ব্যাকগ্রাউন্ড

ফেইসবুকে!

​সে কী হিন্দু মুসলিম বৌদ্ধ না খ্রীষ্টান?

​সে কী হিন্দু মুসলিম বৌদ্ধ না খ্রীষ্টান?

রুকুন-উদ-দৌলা সোহেল

ডাস্টবিনের পাশে রক্তাক্ত নোংরা  কাপড়ে মোড়ানো এক নবজাতক শিশু। যে হয়তো ঘণ্টা খানেক আগে পৃথিবীর আলো দেখেছে। মায়ের বুকের দুধ পান করার ভাগ্য হয়তো তার হয়নি। কচি কণ্ঠে ক্ষুধার্ত শিশুটির কান্না ভোরের বাতাসকে ভারি করে তুলেছে। 

সোনার পাড়া এলাকাটায় সবুজ-শ্যামল সুন্দর পরিবেশের একটি আবাসিক এলাকা। এখানে যারা বাস করেন তারা সবাই সব সময় একে অপরের সাথে মিলে-মিশে থাকেন।একের কষ্ট যেন সবার কষ্ট। ঠিক তেমনি আনন্দটাও ভাগ করে নেন সবাই। এই পাড়ায় হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ না খ্রীষ্টান কোন ভেদা ভেদ নেই। যার যার ধর্ম সে সে পালন করে। একে অপরের র্ধমিয় অনুষ্ঠানে অংশ নেন। বলতে গেলে বিভেদ হীন অসাম্প্রদায়িক একটি পাড়া। 

মসজিদ থেকে ভেসে এলো মুয়াজ্জিনের আযান। ভোরের পাখিরা কিচিরমিচির শব্দে জানান দিচ্ছে ভোর হচ্ছে এবার জাগতে হবে। আর সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে ফজরের নামাজ পড়তে মসজিদের দিকে যেতে শুরু করলেন মুসল্লিরা।

ফজরের নামাজ পড়ে রাস্তার পাশের ডাস্টবিনের সামনে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন মোহাম্মদ এনায়েত উল্লাহ্। নবজাতকের কান্না শুনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে  ভাবছে কার এই শিশুটি? কে এতো নির্দয় যে এমন সুন্দর ফুটফুটে শিশুটিকে এই নর্দমায় ফেলে গ্যাছে। এনায়েত উল্লাহর খুব ইচ্ছে হচ্ছে শিশুটিকে কোলে তুলে নিতে, কিন্তু ভয় পাচ্ছে। যদি কোন পুলিশি ঝামেলায় জড়াতে হয় সেই ভয় তাকে সামনে যেতে বাঁধা দিচ্ছে।

কিছুক্ষণ পর ঐ ডাস্টবিনের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলো শ্রী ভবেশ ঘোষ। নবজাতকের কান্না শুনে তিনিও থমকে দাঁড়ালো। ভবেশ ঘোষ এনায়েত উল্লাহকে বললো আহারে এমন সুন্দর ফুটফুটে বাচ্চাটাকে কে এভাবে ফেলে গেলো? ভগবান তাদের কোনদিন ক্ষমা করবেননা। এনায়েত সাহেবও সুর মেলালো আল্লাহ্ এই শিশুর জন্মদাতা-জন্মদাত্রীকে কখনো মাফ করবেননা। দু'জনই ভাবছে এখন কী করা যায়?

