ব্যাকগ্রাউন্ড

ফেইসবুকে!

এক তরফা মডারেট টেকসই হবে কি?

পরিমানগত দিক থেকে মডারেটের অবিধানিক অর্থ হতে পারে, ‍average, modest, medium, middling. Ordinary, common, commonplace আবার চেতনাগত দিক থেকে হতে পারে make or become less extreme. আমরা চেতনাগত দিক থেকে এবং সুযোগ সুবিধা, বাদানুবাদ. আক্রোশ মেলামেশা, আদব কায়দা, আদর আপ্যায়ন, নীতি আদর্শ, পথ চলা পথ আটকানো সবকিছুতেই মোটাদাগে মেডারেট যুগে প্রবেশ করেছি এবং আমরা সুবিধামত মডারেট হয়ে যাচ্ছি। ক্ষমতা সুযোগ সুবিধা দেনা পাওনার হিসেবটাও মডারেট হয়ে যাচ্ছে। আমরা সুত্র খুঁজচ্ছি শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের। মডারেট হতে গিয়ে আদর্শের চেয়ে নগদ প্রাপ্তিকেই প্রাধান্য দিচ্ছি। এক্সট্রিম এক্টিভিজনমকে নিরুৎসাহিত করছি, যা একটা গণতান্ত্রিক সমাজে খুবই উপযোগী।
মডারেট হতে গিয়ে বা মডারেট সাজতে গিয়ে আদর্শ থেকে যোজন যোজন মাইল দৃরে সরে যাচ্ছি, যাতে মৌল চেতনা অনেকাংশেই আক্রান্ত হচ্ছে। আমরা পাশ কাটিয়ে যাচ্ছি নিকট অতীতের অনেক বিভৎস্য অভিজ্ঞতাগুলোকে। বর্তমান সময়ে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ও প্রসঙ্গ মুক্তিযুদ্ধের মুল চেতনা থেকে বিচ্যুতি। দীর্ঘ পথ পারি দিয়ে বর্তমান মহাজোট সরকার মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী সংগঠন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ২০০৯ সালে শাসন ভার গ্রহন করে। ক্ষমতায় আসে ভিশন২০২১ সামনে রেখে। দেশ তথ্যপ্রযুক্তিতে সমৃদ্ধ হবে, দ্রব্যমূল্য সহনীয় মাত্রায় থাকবে, শিক্ষা স্বাস্থ্য মানুষের দোড় গোড়ায় পৌছবে, ৭১ এর চেতনায় ৭২ এর সংবিধানে ফিরে যাবে, জাতিরজনকের সপরিবারে ও জাতীয় চার নেতার হত্যার বিচার হবে, ৭১ এর যুদ্ধাপরাধী রাজকারদের বিচার হবে, যুদ্ধাপরাধী ও স্বাধীনতা বিরোধী সংগঠনগুলো নিষিদ্ধ হবে ইত্যাদি। শত প্রতিকুলতার মধ্যেও বেশীরভাগ প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হয়েছে বঙ্গবন্ধ তনয়া বঙ্গরত্ন দেশরত্ন মাননীয় শেখ হাসিনার দৃঢ়তায় এবং দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নেতৃত্বের কারণে। সাধুবাদ পাওয়ারই যোগ্য।
দেশ স্বাধীন হয়েছে প্রায় ৪৭ বছর। স্বাধীনতা বিরোধীরা বঙ্গবন্ধুর সাধারণ ক্ষমতার অজুহাতে অনেক চিহ্নিত অপরাধী ধরাছোঁয়ার বাইরে। কালের আবর্তে অনেক কুখ্যাত ব্যক্তি প্রতিষ্ঠা পেয়েছে, পেয়েছে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। কোষ্টি ঘাটলে অনেক অগ্রসরমান ও প্রতিষ্ঠিত মানুষের বিতর্কীত ভূমিকার সন্ধান পাওয়া যাবে ৭১ এর সময়কালে। তথ্যপ্রযুক্তির বদৌলতে অনেক প্রভাবশালী ও প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিরা উইকিপিডিয়া ও বাংলাপিডিয়াকে সমৃদ্ধ করেছেন তাদের কর্মকাণ্ড দিয়ে। অনেক বিতর্কিত প্রভাবশালী ব্যক্তি আছেন যাদের জীবনবৃত্তান্ত থেকে অদৃশ্য কারণে ৭১ সাল থেকে ৭৫ সাল পর্যন্ত ভূমিকা কর্মকাণ্ড অপ্রকাশিত। সেসময়টাতে সামর্থ্যবান শিক্ষিত যুবকরা বেশীরভাগই ছিল স্বাধীনতার পক্ষে। অপরাধীদের কিছু অংশ ছিল যুবক বয়সেই প্রতিষ্ঠিত । কিন্তু সুযোগসন্ধানীগোষ্ঠী বরাবরের মতোই ধরাছোঁয়ার বাইরে।
