ব্যাকগ্রাউন্ড

ফেইসবুকে!

একাত্তরের বিদেশী বন্ধুগণঃ দুঃসময়ের সারথি - পর্ব-২০

৭৩. বৃটেনের শ্রমিকদলের নেতৃবৃন্দ ও খনি শ্রমিকদের ভূমিকাঃ 

বৃটেনের শ্রমিকদলীয় পার্লামেন্ট সদস্য আর্থার বটমলের নেতৃত্বে প্রেরিত বৃটিশ পার্লামেন্টারি প্রতিনিধি দলের এক সদস্য টোবি জ্যাসেল কলকাতায় প্রদত্ত এক বিবৃতিতে বলেন, ‘পাকিস্তান সৈন্যবাহিনী পূর্ববঙ্গে হিন্দু-অধ্যুষিত বহু গ্রাম নির্বিচারে ধ্বংস করেছে। ’ দি ডেইলি টেলিগ্রাফ পত্রিকায় ১লা জুলাই প্রকাশিত এই রিপোর্টে বলা হয়, ‘গত দশ দিন যাবৎ মি. জ্যাসেল ও তাঁর সঙ্গীরা পূর্ববঙ্গের বহু এলাকা এবং ভারতে অবস্থিত শরনার্থী শিবিরগুলো ঘুরে দেখেছেন। ’ একই দিনে ‘দি টাইমস’-এ প্রকাশিত এক রিপোর্টে বলা হয়, ‘ঢাকা জেলার উত্তর-পশ্চিম কোণে প্রায় ৪০ মাইল দূরবর্তী সিন্দুরী গ্রামের বাড়িঘর লুটপাট করার পর পাকিস্তানি সৈন্যরা গ্রামটি আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিয়েছে। গত পাঁচদিনে এই এলাকায় আরও ৭টি গ্রাম ধ্বংস করা হয়েছে। পাকিস্তানি সৈন্যবাহিনী সিন্দুরী গ্রামের স্বর্ণকার রাধাবিনোদ কর্মকারসহ সাতজন পুরুষ ও একজন বৃদ্ধাকে নির্মভাবে হত্যা করেছে। চারজন মহিলাকে ধর্ষণ করা হয়েছে। ’ মি. বটমলের নেতৃত্বে প্রেরিত বৃটিশ পার্লামেন্টারি দলের সদস্য রেজ প্রেন্টিস দিল্লিতে সাংবাদিকদের সঙ্গে পূর্ববঙ্গ সমস্যা সম্পর্কে আলোচনাকালে বলেন, ‘কেবল রাজনৈতিক সমাধানের মাধ্যমেই শান্তি ফিরিয়ে আনা সম্ভব বলে তিনি মনে করেন। ’ ২রা জুলাই ‘দি টাইমস’-এ প্রকাশিত এই রিপোর্টে আরও বলা হয়, ‘পূর্ববঙ্গ থেকে নির্বাচিত প্রদিনিধিদলের নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে আলোচনা করে এই ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। ’
মি. বটমলে ভারতীয় পার্লামেন্ট সদস্য ও সাংবাদিকদের এক সভায় বক্তৃতাদান কালে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্টকে সাবধান করে দিয়ে বলেন, ‘পূর্ববঙ্গে আরও একটি ভিয়েতনাম সৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে। পূর্ববঙ্গ সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য উদ্যোগী না হলে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট তাঁর ফলাফলের জন্য দায়ী থাকবেন বলে তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন। ’
বৃটেনের জাতীয় খনি শ্রমিক ইউনিয়ন খুবই শক্তিশালী একটি ইউনিয়ন। একাত্তরের জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহে স্কটল্যান্ডের এবারডিনে অনুষ্ঠিত এই শ্রমিক ইউনিয়নের পাঁচদিন ব্যাপী বার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলন শেষে এই ইউনিয়ন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও বাঙালিদের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানায়। এই সম্মেলনে ইউনিয়নের কার্যকরী কমিটি বাঙালিদের পরিস্থিতি প্রসঙ্গে একটি প্রস্তাব উত্থাপন করে। প্রস্তাবে বেশ কয়েকটি বিষয় উল্লেখ করা হয়-
  1. বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের গ্রেফতার ও নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ জানানো হয়।
  2. শতকরা ৯৯ ভাগ সমর্থনপুষ্ট আন্দোলনকে নস্যাৎ করার জন্য পাকিস্তান সরকার সামরিক অভিযান শুরু করেছে।  তাই এই অভিযান বন্ধ করে দ্রুত নির্বাচনের রায় কার্যকরের আহ্বান জানানো হয়।
  3. বাংলাদেশের পরিস্থিতি বিষয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের বিষয়ে গুরুত্ব দেয়া হয়।
  4. পাকিস্তানের সামরিক হস্তক্ষেপ বন্ধে বৃটিশ সরকারকে চাপ প্রয়োগের দাবি জানানো হয়।
  5. পূর্ব পাকিস্তানে বেসামরিক শাসন ব্যবস্থা চালু না হওয়া অবধি বৃটিশ সরকার যেন পাকিস্তানকে কোনোরকম সাহায্য না করে, তাঁর দাবী জানানো হয়।
 
