ব্যাকগ্রাউন্ড

মুক্তচিন্তার বিশ্ব

আপনার পছন্দের যে কোন কিছু সহব্লগারদের সাথে শেয়ার করতে ও শেয়ার কৃত বিষয় জানতে এখানে ক্লিক করুণ

ফেইসবুকে!

ছোটগল্প: দুই ফোঁটা চোখের জল



















ছোটগল্প: 

দুই ফোঁটা চোখের জল
সাইয়িদ রফিকুল হক

 
মাহমুদ ভেবেছিলো এই ফার্মেই সে সারাজীবন কাটিয়ে দিবে। কিন্তু তার এক-গ্রেড উর্ধ্বতন বসের ইদানীংকালের আচার-আচরণ ও হাবভাব দেখে ওর এখন মনে হচ্ছে, চাকরিটা এখনই ছেড়ে দিতে পারলে বাঁচে। কিন্তু চাকরি সে ছাড়বে না।
তার এই সেমি-বস আলমাস মাত্র এক-গ্রেড উপরে উঠেই মাহমুদের ওপর খুব খবরদারি করছে। মাহমুদ এখনও কিছু বলেনি। সবকিছু নীরবে সহ্য করছে। চাকরিটা ওর প্রয়োজন।
 
মাহমুদ এখনও বিয়ে করেনি। তবুও ওর চাকরির ভীষণ প্রয়োজন। মফস্বলে ওর ছোট দুই ভাই-বোন কলেজে পড়ছে। ওদের খরচটা স্বাচ্ছন্দ্যে চালাবার জন্যই সে এই অফিসে চাকরিটা ধরে রেখেছে।
সে মন দিয়ে চাকরিটা করছিলো। কিন্তু এতে যে তারই এক সিনিয়র-কলিগ ব্যাঘাত ঘটাবে, তা সে স্বপ্নেও ভাবেনি। এই লোকটা কিন্তু মাহমুদের চেয়ে মাত্র এক-গ্রেড উপরে! আর তাতেই তার এই হম্বিতম্বি। বয়সে সে মাহমুদের চেয়ে বেশ বড়। কিন্তু চালচলন দেখলে মনে হয় সে যেন ভার্সিটি-পড়ুয়া ছাত্র। এতেও মাহমুদ তার এই সেমি-বসের উপর খুব একটা অসন্তুষ্ট হতো না। তার রাগ এই লোকটা নিজে ঠিকমতো অফিস করবে না। কিন্তু সে আর সবার উপর অহেতুক খবরদারি করবে, আর একটা চাপসৃষ্টি করবে।
 
মাহমুদ লক্ষ্য করেছে, তার এই বস অফিস-ছুটির পরে বাসায় না ফিরে, অফিসের কম্পিউটার-অপারেটরের সঙ্গে প্রায় প্রতিদিন কোথাও-না-কোথাও ঘুরতে যায়। এই অফিসের আরও অনেকে ব্যাপারটা লক্ষ্য করেছে। এই নিয়ে তাদের মধ্যে কানাঘুষাও চলছে রীতিমতো। তবে সামনে কেউ কিছু বলে না। এদেশের মানুষের যা স্বভাব!
মাহমুদ ব্যাপারটা মনোযোগ দিয়ে লক্ষ্য করছে। আর সে ভাবছে: লোকটার একটা স্ত্রী আছে, সন্তানও আছে। কিন্তু সন্তানের সঠিক সংখ্যাটা সে এখনও জানে না।আর এইরকম একজন মানুষ বাইশ-তেইশ বছরের একটা মেয়ের সঙ্গে এতো ঘনিষ্ঠভাবে চলাফেরা করে কীভাবে? দেশ থেকে মানুষের এখন লজ্জাশরম আস্তে-আস্তে উঠে যাচ্ছে নাকি! ঘরে স্ত্রী আছে। সন্তানও আছে। এই সংসারটাকে একরকম ‘চাঁদের হাট’ বলা যায়। তবুও এই লোকগুলো দড়িছেঁড়া ষাঁড়ের মতো এমন পাগলামি করছে কেন?এদের আচার-আচরণ দিন-দিন যেন আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে। এরা মরীয়া হয়ে স্ত্রী ফেলে পরনারীতে সুখ খুঁজে বেড়াচ্ছে। আসলে, এদের পাপে ধরেছে।
 
