ব্যাকগ্রাউন্ড

মুক্তচিন্তার বিশ্ব

আপনার পছন্দের যে কোন কিছু সহব্লগারদের সাথে শেয়ার করতে ও শেয়ার কৃত বিষয় জানতে এখানে ক্লিক করুণ

ফেইসবুকে!

​বাবা: ধোঁয়াশার স্মৃতিঘোর!

(নিরন্তর বহমান অশ্রুসিক্ত শোকগাথা: ১৪ই আগস্টে আমার নিবেদন।)
*
সনির্বন্ধ অনুরোধ: যারা লেখাটি আগে পড়েছেন তারা আবারও পড়ুন। এ এক চিরন্তন আত্মত্যাগ- কখনও পুরনো হয় না, কখনও ম্লান হয় না। স্মৃতিতে, অনুভবে চির ভাস্বর, চির অম্লান। 

*

বড় হবার পরে ছোটবেলার দেখা বাবাকে নিয়ে অনেকেরই অনেক স্মৃতি থাকে। সুখের স্মৃতি, দুখের স্মৃতি, গর্বের স্মৃতি নিয়ে স্মৃতিময়তার নানান স্মৃতিপট। আমার তেমন কোন স্মৃতি নাই। যা আছে তা খুবই ধোঁয়াশার, অস্পষ্ট এবং ভাসা ভাসা। আমি কখনও কখনও মেলাবার চেষ্টা করি, আমার যে স্মৃতিটুকু আছে তা কি সত্যিই আমার স্মৃতিপটের স্মৃতি, নাকি অন্যের কাছ থেকে শুনে শুনে স্মৃতিপটে জমে যাওয়া স্মৃতি। আমি স্মৃতি বিভ্রান্ত হয়ে পড়ি।   

স্মৃতি থাকার কষ্ট ও সুখ দুটোই আছে। স্মৃতি না থাকার মধ্যে কোন সুখ নেই, পুরোটাই কষ্টের। আমার জন্মদাতার স্মৃতি আমার মধ্যে নেই সেটিতে কোন সুখ থাকার কথা নয়। আমি স্মৃতিহীনতার সে কষ্টে ভুগি। জীবনের কিছু কিছু বিষয় আছে যার সাথে নিত্য বসবাস করেও তাতে অভ্যস্ত হওয়া যায় না। আমার ক্ষেত্রে বাবার স্মৃতিও তেমন। এরই মধ্যে আছি কিন্তু অভ্যস্ত হতে পারিনি। হওয়া যায় না। 

বছর চারেক বয়স থেকে দেখে আসছি বাবা নেই, তবুও এ না দেখাটায় আজও কেমন যেন অভ্যস্ত হতে পারিনি। পারা সম্ভবও নয়। কারণ এর সাথে আমার হৃদয়ে ধারণ করা দেশের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার চেতনার অবিচ্ছেদ্য একটা সম্পর্ক রয়ে গেছে, সে চেতনারই অংশ আমার বাবা। সুতরাং বাবাকে আমার মনে পড়ে তিনি শুধুমাত্র আমার  বাবা বলে নন, তিনি এ দেশের স্বাধীনতার ইতিহাসেরও অংশ বলে।

অনেকের বাবাই থাকে না, পৃথিবীর মরণশীল নিয়মে তারা চলে যান। কিন্তু আমার বাবা সেই স্বাভাবিক মরণশীল নিয়মে যাননি। দেশের জন্য, দেশের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করতে করতে আমার বাবা চলে গেছেন। লড়াকু বাবার যোদ্ধার বেশে ওভাবে চলে যাওয়া জাতির জন্যে গর্বের, দেশের জন্য গর্বের- কিন্তু আমার জন্য কষ্টের, ভয়াবহ কষ্টের। 

গৌরবময় এ কষ্টের মধ্যেও গর্ব আছে কিন্তু গর্ব বোধের জন্য যে মানসিক ও মানবিক উৎকর্ষতার অবস্থা ও অবস্থান প্রয়োজন হয়- বাবাহীন সংসারের সীমাহীন অর্থনৈতিক দৈন্যতা ও অসহায়ত্বের কারণে তেমন অনুকূল পরিবেশ আমি কখনও পাইনি। ভয়াবহ প্রতিকুল পরিবেশের সাথে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতেই চলে গেছে আমার জীবনের দুই যুগেরও বেশি সময়। ফলে বাবার আত্মত্যাগের পুরো বিষয়টিই ছিল আমার জন্য কষ্টের। এমনই কষ্টের যে কষ্টকে কষ্ট হিসেবে অনুভব করার সুযোগও আমার হয়ে ওঠেনি।  