৭৪.    শ্যাম মানেকশ, ভারত
 
                                                                   শ্যাম মানেকশ
ফিল্ড মার্শাল শ্যাম হোরামশিজি প্রেমজি ‘শ্যাম বাহাদুর’ জামসেদজি মানেকশ। পারস্য বংশোদ্ভূত ভারতীয় সামরিক কর্মকর্তা। তিনি ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশের অমৃতসর শহরে ১৯১৪ সালের ৩রা এপ্রিল জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৩২ সালে ব্রিটিশ-ভারতীয় মিলিটারি একাডেমি, দেরাদুনে প্রথম ব্যাচের ক্যাডেট হিসেবে যোগ দেন এবং ১২তম ফ্রন্টিয়ার ফোর্স রেজিমেন্টের চতুর্থ ব্যাটালিয়নে কমিশন লাভ করেন। প্রায় ৪ দশকের দীর্ঘ সামরিক জীবনে তাঁর অর্জন অনেক। ১৯৬৯ থেকে ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত ভারতীয় সেনাবাহিনী প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে তিনি বাংলাদেশ-ভারত যৌথবাহিনীর প্রধান ছিলেন। সেনাবাহিনীসহ অন্যান্য সব বাহিনী প্রধানদের চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি এ যুদ্ধের সামগ্রিক দায়িত্ব পালন করেন। এ যুদ্ধে যৌথ বাহিনী জয়ী হয়, পাকিস্তান ৯৩ হাজার সৈন্যসহ আত্মসমর্পণ করে। এর মাধ্যমেই পৃথিবীর মানচিত্রে বাংলাদেশ নামে একটি স্বাধীন দেশের উত্থান ঘটে।
ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী একবার মন্ত্রিপরিষদের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি জরুরি সভায় তাঁকে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘পূর্ব পাকিস্তানের হাজার হাজার শরণার্থী আসাম, ত্রিপুরা ও পশ্চিমবঙ্গে প্রবেশ করছে। এ অবস্থায় আপনি কী করছেন?’ উত্তরে স্পষ্টভাষায় জেনারেল শ্যাম মানেকশ’ জবাব দিয়েছিলেন- “Nothing, it’s got nothing to do with me. You didn’t consult me when you allowed the BSF, the CRP and RAW to encourage the Pakistanis to revolt. Now that you are in trouble, you come to me. I have a long nose. I know what’s happening.”
তৎকালীন ভারতের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী, যিনি সর্বমহলে লৌহমানবী নামে পরিচিত ছিলেন, তাঁকে মন্ত্রিপরিষদের সামনে এমনভাবে কথা বলার দুঃসাহস দেখানোর মতো একমাত্র তিনিই ছিলেন। 
ইন্দিরা গান্ধী বলেছিলেন, ‘আমি চাই আপনি পাকিস্তানে প্রবেশ করুন।’ উত্তরে শ্যাম পাল্টা প্রশ্ন করলেন, ‘তার মানে যুদ্ধ!’ প্রধানমন্ত্রী বললেন, ‘যদি যুদ্ধ হয়, তবে তাই করুন।’ শ্যাম বললেন, ‘আপনি কি প্রস্তুত? আমি অবশ্যই না। এখন এপ্রিল শেষের দিকে। হিমালয়ের বরফ গলতে শুরু করেছে এবং চীন থেকে আক্রমণের সম্ভাবনাটা উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না। পূর্ব পাকিস্তানে বৃষ্টি শুরু হওয়ার সময় এখন। এর ফলে সারা দেশ পানি ও বন্যায় একাকার হয়ে যাবে। নদ-নদীগুলো সাগরের রূপ নেবে। এ পরিস্থিতিতে আমাদের সৈন্যবাহিনী তো সড়কের মধ্যে আটকে যাবে। বিরূপ আবহাওয়ার জন্য আমাদের বিমানবাহিনী সেনাবাহিনীকে কোনোরূপ সাহায্য করতে পারবে না। পাকিস্তানিরা তখন আমাদের মাটিতে মিশিয়ে দেবে।’
শ্যাম আরো বললেন, ‘তাছাড়া সেনাবাহিনীর একটি বড় অংশ এখন পশ্চিমবঙ্গে নকশালিদের বিদ্রোহ দমনে নিয়োজিত। এমতাবস্থায় তাদেরকে সুসংগঠিত করে পুনঃপ্রশিক্ষণ প্রদানে দেড়-দু’মাসের প্রয়োজন হবে। এছাড়া পাঞ্জাব ও হরিয়ানা প্রদেশে এখন ফসল কাটার সময়। এখন দেশে যুদ্ধ শুরু হলে সব রাস্তা, রেলপথ, ঘোড়া ও গাড়ি ব্যবহার করতে হবে সৈন্য পরিবহনে। ফলে শস্য পরিবহন সম্ভব হবে না। এতে ভারতে দুর্ভিক্ষ শুরু হলে সবাই দোষ দেবে আমাকে। তা ঘাড়ে নিতে চাই না। সাঁজোয়া ডিভিশন আমার প্রধান শক্তি। কিন্তু তাদের কাজ চালানোর জন্য আছে মাত্র বারোটি ট্যাঙ্ক। এর পরও আপনি যদি আমাকে এগিয়ে যেতে বলেন, তবে আমরা যে পরাজিত হবো তা আপনাকে শতভাগ নিশ্চয়তা দিয়ে বলতে পারি। প্রধানমন্ত্রী, এখন আপনি আমাকে আদেশ করুন যুদ্ধ শুরু করব কি না।’
সেদিন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী শ্যামের সাথে একমত পোষণ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। এবং সবশেষে তিনি শ্যামকে বলেছিলেন, ‘ঠিক আছে শ্যাম, আপনি জানেন আমি কী চাই।’ শ্যাম উত্তর দিয়েছিলেন, ‘জি, আমি জানি আপনি কী চান’। জেনারেল মানেকশ’ এই বলে শেষ করেছিলেন যে, এই যুদ্ধ অবশ্যই আমার সময় অনুযায়ী হতে হবে। যুদ্ধে একজন মাত্র কমান্ডার থাকবে। আমার একজন মাত্র রাজনৈতিক অধিকর্তা থাকবেন। তার নির্দেশ অনুযায়ী আমি কাজ করব, অন্য কারো নয়।’
খুব সূক্ষ্ম কৌশল অবলম্বন করে তিনি অল্প সংখ্যক সৈন্য এবং অস্ত্রের সাহায্যে অপেক্ষাকৃত অধিক অস্ত্রশস্ত্রে সমৃদ্ধ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে মাত্র ১৩ দিনের যুদ্ধে অপ্রত্যাশিত বিজয় অর্জন করতে সক্ষম হন। এবং এই কারণে, তিনি ইতিহাসের 'অমর নায়ক' হিসাবে ভারতে খ্যাতি এবং সম্মানের শীর্ষে উঠেছিলেন।
২০০৮ সালের ২৭শে জুন মৃত্যুবরণ করেন তিনি। বাংলাদেশ সরকার মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদান রাখার স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১২ সালে তাঁকে মরণোত্তর সম্মাননা প্রদান করেন।         
 