মাহমুদ মন দিয়ে নিজের কাজ করছিলো। তবুও আলমাস তার সামনে এসে দাঁড়ালো, আর বললো, “তোমার কাজে ধীরগতি। কিন্তু গতি আরও বাড়াতে হবে, বুঝলে?”
মাহমুদ তাকে দেখে আগেই উঠে দাঁড়িয়েছিলো। এখন সে, বিনয়ের সঙ্গে বললো, “জ্বী স্যার। তাই হবে। আর আমি তো চেষ্টা করছি।”
এবার আলমাস বললো, “কিন্তু আরও চেষ্টা করতে হবে। অফিসে কাজের গতি না বাড়লে কোম্পানীর লস তো। ব্যাপারটা বোঝো না কেন?”
তারপর সে “ও-কে কাজ করো”—বলে আর-একদিকে চলে গেল। এতে মাহমুদ যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো। অন্যরা তার খবরদারি দেখে মুখটিপে হাসছে।
মাহমুদ অফিসেরই একটা প্রয়োজনে কিছু কম্পোজের কাজ করার জন্য কম্পিউটার-অপারেটরের কাছে গেল। আশ্চর্য মেয়েটি যে-ভাব দেখালো, তাতে মাহমুদের মনে হলো: এই মেয়েটি বুঝি অফিসের দ্বিতীয় বস। সে মাহমুদকে দেখে উঠে দাঁড়ালো না। এমনকি একটা সালাম পর্যন্ত দিলো না। অথচ, মাহমুদ তার উপরের পোস্টের লোক। আসলে, মেয়েটির যৌবন আছে, একটু রূপ আছে, বয়সটাও কম আছে, তার রূপমুগ্ধ-ভক্তও কিছু আছে, আর আছে কারও কাছে যে-কোনো সময় হারিয়ে যাওয়ার সুযোগ! তাই, তার মনে হয়তো একটু অহংকার জন্মেছে। তাছাড়া, এই অফিসের অনেকেই তার প্রতি দুর্বল। আর সে-কথা এই মেয়েটি নিশ্চিতভাবে জানে।
মেয়েটির অশিষ্ট-ব্যবহার মাহমুদ গায়ে না-মেখে নিজেকে সংযত করলো। তারপর সে বললো, “আমার কাজটি জরুরি। তাই, একটু তাড়াতাড়ি আপনাকে কম্পোজের কাজটা করে দিতে হবে।”
কিন্তু মেয়েটি এতে কোনো আগ্রহ দেখালো না। শুধু বললো, “স্যার, আমি তো কাজ করছি। আর সময় হলে পরে আপনার কাজটা ধরবো। আপনার কাগজটা পাশে রেখে যান।”
মাহমুদ দেখলো, মেয়েটি অহেতুক একটা অ্যানিমেশন নিয়ে ব্যস্ততার ভান করে সময় কাটাচ্ছে।
মাহমুদ ভিতরে-ভিতরে রাগে ফেটে পড়লো। কিন্তু অফিস বলে কথা। তাই, সে যথেষ্ট ভদ্রতা বজায় রেখে আবার বললো, “আপনার এই বিনোদনমূলক কাজটা এখন না করলেও চলবে। আগে আমার কাজটা করে দিন।”
এতে মেয়েটি মুহূর্তের মধ্যে একরকম কালনাগিনীর রূপধারণ করে মাহমুদের দিকে চেয়ে বললো, “স্যার, আপনি আমাকে এভাবে ইনসাল্ট করতে পারেন না। আমি আপনার ব্যক্তিগত সহকারী নই যে, আমি আপনার কথা মতো চলবো। আর আমি এখন অফিসের কাজ করছি। আমি এই অফিসের একজন স্টাফ। আর আপনি দেখতে পাচ্ছেন, আমি এখন অফিসের কাজেই ব্যস্ত আছি। তবুও আমাকে বিরক্ত করছেন কেন?”
এতে মাহমুদ ভীষণভাবে আহত হলো। আর সে দেখলো, মেয়েটি এখন ফাজলামিই করছে।
মাহমুদ তাকে আর-কিছু না বলে অন্য সেকশনে গিয়ে নিজেই কম্পোজের কাজটা সেরে নিলো।
 