সকালে হাঁটতে বেরিয়েছে বিপ্লব বড়ুয়া। পাশ দিয়েই যাচ্ছিলো। নবজাকের কান্না আর পরিচিত দু'জন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে দেখে তিনিও দাঁড়িয়ে পড়লেন। হাঁটতে হাঁটতে ঘাম ঝরছে তার শরীর দিয়ে।

বিপ্লব বড়ুয়া কপালের ঘাম মুছে মোহাম্মদ এনায়েত উল্লাহ্ ও ভবেশ ঘোষকে জিজ্ঞেস করলেন কে এই শিশু? কে এভাবে ফেলে গেছে এত্তো সুন্দর ফুটফুটে বাচ্চাটাকে। যে বা যারা এই নবজাতককে এভাবে নর্দমায় ফেলে গ্যাছে তাদের কী দয়ামায়া নেই!! মানুষ কি ভাবে এতো পাষাণ হতে পারে! উপরওয়ালা তাদের বিচার করবেন।
এনায়েত উল্লাহ্ সাহেব বললেন আমরাও তাই ভাবছি। কিন্তু এখন কি করবো তা ভেবে পাচ্ছিনা।
বিপ্লব বড়ুয়া বললেন আমাদের কিছু একটা করা দরকার। শিশুটি ক্ষুধার যন্ত্রণায় খুব কাঁদছে। এভাবে থাকলে হয়তো শিশুটি মরে যাবে।
পূব আকাশে সূর্য আস্তে আস্তে আলো ছড়িয়ে দিনের শুরুর জানান দিচ্ছে। শুরু হবে যান্ত্রিক জীবনের আর একটি দিন। সূর্যের রক্তিম আভা নবজাতকের মুখে পড়ায় শিশুটিকে আরো সুন্দর লাগছে।
বাজারের ব্যাগ হাতে পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন ড্যানিয়েল গোমেজ। পাড়ার তিনজন লোককে ডাস্টবিনের পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তিনিও দাঁড়িয়ে পড়লেন। তিনজনকে উদ্দেশ্য করে বললেন-আরে আপনারা এই ডাস্টবিনের পাশে দাঁড়িয়ে কেনো? ওনাদের আর উত্তর দিতে হলোনা। নবজাতকের কান্না শুনে শিশুটিকে দেখে তিনি নির্বাক হয়ে গেলেন। হায় ঈশ্বর কে এই শিশু? তোমার সৃষ্ট জগতে এমন পাষাণ মানুষ কি আজো আছে যে তার এমন ফুটফুটে সন্তানকে এভাবে ময়লার ডাস্টবিনে ফেলে দেয়।
কে তার পিতা? কে তার মা? কী তার ধর্ম?
মোহাম্মদ এনায়েত উল্লাহ্ সাহেব ছোট-খাটো ব্যাবসা করেন। একটি মাত্র মেয়ে। কলেজে পড়ে। এবার অনার্স ফাইনাল দিবে। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়েন। কোরান হাদিস মেনে চলতে চেষ্টা করেন।
তিনি  শ্রী ভবেশ ঘোষ, বিপ্লব বড়ুয়া ও ড্যানিয়েল গোমেজকে উদ্দেশ্য করে বললেন আমার একটি মাত্র মেয়ে, ছেলে নেই এই শিশুটিকে আমি আমার বাসায় নিয়ে যাই। আমার পরিচয়ে সে বড় হবে। আল্লাহ্ সহায় থাকলে আমি তাকে আমার সন্তান হিসেবে মানুষের মতো মানুষ করবো।

শ্রী ভবেশ ঘোষ। স্বর্ণের ব্যাবসা করেন। তার দুটো স্বর্ণের দোকান আছে। পাড়ায় ভালো প্রভাবও আছে। পাড়ার ছোট-বড় সবাই তাকে সম্মানও করে।
তিনি বললেন দাদা আমার একটা ছেলে। উচ্চ শিক্ষার জন্য বিদেশে পাঠিয়েছি। লেখা-পড়া শেষ করে বিদেশে বিয়ে করে ওখানেই থাকে। বছর তিনেক আগে একবার এসেছিলো। এখনতো সপ্তাহে একবার ফোনেও বাবা-মার খবর নেয়ার সময় হয় না ওর। মাঝে সাজে ফোন করলে বলে তার নাকি কাজের প্রচুর চাপ। তাই সময় হয়না। দেশে আসার ইচ্ছে নেই তার। আমার বাসায় আমরা দু'জন ছাড়া আর কেউ নেই। বাচ্চাটাকে আমিই নিয়ে যাই। ভগবানের দয়ায় আমার কিছুর অভাব নেই। আমি ওকে সু শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তুলবো। তার কোন কিছুর অভাব হবেনা। কোন অভাব রাখবোনা আমি।  