২৫শে মার্চ পাক বাহিনী নিরীহ বাঙ্গালীদের উপরে গণহত্যা শুরু করলে আমার বাবা আমার বড়ভাই জাহাঙ্গীর আলমকে সাথে নিয়ে স্থানীয়দেরকে সংগঠিত করেন এবং খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিলের পুলিশ ফাঁড়ি দখল করার নেতৃত্ব দেন।  সেই দখলকৃত অস্ত্র দিয়ে স্বদেশ রক্ষার জন্য জীবন বাজি রেখে সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। সেই থেকেই তিনি হয়ে পড়েন এ দেশের কোলাবরেটর এবং পাক সেনাদের মোস্ট ওয়ান্টেডদের একজন। 

দিনটি ছিল ১৪ই আগস্ট ১৯৭১ সাল। বাজার করতে যাবার ছদ্মবেশে বাবা সেদিন বেরিয়েছিলেন মুক্তিবাহিনীকে তথ্য সরবরাহ করার জন্য রাজাকার ও পাক হানাদার বাহিনীর তথ্য যোগাড় করতে। ২৫শে মার্চের পর থেকেই জীবনের সমূহ ঝুঁকি নিয়ে এ কাজ তিনি নিয়মিত করে যাচ্ছিলেন। ঐদিন  কোলাবরেটরদের সহায়তায় পাক সেনারা আমার বাবাকে ধরে ফেলে। সেই থেকে তিনি নিখোঁজ।   

বাবা আমার বড় দু ভাইকে মুক্তিযুদ্ধে পাঠিয়ে ছিলেন। বড় ভাই আমাদের থানার প্রথম গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার জাহাঙ্গীর আলম। আলফাডাঙ্গা, বোয়ালমারী, কাশিয়ানী অঞ্চলে সফল মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনাকারী এবং ভাটিয়াপাড়ার সম্মুখ যুদ্ধে পাক সেনাদের বিপর্যস্ত করে সারেন্ডার করানো বীর মুক্তিযোদ্ধা।

পাক সেনারা বোয়ালমারীর সোনালী ব্যাংকে রক্ষিত বাঙালিদের স্বর্ণ লুট করে পাকিস্তান পাঠিয়ে দিচ্ছিল। খবর পেয়ে আমার বড়ভাই কমান্ডার জাহাঙ্গীর আলম সহযোদ্ধাদের নিয়ে পাক বাহিনীকে আক্রমণ করেন এবং সম্মুখ সমরে তাদের পর্যুদস্ত করে সে স্বর্ণ উদ্ধার করেন। উদ্ধারকৃত সেই স্বর্ণ তিনি প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের কাছে জমা দেন। জমাদানের সে রশিদটি আজও বড়ভাইয়ের কাছে আছে। সে এক বিশাল ইতিহাস। 

আমার সহোদর মেঝো ভাই। মুক্তিযোদ্ধা নৌ কমান্ডো বাহিনীর কমান্ডার হুমায়ুন কবির। অপারেশন জ্যাকপটে প্রচণ্ড শীতের রাতে ডুবুরী হয়ে প্রায় একক প্রচেষ্টায় মংলায় পাকিস্তানী অস্ত্রবাহী যুদ্ধ জাহাজের তলদেশে মাইন পেতে সেটাকে ডুবিয়ে দিয়ে দেশের দক্ষিণাঞ্চলকে রক্ষা করা বীর নায়ক। প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের লাল গালিচা সম্বর্ধনা প্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা।

বর্তমান ক্লাস এইটের টেক্সট বুকের ‘তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি’ বইটিতে আমার মেঝো ভাইয়ের একটি ছবি সংযুক্ত করা হয়েছে। ছবিটি মুক্তিযুদ্ধের সময়ে ভারতে মাইন প্রশিক্ষণকালীন তোলা। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন দু' দেশের যৌথ নৌ বাহিনীর প্রধান কমোডোর মিহির কে রয় এর লেখা ‘ওয়ার ইন দ্য ইন্ডিয়ান ওশান’ বইটি থেকে ছবিটি সংগ্রহ করা হয়েছে। এটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের এক ঐতিহাসিক ছবি।