মাহমুদ ঘটনার আর-কিছু মনে রাখেনি। কিন্তু ঘটনা যার মনে রাখার কথা, সে কিন্তু ঠিকই মনে রেখেছে। তাই, লাঞ্চের পরে মাহমুদের ডাক পড়লো আলমাসের রুমে।
মাহমুদ রুমে ঢুকে তাকে সালাম দিলো। কিন্তু লোকটি মাহমুদের সালামের জবাব তো দিলোই না বরং মুখে একটা প্রবল বিতৃষ্ণার ভাব ফুটিয়ে তাকে উদ্দেশ্য করে আদেশের সুরে বললো, “চেয়ারে বসো।”
মাহমুদ বাধ্যগত-অধীনস্তের মতো চেয়ারে বসে পড়লো।
আলমাস একটু ভেবে তারপর বলতে লাগলো, “তুমি তৃষ্ণার সঙ্গে বেআদবি করেছো কেন? এগুলো কিন্তু অফিস-ডিউটির মধ্যে পড়ে না। আর এটা একধরনের বাড়াবাড়ি। ভবিষ্যতে এরকম আর করবে না। নইলে আমাকে একটা ব্যবস্থা নিতে হবে।”
এতে মাহমুদ খুব বিরক্ত হলো। আর সে নিজেকে সামলাতে না পেরে বললো, “স্যার, আপনার কাজকর্মও তো অফিস-ডিউটির মধ্যে পড়ে না!”
এতে আলমাস যেন কিছুটা অবাক হয়ে বললো, “মানে? কী বলতে চাও তুমি?”
মাহমুদ এবার বলিষ্ঠকণ্ঠে বললো, “স্যার, এই যে আপনি রোজ-রোজ অফিস-ছুটির পরে কিংবা কখনও-কখনও অফিস-ছুটির আগেই অফিসের কাজকর্ম ফেলে তৃষ্ণাকে নিয়ে যেখানে-সেখানে ঘুরে বেড়ান—এতে বুঝি অফিসের খুব লাভ হয়? আপনি এখন বেআইনিভাবে তৃষ্ণার পক্ষ নিয়েছেন। অথচ, অপরাধ করেছে সে। আর বেআদবি করেছে সে। অফিসের কাজ করতে সে অপারগতাপ্রকাশ করেছে। আর আপনি এখন দোষ দিচ্ছেন আমাকে! আপনার কার্যক্রমই অফিসবিরোধী। আর...।”
মাহমুদ আর-কিছু বলতে পারলো না। তার আগেই আলমাস নেকড়ের মতো গর্জে উঠলো, “চোপ বেআদব! আমার ব্যাপারে নাকগলাবি না। আমি যা-কিছু করি তা অফিসের জন্যই করি। তোর মতো কাজে ফাঁকি দেই না।”
তারপর সে তাচ্ছিল্যের সঙ্গে মাহমুদের উদ্দেশ্যে বললো, “যা-যা বের হ ব্যাটা আমার রুম থেকে।”
মাহমুদ চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো, আর বললো, “স্যার, আমাদের কথা হয়তো অফিসের সবাই শুনে ফেলেছে। তারাই দেখবে কে অপরাধী। আমি আপনার হুমকিতে ভয় পাই না। আমার চাকরি থাকলে থাকবে। আর নয়তো ফার্মগেট-ওভারব্রিজে হকারি করবো। তবুও কারও অন্যায় মেনে নেবো না। আপনি স্যার ভুল করছেন। বসের ক্ষমতার অপব্যবহার করছেন। আপনার মধ্যে মনুষ্যত্ব কমে যাচ্ছে। আর আপনি এসব তালটিবালটি বাদ দিয়ে ম্যাডামের কাছে ফিরে যান। এই বয়সে আপনার এসব...।”
মাহমুদ তার কথা শেষ করতে পারলো না।
এবার আলমাস তার দিকে কিছুটা তেড়ে আসায় সে আত্মরক্ষার্থে রুম থেকে বেরিয়ে এলো। আর ভীষণ মন খারাপ করে অফিসের বাইরে এসে একটু খোলা বাতাসে দাঁড়ালো। আর সে ভাবলো: সামান্য প্রতিবাদেই আজ তার এই অবস্থা! এইসব প্রাইভেট-ফার্মে তো প্রতিবাদ করে টিকে থাকা ভীষণ মুশকিল। এখানে শুধু সহ্য করতে হবে। আর মুখবুজে কাজ করে যেতে হবে। আর শুধু কর্তাব্যক্তিদের হুকুম তামিল করতে হবে অক্ষরে-অক্ষরে। কিন্তু এসব আর কতো?
 
