়ের ওপর শতাব্দীর ভয়াবহ তাণ্ডবলীলা চালিয়েছিল। এরা সেই সময় স্থানীয় হিন্দুদের বাড়িঘরে আগুন দিয়েছিল, লুটপাট করেছিল, নারীনির্যাতন করেছিল ও মন্দির ধ্বংস করেছিল। আর এরাই বুঝি এখন মন্দির-রক্ষা করবে? দেশে বুঝি আর মানুষ নাই?
 
প্রাপ্ত ছবিটা নিয়ে খানিকটা গবেষণা করতেই বেরিয়ে এলো যাবতীয় তথ্য। এই ভুয়া ছবিটি প্রকাশ করেছে দেশের শীর্ষস্থানীয় চোরাকারবারি-গ্রুপের (যমুনা-গ্রুপের) চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম বাবুলের পত্রিকা দৈনিক যুগান্তর। তারাই প্রথম এই ভুয়া ছবিটি তাদের পত্রিকার অনলাইন-ভার্সনে প্রকাশ করেছে। আর তাদের ২০/১০/২০১৯ তারিখের অনলাইন পত্রিকায় এই ছবিটি এখনও আছে। আর সেখানে ছবিটির নিচে লেখা আছে: “ছবি: সংগৃহীত!” অর্থাৎ, এই ছবিটা তাদের কেউ তোলেনি। আর এই ছবিটি দিয়ে ‘হাটহাজারী-মাদ্রাসা’র সম্প্রীতির ভুয়া নিউজ করেছে ‘আবু তালেব’ বলে একটা ব্যক্তি। সে পেশায় হয়তো একটা সাংঘাতিক। আর সে হয়তো ‘যমুনা-গ্রুপে’র পোষ্যকোটার কেউ-একটা হবে। এরা পেইড এজেন্ট মাত্র। এদের দ্বারা দেশে এরকম নানান সংবাদ প্রচার করা হচ্ছে। মনে রাখবেন: ২০১৩ সালের ৫ই মে ঢাকাসহ সারা বাংলাদেশে ‘হেফাজতে শয়তানদের’ তাণ্ডবলীলার প্রতি এই ‘যমুনা-গ্রুপে’র বাবুলের দৈনিক যুগান্তরের অকুণ্ঠ সমর্থন ও মদদ ছিল।
এবার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আসি। এই ছবিটি দিয়ে ‘হাটহাজারী-মাদ্রাসা’র ছাত্রদের সম্প্রীতির দৃষ্টান্ত বিষয়ে একটি বিশেষ প্রতিবেদন (যার শিরোনাম: হামলা থেকে রক্ষায় মন্দিরের নিরাপত্তায় হাটহাজারী মাদ্রাসাছাত্ররা) প্রকাশ করেছে যুগান্তরের বিশেষ প্রতিনিধি আবু তালেব। সে হাটহাজারী থেকে এই নিউজ সরবরাহ করেছে (পত্রিকায় তা-ই লেখা আছে)। কিন্তু এই বিষয়ে সে নিজে কোনো ছবি তুলতে পারেনি, এবং কোথাও কোনো বাস্তব ছবি বা ভিডিও খুঁজে পায়নি। তাই, কোথা থেকে একখান ছবি সংগ্রহ করে তার নিচে লিখে দিয়েছে: ছবি: সংগৃহীত! এত গুরুত্বপূর্ণ একটা নিউজে ছবি—সংগৃহীত! হলুদ সাংবাদিকতা আর কাকে বলে!
 
এই ছবিটি কবেকার তোলা, কে তুলেছে, তার কোনো হদিস নাই। কিংবা এমনও হতে পারে ‘হাটহাজারী-মাদ্রাসা’র অতীত ও বর্তমানের সমস্ত অপকর্ম ধামাচাপা দিতে সুযোগ বুঝে মাদ্রাসার কয়েকটা ছাত্রকে দিয়ে এইরকম ছবি তুলেছে মাদ্রাসা-কর্তৃপক্ষ। কারণ, এরা কখনো অসাম্প্রদায়িক ছিল না, আর এখনও নয়। এরা সবসময় সাম্প্রদায়িক। ১৯৪৬ ও ১৯৪৭ সালের রায়টের সময়ও এদের অপকর্মের ইতিহাস রয়েছে।
 
এই ছবিটির মধ্যে কোনো সম্প্রীতির চিত্র খুঁজে পাইনি। বরং এদের হাবভাব দেখে এটাকে বড়সড় একটা প্রহসন ও স্রেফ ভণ্ডামি বলেই মনে হয়। এর পক্ষে কয়েকটি যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করছি:
 
১. ‘হাটহাজারী-মাদ্রাসা’র ইতিবাচক কোনো ইতিহাস নাই। ১৯৭১ থেকে ২০১৩ সালের ৫ই মে’র হেফাজতি-তাণ্ডব পর্যন্ত তাদের পাপের ইতিহাস বিধৃত হয়েছে। এমনকি বাংলাদেশে যেকোনো ধর্মীয় তাণ্ডবে সবসময় তাদের বড়সড় সম্পৃক্ততা রয়েছে।
 
২. ভোলার পরিকল্পিত এই ঘটনায়ও ‘হাটহাজারী-মাদ্রাসা’র ছাত্রদের সম্পৃক্ততা রয়েছে। তারা কথিত ‘তৌহিদীজনতা’র অংশীদার। এরা কীভাবে মন্দির-রক্ষা করবে?
 