৭৫. ইন্দোনেশীয় জনগণের সোচ্চার প্রতিবাদ
 
একাত্তরে আমাদের মুক্তিযুদ্ধে মুসলিম বিশ্ব তথা ইসলামী দেশগুলোকে আমরা পাশে পাইনি। ইন্দোনেশীয় সরকারও তার ব্যতিক্রম নয়। তবে সরকারের বিরোধিতা স্বত্ত্বেও কিছু ইসলামী দেশের জনগন পশ্চিম পাকিস্তান কর্তৃক বাঙালিদের উপর দমন-পীড়ন ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন।
ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্র বিষয়ক মন্ত্রী ড. অ্যাডাম মালিক ২৭শে মার্চ প্রকাশ্যে বলেছিলেন যে, পাকিস্তানের দুই শাখার মধ্যে যা কিছু ঘটছে তা সেদেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার এবং ৭ই এপ্রিল ঘোষণা করেছে যে 'কোনো বিদেশী দেশের হস্তক্ষেপ করার অধিকার নেই যে কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে। ১২০ জন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ২৫ এপ্রিল প্রকাশ্যে বলেছিলেন যে তার সরকার 'পাকিস্তান ভাঙার বিরোধী'। ১২১ জন তা সত্ত্বেও ইন্দোনেশিয়া সংঘর্ষে অবিচ্ছিন্ন থাকা অব্যাহত রেখেছে এবং ইস্যুতে একটি 'নিরপেক্ষ অবস্থান' বজায় রেখেছে।
ইতোমধ্যে, ইন্দোনেশিয়ার বিরোধী রাজনৈতিক দল, প্রেস, বুদ্ধিজীবী এবং ছাত্র সমাজের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ, যাদের সকলেই বছরের পর বছর ধরে জাতীয় স্বাধীনতার জন্য ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করার অভিজ্ঞতা পেয়েছে, তারা শুরু থেকেই বাংলাদেশের পক্ষে ছিল এবং সেটাও তাদের সরকারের নিরপেক্ষতার স্পষ্ট বিরোধিতা করে। । ইন্দোনেশিয়ায় প্রবাসী বাঙালিদের একটি অংশ, ‘আমারা’ নামক ব্যানারে সংগঠিত, বাংলাদেশ আন্দোলনের পক্ষে ইন্দোনেশিয়ার জনমতকে একত্রিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের হত্যার প্রতিবাদে ৭ই এপ্রিল ঠিক জাকার্তায় পাকিস্তান দূতাবাসের সামনে বিক্ষোভ দেখায় ইন্দোনেশিয়ার প্রায় ২০০ শিক্ষার্থী
১৫ই এপ্রিল, ডেটকার্টা টাইমস লিখেছিল, “রাজনীতিবিদ, শিক্ষক, ছাত্র, ডাক্তার, প্রকৌশলী এবং এমনকি নারী ও শিশু সহ নিরস্ত্র বেসামরিক লোকজনও পূর্ব পাকিস্তানে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। সাধারণভাবে মুসলিম বিশ্ব কি এর ভুক্তভোগী হবে? ইসলাম কি সশস্ত্র মুসলমানদের দ্বারা নিরস্ত্র মুসলমানদের হত্যার অনুমতি দেয়? সংখ্যালঘুদের সংখ্যাগরিষ্ঠের দ্বারা সামাজিক ও অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারের দাবিতে ইসলামী নীতি কি দমনকে সমর্থন করতে পারে? মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর উচিত এ বিষয়ে দ্রুত কাজ করা এবং দেখা উচিত যে ভালো মুসলমানরা স্ব-ধর্মালম্বী মুসলমানদের দ্বারা গণহত্যার শিকার হচ্ছে না। আন্তর্জাতিক ইসলামিক সংস্থাগুলোরও পূর্ব পাকিস্তানের বর্তমান পরিস্থিতিতে নীরব দর্শক হওয়া উচিত নয়, বরং গণহত্যা বন্ধ করতে এবং এই অঞ্চলে শান্তি ফিরিয়ে আনার জন্য তাদের সীমিত শক্তির মধ্যে যা সম্ভব তা করা উচিত।”
তাছাড়া, বিরোধী শিবিরের তিন সদস্যের ইন্দোনেশিয়ান প্রতিনিধি দল, ইন্দোনেশিয়ার প্রাক্তন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. নাটসি, একজন প্রবীণ রাজনীতিবিদ ড. মোহাম্মদ রোম এবং ব্রাজিল ও ইতালিতে প্রাক্তন ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রদূত অধ্যাপক আবু হানিফা সেপ্টেম্বরের ১৮-২০ তারিখ দিল্লিতে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশ নিয়েছিলেন। রোম সম্মেলনে বলেন, “আমি একমত নই যে বাংলাদেশ পাকিস্তানের একটি ঘরোয়া সমস্যা। যদি কোনো দেশের পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক শান্তির জন্য হুমকি হয়ে থাকে, তাহলে এটি একটি অভ্যন্তরীণ সমস্যা হতে পারে না। এটা স্পষ্ট যে পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক শান্তির জন্য হুমকি। জাতিসংঘ এবং নিরাপত্তা পরিষদের হস্তক্ষেপ না করার কোনো কারণ নেই। ”
                                                                অধ্যাপক আবু হানিফা