ছোট ফুফুর ছেলে নুরুল ইসলাম বটু ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার। বড় ফুফুর  দুই ছেলে গোলাম সরওয়ার এবং সাইদুর রহমান সাকেন মুক্তিযোদ্ধা। আত্মীয়-স্বজন-পরিচিত মহল মিলে ৩২ জন মুক্তিযোদ্ধা। সবাইকে সংগঠিত করে আমার বাবাই এদেরকে মুক্তিযুদ্ধে পাঠিয়েছিলেন।

পরিবারের একমাত্র রোজগেরে মানুষকে হারিয়ে সাতটি এতিম সন্তানকে নিয়ে শুরু হয় আমার বিধবা মায়ের জীবনযুদ্ধ। সম্পূর্ণ সহায়-সম্বলহীন ভয়াবহ ও দীর্ঘমেয়াদী সে জীবনযুদ্ধ পারিবারিক মণ্ডলে মুক্তিযুদ্ধের চেয়েও ভয়ঙ্কর, তার চেয়েও অনিশ্চিত। নয় মাস মুক্তিযুদ্ধ শেষে দেশ স্বাধীন হয়। আমাদের জীবন যুদ্ধ চলতে থাকে। কান্না, ক্ষুধা, দারিদ্র, অনিশ্চয়তা, মানুষের অত্যাচার, নির্যাতনের সে ভয়াবহ জীবন-যুদ্ধের কাহিনী অত্যন্ত মর্মস্পর্শী এবং বর্ণনাতীত। আমার লেখা 'মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী জীবনযুদ্ধ' বইটি পড়লে সে সম্পর্কে কিছুটা ধারণা পাওয়া যাবে। 

চিররুগ্ন, কৃশকায় শরীরের মাকে দেখেছি আমাদের মুখে দু' মুঠো অন্ন যোগাড়ের জন্য পরের বাড়িতে কাজ করতে। দাঁড়াবার শক্তিবিহীন শরীর নিয়ে অন্যের ধান ভানতে, ঘর লেপতে, অপারগতার কারণে বিশ্রী ভাষার কঠোর কথা শুনতে। জীবনের তরে, বেঁচে থাকার জন্য কষ্ট করেছি আমি, আমাদের পরিবারের প্রতিটি সদস্য। বাবার ফিরে আসার প্রতীক্ষায় ৩৮ বছর চোখের জল ফেলে বিগত ৩রা এপ্রিল ২০০৮ সালে বিগত হয়েছেন আমার আজন্ম সংগ্রামী জনমদুখী মা। জীবনের কাছে হার না মানা এক মহীয়সী নারী।  

এতিমখানায় থেকে লেখাপড়া করেছে আমার দু' ভাই। ক্লাস ফোর থেকে মায়ের কোল ছেড়ে পরের বাড়ীতে বাড়ীতে থেকে ধাক্কা খেয়ে খেয়ে প্রতিনিয়ত অনিশ্চয়তার মধ্যে এই থামে, এই চলে এমন চরম দ্বন্দ্বের মধ্যে কেটেছে আমার শিক্ষাজীবন। একবার এ স্কুল, তো একবার ও স্কুল, তো আরেকবার কোন স্কুল নয়- এ ছিল আমার স্কুলে পড়া। সে এক মর্মস্পর্শী জীবনযুদ্ধ। 

গরীবের ছেলের লেখাপড়া করার বিলাসিতা নিয়ে বিরূপ মন্তব্য শুনতে হয়েছে আমার প্রতিটি ভাইকে, সমাজের কাছে আমার মাকে দিতে হয়েছে চরম অপমানের মূল্য। দুইদিন চুলায় ভাতের হাড়ি না চড়ার পরেও একমুঠো চাল আমার মাকে কেউ ধার দেয়নি- আমাদের শোধ করার সামর্থ্য নেই বলে, মাঠে কাজে না পাঠিয়ে আমার মা আমাদেরকে স্কুলে পাঠিয়েছে বলে। অজপাড়াগাঁয়ের সে শৈশব অভিজ্ঞতা আজও আমাকে কাঁদায়। এখন লিখতে বসেও কাঁদছি। যতবারই মনে পড়ে ততবারই চোখে পানি চলে আসে। বুকের ভিতরে লুকিয়ে থাকা এ এক ছাইচাপা আগুন, কখনও মরে না, কখনও ভোলা যায় না।         

