ব্যাকগ্রাউন্ড

ফেইসবুকে!

ঘুষ ও ঘুষি



ঘুষ ও ঘুষি
সাইয়িদ রফিকুল হক

 
সমাজে-রাষ্ট্রে এখন সাধু-সজ্জন ব্যক্তির দাম একেবারে কমে গেছে। এদের দাম পড়তে শুরু করেছে সেই আশির দশক থেকে। ভালোমানুষের এই দরপতনের অমানুষিক খেলা এখন আরও বেশি প্রকট। ভালোমানুষগুলো এখন সমাজে-রাষ্ট্রে সংখ্যালঘু। এখন পাশবিকতার চিরঅনুসারী আর এই পথের সম্রাটদের বিরাট পসার ও মর্যাদা। এরাই আজকালকার সমাজে-রাষ্ট্রে সংখ্যাগরিষ্ঠ। এদের পতনের কোনো সম্ভাবনা নাই। এদের দরবৃদ্ধির পথ আরও সুগম হচ্ছে। এইজাতীয় প্রাণিদের সংখ্যা দিন-দিন বাড়ছে এবং তা আরও বৃদ্ধি পাবে। তার কারণ, মানুষের মতো দেখতে একশ্রেণীর লোভী-ইতর এদের ঘোরতর সমর্থক ও পদলেহনকারী।
 
সমাজে-রাষ্ট্রে এখন ঘুষ ও ঘুষির জয়জয়কার। এখানে, যে ঘুষ খেতে পারে আর ঘুষ দিতে জানে তার মর্যাদা খুব বেশি। আর যে যত ঘুষ দিতে পারে আর ঘুষ খেতে পারে—তার তত বেশি দাম। একই সঙ্গে যে বা যারা যেকাউকে অতিসহজেই নিজের প্রভাব খাটিয়ে ঘুষি দিতে পারে—সমাজে-রাষ্ট্রে আজ তারা তত বেশি প্রভাবশালী! এদের মর্যাদা সবার উপরে! সবাই এদের খুব ভয় পায়, মান্য করে, ভক্তিশ্রদ্ধাসহকারে একেবারে মাথায় তুলে রাখে! সমাজে-রাষ্ট্রে মাস্তান, পাতিমাস্তান, গুণ্ডাপাণ্ডা, দাপুটে লোক, ষণ্ডাপ্রকৃতির লোক, আর পেশীশক্তির অধিকারী অমানুষদের বিরাট আশ্রয়প্রশ্রয় ও সম্ভাবনা রয়েছে। এখন ঘুষ ও ঘুষি অনেকেরই বেঁচে থাকা আর টিকে থাকার প্রধান হাতিয়ার।
 
ঘুষদাতা-ঘুষখোর আর পেশীশক্তির অধিকারী প্রাণিগুলোর দাপট সমাজে-রাষ্ট্রে এখন সবচেয়ে বেশি। এদের সঙ্গে কেউ পারে না। এদের গতি অপ্রতিরোধ্য! এরা দুর্বারগতিতে এগিয়ে চলেছে এদের অভীষ্ট ধ্বংসাত্মক লক্ষ্যে। এদের আছে অর্থবল, জনবল, সরকারি বল, প্রভাবশালীদের সমর্থন-বল আর দেশের সর্বস্তরের নেতিবাচক মিডিয়া ও অসভ্য পত্রিকাগোষ্ঠীর মদদ। দেশের অসভ্য-ইতর ও বর্বর ইলেকট্রিক ও প্রিন্ট মিডিয়া সবসময় এদের পদলেহনে ব্যস্ত। সুতরাং, এদের গতি কে-কীভাবে রুখবে? সাধারণ মানুষের সামান্য প্রতিবাদ এদের গায়ের একটা লোমও ছিঁড়তে পারে না। আর পারবেও না কখনো। এর জন্য চাই সর্বাত্মক প্রতিরোধ ব্যবস্থা। আর এদের বিরুদ্ধে এই মহাব্যবস্থাপনা রাষ্ট্রকেই করতে হবে।
 
আজকাল আমাদের সমাজে-রাষ্ট্রে একশ্রেণীর অর্থলোভী-কুকুরের জন্ম হচ্ছে নিয়মিতভাবে। এদের কোনো হিতাহিতজ্ঞান নাই। এরা অর্থ পেলে যেকাউকে সমর্থন বা যেকারও পক্ষাবলম্বন করতে সামান্য কুণ্ঠাবোধও করে না। এদের পিতা, উপাস্য, আদর্শ ও পথপ্রদর্শক হলো একমাত্র অর্থ তথা অর্থদাতা। এরা চিরকাল অর্থপূজারী। দেশের ইলেকট্রিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার বাকসর্বস্ব সুশীল-ভেকরা এতোটাই অর্থলোভী যে, এরা অর্থগন্ধে পাগল হয়ে একটা ‘গোলাম আযমে’র গুণকীর্তন করতেও ন্যূনতম লজ্জা বা দ্বিধাবোধ করে না। সমাজের তথা রাষ্ট্রের অতিনিকৃষ্ট প্রাণিগুলোর পক্ষে এরা দাঁড়াতেও সামান্য লজ্জাবোধ করে না। এরা অর্থপূজারী বলেই আজ নিজেদের হস্তগত করা ইলেকট্রিক ও প্রিন্ট মিডিয়াকে মানুষ ও মানবতার শত্রুদের পক্ষে গুণগান গাইতে সদাব্যস্ত রেখেছে।
 
