ব্যাকগ্রাউন্ড

ফেইসবুকে!

মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ধারাবাহিক উপন্যাস: মুক্তিযুদ্ধ এখনও শেষ হয় নাই (প্রথম খণ্ড—ষষ্ঠ পর্ব)



মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ধারাবাহিক উপন্যাস:
মুক্তিযুদ্ধ এখনও শেষ হয় নাই
(প্রথম খণ্ড—ষষ্ঠ পর্ব)
সাইয়িদ রফিকুল হক

 
দুপুরের পরে ওদের মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক আলোচনা আরও জমজমাট হয়ে উঠলো। এই বিষয়টি ওদের সবার নিকট খুবই প্রিয়। আজকের বাংলাদেশরাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে। পৃথিবীর জারজরাষ্ট্র পাকিস্তানকে পরাজিত করে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেছে। ওরা এই দেশের শত্রু-মিত্রদের খুব ভালোভাবে চিনতে চায়। চারিদিকে এখন মুখচেনা, অচেনা, অর্ধচেনা, মুখোশধারী শত্রুরা ঘোরাফেরা করছে। এদের চিনতে হবে। এদের ধরতে হবে। আর এদের চিরতরে নির্মূল করতে হবে।
 
তরুণ বিপ্লব একটাকিছু বলার জন্য খুব উসখুস করছিল। তা টের পেয়ে অধ্যাপক রায়হান বললো, “তুমি মনে হয় কিছু-একটা বলতে চাচ্ছো? কোনোপ্রকার সংকোচ বা ভনিতা না করে তোমার মনের মধ্যে যা আছে তা বলে ফেল। আমাদের গুরুজী এতে কিছুই মনে করবেন না। তার কারণ, এইজাতীয় প্রশ্ন শুনে তিনি আরও খুশি হন। আর প্রশ্ন শুনলে আমাদের গুরুজী আরও আনন্দিত হন।”
একথা শোনার পর বিপ্লব সাহসী হয়ে উঠলো। সে দাঁড়িয়ে অধ্যাপক লিটু মিয়ার দিকে তাকিয়ে একটুখানি গম্ভীর হয়ে বললো, “স্যার, এখন দেখি কিছুসংখ্যক অমানুষ মুক্তিযুদ্ধের কথা বলে, রাজাকারদের পক্ষে কাজ করে, আর সবসময় আওয়ামীলীগের ঘোর বিরোধিতা করে থাকে। এরা আওয়ামীলীগকে একদম সহ্য করতে পারে না। এর কারণ কী, স্যার? যদি সংক্ষেপে একটুখানি বলতেন, স্যার।”
 
