ব্যাকগ্রাউন্ড

মুক্তচিন্তার বিশ্ব

আপনার পছন্দের যে কোন কিছু সহব্লগারদের সাথে শেয়ার করতে ও শেয়ার কৃত বিষয় জানতে এখানে ক্লিক করুণ

ফেইসবুকে!

শুধু 'পান্তা ইলিশ' নয়, পহেলা বৈশাখে 'কাঞ্জি ইলিশ' চাই।

জুয়েল ভাই আমার একজন অতি প্রিয় বন্ধু।সেদিন মুঠোফোনে জানতে চাইলেন 'কাঞ্জির ভাত খাইবেন নাকি'? 
-'আজ্ঞে হ্যাঁ,খামু'। 
-'বৃহস্পতিবারে ভাবীকে নিয়া চইল্যা আইয়েন সকাল এগারোটায়'। জুয়েল ভাইয়ের কড়া নির্দেশ। বুঝে গেছি, এই নির্দেশ অমান্য করলে আমার কপালে আর কোনোদিন কাঞ্জির ভাত জুটবে না।
 
কারণ সেই ছোট্ট বেলা কাঞ্জির ভাত খেয়েছি। তো কমপক্ষে চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ বছরতো হবেই।মায়ের হাতে রান্না করা কাঞ্জির ভাত। এর পরে আর কখনো খেয়েছি কিনা, মনে নেই। আহা, কী যে স্বাদ, আর টকটক গন্ধ! যে একবার লঙ্কা বাটা কিংবা ঝাল ভর্তা দিয়ে খেয়েছে,সে কখনো ভুলতে পারবে না। আমিও পারি নাই।
 
কাঞ্জি আর কাঁজি। যেন এরা সহোদর। কেউ বলে কাঞ্জি, আবার কেউ বলে কাঁজি। যে নামেই ডাকা হোক না কেন, স্বাদে গন্ধে এরা একই। কাঞ্জির ভাতের সাথে মানানসই ভর্তা হলে আর কিচ্ছু লাগে না। ভর্তার সাথে মেথি শাক, উচ্ছে, নিরামিষ, ইলিশ,চাপিলা, কৈ আর পুঁটি মাছ ভাঁজা। বেগুন ভাঁজা দিয়েও খাওয়া যায়।
 
জুয়েল ভাই এর নির্দেশ।না মেনে উপায় নেই।ভাবিও বোধহয় প্রস্তুত। আমিও লোভ সামলাতে পারলাম না। চলে গেলাম বৌকে নিয়ে আজ জুয়েল ভাইয়ের লন্ডনের ক্লেহল প্রাসাদে।সাথে চাপিলা মাছ ভাজি আর খেজুর দিয়ে 'টক-ঝাল-মিষ্টি' চাটনি নিয়ে।জুয়েল ভাইয়ের বাসা। আহঃ কী টক টক গন্ধ। মনে পরে গেলো মায়ের হাতের রান্না করা সেই কাঞ্জির কথা।

আমার মাকেও কাঞ্জি রাঁধতে দেখেছি।এখন রাঁধে কিনা আমার জানা নেই। কখনও জিজ্ঞেসও করিনি।বোধহয় এই ঐতিহ্য হারিয়েই গেছে। মা ভাত রান্নার সময় প্রথম বলক উঠা ভাত একটি মাটির হাড়িতে জমা করতেন। ওই হাড়িটা চুলার আশেপাশেই থাকতো। জমা করা চাল রান্না হতো সপ্তাহের শেষে কোনো একদিন।অথবা তারও পরে। কখনো কাঞ্জির জাউ,কখনো কাঞ্জির ভাত। মরিচ বাটা কিংবা শুটকির ঝাল ভর্তা দিয়ে খেতাম।আমি ছোট বেলা থেকেই ঝাল পছন্দ করি। সেই পুরানো টক গন্ধটা যেন আজও নাকে-মুখে লেগে আছে। আহঃ কী আনন্দ!
 