প্রভাবশালীদের মধ্যে স্বাধীনতার পক্ষে বিপক্ষেই আছে। যেমন প্রফেসর আনোয়ার হোসেন চৌধুরী- বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ, ঢাবির মহসীন হলের হাউজ টিউটর ছিলেন, যুবক অথচ যুদ্ধে যাননি, মুনতাসির মামুন, শাহরিয়ার কবীর, ডঃ মুহাম্মদ জাফর ইকবাল অন্য পক্ষে আছে, প্রাণের প্রতিষ্ঠাতা মেজর আমজাদ খান, বিকল্প ধারার মহাসচিব মেজর মান্নান, আল্লামা শফী। ১৯৭১ সালে তাদের ভূমিকা সন্দেহজনক।
যা বলছিলাম, মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী সংগঠন নিরংকুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে। অবিকল ৭২ এ ফেরা হয়নি। ধর্মনিরপেক্ষতা বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদ এখনও অধরা। অজুহাত, বর্তমান সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের দেশে সামরিক শাষকদের বসানো ধর্মীয় অনুভূতি পরিবর্তন করা অসম্ভব। ৭১ এর মুল চেতনায় থাকলেও আমরা মডারেট। কিছু পরিবর্তনের সাথে খাপখাইয়ে নেয়া আমাদের কর্তব্য ও করণীয়।
মুল চেতনায় ছিল ধর্মনিরপেক্ষতা। স্বাধীনতার পর থেকে দেশে ঘটে যাওয়া কোন সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসেরই দৃশ্যমান কোন বিচার হয়নি। বিচার হয়নি ধর্মান্ধদের হাতে ঘুন হওয়া এবং আহত হওয়া কোন মুক্তচিন্তকের। বিভিন্ন অজুহাতে বিষয়টি পাশ কাটিয়ে যাওয়া হয়েছে। এমনটি বেশীরভাগ ক্ষেত্রে মুক্তচিন্তকদের দিকেই অঙ্গুলি প্রদর্শন করা হয়েছে। তাদের বাড়াবাড়িতেই ধর্মান্ধগোষ্ঠী অনুভূতিতে আঘাত পেয়েছে। ধর্মকে রাজনীতিতে টেনে আনা পাকিস্তানী আমল থেকেই চলে আসছে। বাঙ্গালী সমাজ ব্যবস্থা শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের। যতটুকু সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস সৃষ্টি হয়েছে তা পাকিস্তানীদের দেখানো পথেই। বৈষয়িকতাই এর মুল কারণ হিসাবে বিবেচিত হয়েছে। জমি দখল জোর করে দেশান্তর আরও অনেক কিছু।
বিগত ৪ঠা নভেম্বর ২০১৮ সহোরওয়ার্দী উদ্যানে হেফাজতে ইসলামের শোকরানা ও প্রধানমন্ত্রী সংবর্ধনা অনুষ্ঠান মডারেট যুগের দিগন্ত উন্মোচিত করেছে। হেফাজতের অতীত ঘটনাবলী এর সাথে সত্যিই বেমানান। ২০১৩ সালে কাদের মোল্লাসহ যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শান্তির দাবিতে গড়ে উঠা গণজাগরণের সরাসরি বিরোধীতা করেছে হেফাজত ইসলাম নামে অরাজনৈতিক সংগঠনটি। রাষ্ট্রের সরকার ব্যবস্থা, অর্থনীতি, নারী শিক্ষা সহ মুক্তমনা মুক্তচিন্তকদের বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখিয়ে এবং মহাজোট সরকার পতনের ডাক দিয়ে তারা সমাবেশ করেছিল মতিঝিলের শাপলা চত্বরে। হেফাজত প্রধান আল্লামা শফি নারীদের তেতুলের সাথে তুলনা করেছিলেন, নারী শিক্ষার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন, নারীদের কর্মসংস্থান এবং কর্মজীবী নারীদের কটাক্ষ করে বেস্যার সাথে তুলনা করেছিলেন। মুক্তমনা মুক্তচিন্তকদের নাস্তিক উপাধী দিয়ে কতলকে যায়েজ ঘোষণা করেছিলেন। রাজীব, দ্বীপ, বাবু, অনন্ত, অভিজিত, দীপন, নীলকে হত্যা করা হয়েছে তার কতল ঘোষণার পরই। প্রায় শতাধিক ব্লগার লেখকের তালিকা প্রকাশ করা হয়েছিল তাদের হত্যার উদ্দেশ্যে। প্রাণের মায়া ও নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য অনেকেই দেশ ছেড়েছেন। সরকার তথা মডারেট গোষ্ঠী কোন কৈফিয়ত তলব করেননি, এমনকি জাতির কাছে তাদের অপকর্মের জন্য ক্ষমাও চায়নি। তারাই আজ ঐতিহাসিক সহোরওয়ার্দী উদ্যানে বলতে গেলে সরকারী পৃষ্ঠপোষকতায় শোকরানা ও সংবর্ধনা অনুষ্ঠান সফলতার সাথে করে গেল।