অধ্যাপক আবু হানিফা একাত্তরের অক্টোবরে বাংলাদেশ সম্পর্কে দীর্ঘ এক প্রবন্ধ লেখেন ইন্দোনেশীয় পত্রিকা কিবলেত-এ।  প্রকৃতপক্ষে সেই প্রবন্ধ ছিলো বাঙালিদের ভাবনা-চিন্তার বহিঃপ্রকাশ। বিভিন্ন সভা ও আন্দোলনে বাঙালিদের দাবীর কথাই উঠে এসেছিলো সেই প্রবন্ধে। পশ্চিম পাকিস্তানি নেতৃবৃন্দের কঠোর সমালোচনা করেছেন। ইয়াহিয়া খানের অদক্ষতা, জুলফিকার আলী ভুট্টোর ষড়যন্ত্র আর পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর দমন-পীড়নের ফলে বাঙালিদের রক্তে রক্তাক্ত হচ্ছে পূর্ব বাঙলার মাটি। তিনি আরও বলেন, ইসলামী দেশ হওয়া স্বত্ত্বেও বাঙালিদের প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানি নেতৃবৃন্দের দৃষ্টিভঙ্গী মুসলিম আদর্শের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। তাই এটি অনুমান করা খুব সহজ যে ইসলামকে তারা অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। ভবিষ্যতে পূর্ব পাকিস্তানে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসলেও সে দেশের মানুষ ভবিষ্যতে দীর্ঘ সময়ের জন্য শারীরিক ও মানসিকভাবে একটা ক্ষত বয়ে বেড়াবে, এ সমস্যা আগামী দশ বছরেও হয়তো ঠিক হবে না। পাশাপাশি তিনি দুর্দশাগ্রস্থ বাঙালিদের সাহায্যার্থে এগিয়ে আসা দেশগুলো বিশেষ করে সোভিয়েত ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, পশ্চিম জার্মানি, ফ্রান্স ও জাপানসহ অন্যান্য দেশের নেতৃবৃন্দের প্রশংসা করেছেন। বাংলাদেশের পক্ষে দাঁড়ানো প্রধান শক্তি ভারতের কথা বিশেষ ভাবে উল্লেখ করেছেন। সেইসাথে মধ্যপ্রাচ্যের ইসলামী দেশগুলোর নিরবতাকে হতাশাজনক আখ্যায়িত করে তিনি বলেন, ইসলামী দেশ হওয়া স্বত্ত্বেও তারা মানবতাকে উপেক্ষা করে গুরুত্ব দিচ্ছে রাজনীতিকে, এটা দুঃখজনক।  তিনি ইন্দোনেশীয় নেতাদের উদ্দেশে বলেন, যখন বিশ্বে প্যালেস্টাইনিদের সমস্যার কথা উঠছে, তখন ইন্দোনেশীয় নেতারা তাদের সাহায্যের জন্য জোর দাবী জানাচ্ছেন, আর এই মুহূর্তে প্যালেস্টানিদের থেকে বহুগুণ বেশি সংখ্যক বাঙালির উপর হত্যা, নির্যাতন ও নানামুখী দুর্দশায় জর্জরিত, তখন আমাদের ইসলামী নেতারা নিজেরা ব্যস্ত রয়েছেন রাজনৈতিক আর মানবিক সমস্যার গুরুত্ব বিশ্লেষণে। 

চলমান...... 


পূর্ববর্তী পর্বগুলো পড়তে চাইলে এখানে ক্লিক করুন। 

ছবি
সেকশনঃ মুক্তিযুদ্ধ
লিখেছেনঃ নিভৃত স্বপ্নচারী তারিখঃ 27/10/2021
সর্বমোট 328 বার পঠিত
ফেসবুকের মাধ্যমে কমেন্ট করুণ

সার্চ