একসময় মাহমুদ আবার তার টেবিলে ফিরে এলো। আর মন দিয়ে কাজ করতে আরম্ভ করলো। সে একটু আগে যা-ঘটেছে তা ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করছে। এসব মাথায় নিয়ে অফিস করতে গেলে আরও ঝামেলা বাড়বে। আর সে ভাবলো: বসের ধমকে তার মর্যাদা ক্ষুণ্ন হবে না। কারণ, সে এমন কোনো অপরাধ করেনি। আর অফিসের বড় বস তো আছেন।
 
অফিস-ছুটি হতে আর বেশি বাকী নেই। মাহমুদ মন দিয়েই কাজ করছিলো। এমন সময় সে দেখলো, তার সামনে দিয়ে তারই সিনিয়র-বস আলমাস ও কম্পিউটার-অপারেটর তৃষ্ণা দাপটের সঙ্গে হেঁটে যাচ্ছে। সে আড়চোখে দৃশ্যটা দেখে সজাগ হলো। আর ভাবলো: আজ ওদের পিছু নিবে। ওরা রোজ-রোজ এভাবে “হানিমুন-দম্পতির” মতো চলাফেরা করবে তাতো হয় না।
ওরা বেরিয়ে যেতেই কয়েক সেকেন্ড পরেই অফিসের বাইরে চলে এলো মাহমুদ। সে দেখলো, ওরা একটা রিক্সায় চেপে বসেছে। আর সেও তাড়াতাড়ি একটা রিক্সা ঠিক করে ফেললো।
 
