ব্যাকগ্রাউন্ড

ফেইসবুকে!

শিল্পায়ন

মেয়েকে মারতে খুব বেশি পরিশ্রম করতে হয়নি। ঘুমন্ত মেয়ের মুখের উপর শাদা বালিশটা চাপা দিতেই খানিকটা নড়ে উঠছেলি মাত্র। তবে ক্ষেতমুজুর তালেবের তাতে তেমন কোনো সমস্যা হয়নি। খেটে খাওয়া শরীর। ওইটুকু মেয়ে আর কীই বা প্রতিরোধ করবে! নিষ্পাপ মেয়েটি পাপমুক্ত, বিশুদ্ধ থাকতইে এই কলুষিত পৃথবী থেকে বিদায় নিতে পারল। এইটুকু সান্ত্বনাও বা কম কী? ঘুমন্ত মেয়েটা এখনো যেন ঘুমাচ্ছে। ওর এই ঘুম আর ভাঙ্গবে না কোনোদিন। নিষ্পাপ মুখখানিতে বিন্দুমাত্র, ক্ষোভ, ঘৃণা কিংবা লালসার চিহ্নমাত্র নাই। ঘন কালো চুলের কয়েকটা এলোমেলো হয়ে মুখের ওপর ছড়িয়ে আছে। নিজের মেয়েকে আজকরে আগে এত ভালোভাবে লক্ষ্য করা হয়নি তালেবের। মেয়েটো দেখতে ঠিক ওর মায়ের মতোই হয়েছিল। সেই একই চুল, মুখের গড়ন। আজ ও ওর মায়ের কাছইে চলে গেল। নাহ! এখনো অনেক কাজ বাকি। এভাবে মরা মেয়ের দিকে তাকিয়ে থেকে সময় নষ্ট করার মতো সময় ওর হাতে নেই। না! সন্তান হত্যার দায়ে ধরা পড়ার ভয় ওর নেই। তবে কাজ বাকি অনেক।
তিতলি মানে মেয়ের লাশটি চাদর দিয়ে ঢেকে ঘর থেকে বাইরে এল তালেব। হাঁটতে হাঁটতে চলে এলো মোল্লার দিঘীর পাড়ে। দিঘীর উত্তরের পাড়ে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে তিনটি তাল আর দুইটি সুপারি গাছ। তারই একটি তাল গাছের নিচে দাঁড়িয়ে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল তালেব। চোখের জল যেন জলীয় বাষ্প হয়ে জমে ছিল খানিকটা ফুসরৎ পেতেই ঝর্ণাধারা বইয়ে দিল।
ওর কাঁন্নার শব্দে দিঘীর পাড়ের স্থায়ী বাসিন্দা তাল আর সুপারি গাছের বাবুই পাখিরা আতঙ্কে একযোগে ডেকে উঠল। সামনে যতদূর চোখ যায় মাঠ।মাঠ জুড়ে ধান। মাঠ আর ধানক্ষেত পেরিয়ে সেই কিচিরমিচির শব্দ মিলিয়ে যায় দূর দূরান্তে।
ধান গাছগুলো ধানের শিষের ভাড়ে ভরা যৌবনা নারীর মতন সামনে খানিকটা নুয়ে পড়েছে। দখিনা বাতাসে হেলে দুলে নাচছে ধান গাছ। এবারে যে পরমিাণ ধান হয়েছে এমন ফলন বাপ-দাদার জন্মে দেখে নাই তালেব। অথচ এবারও কৃষকের অবস্থা তথৈবচ। মাঠভরা ধান থাকলেও কামলার অভাবে ধান কাটা যাচ্ছে না। একমণ ধান বিক্রি করে একজন কামলার মুজুরি হয় না। গাঁও গ্রামে জুয়ান পোলাপান এখন আর কামলা দেয় না। শহরে চাকরি করে,প্যান্ট শার্ট পড়ে ঘুরে বেড়ায়। ওর মতো যারা পরর্বিতনটাকে মেনে নিতে পারে নাই তারাই এখনো রয়ে গেছে গ্রামে। তালেব চাইলইে চলে যেতে পারত শহরে। গার্মেন্টস কিংবা কোনো ফ্যাক্টরিতে গিয়ে কাজও জুটিয়ে নিতে পারত। কিন্তু এসব ভাবলইে বাপজানের কথা মনে পড়ে তালেবের। 