চেতনাকে জলাঞ্জলি দিয়ে ধর্মান্ধ শক্তির সাথে আপোষ করে শান্তিপূর্ণ সহবস্থান শুধুই ক্ষমতায় আসা এবং টিকে থাকার কৌশল বৈ আর কিছু নয়। এখানে ধর্মান্ধগোষ্ঠীর আদর্শিক কোন পরিবর্তন লক্ষনীয় নয়। তারা শুধু তাদের প্রাপ্তি স্বীকার করে নুতন প্রাপ্তির সুযোগ করে নিয়েছে কিন্তু রাষ্ট্রের সমাজ ব্যবস্থার সাথে সহাবস্থানের কোন ইতিবাচক ইঙ্গিত দেয়নি এবং তা দৃশ্যমানও নয়। জাতিরজনক বঙ্গজননীর গর্ভে ”কওমী জননী”। এ যেন মডারেটে সাজার অনন্য দৃষ্টান্ত।
বিশ্লেষকদের ধারণা, রাজনীতির কৌশল হিসাবে সরকার প্রধানের এই উদ্দোগ। এ যাবতকাল সামরিক শাষকসহ বিএনপি জামায়াত সৌদির পৃষ্ঠপোষকতায় এই পক্ষকে নিয়ন্ত্রণ করত। তারা ভোটের ফায়দা নিত ধর্মান্ধতার অজুহাতে। তাদেরকে মুল সামাজিক কর্মকাণ্ডের সাথে একীভূত করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে হবে এবং তারা যাতে বিভ্রান্ত না হয় এবং ৫ মে ,২০১৩’র মতো কোন অস্থিতিশীল অবস্থার পুনরাবৃত্তি ঘটাতে না পারে তাই এই তোষণ নীতি। এ আগে তাদেরকে গণভবনে দাওয়াত দেয়া হয়েছিল। উন্নয়নের ছোঁয়া হেফাজতের গাঁয়েও লেগেছে তা অনেকটাই দৃশ্যমান। কওমী শিক্ষার স্বীকৃতি তাদের কাছে বাড়তি পাওনা। বর্তমান সরকার তাদেরকে সবকিছু উজার করে দিয়েছে। দৃশ্যমান প্রাপ্তি বলতে শুধুই রাজনৈতিক নিরবতা।
হেফাজত কিন্তু মডারেট হয়নি কিন্তু মডারেট হতে শুরু করেছে ৭১ এর চেতনায় উজ্জীবিত তরুণ সমাজ। তারা ৭১ এর চেতনার এক্সটিইমজম এক্টিভিটিজ থেকে সরে এসেছে। সরু সূতায় পথ চলা অধিক ঝুঁকি বিবেচনায় তারা ধর্মান্ধ অপশক্তিকে তোষণে মনোনিবেষ করেছে। সরকার প্রধানের সন্তুষ্টি মানে সহযোগী সহযোদ্ধা সমমনা সমর্থকদের সন্তুষ্টি। এই ভূখণ্ডে এখন প্রতিক্রিয়া দেখানোর সুযোগ নাই। মদিনা সনদের বিরোধীতা, নবী রসুলের কটুক্তিকারীর শাস্তি, বিশিষ্টজনদের কটুক্তিকারীর শাস্তি সবই, অনুভূতাঘাতের শাস্তি সবই রয়েছে। এমনকি তেতুল হুজুর খ্যাত আল্লামা শফিকে নিয়েও সমালোচনা করলে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। শুধু হয়নি আদর্শ ও চেতনা বিচ্যুতির শাস্তি। যুদ্ধাপরাধী সংগঠনগুলো এখনও নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়নি। ধর্ম ব্যবহার করে উগ্র রাজনীতি নিষিদ্ধ হলে হয়তো এসবের প্রয়োজন হতো না।

পশ্চিমাদের সেক্যুলারিজম, আমাদের ধর্মনিরপেক্ষতা এই মডারেট যুগে এবং মডারেট সাজার প্রতিযোগীতায় অধরাই থেকে যাবে। সময় বলে দেবে আমরা মডারেট হচ্ছি না মডারেট বানানো হচ্ছে। এই মডারেট কি শুধুই একতরফা। মডারেট একতরফা হলে কখনও টেকসই হবে না। দূর্বল নেতৃত্ব দেশকে অতল সাগরে ভাঁসিয়ে দিতে পারে।
 

ছবি
সেকশনঃ সাধারণ পোস্ট
লিখেছেনঃ নিরব তারিখঃ 04/11/2018 08:27 PM
সর্বমোট 43 বার পঠিত
ফেসবুকের মাধ্যমে কমেন্ট করুণ

সার্চ