ব্যাকগ্রাউন্ড

ফেইসবুকে!

নিঝুমপুরে একরাত্রি # পর্ব- ১ #

 
# কিশোর এডভেঞ্চার কাহিনী # 
(এটি একটি কাল্পনিক ভৌতিক রহস্যপোন্যাস। গল্পের ঘটনা ও চরিত্রের সাথে বাস্তবের কোনো মিল নেই।)
 
পরীক্ষা শেষ হয়েছে আজ প্রায় তিন দিন হলো। সোহেল আর রুদ্রর ছটফটানি ক্রমে বেড়েই চলেছে। রোজই প্ল্যান করে কোথায় যাওয়া যায়। খুব শিঘ্র বেরিয়ে পড়তে হবে। অপু এ ব্যাপারে একেবারেই নির্বিকার। অথচ বরাবর ওর আগ্রহটা বেশি থাকে। তাছাড়া অপু সাথে না গেলে বেড়ানোর মজাটাই পাওয়া যাবে না, এটা সবাই বেশ অনুধাবন করতে পারছে। বিকাল হতেই দুই বন্ধু অপুর বাসায় হাজির। উদ্দেশ্য ট্যুর প্ল্যান করা। এই ছুটিটা কোনোভাবেই বৃথা যেতে দেয়া যাবে না।
‘কি রে, তুই যে চুপ করে আছিস। বেড়াতে যাবি না? পরীক্ষার আগে বেড়াতে যাবার কথা তুই-ই তো বলেছিলি।’ অপুর উদ্দেশ্যে বললো সোহেল।
‘হ্যা। যেতে তো চাই, কিন্তু শুভর তো কোনো খবর পাচ্ছি না।ও বলেছিলো কোথায় যেনো নতুন জায়গায় বেড়াতে যাবে।’
সোহেল বললো, ‘দাড়া, আমি শুভকে ফোন দিচ্ছি।’
কয়েকবার চেষ্টা করেও শুভকে ফোনে পাওয়া গেলো না। তবে খুব বেশি সময় অপেক্ষা করতে হলো না ওদের। কিছুক্ষণের মধ্যে সোহেলের নম্বরে একটি অপরিচিত মোবাইল থেকে ফোন এলো। সোহেল হ্যালো বলতেই অপর প্রান্ত থেকে ভেসে এলো শুভর কণ্ঠস্বর।
‘কি রে, তোর ফোনে কি হয়েছে? এটা কার নম্বর?’ সোহেল জানতে চাইলো।
সাথে সাথেই শুভ বলে উঠলো, ‘হাত থেকে পড়ে গিয়ে মোবাইলটায় সমস্যা দেখা দিছে। এটা আমার এক আত্মীয়ের নম্বর। তোরা বেড়াতে যাবি না?’
‘হ্যা, যেতে তো চাই-ই। কিন্তু তোরই তো দেখা নাই। আমরা তো তোর জন্য অপেক্ষা করছি।’ উত্তরে বললো অপু।
শুভ বললো, ‘আমিও তো যেতে চাই কিন্তু ফাহিমকে কিছুতেই ফোনে পাচ্ছি না। ও-ই তো আমাকে ওদের গ্রামের বাড়ির গল্প শুনিয়েছিলো। ইন্ডিয়ার বর্ডারের খুব কাছেই ওদের বাড়ি। ওখানে নাকি দেখার মতো অনেক কিছু আছে। গ্রামের খুব কাছ দিয়ে খুব সুন্দর একটি নদী বয়ে গেছে। কালাহার নদী। তারপর ওদের বাড়ি পাশে অনেক বড় একটা বিল আছে- উজান বিল। বিলটার ওপারেই পাহাড়। ওখান থেকেই ইন্ডিয়ার এড়িয়া শুরু। সে বিলে শীতের সময়টাতেও পানি থাকে।প্রচুর অতিথি পাখি আসে। প্রতি পূর্ণিমা রাতে চমৎকার জ্যোৎস্না পড়ে সে বিলে।’
মোবাইলের স্পিকার অন থাকায় ওরা তিনজনেই শুভর কথা শুনতে পাচ্ছিলো। রুদ্র বলে উঠলো, ‘তাহলে তো যাওয়াই যায়।’
খুব আগ্রহী কণ্ঠে শুভ আরও যোগ করলো, ‘এছাড়াও ওদের বাড়ির একপ্রান্তে অনেক বড় একটা দিঘি আছে। মতিহার দিঘি। লাল আর সাদা রঙের শাপলা ফুলে নাকি ছেয়ে থাকে সে দিঘি।’
হাসতে হাসতে রুদ্র বললো, ‘তুই তো দেখি ওদের গ্রামের সবকিছুই মুখস্ত করে ফেলেছিস!’
অপু হঠাৎ বলে উঠলো, ‘আমি তো এই ফাহিমকে চিনতেই পারছি না। অচেনা একজনের বাড়িতে যাবো যাকে চিনি না, বিষয়টা যেন কেমন লাগছে।’