বাপজান কইত,”যতই চাকরী কর বাজান, মাটির কাছে তোমাকে ফিরে আসতেই হবে। মাটি নিঙরিয়ে ফসল না ফলাতে পারলে না খেয়ে মরতে হবে বাজান। ট্যাহা চিবিয়ে খেলে পেট ভরবে না বাজান।”
প্রতিবারের মতো এবারও নিজের খানিকটা জমি আর কিছু বর্গা জমিতে ধান চাষ করেছে তালেব। সন্তান লালন পালন করতে যেমন বাবা মা খরচের হিসাবটা করে না কৃষকও তেমনি ফসল ফলানোর সময় খরচের হিসাব নিয়ে বসে না। বীজ থেকে শুরু করে সার অব্দি সব কিছুরই ব্যবস্থা করতে হয় হাসিমুখে। নিজের জন্য এমনকি পরিবারের জন্য খাবার না কিনে হলেও চাষের জমিতে পানি সেচের ব্যবস্থাটা করতেই হয়। এবার ধানের ফলন দেখে ভেবেছিল যাক বাঁচা গেল। এবার ধান বেঁচে মেয়ের একটা বিয়ে দিয়ে দেবে। মা মরা মেয়ে। আর কত দিনই বা ঘরে রাখবে! দিনকালও আজকাল ভালো না। তাছাড়া মহাজনের টাকাটাও শোধ দিতে হবে। গতবারের টাকা শোধ দিতে পারে নাই ও। বন্যায় ফসল ভেসে গেছে। তার উপর এবার আবার ট্যাহা নিয়ে ধান লাগিয়েছে।
বিঘা খানেক ধান কাটা হয়েছে ওর। এই ধান বেঁচে বাকি ধান কাটার বন্দোবস্ত করতে হবে। ধান নিয়ে বাজারে গিয়ে মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ল ওর, চাতালের মহাজনেরা যে দাম হাঁকছে সে দামে ধান বেঁচলে এবছর মেয়ের বিয়ে তো দিতে পারবেই না সুদের বোঝাও বাড়বে। তাছাড়া সারা বছরের খরচাগুলোও বাকির খাতাতেই থাকবে। পানির দামে ধান বিক্রি করে মোল্লার চায়ের দোকানে গিয়ে বসল তালেব।
নানান জন নানান বিষয় নিয়ে কথা বলছে। ওর কানে কিছুই ঢুকছে না। পাশের বেঞ্চে বসে আছে দুই ছোকরা। তাদরে মধ্যে একজনকে ও চেনে। রামগাতীর জুড়ান মোল্লার পোলা সুরুত। সেই সুরুতই বলছে, “দেখেলি ময়দান, এবারও ধানের দাম নইে। কৃষিমন্ত্রী নাকি কাল কইছে, “এবার আর ধানের দাম বাড়বে না। সরকার বেশি ধানও কিনতে পারবে না। সরকাররে থোয়ার জায়গা নাই।”
পাশ থেকে ময়দান বলে ওঠে, “হালারপুতদের রাজনীতি বুঝি না। পানির দামে ধান বেঁচি আইলাম অথচ চালের বাজারে গিয়ে দেখ আগুন লাগছে।। সবাই খালি আমাগোই পুটকি মারে। নিজেরা তো সুখইে থাকে। আমাগো নিয়ে ভাববে কেন? এসব বালছাল থুইয়া চল গার্মেন্টসে যাই।”
তারপর সুরুত কী কইল সেসব তালেবের কানে ঢুকে না। ওর মাথায় শুধু একটা কথাই ঘুরপাক খাচ্ছে, যায়গা নাই, সরকার ধান কিনব কম, দাম বাড়বে না, তিতলির বিয়ে, সুদের টাকা, মাঠ জুড়ে পাকা ধান।

