ব্যাকগ্রাউন্ড

ফেইসবুকে!

তেল নিয়ে তেলেসমাতি

# ধরুন কোনো ব্যবসায়ী টার্গেট করে রাখলো সে ১০০ টাকায় ৪০ টাকা লাভ করবে। ব্যবসা করতে গিয়ে সে ৪০ টাকা লাভ করতে পারলো না, প্রকৃতপক্ষে লাভ করলো ৩০ টাকা। এরপর সে বলল- তার লস হয়েছে ১০ টাকা।‌ সে তার ব্যবসা চালিয়ে গেল এবং বলতে থাকলো আমি ১০ টাকা ভর্তুকি দিয়ে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছি।‌ ব্যবসায়ীর এই কথার মধ্যে তার ৩০ টাকা লাভের বিষয়টি ঢাকা পড়ে র‌ইল। # 'সরকার বিপিসিকে ভর্তুকি দেয়' এই কথাটাকে যতোটা সরল মনে হয়, কথাটা মোটেও তত সরল নয়। সরকার প্রথমেই বিপিসির কাছ থেকে লিটারপ্রতি ডিজেলে ১১ টাকা ভ্যাট ও অন্যান্য শুল্ক মিলে ১৭ টাকা আয় করে নেয়। ৬৫ টাকায় ১৭ টাকা মানে শতকরা হিসেবে ১০০ টাকায় ২৬ টাকা সরকার আয় করে। এছাড়া সরকার প্রাথমিক জ্বালানির ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক-মূসক আদায় করে। অর্থাৎ সরকার শতকরা ২৬+২৫= ৫১ টাকা আগেই লাভ করে নেয়। # সরকার এখন বলছে জ্বালানি তেলে ১৩ শতাংশ ভর্তুকি দিচ্ছে। এই ১৩ শতাংশ ভর্তুকি মানে আসলে সরকার এখনও শতকরা ৫১-১৩= ৩৮ টাকা লাভ করে যাচ্ছে। এখানে সরকারের ১৩ টাকা ভর্তুকি মানে ৩৮ টাকা লাভ থেকেই যাচ্ছে। ফলে ভর্তুকি মানে কোনোভাবেই লোকসান নয়। এটা শুভঙ্করের ফাঁকি। # বিশ্ববাজারে যখন তেলের মূল্য রেকর্ড পরিমাণ কম তখন‌ সরকার তেলের দাম ততটা না কমিয়ে মাত্র ৩ টাকা কমিয়েছিল ফলে বিগত পাঁচ মাস বাদে গত ৭ বছরে সরকার বিপিসির মাধ্যমে আয় করেছে ৪০ হাজার কোটি টাকা।‌ # বিপিসির লাভ যখন লিটার প্রতি ১৫-৪০ টাকা ছিল, তখন বহু সমালোচনার পর এপ্রিল ২০১৬ সালে সরকার লিটার প্রতি মাত্র ৩ টাকা দাম কমিয়েছিল। ফলে গত ৭ বছর ধরে সরকার গড়ে ২৩ শতাংশের বেশি লাভ করেছে। এরপর ডিজেল-কেরোসিনের দাম বাড়ানোর সুযোগ না পেয়ে সরকার কয়েকবার বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বাড়িয়েছে। এখন আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির কারণে প্রতি লিটার ডিজেলে ১৩ টাকা লোকসান দেখিয়ে এক ধাক্কায় ডিজেলের দাম ১৫ টাকা বাড়িয়ে ৬৫ টাকা থেকে ৮০ টাকা করেছে। এই লোকসান প্রকৃত লোকশান‌ নয়, এর মধ্যে ট্যাক্স, ভ্যাট, মুসক বাবত সরকারের ৩৮ টাকা লাভ থেকেই যাচ্ছে। তাছাড়া এ হিসাবটি শুধুমাত্র বিগত পাঁচ মাসের জন্য প্রযোজ্য, বাকী সাড়ে ছয় বছর সরকার অনেক বেশি লাভ করেছে। # লিটার প্রতি ১৫ টাকা দাম বাড়া মানে শতকরা হারে ২৩ শতাংশ দাম বাড়া। জ্বালানি তেলের দাম ২৩ শতাংশ বাড়া মানে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার খরচ শতকরা ২৩ ভাগ বেড়ে যাওয়া। কারণ, জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির ইমপ্যাক্ট জীবনযাত্রার সর্বত্র। যদিও তথ্যমন্ত্রী বলছেন এ জন্য অন্যান্য খরচ বাড়বে না। আমার স্মরণ মতে তথ্যমন্ত্রীরা সাধারণত ছাগল টাইপের হয়। বিএনপির আমলের ছাগল ছিল নাজমুল হুদা। এখনকার ছাগল হাসান মাহমুদ।‌ কথা বলতে গেলে উনি গরুকে টেনে নদীতে নামিয়ে নদীর রচনা লেখার মতো বিএনপিকে টেনে এনে তাদের বদনামের কথা ছাড়া আর কোনো কাজের কথা বলতে পারেন না। ওবায়দুল কাদের এবং হাসান মাহমুদ যদি বিএনপির নাম মুখে না আনে তবে বিএনপি বলে দেশে যে একটা দল আছে এটা কোনো মিডিয়ায় উচ্চারিত হবার সুযোগ থাকে না। # শুধুমাত্র ২০২০-২০২১ অর্থবছরে সরকার বিপিসির মাধ্যমে তিন হাজার কোটি টাকা লাভ করেছে। পদ্মা অয়েল কোম্পানি লাভ করে ২৫২ কোটি টাকা, যমুনা ও মেঘনার লাভ যথাক্রমে ২০০ ও ২২০ কোটি টাকা। এছাড়া অন্য কোম্পানিগুলো মিলে আরও প্রায় ৫০ কোটি টাকা মুনাফা তুলেছে। # সরকার বলছে- ভারতে তেলের দাম কম বলে বাংলাদেশ থেকে ভারতে তেল পাচার হয়ে যাচ্ছে এবং সেই পাচার রোধ করতে বাংলাদেশ তেলের দাম বাড়িয়েছে। এই যুক্তিটা খুবই দুর্বল যুক্তি। আমরা ভারতের অঙ্গরাজ্য ন‌ই, আমাদের দাম বাড়ানো-কমানোর সিদ্ধান্তটা আমাদের প্রেক্ষাপটের উপরে নির্ভর করবে, এখানে ভারতকে টেনে এনে সরকার নির্বিজতার পরিচয় দিয়েছে। সরকারের কথায় মনে হচ্ছে আমরা ভারতের অঙ্গরাজ্য। সরকারের ভারত তোষণ চরিত্র সম্পর্কে জনগণ এমনিতেই অবগত, এ বিষয়ে আর উলঙ্গ হবার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। তাছাড়া ভারতে এখন চরম সাম্প্রদায়িক শক্তি ক্ষমতায়, সে কি করলো না করলো সেটা একটা সেকুলার দেশের উদাহরণ হতে পারে না। ইতিবাচক কোনো উদাহরণ হলে তাও না হয় একটা কথা ছিল। এটা তো কোনো ইতিবাচক উদাহরণ নয়। # তেল পাচার হলে পাচার রোধের জন্য বর্ডারে ব্যবস্থা নিতে হবে। জনগণ এজন্য বিজিবি পুষতেছে। বিজিবি যদি এটা রোধ করতে না পারে তবে সে ব্যর্থতা বিজিবির, সে জন্য বিজিবিকে শক্তিশালী করতে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে, তেলের দাম বাড়িয়ে জনগণের উপরে কেন জীবনযাত্রার খরচ বাড়ানোর চাপ দেবেন? পাচার হ‌ওয়া মানে ট্যাঙ্কার ভরে ভরে তেল ভারতে যাওয়া। বিজিবি থাকতে এটি কী করে সম্ভব? দুচার লিটার তেল যদি কেউ ভারতে যাবার সময় সাথে করে নিয়ে যায় তার ইমপ্যাক্ট রাষ্ট্র পর্যায়ে পড়ার কথা নয়। তেল পাচার রোধ করতে পারেনি বলে বিজিবির কারো শাস্তি হতে আমরা দেখিনি। ফলে এটি দাম বাড়ানোর পক্ষে একটা খোড়া যুক্তি। # সরকারের মধ্যে দুর্নীতির আখড়া। আমরা পত্রিকায় দেখেছি বিদেশে অর্থ পাচারের তালিকায় শতকরা ৭৫ জনই সরকারি চাকুরে। কানাডার বেগমপাড়া সরকারি চাকুরেদের দখলে। বিদেশে পাচার বাদেও দেশের মধ্যে শান-শ‌ওকতে তারাই এগিয়ে।‌ টাকার প্রয়োজনে দুর্নীতি কমাতে হবে।‌ কিন্তু এ সরকার সেটা পারছে না। কারণ, সরকার তাদেরকে এসব অবৈধ সুযোগ-সুবিধা দিয়ে হাতে রেখে ক্ষমতায় টিকে আছে। এ সরকারের জনভিত্তি খুবই দুর্বল।‌ জনভিত্তি দুর্বল বলেই সরকার ভীত এবং সে কারণেই সরকার আমলা তোষণ ও ভারত তোষণ নীতি থেকে বেরিয়ে আসতে পারছে না।‌ # সরকার ম্যাকিয়াভেলির তত্ত্ব অনুসারণ করে দেশ চালাচ্ছে।‌ যে কোনো মূল্যে তাকে ক্ষমতায় থাকতেই হবে। ফলে এখানে সত্য বলা যাবে না। সত্য বললেই সে জামায়াত-বিএনপির লোক। তার উপরে নানারূপ নিপিড়ন-নিষ্পেষণের শেষ নাই।‌ সরকারের এসব অপকর্ম জায়েজ করতে অথর্ব মন্ত্রী পরিষদ আছে, তারা মুরিদের মতো সরকারের সকল কাজের প্রশংসা করার জন্য সর্বদা জিকির করছে। কে কার থেকে বেশি জিকির করলো সেটাই টিকে থাকার যোগ্যতা। সত্য বললেই নাই হয়ে যাবে। # এভাবে জ্বালানি তেলের এতোটা মূল্য বৃদ্ধি কখনোই যৌক্তিক হতে পারে না। ফলে সরকার এটিকে পুনর্বিবেচনা করবে সেটাই প্রত্যাশা।‌ আমার ধারণা এ মূল্য বৃদ্ধি থাকবে না। পরিবহণ ধর্মঘট যদি দীর্ঘায়িত হয় তাহলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনা একটা ঘোষণা দিয়ে এটা কমিয়ে আনবেন। তখন ধন্য ধন্য পড়ে যাবে। উনি এটা পছন্দ করেন। অসুবিধা নাই, জ্বালানি তেলের দাম কমাক, আমরা উনাকে পর্যাপ্ত তেল মেরে দেবো। দাম তো কমলো। মানুষ আর খরচার ভার নিতে পারছে না।

ছবি
সেকশনঃ সাধারণ পোস্ট
লিখেছেনঃ যুক্তিযুক্ত তারিখঃ 07/11/2021
সর্বমোট 233 বার পঠিত
ফেসবুকের মাধ্যমে কমেন্ট করুণ

সার্চ