ব্যাকগ্রাউন্ড

ফেইসবুকে!

নিঝুমপুরে একরাত্রি # পর্ব- ২ #

# কিশোর এডভেঞ্চার কাহিনী #

১ম পর্বের পর-

বন্ধুদের উদ্দেশ্যে ফাহিম বললো,
‘তাহলে কবে যাচ্ছিস তোরা? আমি সেভাবে বিল্লুকে বলে রাখছি। ও তোদের জন্য স্টেশনে অপেক্ষা করবে।’
‘যাবোই যখন, তাহলে আর দেরি করে লাভ কি। আগামীকালই যাই। কি বলিস তোরা?’ বলে বাকি তিন বন্ধুর দিকে তাকালো সোহেল।
‘আমার কোনো সমস্যা নাই।’ রুদ্র বললো।
ফাহিম তার উপরের পাটির দাঁত দিয়ে নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরে কি যেন ভাবছে। কিছুক্ষণ পর ওদের দিকে তাকিয়ে বললো,
‘না, কাল না। তোরা বরং পরশু যা। কাল বিল্লু সময় পাবে না।’
রুদ্র বলে উঠলো, ‘সমস্যা নাই। একদিন পরে গেলে এমন কি ক্ষতি হয়ে যাবে। আমরা আগামী পরশুই যাবো।’
‘কিভাবে, কোন পথে তোদের গ্রামে যাবো, আমাদের একটা ডিরেকশন দে।’ ফাহিমের উদ্দেশ্যে বলে উঠলো শুভ।
‘তোরা কমলাপুর স্টেশন থেকে ট্রেনে করে যাবি। ট্রেন ছাড়ে দুপুরে। আন্ধারমানিক ষ্টেশনে নামবি। বিকাল পাঁচটায় ট্রেন ওখানে পৌঁছবে।’
‘তারপর?’ সোহেল জানতে চাইলো।
আবার বলতে শুরু করলো ফাহিম। ‘ষ্টেশন থেকে ভ্যান গাড়িতে করে রামচন্দ্রপুর গ্রামের শকুনটিলা খেয়াঘাটে নামতে হবে তোদের। ওই ঘাট দিয়ে কালাহার নদী পার হয়ে ওপারে কিছুটা পথ হেঁটে গেলেই বৈদ্যানগর গ্রাম। গ্রামের শেষ প্রান্তে গুদারাঘাট থেকে নৌকায় চড়ে উজান বিল পাড়ি দিলে আমাদের নিঝুমপুর গ্রামে পৌঁছে যাবি। তবে তোদের চিন্তার কোনো কারণ নাই। বিল্লু তোদেরকে আন্ধারমানিক রেল স্টেশন থেকেই পিক করবে। ও-ই আমাদের গ্রামে নিয়ে যাবে। ওখানে তোদের থাকা খাওয়ার কোনো সমস্যা হবে না। যে ক’দিন খুশি থাকতে পারবি। এর মধ্যে আমি সুস্থ হয়ে গেলে গ্রামে গিয়ে তোদের সাথে মিট করতে পারবো।’
ফাহিমের বর্ননা শুনে অপুর চোখ দু’টো বড় বড় হয়ে গেলো। অস্ফুট স্বরে বললো, ‘এতো কিছু করে তোদের গ্রামে যেতে হবে! এ তো দেখছি একেবারে অজ পাড়া-গাঁ। নদী, বিল, দিঘি! আমি বাপু সাতার জানি না।’
বলে সে একে একে চার বন্ধুর মুখের দিকে তাকালো। সবশেষে ফাহিমের দিকে চোখ পড়তেই দেখলো ও স্থির দৃষ্টিতে অপুর দিকে তাকিয়ে আছে। চোখের ভাষায় সে যেন বলছে, ‘চলে যা, মজা পাবি।’ না চাইলেও বেড়াতে যাবার সিদ্ধান্তে ফিরে গেলো অপু।
‘আচ্ছা, তোর কাজিন বিল্লুকে চিনবো কি করে? ওর ফোন নম্বর দে।’ রুদ্র বললো।
ফাহিম ওদের একটা মোবাইল নম্বর দিলো। এবং বলে দিলো ‘কেবলমাত্র আন্ধারমানিকের কাছাকাছি পৌঁছে বিল্লুকে ফোন দিবি। ওখানে ও তোদের জন্য অপেক্ষা করবে।’
বাসায় ফেরার পর থেকেই গুম মেরে বসে আছে অপু। মন থেকে কিছুতেই দ্বিধা কাটাতে পারছে না। সোহেল বললো,
‘এতো চিন্তা করছিস কেন?’
