ব্যাকগ্রাউন্ড

মুক্তচিন্তার বিশ্ব

আপনার পছন্দের যে কোন কিছু সহব্লগারদের সাথে শেয়ার করতে ও শেয়ার কৃত বিষয় জানতে এখানে ক্লিক করুণ

ফেইসবুকে!

গল্পঃ দুঃস্বপ্নের ঘণ্টাধ্বনি (২য় - শেষ পর্ব)

জানালার পাশ দিয়ে ডিঙি নৌকা নিয়ে ঝিলের মাঝখানের খোলা জায়গাটির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে মতি। শান্তদের পাশের ঘরটিতেই থাকে। এই বস্তিতে অনেক ছেলেমেয়েই আছে কিন্তু একমাত্র মতিই নিয়মিত ওর খোঁজখবর নেয়। বাবা-মা বাইরে চলে গেলে ওকে একাই থাকতে হয়। মতি প্রতিদিন এই ঝিলে মাছ ধরে। শান্তদের ঘরের পাশ দিয়ে যাবার সময় ওদের জানালার পাশে নৌকা ভিড়ায়। শান্তও যেন ঠিক এই সময়টিতে মতির প্রতীক্ষায় থাকে। মতি ঝিলে মাছ ধরে আর শান্ত জানালার পাশে বসে ওর মাছ ধরা দেখে। যখন মাছ ধরা থাকে না মতি ওদের ঘরে এসে ওর সাথে খেলে। আজও মতি ওদের ঘরের জানালার পাশে নৌকা ভিড়িয়ে কথা বলে।
-তুই ঘরের মধ্যে একলা একলা কি করস? নৌকায় যাবি আমার লগে?
শান্ত বলে- আমি ক্যামনে যামু, আমি তো এহন ক্রাচ দিয়াও হাটতে পারি না!
মতি অভয় দেয়, আমি তোরে নৌকায় উঠাইয়া নিমু, কোন সমস্যা হইবো না।
শান্ত ম্লান হাসে। না-রে! তুই যা, আমি এইহানে বইসাই তোর মাছ ধরা দেখুম।
মতি হেসে বলে- ঠিক আছে, আইজ বেশি মাছ পাইলে তোরেও কিছু দিমুনে। 
সরকারী জমিতে স্থানীয় প্রভাবশালীদের তোলা এই বস্তিতে একশ’র বেশি ঘর আছে। কিছু কিছু ঘর ঝিলের উপরেই তৈরি। কাঠের মেঝে। গায়ে গা লাগানো ঘরগুলোতে শতাধিক পরিবারের বসবাস। কেউ রিক্সা চালায়, কেউ বা সবজী বিক্রেতা আর কেউ কেউ কাজ করে পোষাক কারখানাগুলোতে। প্রায় সময়ই এখানে হৈ-হট্টগোল লেগে থাকে। সামান্য বিষয় নিয়েও খিস্তি-খেউড়, অশ্রাব্য ভাষায় গালাগালি- এটা এই বস্তিবাসীদের কাছে অতি স্বাভাবিক বিষয়।
এলাকার মাস্তানদের নিয়মিত আখড়াও এই বস্তি। নেশা দ্রব্য বেচাকেনার এক অভয়াশ্রম। প্রায়ই বিভিন্ন গ্রুপের মধ্যে মারামারি বাধে। কখনও কখনও আগ্নেয়াস্ত্রের মহড়া। মাঝে মধ্যে পুলিশের আনাগোনাও দেখা যায়, তবে নিয়মিত বখরা পেলে তেমন একটা ঝামেলা করে না পুলিশ।   