চাস্টাল থেকে বের হয়ে বিড়ি টানতে টানতে বাড়ির পথে পা বাড়ায় তালবে। বটতলায় মানুষের জটলা দেখে খানিকটা দাঁড়ায় ও। বটতলার বেদির উপর দাঁড়িয়ে সোবহান মাস্টার কী সব বলছে, 
“সারা দ্যাশে ধান হয়ছে দুই কোটি ম্যাট্রিক টন। সরকার কিনবে মাত্র দেড় লাখ ম্যাট্রিক ধান। অথচ চাল কিনবে দশ লাখ ম্যট্রিক টন। এ সরকার তোমার আমার সরকার না ভাই। এ সরকার মিল মালিকের সরকার।” সব কথা বুঝতে পারে না ও। এমনকি লাখ কোটির হিসাব না বুঝলেও ভয়ে ওর গায়ের লোম খাড়া হয়ে যায়। বুঝতে পারে সামনে খুব খারাপ কিছু্ই ঘটতে যাচ্ছে। সারা দেশে কোথাও কোথাও নাকি চাষারা আন্দোলনেও নেমেছে। ওর মাথায় এত কিছু ঢুকে না। শুধু ঘুরপাক খায় তিতলির বিয়ে, সুদের টাকা, মাঠ জুড়ে পাকা ধান।

বাড়ি ফেরার পথে মহাজনের সাথে দেখা। ওকে দেখেই মহাজন দাঁত কেলিয়ে হাসি দিয়ে বলে, 
“কী মিয়া! এবার তো ভালই ধান ফলাইছ। ট্যাহাডা দিয়ে যাবা কবে? গতবারের ট্যাহাও তো বাকি আছে তোমার। এবার কিন্তু সুদের হারটাও চড়া!”
বলইে আবার দাত কেলিয়ে হাসতে থাকে মহাজন।তালেবের মুখ দিয়ে কথা ফোটে না। বোবার মতো তাকিয়ে থাকে মহাজনের চকচকে শার্ট আর হাতে জ্বলজ্বল করা সোনার আংটির দিকে। বাড়িতে ঢুকতেই তিতলি হাসতে হাসতে এগিয়ে আসে। বাপের খালি হাত দেখে মনটা খারাপ করে চুপচাপ ঘরে চলে যায় মেয়েটা। পড়নের কাপড়টা ছিড়ে গেছে অনেকদিন। জোড়াতালি দিয়ে এত দিন চালিয়ে দিচ্ছিল। সে কথা তালেবেরও অজানা নয়। ধান বেঁচে তিতলির জন্য একটা শাড়ি আনবে সে কথা সে হাঁটে যাওয়ার আগেও বলে গেছে। অথচ এসেছে খালি হাতে। মেয়ের চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকে তালেব। কিন্তু তাকিয়ে থাকা বাদে ওর কোনো ভাবান্তর হয় না।