রিক্সাওয়ালা বেশ দক্ষ। আর বোঝা যায়, আগেও সে এরকম কারও শখের গোয়েন্দাগিরি করেছে। বেশ দক্ষতার সঙ্গে লোকটি রিক্সা চালিয়ে ওদের পিছু-পিছু যাচ্ছে।
দেখতে-দেখতে ওরা দুজন ‘ঢাকা নিউ মার্কেটে’র কাছে এসে নামলো। আর ওদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মাহমুদও প্রায় ওদের গা-ঘেঁষে নামলো।
এখন একটু-একটু শীতভাব হওয়ায় মাহমুদের সুবিধা হলো। সে মাফলারের মতো একটা কাপড় দিয়ে মুখটা বেঁধে নিয়েছে। এখন কেউই তাকে সহজে চিনতে পারবে না। সে নিশ্চিন্তমনে ওদের পিছনে-পিছনে একটা চাইনিজে ঢুকে পড়লো।
ওরা দুজন ডান দিকের কোণায় একটা টেবিল-দখল করে বসলো। আর মাহমুদ বসলো নিরাপদ দূরত্বে ওদের দিকে সাইড করে। এবং সে ওদের খুব কাছাকাছি না বসে একটা নিরাপদ দূরত্বেই বসলো। আর এমনভাবে বসলো, যাতে এখানে বসে সে ওদের পুরা চেহারাটা ভিডিও করতে পারে।
ওরা মাত্র দুজন। তাই কী হাসি আর হৈ-হুল্লোড়! দুজনে এপাশটা একেবারে মাতিয়ে রেখেছে। এদিকের আলোটাও ভালো ছিল না। চাইনিজের কেমন একটা আলো-আঁধারি পরিবেশ। কিন্তু মাহমুদ একটাকিছু লেখার ভান করে ‘ওয়েটার’কে এদিকের আলোটা জ্বেলে দিতে বলেছে। এই সুযোগে সে তার পকেট থেকে মোবাইল-ফোনটা বের করে চুপি-চুপি ভিডিও’র কাজটা সারছে। সে ডান হাতে লিখছে, আর বাম হাতে নিরাপদে ভিডিও করার কাজটা চালিয়ে যাচ্ছে।
মাহমুদ দেখলো, মিনিট দশেক সে ওদের কার্যক্রম ভিডিও করতে পেরেছে। তার আরও কিছুক্ষণ  ভিডিও করার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু এমন সময় সেই ‘ওয়েটার’ তার কাছে এসে আলমাসদের দেখিয়ে খুব বিনয়ের সঙ্গে আস্তে-আস্তে বললো, “স্যার, পাশের টেবিলের উনাদের আলোতে সমস্যা হচ্ছে। যদি কিছু মনে না করেন, আপনি স্যার অন্যদিকে বসুন—তাহলে, আমি সেখানে আলো জ্বালিয়ে দেবো।”
মাহমুদ একটু হেসে ‘ওয়েটারে’র দিকে তাকিয়ে বললো, “না, থাক, তার আর দরকার হবে না। আমি এখন চলে যাচ্ছি। আমার একজন লোক আসার কথা ছিল। কিন্তু মনে হয়, সে আজ আর আসবে না।” নিজেকে নিরাপদে রাখার জন্য তাকে ওয়েটারের সঙ্গে এই চালাকিটা করতে হলো। সে ভালোর জন্য এখানে এসেছে। আর সে আলমাসের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটাতে চায়। আর সে একটা সংসার ভেঙ্গে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা করতে চায়। একজন সামাজিক-মানুষ হিসাবে সে এই দায়িত্ববোধ সহজে এড়িয়ে যেতে পারে না।
‘তোমাকে ধন্যবাদ’, বলে মাহমুদ ওয়েটারের হাতে বিশ টাকার একটা নোট ধরিয়ে দিয়ে চাইনিজ থেকে বেরিয়ে এলো। তারপর সে একমুহূর্তের মধ্যে মিশে গেল বিশাল ঢাকা-শহরের জনসমুদ্রে। আর এখানে, কার এতো সময় আছে যে, সে দেখবে কে কী করছে!
 
দুইদিনের মধ্যে মাহমুদ তার বস আলমাসের বাসার ঠিকানা জোগাড় করে ফেললো। অফিসের একটা বিশ্বস্ত-পিয়নের মাধ্যমে সে এই কাজটি করেছে। আর সে এমনভাবে তার কাছ থেকে ঠিকানাটা চেয়ে নিয়েছে, যাতে পিয়নটি কোনো সন্দেহ না করে। আর এব্যাপারে মাহমুদ এখন খুবই হুশিয়ার।
 
সাপ্তাহিক ছুটির পরদিন মাহমুদ আজ আবার অফিসে এসেছে। না, আজ আর কোনো গ্যাঞ্জাম বাধেনি। বরং সে তার সেমি-বস আলমাসের কাছ থেকে অফিস-ছুটির দুই ঘণ্টা আগে তার নিজের একটা বিশেষ প্রয়োজন দেখিয়ে ছুটি চেয়ে নিলো। যাতে, মাহমুদ আজ ওর বসের বাসায় গেলে অন্তত বসের সঙ্গে দেখাদেখির ব্যাপারটা না ঘটে।
 