          সাহেবদের বাসায় পৌঁছুতে প্রায় ভিজে গেল জয়নাব। বেগম সাহেব তাকে দেখেই তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলেন। গত দু’দিন কাজ কামাই দেয়ার জন্য একচোট নিলেন। জয়নাব চুপচাপ শুনে নিজের কাজে মন দেয়। দু’দিনের জমানো কাজ, একটু বেশিই সময় লাগছে কিন্তু কিছুতেই আজ কাজে মন বসে না তার। ছেলেটা ঘরে একা। তাড়াতাড়ি বাসায় ফেরার জন্য ছটফট করে। সে জানে সব কাজ শেষ না হলে বেগম সাহেব কিছুতেই ছাড়বেন না। জয়নাব দ্রুত হাত চালায়। মনে মনে ভাবে কবে যে ভাগ্যের চাকা ঘুরবে! কাজ শেষে বেগম সাহেবের কাছে গিয়ে দাঁড়ায় জয়নাব।
-আফা, সব কাম শেষ, আমি এহন যাই?
বেগম সাহেব কিছুটা রাগত স্বরেই বললেন-
গতকাল আসোনি, ডিপে অনেকগুলো মাছ জমে আছে। ওগুলো কেটে দিয়ে যাও।
-কাইল কাইটা দিমুনে। আইজ একটু তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরতে হইবো। ম্লান হেসে বলল জয়নাব।
বেগম সাহেব আবার ধমকে উঠলেন। কাল কেন? আজ রান্না করতে হবে না? তোমাদের সমস্যার কথা আর কত শুনবো?
বেগম সাহেব মোবাইলে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। দূরের মসজিদ থেকে তখন ভেসে আসছিলো জোহরের আযান। জয়নাবের দুশ্চিন্তা আরও বাড়ে। সে বেগম সাহেবের সামনে গিয়ে আবার দাঁড়ায়।
-আফা, আমি বিহালে আইসা আপনের মাছ কাইটা দিমুনে। পোলাডারে ঘরে একলা রাইখা আইছি, ও-তো একলা চলতে পারে না।
জয়নাবের দিকে ভ্রূক্ষেপ নেই গৃহকর্ত্রীর। তিনি মোবাইলে কথা বলায় ব্যস্ত। জয়নাব বুঝে গেল খুব সহজে মুক্তি মিলবে না। তার ছেলের কি হল তাতে বেগম সাহেবের কী যায়-আসে? কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে মাছ কাটতে বসে যায় জয়নাব কিন্তু মনটা পড়ে থাকে বস্তির ছোট্ট ঘরে।
জানালার ধারে বসে শান্ত দেখে ঝিলের মাঝখানে পৌঁছে গেছে মতির ছোট্ট নৌকাটি। এখন বৃষ্টি নেই। পরিষ্কার আকাশ। ঝিলের খোলা পানিতে নীল আকাশের ছায়াটা কেঁপে কেঁপে উঠছে। মতি বড়শি ফেলেছে ঝিলের জলে। মাঝে মধ্যেই শান্তর দিকে তাকিয়ে হাসে। ইশারায় কথা বলে। বড়শিতে বড় কোন মাছ পেলেই মতি উপরে তুলে ওকে দেখায়, শান্তও হাততালি দিয়ে মতিকে উৎসাহ দেয়। এভাবেই কেটে যায় শান্তর অলস সময়গুলো। মতি দূর থেকে ওকে সঙ্গ দেয়।       
সেদিন ঠিক দুপুর বেলা পেছনের গলি দিয়ে বেশ কিছু যুবক এসে জড়ো হল বস্তিতে। একজন-দু’জন করে লোকসংখ্যা আরও বাড়ে। একসময় গুঞ্জন ওঠে- বস্তি ভেঙে দেয়া হবে। গুঞ্জন থেকে হৈচৈ- হুমকি- অস্ত্রের ঝঙ্কার; তারপর ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক। বস্তির বাসিন্দারা দিগ্বিদিক ছোটে; যে-যার মত ঘরের মালামাল সরাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। 
