ব্যাকগ্রাউন্ড

মুক্তচিন্তার বিশ্ব

আপনার পছন্দের যে কোন কিছু সহব্লগারদের সাথে শেয়ার করতে ও শেয়ার কৃত বিষয় জানতে এখানে ক্লিক করুণ

ফেইসবুকে!

গল্পঃ অচেনা আগন্তুক – পর্ব-১

   ঘটনাটা ঘটার ঠিক তিনদিন পর লোকটিকে দেখা গিয়েছিলো এলাকায়। বাজারের শেষ প্রান্তে সাজু মিয়ার চায়ের দোকানে প্রতিদিনের মত আড্ডাটা তখন জমে উঠেছে কেবল। লোকটি হঠাৎ সেখানে উপস্থিত হয়ে একজন ভদ্রলোকের খোঁজ করছিল। তার ভাষ্য থেকেই জানা গেল তিনি স্থানীয় সমাজসেবা কেন্দ্রের এক ভদ্রলোকের কাছে এসেছেন, যিনি এখান থেকে অন্যত্র বদলী হয়ে গেছেন প্রায় দু’মাসের বেশী সময় আগে। বন্ধুকে না পেয়ে ভদ্রলোক খানিকটা হতাশই হলেন। লোকটির বয়স পয়ত্রিশ কি ছত্রিশ হবে, উচ্চতা মাঝারি, ভরাট ফর্সা মুখে ফ্রেঞ্চকাট দাড়িগুলো বেশ মানিয়ে গেছে, আর পরনে আকাশী রঙের স্ট্রাইপ পাঞ্জাবী পরিহিত লোকটিকে দেখে উপস্থিত সবারই মনে হয়েছিলো একজন নিখাত ভদ্রলোক।
   লোকটি চা-দোকানের সামনের বেঞ্চিতে বসে চায়ের অর্ডার দিল। চা খেতে খেতে এলাকার মানুষজনের আলাপচারিতা শুনছিলো।
    এখান থেকে লাস্ট ট্রেন ক’টায় ছাড়ে? লোকটি জানতে চাইলো।
    রাত দশটায়। পাশে বসা তোরাব আলী জবাব দিল।
   লোকটি ঘড়ির দিকে তাকালো। মুখে হতাশার ছাপ স্পষ্ট। এখনো অনেক সময় বাকী। অচেনা এলাকায় এতটা সময় কাটানো কিছুটা সমস্যাই বটে। ছোট্ট মফস্বল শহর। এখানে দেখার মত তেমন কিছুই নেই। কয়েকটা চায়ের স্টল, কিছু মুদি দোকান, টেইলার্স, সেলুন, বাজারের একপাশে একটা কাঠ চিড়ানোর স-মিল আর ধান ভাঙানোর কল। সন্ধ্যার কিছুক্ষণ পরই পুরো বাজার এলাকা প্রায় খালি হয়ে যায়। এখান থেকে প্রায় দুই মাইল উত্তরে ষ্টেশন।
    তোরাব আলী তার দিকে তাকিয়ে বলল, ভাই সাহেব যাইবেন কই?
    ঢাকা।
   ও আচ্ছা। সাতটার পর এই বাজারে কাউরে পাইবেন না। স্টেশনে যাইতে হইলে আগে ভাগেই রওনা দিতে হইবো।
    দূর মিয়া, নয়া মানুষটারে হুদাই চিন্তায় ফালাইয়া দিতাছো ক্যান, আমগো জগলুরে কইয়া রাখলে হেয় তো ওনারে স্টেশনে পৌঁছাইয়া দিতে পারবো। দোকানের একপাশে বসা রাজিব সিদ্দিকী বলে উঠলো।
    আপনে ঠিকই কইছেন কমিশনার সাব, জগলুরে কইয়া ওনারে যাওনের ব্যবস্থা কইরা দেওন দরকার। বিদেশী মানুষ য্যান বিপদে না পড়ে।
    লোকটি কিছুটা আশ্বস্ত হল।
   চা খেতে খেতেই লোকজনের আলাপচারিতা চলছিল। বিষয়বস্তু দেশ-বিদেশের রাজনীতি। ইউরোপ-আমেরিকা থেকে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতিও উঠে এসেছিল আলোচনায়। আগন্তুক লোকটি মনে মনে ভাবছিল, এই প্রত্যন্ত অঞ্চলের লোকজনও এখন বেশ সচেতন হয়ে উঠেছে। লোকজনের কথার ফাঁকে আগন্তুক লোকটি হঠাৎ জানতে চাইল,  
     আমার বন্ধুর কাছে শুনেছিলাম, এইখানে নাকি লম্বা সময় ধরে মেলা বসে, যাত্রাপালা হয়; সেটা কি শেষ হয়ে গেছে?    
    কেউ কোন উত্তর দিল না। লোকটি অবাক হয়ে লক্ষ্য করলো হঠাৎ যেন পরিবেশটা কেমন থমথমে হয়ে গেল। সবার দৃষ্টি এখন আগন্তুকের দিকে। কয়েকজন লোক উঠে চলে গেল।
     আমি আসলে মেলাটা দেখতেই এসেছিলাম। আমার বন্ধুর মুখে শুনে শুনে এখানকার মেলা সম্পর্কে একটা আগ্রহ জন্মেছিলো।  
     ওটা শেষ হয়ে গেছে। রাজিব সিদ্দিকী বলে উঠলো।
    ও। তাইলে তো আমার বন্ধু এখানে থাকলেও কোন লাভ হইতো না। শুধু শুধুই এতদূর আসা।
    আপনে জানতেন না যে আপনের বন্ধু এখান থেকে বদলী হয়ে গেছে? কিছুটা রুক্ষ কণ্ঠে বলে উঠলো বলরাম হালদার, এলাকার প্রাইমারী স্কুলের মাস্টার।  
    মাস্টার তোমার কথা বলার ধরণটা আর বদলাইলো না। উনি জানলে কী এতদূর আসেন! বলরামের কথার উত্তরে বলল রাজিব সিদ্দিকী।
     বিষয়টা হালকা করতে আগন্তুক বলে উঠলো- আসলে অনেকদিন ওর সাথে যোগাযোগ নেই, ফোনেও পাচ্ছিলাম না। তাই ভাবলাম হঠাৎ এখানে এসে ওকে চমকে দেব।
    কেউ আর কোন কথা বলছিল না। আবার সেই নিরবতা। লোকটি কিছুটা অস্বস্তি বোধ করছিলো। পরিবেশটা হালকা করতেই সাজু মিয়া বলল,
     ভাই, আপনেরে আরেক কাপ চা দেই?
     লোকটি হেসে সায় জানাল।
 