আমি নিশ্চিত কাঞ্জি কী জিনিস এখনকার প্রজন্ম দেখেনি।খায়ও নি।পহেলা বৈশাখের কারণে তবু পান্তা ভাত চোখে দেখেছে। এবং খাচ্ছে।
 
মুষ্টি চাল থেকে রাখা হয় কাঞ্জি। কাঞ্জির চাল থেকে প্রস্তুত হয় কাঞ্জিভাত, কাঞ্জি জাউসহ নানা রকম পিঠা।খেতে একটু টক এবং গন্ধযুক্ত।
 
সাধারণ ভাতের মতোই কাঞ্জি রান্নার প্রক্রিয়াটা প্রায় একই রকম। তবে রান্নার পূর্ব প্রস্তুতি একটু ভিন্ন।এই ভাত রান্নার জন্য সাত থেকে দশ দিন সময় নিতে হয়। প্রতিদিনের ভাত রান্নার চাল থেকে প্রথম বলক উঠা এক-দুই মুঠি ভেজা চাল আলাদা করে মাটির হাঁড়িতে ভিজিয়ে রাখা হয়।এই চাল থেকে টকটক গন্ধ বেরুলে সেটি রান্না করা হয় ভাতের রেসিপিতে।

এর উৎপত্তি কোথায় এই নিয়ে গবেষণা হতেই পারে।কাঞ্জি ঐতিহ্য কী শুধুই বাঙালির? তা বোধহয় নয়। তবে যতদূর জানতে পারি, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে এটি জনপ্রিয় একটি খাবার। প্রাত:রাশ হিসাবে চীনে এর জনপ্রিয়তা সবচেয়ে বেশি।চীনে এটাকে কঞ্জি বলে।
 
তবে, চীনে ঠিক কাঞ্জিরভাত হিসেবে নয়,কাঞ্জিকে এরা সুপ বানিয়ে খায়।আমরা যেটাকে লেই বলি।কাঞ্জি সুপের জনপ্রিয়তা চীনে আকাশচুম্বী। তৈরি প্রক্রিয়া অনেকটাই কাছাকাছি হলেও চাইনিজ কাঞ্জি একটু ভিন্ন রকম। একটু পাতলা হয়।সিদ্ধ করার সময় জল বেশি দিয়ে চাল সিদ্ধ করে নেয়। একটু বেশি সময় ধরে সিদ্ধ করে। যাতে আলাদা করে দানাগুলো ভেসে না থেকে প্রায় মিশে যায় ভাতের ফ্যানে। এর পর ফুটন্ত কাঞ্জিতে চিকেন বা মিট দিয়ে সুপ তৈরী করে।এটা খুবই দামি একটি সুপ্।এবং ভিন্ন প্রকৃতির।
 
শুধু চীনেই নয়। আমাদের নেইবারহুড কোন্ট্রিতেও এর চল আছে। তামিলনাড়ুতে চাল ভেজে গুঁড়ো করে জলে সিদ্ধ করে খাওয়া হয়। এরা এর নাম দিয়েছে আরিসি কাঞ্জি। কেরালায় খায় জিরাকা কাঞ্জি। গোয়া, অন্ধ্রে এর নাম গাঞ্জি। এরা নারকেলের দুধ মিশিয়ে খেতে পছন্দ করে। সঙ্গে আচার থাকে।

আমাদের দেশে শুধু কাঞ্জির ভাত নয়। কাঞ্জির জাউও অঞ্চল ভেদে জনপ্রিয়। শুঁটকির ভর্তা দিয়ে কাঞ্জিজাউ বা ভাত অনেকেরই একটি প্রিয় খাদ্য। মুখের রুচি ফিরাতে অনেকেই কাঞ্জিজাউ খেয়ে থাকেন।আগে দাদি-নানীরা তাই করতেন। পোয়াতি বৌকে কাঞ্জি খেতে দেয়া হতো মুখের রুচি ফেরাতে। কাঞ্জি দিয়ে পিঠাও বানানো হয়। চ্যাপ্টা আকারের পিঠার নাম কাঞ্জিচ্যাপ্টি।অনেক জায়গায় এটাকে কাঞ্জির 'মৌলখা' বলে থাকে।
 