বস্তিতে হঠাৎ হৈচৈ আর চিৎকার শুনে কান পাতলো শান্ত। মনে মনে ভাবলো- বোধহয় বড় ধরনের ঝামেলা হয়েছে। হয়তো পুলিশ কাউকে ধরে নিয়ে গেছে কিংবা কারো সাথে মারামারি। এগুলো তো হরহামেশাই হচ্ছে। যা হচ্ছে হোক! মতির মাছ ধরা দেখায় আবার মন দেয় শান্ত। চেঁচামেচির শব্দটা ধীরে ধীরে আরও বাড়ে, লোকজনের ছোটাছুটি আর গুড়ুম-গুড়ুম শব্দ-যেন সবকিছু ভেঙে গুড়িয়ে যাচ্ছে। শান্ত একটু একটু করে এগিয়ে যায় চৌকির কর্ণারের দিকে, কী ঘটছে দেখার চেষ্টা করে। কিন্তু ঘরের দরজা ভেজানো থাকায় কিছুই দেখতে পায় না। আবার ফিরে আসে জানালার কাছে। মতির বড়শিতে মনে হয় একটা বড় মাছ আটকা পড়েছে!
বড়শিতে টান পড়তেই চিৎকার করে ওঠে মতি। ‘খাইছে, এইবার ধরা খাইছে। কই যাইবা বাছাধন?’
শান্ত খুশিতে হাততালি দেয়। মতি একবার ঘুরে শান্তকে দেখে, আবার মন দেয় মাছের দিকে। বড় মাছ, মতি মাছটাকে খেলায়। মাছটা এদিক-ওদিক ছুটে যায়, মতিও ওর সাথে নৌকা ঘুরিয়ে ভারসাম্য রক্ষা করে। শান্ত ঝিলের দিকে তাকিয়ে মতির মাছ নিয়ে খেলা করাটা বেশ উপভোগ করে।
বড়শিতে গাঁথা মাছটার গতিবিধি বোঝার ফাঁকেই কানে ভেসে আসলো ভাঙচুরের শব্দটা। পেছনে ফিরে তাকিয়েই কিশোর মতি মনে মনে বিশাল একটা ধাক্কা খেল। মুখ দিয়ে অস্ফুট স্বরে কেবল বেরিয়ে এলো একটি শব্দ- শান্ত! 
মতি ছিপ ফেলে দিয়ে দ্রুত ঘুরিয়ে দিল নৌকার মুখ। বড়শিটা পড়ে থাকলো পানিতেই। মাছটা প্রাণপণে চেষ্টা করে মুক্তি পেতে। কিন্তু গলায় আটকে পড়া বড়শির হুকটা ক্রমশ আরও শক্ত করে বিঁধে যায়। মাছটা হাঁসফাঁস করে, কিন্তু মুক্তি মেলে না।
          সাহেবের বাসা থেকে বেরুতেই জয়নাব দেখতে পেল- মতি হন্যে ছুটে আসছে তারই দিকে। কাছে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল- খালা, বস্তি ভাইঙা দিছে, তুমি তাড়াতাড়ি চল। জয়নাবের তখন দিশেহারা অবস্থা। সে মতির পিছু-পিছু প্রায় দৌড়ে ছুটে চলে। 
মহিদুল আজ রিকশা নিয়ে অনেক দূর চলে গিয়েছিল। সাধারণত এতদূর যায় না সে, এলাকার মধ্যেই রিকশা চালায়। আজ একজন বৃদ্ধ মানুষের অনুরোধ ফেলতে পারলো না। দু’দিন ধরে ছেলেটার অসুখটা বেড়ে গেছে, ট্রিপ নিয়ে বস্তির কাছাকাছি ফিরলেই ছেলেটাকে দেখে যায়। আজ ফিরতে ফিরতে প্রায় দুপুর গড়িয়ে গেল। রিকশা নিয়ে এলাকার রাস্তায় আসতেই তৈয়ব আলী তাকে দেখে বলে উঠল-