অপু সোহেলের দিকে তাকালো। ‘এই ফাহিমকে আমার ভালো লাগে নাই। ছেলেটা অদ্ভুত ধরণের। ওর চোখের দিকে লক্ষ করেছিস? তাকানো যায় না। খুব অস্বস্তি লাগে। আমার মোটেই যাবার ইচ্ছে ছিলো না, কিন্তু ওর চোখের দিকে তাকিয়ে অনিচ্ছা স্বত্বেও রাজি হয়ে গেলাম। বিষয়টা এমন যেন ও আমার মুখ দিয়ে হ্যা বলিয়ে ছাড়লো।’
রুদ্র চুপ করে কি যেন ভাবছিলো। হঠাৎ বলে উঠলো, ‘আমিও কিন্তু ওকে চিনতে পারছি না। কখনও অচেনা লাগে, আবার পরক্ষণেই মনে হয় ক্লাসে ওকে দেখেছি আমি। তবে অপু যেমন বলছে ফাহিমকে আমার কাছে অতটা খারাপ লাগেনি।’
ওদের কথাবার্তার মাঝেই হাজির হলো তানিম। বন্ধুদের উদ্দেশ্যে বলে উঠলো, ‘কিরে, সবকিছু ফাইনাল করে ফেলেছিস?’
‘ফাইনাল তো করেছি কিন্তু অপু কেন জানি যেতে চাচ্ছে না।’ রুদ্র বললো।
‘কেন রে, সমস্যা কি?’ তানিম জানতে চাইলো।
‘তুই ফাহিম নামে কাউকে চিনিস? আমাদের ক্লাসে নতুন ভর্তি হয়েছে। আমি ওকে চিনতে পারছি না। ক্লাসে কখনও দেখেছি বলে মনে পড়ছে না। ছেলেটার ভিতরে অদ্ভুত কিছু একটা আছে। আমি মন থেকে ঠিক সায় পাচ্ছি না।’ তানিমের উদ্দেশ্যে বললো অপু।
‘ফাহিমের সাথে আমারও পরিচয় নাই। শুভ ওকে চেনে।’ বললো রুদ্র।
‘ফাহিম নামটা আমার কাছেও নতুন বলে মনে হচ্ছে। সমস্যা মনে হলে যাওয়ার দরকার কি? চল, আমরা অন্য কোথাও যাই।’ সোহেল ও রুদ্রর উদ্দেশ্যে বললো তানিম।
‘তা তো যাওয়াই যায়। তবে আমরা তো আজ ফাহিমকে কথা দিয়ে এসেছি। আগামী পরশু যাওয়ার কথা। এখন অপু বেঁকে বসেছে।’ সোহেল বললো।
তানিম বললো, ‘অপুর উপরে আমার পূর্ণ আস্থা আছে। ও যদি না যায়, তাহলে আমিও যাচ্ছি না।’
‘তাহলে তো আমাদেরও যাওয়া হবে না। অপু ছাড়া আমিও যেতে রাজি না।’ সোহেল বললো।
একে একে তিন বন্ধুর মুখের দিকে তাকালো অপু। ‘তোরা তো আমাকে বিপদে ফেলে দিলি। আমার জন্য তোদের অনন্দযাত্রা নষ্ট হোক, তা আমি চাই না। একটু ভেবে বললো ঠিক আছে, আমি যাবো। যা থাকে কপালে।’ মৃদু হেসে বললো অপু।
তিন বন্ধুর মুখে হাসি ফুটে উঠলো। সোহেল বললো, তাহলে এখন বাসায় যাই। মা তাড়াতাড়ি যেতে বলেছিলো। রুদ্র সোহেলের পিছু নিলে অপু তানিমকে থামালো। তানিম দু’চোখে প্রশ্ন নিয়ে বন্ধুর দিকে তাকালো।
‘ব্যাপার কি, বল তো!’
‘শোন, এই ফাহিমকে আমার স্বাভাবিক মনে হয়নি। অচেনা জায়গা! আমাদের অনেক সাবধান হতে হবে। সোহেল ও রুদ্র এখন উৎসাহী হলেও ওরা কেউ তেমন সাহসী নয়। আমার মনে হয় বিপদে পড়তে যাচ্ছে ওরা, তাইতো আমি যেতে রাজি হয়ে গেলাম।’
তানিম মাটির দিকে তাকিয়ে কি যেনো চিন্তা করলো। তারপর বললো, ‘চল, তোকে নিয়ে এখন এক জায়গায় যাবো।’
অপু কৌতুহলী হয়ে জিজ্ঞেস করলো, ‘কোথায়?’
‘আমাদের মসজিদের বড় হুজুরের কাছে।’
অপু চুপ করে ভাবলো কিছুক্ষণ। তারপর নিরবে মাথা নেড়ে বললো, ‘চল’।
 