অর্ধেক ধানও কাটা হয়নি।ধানগুলো রাগী অভিমানী বালিকার মতো চুপসে গেছে। হেলেও পড়েছে অনেকটা। তালেব আজকাল মাঠেও যায় না। তিতলি বাপের কাজকর্মে বেশ বিরক্ত। মা মারা যাবার পর বাপজানই তার একমাত্র অবলম্বন। সংসারে দুটি মাত্র প্রাণী। তাদরে মধ্যে একজন আজকাল কথাই বলে না। খাওয়া দাওয়াও করে না ঠিকঠাক। বাড়িটা ভুতুরে বাড়ির মতো লাগে । তালেব ইদানীং বিকেল হলেই মোল্লার চায়ের দোকানে গিয়ে বসে। সেখানে কান পেতে মানুষজনের কথা শোনে। কোনো আলোচনায় অবশ্য অংশগ্রহণ করে না। ধানের দাম ছাড়াও এখানে এলে নানান মানুষের মুখে নানান আজগুবি আর উদ্ভট কথা শোনা যায়। আজ চোখ ছানাবড়া হয়ে যাওয়ার মতো একটা কথা শুনল। সোবহান মাস্টাররে সাথে এক ছোকরা বসে ছিল। তার মুখইে শোনা। আম্রিকা না কী এক দ্যাশ আছে সেখানকার চাষারা নাকি ম্যালা ট্যাহা পয়সার মালিক। কারো কারো নিজের হেলিকপ্টারও আছে। ওরা যে গরু পালে তার জন্যও নাকি সরকার ওদের ট্যাহা দেয়। শুধু দেয়ই না, যে পরমিাণ ট্যাহা দেয় তা দিয়ে নাকি বাংলাদশেরে একটা পরিবার সারা জীবন পায়ের উপর পা তুলে খেতে পারবে। আমাগো দ্যাশের মানুষের চেয়ে ওদেশের গরুর কদর বেশি। ওর একবাররে জন্য মনে হয়; আহা এ জীবনে যদি বাংলাদেশের চাষা না হয়ে ওই দ্যাশের গরু হয়ে জন্মাতাম তবুও রাজার হালে থাকতে পারতাম! 
পররে কথাটা শুনে ওর মনটা একদম ভেঙ্গে গেল; কোথায় যেন ছাত্ররা ধানের দাম বাড়ানোর জন্য রাস্তায় নেমেছিল। কিন্তু পুলশি ওদের লাঠিপেটা করে খেদিয়ে দিয়েছে। অচেনা অদেখা ছেলেমেয়েগুলোর জন্য ওর বড্ড কষ্ট হতে লাগল। দম আটকে আসছিল চায়ের দোকানের বদ্ধ ঘরে। রাতে খেতে বসে তিতলি আচমকাই বলে উঠল; “বাবা চলো; আমরাও শহরে যাই। আমার বয়সী মেয়েরাও তো গার্মেন্টসে কাজ করে। বাপ বেটি মিলে কাজ করলে আমাগো আর অভাব থাকব না।
একটু থেমে আবার বলে, “শেখপাড়ার জমির শেখের পরিবারের সবাই যাচ্ছে। আমরা চাইলে ওদরে লগেই যেতে পারি।”
মেয়ের কথায় উত্তর দেয় না তালেব। শুধু ফ্যালফ্যালিয়ে তাকিয়ে থাকে। 
তালেব চাইলে অনেক আগেই শহরে পাড়ি জমাতে পাড়ত। কিন্তু ওই যে বাপজানরে সেই কথাটাই যে বারবার কানে বাজে;
ট্যাহা পয়সা চিবাইয়া খাইলে প্যাট ভরবে না বাজান। যদি ফসলই না থাকে তয় ট্যাহা দিয়েই বা কী করবা বাজান?’