এই মহি, তুই এখনও এইহানে কী করস! তোগো বস্তি তো ভাইঙা দিছে। কালু আর রঙ্গু গ্রুপ একঘণ্টা ধইরা তাণ্ডব চালাইছে।
মহিদুল চমকে ওঠে। ওর অসুস্থ ছেলেটা ঘরে একা। ওর পক্ষে ঘর থেকে একা বেরুনো সম্ভব নয়। জয়নাব এখনও ফিরেছে কি-না সে কে জানে। মহিদুল দ্রুত প্যাডেল মারে। 
সকালে মানুষে গিজগিজ করা বস্তিটা এখন প্রায় ফাঁকা। গুটি কতক লোক তাদের ভেঙে পড়া ঘর থেকে কিছু কিছু গৃহস্থালির সরঞ্জাম বের করার চেষ্টা করছে। জয়নাব বিহ্বল হয়ে তার ভাঙা ঘরের দিকে তাকিয়ে থাকে। পাশে এসে দাঁড়ায় মতির মা। সে জিজ্ঞেস করে- গণ্ডগোলের সময় তুই কই আছিলি? শান্তরে বাইর করস নাই?
জয়নাবের মুখে কথা সরে না। ঠিক তখনই ছুটে আসে মহিদুল। সামনের ধ্বংসস্তুপের দিকে তাকিয়ে জয়নাবকে বলে- শান্ত কই জানু?
জয়নাব নিশ্চুপ। দু’চোখ বেয়ে টপটপ করে জল গড়িয়ে পড়ে।
মহিদুল সামনে তাকিয়ে হতভম্ব হয়ে যায়। তার ঘর কোথায়? ওখানে তো শুধু ধ্বংসস্তুপ। আশপাশ থেকে কয়েকজন তখনই ছুটে যায় মহিদুলের ভাঙা ঘরের দিকে। সেও এগিয়ে যায় কিন্তু তার পায়ে যেন শক্তি নেই! বুকের ভেতরটা দুরু-দুরু করে। শক্ত পায়ে প্যাডেল মেরে সে সওয়ারি নিয়ে কত দূরদূরান্তে চলে যায়! কিন্তু আজ তার সেই জোর কোথায়? সে কান খাড়া করে শুনতে চেষ্টা করে শান্তর গলার স্বর। ওখানে কোন সাড়া নেই।
সামনের জঞ্জাল সরিয়ে মহিদুলের ঘরের দিকে যেতে বেশ কষ্ট হচ্ছিল যুবকদের। প্রায় আধা ঘণ্টা পরিশ্রমের পর সবাই ধরাধরি করে শান্তর দেহখানি এনে শুইয়ে দিল সামনের খোলা জায়গায়। শান্তর শোয়ানো দেহের পাশে ধপ করে বসে পড়লো মহিদুল। দু-হাতে মুখ ঢাকলো।
মতি হাঁটুভেঙে বসে শান্তর পাশে। শান্ত, কথা ক। তোরে আইজ সবচাইতে বড় মাছটা দিমু। 
জয়নাব স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। বহুদূর থেকে শুনতে পায় ভাঙনের শব্দ। তার বুকের মধ্যে যমুনার কলকল ধারা বয়ে চলে, স্রোতের তোড়ে তার সবকিছু ধুয়ে মুছে যায়। সে হারায় তার অতীত-বর্তমানের শেষ অবলম্বনটুকুও। জয়নাব তাকিয়ে দেখে তার শান্ত শুয়ে আছে। সুস্থ্য সবল দু’টি পা। কে বলবে- গত কয়েকদিন ধরে বা-পা’টায় ভর দিয়ে দাঁড়াতেই পারেনি ছেলেটি!

দুঃস্বপ্নের ঘণ্টাধ্বনি (১ম পর্ব)

ছবি
সেকশনঃ গল্প
লিখেছেনঃ নিভৃত স্বপ্নচারী তারিখঃ 18/10/2017 01:32 PM
সর্বমোট 485 বার পঠিত
ফেসবুকের মাধ্যমে কমেন্ট করুণ

সার্চ