অধ্যাপক লিটু মিয়া স্মিতহাস্যে বলতে লাগলেন, “সে-কথা আমি পূর্বেও কিছুটা বলেছি। আর এখনও বলছি: আমাদের প্রিয় বাংলাদেশটা এখনও একাত্তর সালের মতো দুই ভাগে বিভক্ত। একদিকে মুক্তিযুদ্ধের সমস্ত পক্ষশক্তি তথা বাংলাদেশআওয়ামীলীগ ও তাদের সমমনা কয়েকটি দল। অপরদিকে রয়েছে: আওয়ামীলীগবিরোধী তথা পাকিস্তানপন্থী জামায়াত-শিবির, বিএনপি, চীনপন্থী সকল বামদল, জাসদ (রব), জাসদ (সিরাজ), বাসদ, বাম গণতান্ত্রিক মোর্চা, প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক জোট, প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক ছাত্রজোট, সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট, ছাত্রমৈত্রী, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি, ছাত্র ইউনিয়ন, যুব ইউনিয়ন ইত্যাদি। এরা সবাই চীনপন্থী। বাংলাদেশে চীনপন্থীরা কখনো মুক্তিযুদ্ধের পক্ষশক্তি নয়। এরা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ঘাপটিমেরে থাকা রাজাকার-অপশক্তি। কারণ, এদের প্রভু চীন ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল। তাই, এই চীনপন্থীরা আজও পাকিস্তানের দালাল। তবে এরা খুব চালাক-চতুর, ধূর্ত, ধুরন্ধর ও ভয়ানক ধড়িবাজ। সেই ১৯৭১ সালে, এরা প্রকাশ্যে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেনি ঠিকই কিন্তু তাদের মহাপ্রভু চীনের নির্দেশে মুক্তিযুদ্ধের সময় নীরব দর্শকের ভূমিকাপালন করেছিল। এই চীনপন্থীদের পূর্বপুরুষরা কিন্তু সরাসরি রাজাকার তথা মুসলিম-লীগের দালাল ছিল। তাই, এইসব দালালপুত্র কখনো মুক্তিযুদ্ধের পক্ষশক্তিকে সমর্থন করতে পারে না। বাংলাদেশে ১৯৭১ সালে, মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী এইজাতীয় চীনপন্থী দালালদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় হলো: দৈনিক প্রথম আলো ওরফে দৈনিক প্রথম শয়তানের আলো নামক পত্রিকার তথাকথিত সম্পাদক মতিউর রহমান, দি ডেইলি স্টারের তথাকথিত সম্পাদক মাহফুজ আনাম। এদের-উভয়েরই পিতা ও পিতামহ পাকিস্তানের একনিষ্ঠ গোলাম ও মুসলিম-লীগের দালাল ছিল। এজন্য এরা এদের পত্রিকায় সবসময় ইনিয়েবিনিয়ে আওয়ামীলীগের বিরোধিতা আর পাকিস্তানপন্থী জামায়াত-শিবির ও বিএনপি’র পৃষ্ঠপোষকতাদান করে থাকে। এই দুই পত্রিকার কথিত সম্পাদকের ক্ষমতার উৎস পাকিবংশ। বাংলাদেশের সর্বস্তরের পাকিস্তানপ্রেমিকরা এই দুই দালালকে সমর্থন করে থাকে। সেইজন্য আমি তোমাদের বলি, সবার আগে আমাদের বংশ চিনতে হবে। বাংলাদেশে দুইটি রাজনৈতিক বংশ রয়েছে। একটি বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামে নেতৃত্বদানকারী বাংলাদেশআওয়ামীলীগ, আর অপরটি হলো আওয়ামীলীগবিরোধী, মানে জামায়াত-শিবির, বিএনপি, পতিত বামসহ সকল রাজাকারি-বীজের ফসল। বাংলাদেশে দৈনিক প্রথম আলো নামক দৈনিক প্রথম শয়তানের আলো ও দি ডেইলি স্টার পত্রিকা ভিতরে-ভিতরে সবসময় মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও চেতনার বিরুদ্ধে কাজ করে থাকে। কিন্তু বাইরে এরা মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য কতরকম মায়াকান্নাপ্রদর্শন করে সাধারণ মানুষের মধ্যে নিজেদের ইমেজ-বৃদ্ধি করতে চায়। বাংলাদেশের ইতিহাসে একটা মতিউর রহমান ও মাহফুজ আনাম কোনো সাংবাদিক বা সম্পাদক নয়। এরা বাংলাদেশরাষ্ট্রের ক্ষতি করার জন্য জন্মেছে। আর এরা তা আমৃত্যু করে যাবে। দেশের ভিতরে এইরকম আরও কিছুসংখ্যক খবিসশয়তান রয়েছে। এরা হলো: বাম-রাজনীতির বদরুদ্দীন উমর। সেও চিরদিন চীনপন্থী রাজনীতির প্রবক্তা ও ধারক-বাহক। তার নিজস্ব রাজনৈতিক দলের নাম: বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী, বদরগ্রুপ)। শোনা যায়, ১৯৭১ সালে, এই বদরুদ্দীন উমর রাজাকারি-তকমা থেকে নিজেদের বাঁচানোর জন্য কয়েকদিন লোকদেখানোভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে একটুখানি ঘোরাফেরা করেছিল। আসলে, এরা কখনো মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করেনি, মুক্তিযুদ্ধে