‘আরে গতমাসে যে তিনজন ছেলে আমাদের ক্লাসে ভর্তি হলো, তাদেরই একজনের নাম ফাহিম। নতুন তো তাই সবার সাথে ওর পরিচয় হয়ে ওঠেনি। ওদের বাড়ি থেকে ঘুরে এলেই দেখবি কেমন আপন হয়ে উঠেছে।’ ফোনের ওপাশ থেকে শুভ বললো।
সোহেল ও রুদ্রকে বেশ আগ্রহী মনে হলেও অপুর মধ্যে কেমন যেন একটা দ্বিধা লক্ষ করা গেলো।
সোহেল বললো, ‘কি রে, তুই এতো গম্ভীর হয়ে আছিস কেন? তোকে এভাবে একদম মানায় না।’
‘না, আমার কেন জানি অন্যরকম লাগছে।’ অনেকটা আনমনেই বলে উঠলো অপু।
অপুর কথা হেসেই উড়িয়ে দিলো রুদ্র। ‘আরে দূর! তুই না গেলে কি করে হবে? আমরা কোনো মজাই পাবো না।’
‘তাহলে ফাহিমের সাথে যোগাযোগ করে যাওয়ার ব্যবস্থাটা করে ফেল না।’ মোবাইলে শুভর উদ্দেশ্যে বললো সোহেল।
শুভ বলে উঠলো, ‘আরে! সেটাই তো পারছি না। ওকে কিছুতেই ফোনে পাচ্ছি না।’
‘তাহলে ওর বাসায় চল। ঠিকানা জানোস?’ রুদ্র জানতে চাইলো।
ফোনের ওপাশ থেকে শুভ উত্তর দিলো, ‘না’।
সোহেল প্রশ্ন করলো, ‘ওদের বাসা কোথায়? কখনও তোর সাথে ওর এলাকার নাম বলেছে কি না- মনে করার চেষ্টা কর।’
বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো। গভীর ভাবনায় ডুবে আছে যেনো। তারপর অস্পষ্ট স্বরে বললো- ‘একবার কথাচ্ছলে বলেছিলো মনে হয়। সেন্ট্রাল হাসপাতালের উল্টাদিকের গলি দিয়ে যায়। ও একবার বলেছিলো ওখানে ও টেম্পু থেকে নেমে হেঁটে বাসায় যায়।’
রুদ্র বলে উঠলো, ‘তাহলে মনে হয় ভূতের গলি।’
শুভ হেসে বললো, ‘হ্যা, ওখানে হতে পারে।’
সোহেল বললো, ‘চল, আমরা কালই ফাহিমের খোঁজে নেমে পড়ি।’
‘ওর ছবি আছে তোর কাছে?’ শুভর কাছে জানতে চাইলো রুদ্র।
‘না, ছবি তো নেই!’
‘কেন, এসেম্বলির মাঠে সেদিন যখন আমরা একসাথে ছবি তুলছিলাম তখন তো নতুন ছেলেগুলো আমাদের সাথেই ছিলো। মোবাইলে খুঁজে দেখ। পেয়ে যাবি।’
‘না, নেই। ছবি তোলার আগেই ও কোথায় যেনো চলে গিয়েছিলো।’ শুভ বললো।
‘তাহলে কি আর করা, চল আমরা এমনেই খুঁজি। ভূতের গলি এলাকাটা বেশি বড় না, লোকজনকে জিজ্ঞেস করলে পেয়েও যেতে পারি।’ সোহেল বললো।
অপুকে চুপচাপ দেখে ওর পিঠ চাপড়ে দিলো সোহেল। ‘আরে এত চিন্তা করার কি আছে? মাত্র দুই দিনেরই তো ব্যাপার। তুই না গেলে আমরা কেউ মজা পাবো না। চল, ঘুরে আসি দু’দিনের জন্য।’
দুই বন্ধুর পীড়াপীড়িতে রাজি হয়ে গেলো অপু। ঠিক হলো পরের দিন ফাহিমকে খুঁজতে বের হবে ওরা। যেই কথা সেই কাজ। পরদিন চার বন্ধু মিলিত হলো আবার। অপু জিজ্ঞেস করলো,
‘তানিমকে বলিস নাই?’
‘বলেছি তো। ও বললো যাবে আমাদের সাথে। আজ একটু ব্যস্ত। আমাদেরকে সবকিছু ঠিক করতে বলেছে।’ রুদ্র বললো।
অপু বললো, ‘আচ্ছা।’
চার বন্ধু মিলে ফাহিমের খোঁজে বেরিয়ে পড়লো। অবশ্য খুব বেশি খুঁজতে হলো না। ভূতের গলিতে ঢুকে একটা ফার্মেসিতে ফাহিমের খোঁজ করতে যাবে, এমন সময় দেখলো ফাহিম নিজেই সেখানে হাজির। ওর জ্বর হয়েছে, তাই ঔষধ কিনতে এসেছে। বন্ধুদের দেখে ফাহিম বেশ উৎফুল্ল হয়ে উঠলো। অনেকক্ষণ কথা হলো ওদের মাঝে। তবে বাসায় নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে কোনো আগ্রহ দেখালো না ফাহিম।