     সন্ধ্যা হয় হয়। ঠিক এমন সময় চায়ের দোকানের সামনে পুলিশের ভ্যানটি এসে থামল। অন্য সবাই নির্বিকার। তবে লোকটিকে দেখে মনে হল এই ছোট্ট বাজারে এই সময় পুলিশের ভ্যানটি দেখে সে কিছুটা অবাকই হয়েছে। মুখে কিছুই বলল না। গফুর দারোগা চায়ের দোকানের সামনে এসে দাঁড়াল। রাজিব সিদ্দিকীকে দেখে জিজ্ঞেস করল,  
     আপনার কী খবর?
     ভাল। কোন কিছু জানতে পারলেন দারোগা সাব?
     তদন্ত চলছে, দেখা যাক কি হয়। আপানার বাড়িতে নজু মিয়া নামে কেউ কাম করে?
     হ, করে তো।
     ওকে এখন কোথায় পাওয়া যাবে?
     হয়তো বড়িতেই আছে।
     ওকে এখন খবর দিয়া আনানো যাবে?
     কিন্তু দারোগা সাব ও তো একটা সহজ সরল পোলা। ওরে আপনাগো কেন দরকার?
   গফুর দারোগা কয়েক মুহূর্ত রাজিব সিদ্দিকীর দিকে তাকিয়ে রইল। রাজিব সিদ্দিকী কিছুটা ইতস্থত বোধ করছিল। হঠাৎ দারোগা মুখে এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে বলল, তদন্তের স্বার্থে আমাদের অনেক কিছুই করতে হয়, সেইটা আপনেরা বুঝবেন না।
     রাজিব সিদ্দিকী দারোগার কথায় সায় জানিয়ে বলল, তাহলে ঠিক আছে।  
    ইতিমধ্যে পুলিশের দলটি চায়ের দোকানে এসে এক পাশের বেঞ্চিতে বসলো। হঠাৎ গফুর দারোগার চোখ পড়লো নতুন আগন্তুকের দিকে। দারোগার জিজ্ঞাসু দৃষ্টি দেখে রাজিব সিদ্দিকী বলে উঠল,
     উনি ঢাকা থেকে আমগো এলাকার মেলা দেখতে আইছেন।
     দারোগা ভ্রূ কুচকে লোকটিকে দেখল কিছুক্ষণ। তারপর সঙ্গীর দিকে তাকিয়ে বলল,
     তাহলে যা শুনছি মিথ্যা না।
   আগন্তুক ভদ্রলোক মূল ঘটনা না বুঝলেও এটুকু আঁচ করতে সমস্যা হয়নি যে এ আলোচনা তাকে ঘিরেই। হঠাৎ গফুর দারোগা তার উদ্দেশ্যে বলে উঠলো,
     আপনার পরিচয়?
     আমাকে বলছেন? আগন্তুক জানতে চাইলো।
     হুম, কোত্থেকে আসছেন?
     আমার নাম জামিল, জামিল আহসান। ঢাকায় থাকি।
     হঠাৎ এ সময় এখানে কেন?
    এক বন্ধুর কাছে এসেছিলাম। কিন্তু এসে দেখি সে এখান থেকে বদলী হয়ে গেছে। আজ রাতের ট্রেনেই আবার ফিরে যাব।
   আচ্ছা! কিন্তু আপনে ভুল সময়ে এসে পড়েছেন। এখন তো এই এলাকা ছাড়তে পারবেন না।
    জামিল কিছুটা অবাক হয়ে জানতে চাইল- কেন?
    দারোগা যেন শিকারকে বাগে পেয়েছে এমন ভঙ্গিতে বলল,
   ঐ যে বললাম আপনি ভুল সময়ে এসেছেন। তিনদিন আগে এই এলাকায় একটা খুন হয়েছে, যাত্রাদলের একটা মেয়েও নিখোঁজ। এখন তার তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত সবাইকে এলাকা না ছাড়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। 

চলবে......

ছবি
সেকশনঃ গল্প
লিখেছেনঃ নিভৃত স্বপ্নচারী তারিখঃ 23/08/2017 09:23 PM
সর্বমোট 1042 বার পঠিত
ফেসবুকের মাধ্যমে কমেন্ট করুণ

সার্চ