সমাজের প্রায় প্রতিটি মানুষ এখন নিজেকে খুব পণ্ডিত আর বুদ্ধিমান ভাবে। আজকাল সদুপদেশ কেউ গ্রহণ করতে চায় না। ভাবখানা এমন যে, সে নিউটন কিংবা আইনস্টাইনের চেয়েও বেশি জ্ঞানী ও বুদ্ধিমান! মূর্খতা যে এদের প্রধান সম্পদ—তা আমাদের বুঝতে আর বাকি নাই। এই নিম্নশ্রেণীর আত্মসর্বস্ব জীবগুলো নিয়মিত ঘুষ ও ঘুষির চক্করে পড়ে নিজের জীবনটা রসাতলে পাঠানোর পাশাপাশি আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রকেও জাহান্নামের পথে ঠেলে দিতে সামান্য কার্পণ্য করছে না। এরা অর্থের পূজারী আর লোভ ও লাভের সেবাদাস। এই নরপশুগুলোর প্রাণে একটুখানি বিবেকবোধ জাগাতে না পারলে সম্মিলিতভাবে আমাদের শান্তিতে বসবাস করা আর বেঁচে থাকার কোনো সম্ভাবনা নাই।
 
মানুষের বিবেক আজ এতোটাই নিচে নেমে গেছে যে, এদের কাছে মানুষ আর অমানুষ এখন সমান বিষয়! এই বিবেকহীন মানুষগুলোকে সামান্যদরে ক্রয় করতে ঘুষ ও ঘুষির অধিকারী ব্যক্তিবর্গের তেমন-কোনো বেগ পেতে হয় না। সামান্য অর্থের বিনিময়ে এখন দেদারসে বিক্রয় হচ্ছে মানুষের অমূল্য বিবেক! অর্থলোভে মরীয়া হয়ে মানুষ এখন রাতারাতি অমানুষে পরিণত হচ্ছে। আর সবখানে এদের নিয়ন্ত্রণ করছে ঘুষ ও ঘুষি!
 
যেখানে অর্থে কাজ হয় সেখানে অসৎ প্রাণিগুলো ঘুষ দিয়ে মানুষকে কিনে নিচ্ছে—আবার যেখানে ঘুষিতে কাজ হয় সেখানে খুব সহজেই তারা সামান্য ঘুষিতে মানুষের বিবেক দখল করে নিচ্ছে! অনেকেই এখন খুব ভীতসন্ত্রস্ত প্রাণি। এরা নিজের স্ত্রীকে ভয় পায়, একটু গরিব হতে ভয় পায়, কিছুটা অসচ্ছল মানুষ হতে ভয় পায়, অর্থবলে কারও চেয়ে সামান্য ছোট হতে ভয় পায়, আর সবসময় সুখপ্রাচুর্য হারাতে খুব ভয় পায়। এমনকি এরা আজকাল একজন সৎ ও আদর্শবান মানুষ হতেও ভয় পায়! এই অমানুষগুলোকে ঘুষ ও ঘুষিতে পরাস্ত করা এখন খুব সহজ। এই অর্থলোভী-পশুদের কারণে আজ আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্র একেবারে রসাতলে যেতে বসেছে। কে রুখবে আজ এই পশুদের অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রা?
 
সমাজে-রাষ্ট্রে নষ্টমানুষের সংখ্যা ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। মানুষ-নামধারী একশ্রেণীর জীব দিনে-দিনে ভয়ংকর অমানুষে পরিণত হচ্ছে। অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয়সহ সকল ক্ষেত্রে আজ ভণ্ড ও অমানুষের ছড়াছড়ি। এভাবে সর্বক্ষেত্রে লোভী ও ইতরশ্রেণীর গণবিস্ফোরণ হলে একদিন আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্র একেবারে মুখথুবড়ে পড়বে। সেদিন আমাদের পাশে দাঁড়াবার মতো আর-কেউ থাকবে না। তাই, নিজের পায়ে কুড়াল মারার আগেই আমাদের সজাগ ও সতর্ক হতে হবে।
 
সমাজ ও রাষ্ট্রকে বাঁচাতে চাইলে সর্বাগ্রে এই আগ্রাসী ও সর্বগ্রাসী ঘুষ ও ঘুষি কঠোরভাবে প্রতিরোধ করতে হবে। মানুষকে এখনই জেগে উঠতে হবে। আমাদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার হওয়ার আগেই চাই সর্বাত্মক গণপ্রতিরোধব্যবস্থা।
 
 
 
সাইয়িদ রফিকুল হক
২১/০১/২০২০

ছবি
সেকশনঃ সাহিত্য
লিখেছেনঃ সাইয়িদ রফিকুল হক১ তারিখঃ 22/01/2020
সর্বমোট 670 বার পঠিত
ফেসবুকের মাধ্যমে কমেন্ট করুণ

সার্চ