কখনো বিশ্বাস করেনি। মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক তথা অভিজ্ঞ মহলের মতে, বদরুদ্দীন উমররা কয়েকদিন মুক্তিযুদ্ধের খাতায় নাম লিখেয়েছিল আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে বিতর্কিত করার জন্য। এই বদরুদ্দীন উমররা সবসময় আওয়ামীলীগবিরোধী। আর সে নিজে ও তার অনুসারীরা মুক্তিযুদ্ধের পরে নানারকম আজেবাজে বই লিখে আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে বিতর্কিত করার অপচেষ্টা তথা ধৃষ্টতাপ্রদর্শন করেছে। তার এই ধৃষ্টতা এখনও চলছে। এই বদরুদ্দীন উমরের সগোত্রীয় বা এর আপন দুই জমজ ভাই হলো লেখক-নামধারী আখতারুজ্জামান ইলিয়াস ও আহমেদ ছফা। এরা জীবনে-মরণে ছিল চীনপন্থী। এরা চৈনিক। এরা চীনের সৈনিক ছিল। আর তাই, এই দুইটি লেখক-নামধারী জীব সবসময়, সারাজীবন আওয়ামীলীগের বিরুদ্ধে লিখে গেছে। এই দুইটার প্রধান মুরুব্বি বা পীর হলো চীন-বিশেষজ্ঞ ও চীনপন্থী একটা বদরুদ্দীন উমর। ১৯৭১ সালে, চীন ছিল আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে, আর পাকিস্তানের অন্যতম প্রধান পৃষ্ঠপোষক রাষ্ট্র। তোমাদের জ্ঞাতার্থে আবারও বলছি: ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের পক্ষে, আমাদের মহান ও পবিত্র মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী তিনটি প্রধান রাষ্ট্রের একটি ছিল চীন বা গণচীন। পাকিস্তান নামক জারজরাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখতে আর বাংলাদেশরাষ্ট্রকে ধ্বংস করতে পাকিস্তানের সঙ্গে এককাট্টা হয়েছিল তিনটি রাষ্ট্র: আমেরিকা, চীন ও সৌদিআরব। এজন্য বাংলাদেশের চীনপন্থীরা সবসময় রাজাকার। আর মনে রাখবে: যে একবার রাজাকার সে চিরদিন রাজাকার। আর রাজাকাররা কখনো ভালো হয় না। আর রাজাকাররা কখনো ভালো হতে পারে না। এই চীনপন্থীরা ভিতরে-বাইরে সবসময় রাজাকার হলেও এরা কিন্তু সাধারণ মানুষকে ধোঁকা দেওয়ার জন্য মাঝে-মাঝে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে দুই-চারটি সহজ কথাবার্তা বলে থাকে। কিন্তু এরা কখনো এদের অপকর্ম ও অপআদর্শ থেকে দূরে সরে যায় না। তোমাদের আরও একটাকে চিনিয়ে দিচ্ছি। সেও কিন্তু চীনপন্থী। এর নাম আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ। সে ‘বিশ্বসাহিত্য-কেন্দ্র’নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে। এখানে, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সস্তা কিছু বইপত্র জোগাড় করে রাখা হয়েছে। তাও এদের প্রধান মুরুব্বি বদরুদ্দীন উমরদের সাঙ্গোপাঙ্গোদের বই। কিন্তু এখানে বঙ্গবন্ধুর ওপর তেমন কোনো বই নাই। এরা অত্যন্ত কুকৌশলে শিক্ষার্থীদের বই পড়ানোর নামে তাদের নষ্ট বামপন্থী কিংবা আওয়ামীলীগবিরোধী হিসাবে গড়ে তোলার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। আরও একটাকে তোমাদের চিনিয়ে দিচ্ছি। এইটার নাম গ্রামীণব্যাংকের ড. মুহম্মদ ইউনূস। সেও চীনপন্থী এবং পাকিস্তানী দালাল। একমাত্র আওয়ামীলীগ ব্যতীত আর সব দল এদের কাছে খুব প্রিয়। এরা কখনো ভুল করেও আমাদের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাম মুখে আনে না। এদের কাছে এখনও আইয়ুব খান, ইয়াহিয়া খান, জুলফিকার আলী ভুট্টো, জিয়াউল হক, নেওয়াজ শরীফ, ইমরান খান ইত্যাদি খুব প্রিয়। শুনতে খারাপ লাগলেও আজ অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে, এরা সবাই পাকিস্তানের সন্তান। চীনপন্থীরা কখনো বাংলাদেশপ্রেমিক বা বাংলাদেশপন্থী হতে পারবে না। এরা আমৃত্যু থাকবে পাকিস্তানপ্রেমিক ও পাকিস্তানপন্থী। বাংলাদেশে আরও অনেক চীন-বামপন্থী দালাল রয়েছে। এরা হলো: ঢাকা-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-নামধারী এম এম আকাশ; ড. আসিফ নজরুল; ঢাবি’র সাবেক ভিসি ড. এমাজউদ্দিন আহমেদ; শিক্ষক-নামধারী ইমতিয়াজ আহমেদ চৌধুরী; জাহাঙ্গীরনগর-বিশ্ববিদ্যালয়ের চীনপন্থী-রাজাকারদের সর্দার অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ ইত্যাদি।” 
 