সোহেল বললো, ‘কি রে, আমাদেরকে তোর বাসায় নিবি না?’
কিছুক্ষণ আমতা আমতা করে ফাহিম বললো, ‘আসলে আজ বাবা বাসায়। তাই তোদের বাসায় নিতে পারছি না। বাবা আড্ডাবাজি একদম পছন্দ করে না।’
ফাহিমকে দেখে অপুর ভিতরে এক ধরণের অস্বস্তি ভর করলো। বন্ধুদের আলোচনায় অংশ না নিয়ে সে চুপচাপ একপাশে দাঁড়িয়ে রইলো।
শুভ বলে উঠলো, ‘আচ্ছা, তুই না বলেছিলি আমাদেরকে তোদের গ্রামে নিয়ে যাবি। এখন তো স্কুল ছুটি। আমরা আর দেরি করতে চাই না। এবার বল আমরা কবে তোদের গ্রামে যাচ্ছি?’
ফাহিমের মুখ কালো হয়ে গেলো। কোমল স্বরে বললো, ‘বলেছিলাম তো। আমার খুব ইচ্ছে ছিলো তোদেরকে সাথে নিয়ে বাড়িতে বেড়াতে যাবো। কিন্তু কি করবো বল, গতকাল থেকে জ্বর, ঠাণ্ডা। এখন ঔষধ কিনতে আসলাম বলেই তো তোদের সাথে দেখা হয়ে গেলো। এই অবস্থায় বাবা বাসা থেকে একদম বের হতে দেবে না।’
শুভ কপট রাগ দেখিয়ে বলে উঠলো, ‘বুঝছি, তোদের বাড়িতে নিয়ে যাবি না, তাই বাহানা করছিস। ’
শুভকে থামিয়ে দিয়ে ফাহিম দ্রুত বলে উঠলো, ‘না রে! সত্যি বলছি আমি অসুস্থ। তোরা জানিস না আমার বাবা অনেক কড়া স্বভাবের মানুষ। এখন কিছুতেই আমাকে গ্রামে যেতে দিবে না।’
শুভ বললো, ‘তাহলে আমাদের যাওয়া হচ্ছে না? তোর কাছে তোদের গ্রামের গল্প শুনে খুব যেতে ইচ্ছে করছিলো। আমি আমার বাবা-মাকে রাজি করিয়ে ফেলেছি।’
ঠিক তখনই খুব আগ্রহ নিয়ে হঠাৎ শান্তকণ্ঠে ফাহিম বলে উঠলো, ‘আমি না গেলেও সমস্যা নাই। চাইলে তোরা চলে যেতে পারিস। ওখানে আমার চাচাতো ভাই বিল্লু আছে। আমি তোদের ব্যাপারে ওর সাথে মোবাইলে কথা বলেছিলাম। তোরা গেলে ও তোদের স্টেশন থেকে বাড়িতে নিয়ে যাবে। আবার ফেরার সময় তোদের ষ্টেশনে পৌঁছে দিবে। ’
ফাহিমের মুখে তখন এক অদ্ভুত প্রসন্ন হাসি। ভীষণ রকম শান্ত দু’টো চোখে বেড়াতে যাবার আমন্ত্রণ। রুদ্র ওর দিকে তাকিয়ে মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললো- সে যাবে। সোহেলের দিকে ফিরে রুদ্র জিজ্ঞেস করলো, ‘কি রে, যাবি?’
সোহেল সম্মতিসূচক মাথা নেড়ে বললো, ‘ওরা তিনজন গেলে আমি রাজি।’
সোহেলের দেখাদেখি রুদ্রও সায় জানালো। তবে অপুর মধ্যে কিছুটা দ্বিধা লক্ষ করা গেলো। ওরা চারজন একে অন্যের দিকে তাকালো। সোহেল, শুভ ও রুদ্র মিলে অপুকে বোঝাতে লাগলো। ওরা চারজন যখন নিজেদের মধ্যে কথা বলছিলো অপুর মনে হলো ফাহিমের চোখ দু’টো হঠাৎ যেন বেশ উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। ফাহিম অপুর চোখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকালো। অপুর অস্বস্তি আরও বেড়ে গেলো। ফাহিমের দিক থেকে কিছুতেই চোখ সরাতে পারছে না। অনিচ্ছা স্বত্ত্বেও আনমনে বলে উঠলো,
‘ঠিক আছে, চল যাই।’
ঠিক তখনই অপুর দিক থেকে দৃষ্টি সরে গেলো ফাহিমের।

চলবে ...

ছবি
সেকশনঃ গল্প
লিখেছেনঃ নিভৃত স্বপ্নচারী তারিখঃ 03/12/2022
সর্বমোট 818 বার পঠিত
ফেসবুকের মাধ্যমে কমেন্ট করুণ

সার্চ