৩. ২০/১০/২০১৯ খ্রিস্টাব্দ ভোলার সাম্প্রদায়িক উস্কানিতে তারাও তাদের মাদ্রাসার পার্শ্ববর্তী ‘শ্রী শ্রী সীতাকালী মন্দির’টি ভাংচুর করতে গিয়েছিল। পরে নাকি কিছুসংখ্যক বিবেকবান ব্যক্তিবর্গের হস্তক্ষেপে তারা এই অপকর্মসাধন করতে পারেনি।
 
৪. উল্লিখিত ছবিটি কোনোভাবেই ভোলার ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে তোলা কোনো ছবি নয়। এটি অন্য কোনো সময়ে কারও দ্বারা তোলা অন্য কোনো ঘটনার ছবি। এই ছবিটা দেখে মনে, হয় তারা রাস্তায় কোনো-কারণে কোনো-একসময় মানববন্ধন করছিল (কোনোভাবেই ‘মন্দির-রক্ষা’ করতে নয়)। আর নিশ্চিতভাবে বলা যায়—এটি আগের তোলা কোনো ছবি। এটিকে ভোলার ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ‘সাম্প্রদায়িক-সম্প্রীতি’র ছবি বলাটা বাংলাদেশে ‘হলুদ-সাংবাদিকতা’র চরম দৃষ্টান্ত।
 
৫. একাত্তর-টিভিতেও এই ছবিটার আলোকে ‘ভোলার সাম্প্রদায়িক-সহিংস ঘটনা’র পরিপ্রেক্ষিতে ‘সাম্প্রদায়িক-সম্প্রীতি’র একটা দৃষ্টান্তস্থাপনের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু একাত্তর-টিভি-কর্তৃপক্ষও জানে না যে, ওই ছবিটা কে বা কারা তুলেছে, আর এটি কোন সময়ের। তারা এই ভুয়া ছবিটা দেখে (উক্ত ছবিটার আলোকে) ‘হাটহাজারী-মাদ্রাসা’র পার্শ্ববর্তী ‘শ্রী শ্রী সীতাকালী মন্দিরে’র সাংগঠনিক সম্পাদক ড. শিপক নাথের সাক্ষাৎকার পর্যন্ত নিয়েছে! শিপক নাথ বলেছেন, মাদ্রাসার ছেলেরা প্রথমে মন্দির ভাঙ্গতে এসেছিল পরে কিছুসংখ্যক লোকের কারণে তা ভাঙ্গতে পারেনি। মাদ্রাসার গুটিকতক ছাত্রও নাকি এই মন্দির ভাঙ্গতে বাধা দিয়েছে! কিন্তু তিনিও কখনো বলেননি যে, ওই ছবিটা ভোলার ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে মাদ্রাসার ছাত্রদের মহানুভবতার ছবি। পরে শিপক নাথ টিভির অনুষ্ঠানে মাদ্রাসার ছাত্রদের কিছুটা প্রশংসা করেছেন। এর কারণ—ছাত্ররা যেন শতবছরের এই পুরাতন মন্দিরটি আর ভাঙ্গার চেষ্টা না করে। একজন সংখ্যালঘু হিসাবে তিনি এই প্রশংসাটা কৌশল হিসাবে করতে বাধ্য হয়েছেন।
 
৬. দৈনিক কালের কণ্ঠও যুগান্তরের মতো অন্ধ হয়ে এই ছবিটা নিয়ে খুব মাতামাতি করেছে। কিন্তু ছবিটা কে, কখন, আর কীসের জন্য তুলেছে—তা কেউ বলতে পারে না।
 
 
এটি সম্পূর্ণ বানোয়াট ও লোকদেখানো অপচেষ্টা মাত্র। আর এই ছবিটার কোনো মা-বাপ নাই। ছবিটা কে তুলেছে? কেউ জানালে বাধিত হবো।
 
 
সাইয়িদ রফিকুল হক
২২/১০/২০১৯
 
 

ছবি
সেকশনঃ ইতিহাস
লিখেছেনঃ সাইয়িদ রফিকুল হক১ তারিখঃ 28/10/2019 02:05 PM
সর্বমোট 216 বার পঠিত
ফেসবুকের মাধ্যমে কমেন্ট করুণ

সার্চ