ভুলতে পারিনা, আমি ভুলতে পারি না, কোনভাবেই ভুলতে পারি না। আগস্ট আমাকে মনে করিয়ে দেয়, ডিসেম্বর আমাকে মনে করিয়ে দেয়, মার্চ আমাকে মনে করিয়ে দেয়, একুশ আমাকে মনে করিয়ে দেয়, বা-দিবস আমাকে মনে করিয়ে দেয়, মা-দিবস আমাকে মনে করিয়ে দেয়। যতই ভুলতে চাই ততই ছাইচাপা আগুনেরমত এ মাসগুলি, এ দিনগুলি আমাকে দগ্ধ করে। আমার হৃদয়ের তন্ত্রী ছিঁড়ে যায়, চোখের জল চিকচিক করে। জ্বলতে জ্বলতে ভিতরটা অঙ্গার হয়ে যায়। সুপ্ত আগ্নেয়গিরির মতো বুকের ভিতরে চলতে থাকে নিরন্তর তোলপাড়। বুকের ভিতরের আবদ্ধ জ্বলন্ত লাভা আমাকে নিরন্তর দহন করে। 

আমি দ্রোহী হয়ে উঠি। অবিন্যস্ত সে দ্রোহ। মনে হয় সব ভেঙ্গেচুরে চুরমার করে ফেলি। ঘুষখোর কর্মকর্তার মাথায় বাড়ি মেরে, মাথা চুরমার করে ফাটিয়ে দিয়ে বলি, “ঘুষখোরের বাচ্চা, আমি একজন নিখোঁজ মুক্তিযোদ্ধার সন্তান। বাবাকে হারিয়ে শিশু বয়স থেকে যুদ্ধ-পরবর্তী জীবন সংগ্রাম করেছি, স্বাধীনতা যুদ্ধের রেস টেনেছি- এ দেশের মুক্তির জন্য, স্বাধীনতার ফসলের জন্য, জীবনের জন্য- তোমার ঘুষের জন্য নয়।” 

মনে হয় ব্রাশ ফায়ার করে ঝাঁজরা করে দেই স্বাধীনতা বিরোধী কুচক্র ও তাদের পৃষ্ঠপোষক সম্প্রদায়ের কুচক্রী বুক। দেশটাকে যারা শুষে শুষে খেয়ে মুখে গণতন্ত্র ও আমজনতার রাজনীতির কথা বলে দু' নম্বরি করে যাচ্ছে, ধর্মের নামে যারা মানুষ ঠকাচ্ছে-  রক্তের হোলি খেলা খেলি সে সমস্ত দুর্নীতিবাজদের হৃৎপিণ্ডের তাজা রক্ত দিয়ে।

পারিনা, আমি পারি না। সমগ্র বৈরী পরিবেশ আমাকে পারতে দেয়না। কখনও কখনও  পরাধীনতার দৃশ্যমান শৃঙ্খলের চেয়ে স্বাধীনতার অদৃশ্যমান শৃঙ্খল অনেক বেশি ভয়াবহ হিসেবে অনুভূত হয়। সেই ভয়াবহতা আমাকে নিবৃত করে, আমাকে নিরাশ করে দেয়। আমি কিছু ব্যাখ্যা করতে পারি না। আমার অনুভূত দ্রোহের অবিন্যস্ততা আমার হৃৎপিণ্ডকে খামছে ধরে, বুকের তীব্র জ্বালা আমাকে ঘুমাতে দেয় না। আমি অবিরত ছটফট করতে থাকি। 

আমার চোখের কোণে অশ্রু জমে ওঠে, নিজের অজান্তে টুপ করে ঝরে পড়ে সে অশ্রু। আমার হাতের মাংসপেশিগুলি শক্ত হয়ে ওঠে, সাঁড়াশির মতো শক্ত হয়ে ওঠে আঙ্গুলগুলো। আমি হাত রাখি আমার পরবর্তী প্রজন্মের কাঁধে। আমার সকল ক্ষোভ, সকল দ্রোহ সঞ্চারিত করি তার হৃদয়, মস্তিষ্কের অভ্যন্তরে। পরবর্তী প্রজন্মের মাঝেও নিরন্তর চলতে থাকুক এ দ্রোহ, সঞ্চারিত হোক প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরের স্নায়ু-হৃদ চেতনায়।

ছবি
সেকশনঃ সাধারণ পোস্ট
লিখেছেনঃ যুক্তিযুক্ত তারিখঃ 14/08/2017 12:49 PM
সর্বমোট 1164 বার পঠিত
ফেসবুকের মাধ্যমে কমেন্ট করুণ

সার্চ