আলমাসের বাসা চিনতে মাহমুদের বেশি বেগ পেতে হলো না। সে বাসার সামনে এসে দাঁড়ালো, আর দেখলো, বাড়ির গেটে দারোয়ান আছে। তাকে একটা-কিছু না বললে ভিতরে ঢোকা যাবে না।
সে দারোয়ানের কাছে এসে বললো, “বাড়িভাড়ার জন্য এসেছি। মালিকের সঙ্গে একটু দেখা করতে চাচ্ছি।”
এতে দারোয়ান খুশি হয়ে তাকে ‘সালাম’ দিয়ে বললো, “স্যার, দোতলায় গিয়ে কলিংবেল চাপবেন।”
মাহমুদ বিল্ডিংটায় ঢুকে চারতলার সেই নির্দিষ্ট ফ্ল্যাটে চলে এলো। আর দ্রুত বাসার কলিংবেল চাপলো। দরজা খুলতে একটু সময় নিলো। একটু পরে একজন তরুণীকণ্ঠের ভদ্রমহিলা ভিতর থেকে জোরে ‘কে’ বললো। আর মাহমুদ সঙ্গে-সঙ্গে তার জবাব দিলো। তরুণী লুকিং-গ্লাসে মাহমুদকে দেখে দরজা খুলে দিলো।
ভদ্রমহিলা মাহমুদকে দেখে কিছুটা অবাক হলো। তার চোখেমুখে কেমন একটা বিস্ময়-ভাব। তবুও সে নিজেকে সামলে নিয়ে বললো, “কে আপনি? আপনাকে তো চিনলাম না!”
তার এই বিস্ময়-ভাব কাটাতে মাহমুদ তাকে সালাম দিলো। আর খুব সংক্ষেপে নিজের একটা পরিচয় দিলো। এতে মহিলা কিছুটা সহজ হলেন।
মাহমুদ দরজায় দাঁড়িয়ে অনুমানে বুঝলো, ইনি আলমাসের স্ত্রী। ভদ্রমহিলার আনুমানিক বয়স বত্রিশ-তেত্রিশ হবে। দেখতে ভালো। আর এককালে সুন্দরীই ছিল। আর সে আরও বুঝলো, ইনি তার সমবয়সী না হলেও খুব বেশি বড় হবে না। আর তাদের বয়সের ব্যবধান হতে পারে দুই-তিন বছরের।
সে ভদ্রমহিলার দিকে চেয়ে বললো, “আপু, আমি একটু ভিতরে আসতে পারি? আপনার সঙ্গে আমার একটু জরুরি কথা আছে।”
এবার মহিলা যেন সম্বিৎ ফিরে পেয়ে বললো, “আসেন।”
মাহমুদ ভিতরে প্রবেশ করলো। সে বেশি সময় নিলো না। আর খুব সংক্ষেপে, সে তার বস আলমাসের সাম্প্রতিক কীর্তিকলাপ ভদ্রমহিলার কাছে সুন্দরভাবে তুলে ধরলো। তারপর সে তার সেদিনের ভিডিওটা ভদ্রমহিলাকে দেখালো।
মহিলা মাহমুদের সব কথা বিশ্বাস করেছে। আর তার শান্ত-মুখে কিছুক্ষণের মধ্যেই বিশ্বাসের সেই রূপটি নিদারুণভাবে ফুটে উঠলো।
একটু পরে মাহমুদ লক্ষ্য করলো, ভদ্রমহিলার দুই-চোখ দিয়ে টপ-টপ করে পানি পড়ছে।
এমন দৃশ্য দেখে ওর খুব খারাপ লাগলো। আর সে কিছুক্ষণ নীরবে বসে রইলো। তার বুকের ভিতরে একটা অজানা আশঙ্কা পেয়ে বসলো। আলমাস ভালো-না-হলে এরা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে?
সে একটু পরে ভারাক্রান্ত-হৃদয়ে মহিলার উদ্দেশ্যে আস্তে-আস্তে বললো, “আপু, উনাকে এখন থেকে আপনি সবসময় চোখে-চোখে রাখবেন। আর তিনি যেন অফিস-ছুটির পরে সোজা বাসায় ফিরে আসে, এখন থেকে আপনারা সেই চেষ্টাই করবেন।”
 