ওর ধান মাঠে পড়ে রয়। শুধু ওর না আরও অনেক কৃষকই ধান কেটে ঘরে তোলার সামর্থটুকুও হারিয়ে ফেলেছে। প্রথম ধাপে যে ধান কেটেছিল তা বেঁচে বেশির ভাগ টাকাই সুদের একটা অংশ শোধ করতে লেগেছে। এদিকে কামলার বড় অভাব! যা পাওয়া যায় তার দাম এত বেশি যে কামলা নিয়ে ধান কাটতে হলে আবার মহাজনের কাছে সুদে টাকা নিতে হবে। সেদিন চাস্টালে এক চাষা বলছিল, প্রতি টন ধান উৎপাদনে খরচ হয়েছে ২৪ হাজার ট্যাহা আর সেই ধান বেঁচতে হচ্ছে ১৫ হাজার ট্যাহা। প্রতি টনে ৯ হাজার ট্যাহা গৎসা! নিজের পরিশ্রম, স্বপ্ন, সাধনা এসবের হিসাব আর কে রাখে! গতবারও একই রকম হয়েছিল। এর আগে টমেটো তুলেও বিপাকে পড়তে হয়েছিল। এক মন টমেটোর দাম বিশ ট্যাহা ভাগ্য ভালো হলে পঁচিশ ট্যাহাও পাওয়া যেত। অথচ সেই টমেটো বাজার অব্দি নিয়ে যেতে দুইশ ট্যাহা ভ্যান ভাড়াই দেয়া লাগত! কৃষক টমেটো রাস্তায় ফেলে দিয়ে বাড়ি ফিরে এসেছে। 
তালেব ওর বাপ দাদার মুখে শুনেছে, এর আগেও একবার একই রকম হয়েছিল। কৃষক যা ফলায় তাতেই লস আর লস। চাষবাস ফেলে কৃষকেরা দলে দলে নতুন নতুন পাটকল, চটকলে চাকরি নিল। এখন নিচ্ছে গার্মেন্টসে। এখন খবর আসে সেইসব পাটকল, চটকলের শ্রমিকেরা বেতন না পেয়ে রাস্তা অবরোধ করে রাখে। একদিন হয়ত এসব গার্মেন্টস শ্রমিকেরাও বেতন ভাতার অভাবে না খেয়ে মরবে, রাস্তা বেরিকেড দিয়ে আন্দোলন করবে। এদেশের অভাগা চাষা যেদিকে যায় সেদিকেই সাগরের পানি শুকিয়ে যায়। তবে মুক্তি কোথায়? ওর মাথার মধ্যে বিড়বিড় করে এরপর জন্ম নিলে ও আম্রিকার গরু হবে। পরদিন মহাজন এল ওর বাড়িতে। 
-কী মিয়া ট্যাহা দিবা কবে?
-মিয়া ভাই, জানেনই তো এবার ধানের দাম নাই! কামলার অভাবে ধান কাটবার পাড়ছি না। 
-ধানের দাম নাই এ কথা আমারে শোনাইয়া লাভ কী? সুদে আসলে ট্যাহাডা কবে দিবা কইয়া দাও! 
তালেবের মুখে কথা ফুরাইয়া যায়! ও তো নিজেই জানে না কবে টাকাটা দিতে পারবে। কীই বা বলবে।
মহাজনও ছাড়বার পাত্র না! সেও বলে যায়; আগামী শুক্কুরবারের মধ্যে ট্যাহা দিবার না পারলে বাড়ি ছেড়ে দিবা। এ বাড়ি বন্ধক রেখেইে তো ট্যাহা নিছিলা?
এবার টনক নড়ে তালেবের। চড়া দামে কামলা নিয়েই ধান কাটে। বিক্রি করে আরও কম দামে। সব ধান বেঁচেও আসল টাকাই হয় না! সুদ তো অনেক দূর। বাকি আছে মোল্লার দিঘীর পাড়ের এক ফালি জমি। সেখানে যে ধান হয় সেই ধান টুকু ও বিক্রি করে না। দুই বাপ বেটির সারা বছরের খোড়াক! 
কাল টাকা নিতে আসবে মহাজন। ও জানে ওর কাছে যে টাকা আছে তা দিয়ে মন কিংবা পকেট কোনোটাই ভরবে না মহাজনের। বিচরা বসিয়ে ওকে ঘর ছাড়া করতে সময় লাগবে না! বাপ দাদার ভিটেই যদি না থাকে তয় গ্রামে থেকেই বা কী হবে আর চাষই বা করে কী হবে। রাতে খাওয়ার সময় মেয়েকে বলে, 
“ফজরের আজান দেওয়ার আগেই আমরা রওনা হবো।সব গুছিয়ে রাখিস মা।”
এরপর বাপ মেয়ে কেউই কোনো কথা বলে না। খাওয়া শেষ করে মেয়ে সব গুছিয়ে নিজের রুমে চলে যায়। 
ওর ঘুম আসে না! মাঝরাতে বাপজানরে খোয়াবে দেখে। বাপজান ওর দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থেকে কয়; “শ্যাষম্যাষ মাটির মায়া ছেড়ে চলে যাচ্ছিস বাজান? ফসল না ফলালে মানুষ খাবে কী? ট্যাহা চিবাইয়া খেলে প্যাট ভরবে?”
তালেব অনেক চেষ্টা করে কিন্তু মুখ দিয়ে কথা বের হয় না। ও বাপজানকে বলতে চায়, আমি শহরে যেতে চাই না বাজান! গাঁয়ের যে আলো বাতাসে বড় হইছি সেই আলো বাতাস গায়ে মেখেই মরতে চাই। কিন্তু ওর মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বের হয় না। কোনো এক অজানা শক্তি ওর কন্ঠরোধ করে রাখে। বাপজান মন খারাপ করে চলে যায়!