বেলা সাড়ে এগারোটা। কমলাপুর ষ্টেশনের প্ল্যাটফর্মে ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করছে পাঁচ বন্ধু। তানিমকে দেখে শুভ বলে উঠলো, ‘তুইও চলে এসেছিস! ভালোই হলো। লোকজন বেশি হলেই তো বেড়াতে মজা।’
সোহেল বলে উঠলো, ‘অপু তো আবারও বেঁকে বসেছিলো। আমরা তিনজন মিলে ওকে রাজি করিয়েছি।’    
শুভ ফিক করে হেসে ফেললো। ‘কেন, অপু কি ভয় পাচ্ছে? তাহলে তো সমস্যা। মাঝপথেই হয়তো দেখা যাবে ও আবার বেঁকে বসেছে। শেষ পর্যন্ত না আমাদের বেড়ানোটা মাটি হয়ে যায়।’
তানিম সাথে সাথেই প্রতিবাদ করে উঠলো। ‘অপু ভয় পাবে! ভয় বলে কোনো কিছু ওর ডিকশনারিতে আছে নাকি? আমার তো মনে হয় তুই ভয় পেতে পারিস, অপু পাবে না।’
তানিমের কথার পিঠে শুভকে উদ্দেশ্যে করে রুদ্র বলে উঠলো, ‘কেন তুই অপুকে জানিস না? এতদিন একসাথে চলে এই বুঝলি!’
‘তা না, ও যেতে চাচ্ছে না দেখে বললাম।’ মুখটিপে হাসছে শুভ।  
‘অপু মোটেও ভিতু নয়। ও আমাদের মধ্যে সবচেয়ে সাহসী এবং বিচক্ষণ।’ সোহেল বললো।
‘আমাকে নিয়ে তোর সমস্যা হলে এখনই বলে ফেল, আমি ফিরে যাই।’ শুভর উদ্দেশ্যে বললো অপু।
‘না না, আমি তো জানি তুই অনেক সাহসী। ডোন্ট মাইণ্ড ফ্রেন্ড! জাস্ট কিডিং। হাসতে হাসতে অপুর পিঠ চাপড়ে দিলো শুভ।
অপু কিছু না বলে চুপ করে রইলো কিছুক্ষণ। তারপর বিড়বিড় করে বললো, ‘যাচ্ছ তো, ওখানে গেলেই টের পাবে আমার কথা সত্য কি না।’
শুভ মেঝের দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছে দেখে সোহেল জিজ্ঞেস করলো, ‘তুই হাসছিস কেন রে?’
‘হাসছি কোথায়? শেষ পর্যন্ত আমাদের যাওয়া হচ্ছে দেখে ভালো লাগছে। তাই খুশির ভাবটা আটকে রাখতে পারলাম না।’
ট্রেন ছাড়বে ঠিক বারোটায়। কিছুক্ষণের মধ্যে ট্রেন এসে থামলো প্ল্যাটফর্মে।পাঁচ বন্ধু নিজেদের কামরায় গিয়ে বসলো। সোহেল ও রুদ্র তাড়াহুড়া করে জানালার পাশের সিট দুটো দখল করে নিলো।শুভ হেসে বললো একঘণ্টা পর আসন বদল হবে। রুদ্র মুচকি হেসে জবাব দিলো, ‘দেখা যাক কি হয়’। ট্রেন ছাড়তে এখনও কিছু সময় লাগবে বলে মনে হচ্ছে। অপু চুপচাপ বসে আছে দেখে শুভ সোহেলকে কনুই দিয়ে গুতা দিয়ে চোখের ইশারায় জিজ্ঞেস করলো, ‘কি রে, ওর কি হইছে? একেবারে রোবটের মতো স্থির হয়ে বসে আছে যে!’ 
শুভর প্রশ্ন শেষ হতেই সোহেল অপুর দিকে তাকালো। তারপর কিছু একটা বলতে গিয়েও থেমে গেলো। ইতিমধ্যে ট্রেন ছেড়ে দিয়েছে। একটু একটু করে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। সোহেলের চোখে পড়লো অপু কেমন বড় বড় চোখে জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে। হঠাৎ হাত তুলে জানালার বাইরে ইশারা করে বলে উঠলো,
‘ঐ যে ফাহিম!’
চার জোড়া চোখ সাথে সাথেই জানালার দিকে ঘুরে গেলো।

চলবে......

পূর্ববর্তী পর্বঃ
১ম পর্ব 

ছবি
সেকশনঃ গল্প
লিখেছেনঃ নিভৃত স্বপ্নচারী তারিখঃ 08/12/2022
সর্বমোট 213 বার পঠিত
ফেসবুকের মাধ্যমে কমেন্ট করুণ

সার্চ