বাংলাদেশে সব অঞ্চলে কাঞ্জির ভাত খাওয়ার প্রচলন আছে কিনা আমার জানা নেই।তবে,কেউ কেউ বলেন কাঞ্জির ভাত বৃহত্তর ফরিদপুর অঞ্চলের খাবার। চৈত্র সংক্রান্তির বিশেষ অনুষ্ঠানে এই ভাত খাওয়া হয়। চৈত্র সংক্রান্তি উপলক্ষে বেশ কয়েকদিন আগে থেকেই চলে এই অঞ্চলের মানুষের পূর্ব প্রস্তুতি।
 
আমাদের নারায়ণগঞ্জেও কাঞ্জির ভাত এবং কাঞ্জির জাউ খাওয়ার প্রচলন রয়েছে।ছোট্ট বেলা আমি সেটা দেখেছি। 'কাঞ্জির লেই'ও বানাতে দেখেছি।যেটা চীনে কাঞ্জির সুপ হিসেবে খাওয়া হয়।এই লেই অবশ্য অনেকেই খেতে পারতো না।অনেকে এটাকে 'লোতা'ও বলে।
 
জানা গেছে, বিক্রমপুর এলাকায়ও নাকি হরেক রকম ভর্তা দিয়ে কাঞ্জির ভাত খাওয়া হয় অনেকটা উৎসবের মত।
 
কাঞ্জি ঐতিহ্য অনেকটা হারিয়েই গেছে।এটা গ্রাম বাংলার প্রাচীন গৌরবময় সংস্কৃতি।পান্তাভাত যেমন গরিব মানুষের খাবার, বোধহয় কাঞ্জির ভাতও তাই।কিন্তু এখন পান্তা-ইলিশ ধনী লোকের বিলাসিতায় পরিণত হয়েছে। এটা দুর্মূল্যও বটে যা সাধারণ মানুষের ধরাছোঁয়ার বাইরে।
 
কিন্তু কাঞ্জি এখন গরিবের ঘরেও নেই। ধনীদের বিলাসিতা তো দূরের কথা।

চলুননা, বিলাসিতা করে হলেও আমাদের খাদ্য সংস্কৃতি ধরে রাখি। আমরা কাঞ্জি ঐতিহ্য হারাতে চাইনা। তাই আগামী পহেলা বৈশাখে 'ইলিশ পান্তার' পাশাপাশি 'কাঞ্জি ইলিশ' অথবা 'ইলিশ কাঞ্জি'র প্রচলন শুরু করলে মন্দ কি? আমি এর প্রস্তাব রাখছি।এবারের পহেলা বৈশাখ  উৎযাপিত হোক 'পান্তা-ইলিশ' এর পাশাপাশি 'কাঞ্জি-ইলিশ' দিয়ে। 
 
আজ আমিও খেলাম।অসাধারণ এক কাঞ্জি পার্টি।জুয়েল ভাবীর তৈরি আজকের কাঞ্জি পার্টিতে ছিল: কাঞ্জির ভাত, কাঞ্জির জাউ। সাথে ছিল ১৬ প্রকার ভর্তা। এর মধ্যে শুঁটকি ভর্তা, কাঁচা লংকার ভর্তা, বেগুন ভর্তা, শিম ভর্তা, টমেটো ভর্তা, কাঁঠাল বিচি ভর্তা,ইলিশ কাঁটা ভর্তা,মাছ ভর্তা,ধনে পাতা ও কালিজিরা ভর্তা অন্যতম।
 
এছাড়া রয়েছে সরিষা ইলিশ, ফুল কপি ইলিশ, চাপিলা মাছ ভাজা,বিফ কারী, চিকেন ভুনা ও চাটনি। সব শেষে চিতই পিঠা ও দুধ চিতই।
 
আমি খেয়েছি, আপনারও খেয়ে দেখুন।
হ্যাপি কাঞ্জি পার্টি।

ছবি
সেকশনঃ সাধারণ পোস্ট
লিখেছেনঃ শওকত আলী বেনু তারিখঃ 25/02/2017 02:23 PM
সর্বমোট 1420 বার পঠিত
ফেসবুকের মাধ্যমে কমেন্ট করুণ

সার্চ