বিপ্লব বড়ুয়া একটা বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে উচ্চ পদে চাকরি করেন। বেতন যা পান তাতে খুব সুখেই তার সংসার চলে যায়। এক ছেলে ও এক মেয়ের জনক তিনি। মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। ছেলে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার। ভালো মাইনে পায়। ছেলেকে বিয়ে করিয়েছেন দু'বছর হলো। এক বছরের নাতনি সম্পা বড়ুয়া দাদুর হাত ধরে হাঁটতে শুরু করেছে সবে।
তিনি মোহাম্মদ এনায়েত উল্লাহ্ ও শ্রী ভবেশ ঘোষকে বললেন বাচ্চাটাকে আমি নিয়ে যাই। পরম যতেœ মানুষ করবো। আমার নাতনির খেলার সাথী হবে। আমার বৌমা ওর খেয়াল রাখবে। যতœ করবে, মায়ের মমতা দিবে। তার কোন রকম অযতœ হবেনা আশা করি। সে আমার নাতির স্থান পাবে।
 
ড্যানিয়েল গোমেজ সরকারি চাকরি করেন। তার স্ত্রী একটা কলেজে অধ্যাপনা করেন। দু'জনের সংসার। বাগান করা দু'জনের শখ। তাই বাড়ীটাও খুব সুন্দর। হরেক রকম ফল, ফুল আর সবজি  গাছে ছাদ আর বাড়ীর চার পাশ সবুজে ঘেরা। ভালোবাসার হরেক রঙে সাজিয়েছেন বাড়ীটা। চাকরি থেকে অবসররে সময় প্রায় সন্নিকটে।
তিনি মোহাম্মদ এনায়েত উল্লাহ্, শ্রী ভবেশ ঘোষ ও বিপ্লব বড়ুয়াকে বললেন ঈশ্বর আপনাদের সন্তান দিয়েছেন। তাদের মুখে বাবা ডাক শুনেছেন আপনারা। অথচ দেখুন আমার কোন সন্তান নেই। কেউ আমাকে বাবা বলে ডাকেনি। আমার স্ত্রীকে মা বলে ডাকেনি। আমাকে ঈশ্বর সব দিয়েছেন শুধু সন্তান ছাড়া। তাই এই নবজাতক শিশুটিকে আমি নিয়ে যেতে চাই। আমার সন্তান হিসেবে পরম যতেœ তাকে বড় করবো। আমার যা কিছু আছে সহায় সম্পদ সব তার নামে করে দিবো। তার কোন কিছুর অভাব রাখবোনা। শেষ বয়েসে অন্তত পক্ষে বাবা ডাক শুনতে পাবো। ঈশ্বরকে সাক্ষি রেখে বলছি তাকে আমি আমার সন্তানের মতো নয় সন্তান হিসেবে গড়ে তুলবো।

ডাস্টবিনের পাশে রক্তাক্ত নোংরা কাপড়ে মোড়ানো পড়ে থাকা এই নবজাতক শিশুটির পরিচয় কী। কোন ধর্মে তার জন্ম? কোন পরিচয়ে এখন সে বড় হবে?

মানুষ জাতে জন্ম নিয়ে এই নবজাতক এখন কোন ধর্ম পরিচয়ে বড় হবে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ না  খ্রীষ্টান ?
 

ছবি
সেকশনঃ গল্প
লিখেছেনঃ rukunshohel তারিখঃ 28/03/2020
সর্বমোট 269 বার পঠিত
ফেসবুকের মাধ্যমে কমেন্ট করুণ

সার্চ