মাহমুদ উঠতে যাচ্ছিলো। এমন সময় মহিলা তাকে বাধা দিলো। তবুও মাহমুদ উঠে দাঁড়াতে যাচ্ছিলো। এমতাবস্থায় ভদ্রমহিলা তার হাত চেপে ধরে বললো, “বসেন ভাই, আপনে অনেক ভালোমানুষ। এই জীবনে আপনি আমার বিরাটবড় উপকার করলেন। এমন কাজ কেউ কারও জন্য সহজে করে না। আপনাকে এখন অন্তত এককাপ চা না খাওয়ালে আমার অপরাধ হবে। আপনি একটু বসেন। আমার তাড়াতাড়ি হয়ে যাবে।”
মাহমুদ অনেক বাধা দিলো। কিন্তু এতে কোনো কাজ হলো না। অগত্যা মাহমুদকে বসতে হলো।
একটু পরে সে দেখলো, ফুটফুটে-সুন্দর দুটি ছেলে-মেয়ে তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। একটির বয়স চার বছর, আর আরেকটির বয়স সাত হবে।
ওরা ওদের মাকে বললো, “ইনি কে মা?”
আর ওদের মা অনেকটা সহজ হয়ে বললো, “তোমাদের মামা হয়। গ্রামে থাকে।”
এরপর ছেলে-মেয়ে দুটো ভিতরে চলে গেল।
আলমাসের স্ত্রী ইচ্ছা করেই ছেলে-মেয়েদের কাছে মাহমুদের পরিচয় গোপন করেছে—যাতে, ওদের বাবা এইব্যাপারে কোনোকিছু বুঝতে না পারে।
 
চা-পান করে মাহমুদ উঠে পড়লো। কিন্তু সে গেটের দিকে পা বাড়ানোর আগে ভদ্রমহিলা তার সামনে এসে বললো, “এই শহরে আপনি এখন আমার সবচেয়ে আপনজন। আমার এই বিপদে আপনি আমাকে আরও সাহায্য করবেন ভাই। বাকীটা আমি দেখবো। আপনি আমার দেবতা। আরও আগে যদি আপনার মতো একজন মানুষের সঙ্গে আমার পরিচয় হতো—তাহলে, আমার জীবনটা হয়তো আজ এরকম হতো না। আমি এই পাপিষ্ঠের সংসারে এসে পড়তাম না।”
এবার তার চোখ দিয়ে দুই ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়লো।
মাহমুদের এই ছন্নছাড়াজীবনে এমন ভাবাবেগের মুহূর্ত আর কখনও আসেনি। আর তাই, এই দুই ফোঁটা চোখের জল তার এই জীবনে অনেককিছু বলে মনে হলো। আর সে নীরবে এই জল ছল-ছল চোখের মেয়েটিকে সান্ত্বনার বাণী শুনিয়ে দ্রুত ফিরে এলো নিজের ছোট্ট বাসায়। তার অফিসের সমস্ত গ্লানি মুছে গেল আলমাসের স্ত্রীর চোখের জলে।
আর সে ভাবলো, সত্যি, সে একজন মানুষের জন্য—একজন অসহায়-নারীর জন্য কিছু-একটা করতে পেরেছে। তার সামান্য জীবনে এই এক বিরাট সান্ত্বনা। সে এখন নিজেকে একজন মানুষ ভাবতে পারছে।
 
 
 

সাইয়িদ রফিকুল হক
মিরপুর, ঢাকা, বাংলাদেশ।
রচনাকাল: ডিসেম্বর, ২০১৫।
 

ছবি
সেকশনঃ গল্প
লিখেছেনঃ সাইয়িদ রফিকুল হক তারিখঃ 05/11/2017 05:59 AM
সর্বমোট 195 বার পঠিত
ফেসবুকের মাধ্যমে কমেন্ট করুণ

সার্চ