ঘামে ভেজা বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় তালেব। এগিয়ে যায় মেয়ের ঘরের দিকে। নিষ্পাপ মেয়েটা ঘুমাচ্ছে। ঘুমালে মানুষকে আরও বেশি নিষ্পাপ লাগে। একদম শিশুর মতন নিষ্পাপ।
-এ জন্মে তো আর ভালো থাকা হলো না। আবার যদি জন্ম হয় সেই জন্মে বাপ বেটি আম্রিকার গরু হয়ে জন্মাব। 
মোল্লার দিঘীর পাড়ে দাঁড়িয়ে নিজের এক ফালি ধানেক্ষেতের দিকে তাকিয়ে আছে তালেব । দখিনা বাতাসে সোনালী ধানের গাছগুলো হেলেদুলে দোল খাচ্ছে। ও গিয়ে দাঁড়ায় ক্ষেতের একদম মাঝ বরাবর। এই এক একটা ধান ওর এক একটা সন্তানের মতন। কিন্তু এক ব্যর্থ পিতাই শুধু জানে পিতৃত্বের বোঝা কতটা যন্ত্রণাদায়ক আর ভয়ংকর হয়। লুঙ্গির ট্যারে গুছে রাখা দিয়াশলাই বের করেও খানকিটা সময় নিয়ে শেষবারের মতো তাকিয়ে থাকে নিজের কষ্টের ফসলের দিকে। বুক ভরে নিঃশ্বাস নেয় পাকা ধানকে ছুঁয়ে যাওয়া বাতাসে। হাত বাড়িয়ে স্পর্শ করে সোনালী ধান। তারপর; দিয়াশলাইয়ের একটি মাত্র স্ফুলিঙ্গ!

দাউ দাউ করে জ্বলে উঠছে পাকা ধানের ক্ষেত। তার মাঝে দাঁড়িয়ে আছে তালেব মিয়া। চাষা তোলারাম মিয়ার এক মাত্র ছাওয়াল তালেব মিয়া, যে পরিবর্তনটাকে মেনে নিতে পারেনি আজও। আগুনরে লেলিহান শিখা উড়তে উড়তে ছড়িয়ে পড়ে সারা বাঙলায়। পরের দিন দেশের বড় বড় পত্রিকায় শিরনাম হলো
“জ্বলছে কৃষক, পুড়ছে ধান। আগুন ছড়িয়ে পড়ছে সারা বাংলায়।”
তার নিচে সরকার দলীয় দুজন নেতার বক্তব্যও ছেপেছেন তারা। 
একজন বলেছেন, “এ ঘটনায় বিরোধীদলের হাত রয়েছে।”
সাংবাদিকেরা অবশ্য বিরোধীদল বলে কোনো জন্তুর হদিস পান নাই। 
অপর নেতার বক্তব্য, “এসব বিছিন্ন ঘটনা। আমাদের সরকার কৃষি বান্ধব সরকার।”

ছবি
সেকশনঃ গল্প
লিখেছেনঃ রাশেদুজ্জামান কানন তারিখঃ 08/06/2019 02:45 PM
সর্বমোট 149 বার পঠিত
ফেসবুকের মাধ্যমে কমেন্ট করুণ

সার্চ