সব শুনে বিপ্লব অভিভূত। সে এবার আরও উৎসাহী হয়ে বললো, “স্যার, বাংলাদেশে ইসলামপন্থীদের রাজাকারির চিত্রটা যদি আরও বিশদভাবে তুলে ধরতেন। গতদিন এবিষয়ে আপনি একটুখানি আলোকপাত করেছিলেন। আজ যদি আরেকটু বলতেন।”তার কণ্ঠে বিনয় ঝরে পড়েছে।
অধ্যাপক লিটু মিয়া একথা শুনে মনে মনে গভীরভাবে আনন্দে উদ্বেলিত হলেন। তিনি বিনয়ীদের খুব ভালোবাসেন। তিনি মনে করেন, এরাই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ও মহামানব। তিনি আর কালবিলম্ব না করে একাত্তর সালে বাংলাদেশে ইসলামপন্থীদের পাকিস্তানপ্রেমের বিষয়ে বলতে লাগলেন:
 
“১৯৭১ সালে, বাংলাদেশে ইসলামপন্থীরা একবারও ইসলামের পক্ষে কাজ করেনি। তারা সবসময় শয়তানের পক্ষে উলঙ্গ হয়ে অপকর্মসাধন করেছে। সকল ইসলামপন্থীদল পাকিস্তানের পক্ষ নিয়ে বাংলাদেশের নিরীহ ও সাধারণ মানুষকে হত্যার অপকর্মে শামিল হয়েছিল। এদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা অগ্রগণ্য ছিল পাকিস্তানের চিরদালাল আবুল আলা মওদুদীপন্থী গোলাম আযমের নেতৃত্বাধীন জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তান ও তাদের ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘ (পরবর্তীতে দেশস্বাধীনের পরে ১৯৭৬ সালের গোড়ার দিকে এর নামপরিবর্তন করে রাখা হয় ইসলামী ছাত্রশিবির); জামায়াতের আমির গোলাম আযমের নেতৃত্বাধীন রাজাকারবাহিনী, আলবদর, আলশামস ও শান্তিকমিটি বা পীস-কমিটি; পাকিস্তানের চিরগোলাম জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম; নেজামে ইসলাম পার্টি; আজকের হেফাজতে ইসলাম ওরফে হেফাজতে শয়তান; হেফাজতে শয়তানদের নিয়ন্ত্রণাধীন চট্টগ্রামের দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম হাটহাজারী-মাদ্রাসার রাজাকারজোট ও তাদের পরিচালিত মুজাহিদবাহিনী; বরিশালের চোরমোনাইয়ের পীরের ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন বা ইসলামী আন্দোলন, চোরমোনাই-পীরের মাদ্রাসাজোট; পিরোজপুরের শর্ষিণাছারছীনা-মাদ্রাসার রাজাকারজোট; ঢাকার রাজারবাগের পীরের আস্তানা; ইসলামী ঐক্যফ্রন্ট; ইসলামী ঐক্য মোর্চা ইত্যাদি।
 
বাংলাদেশে ইসলামপন্থীরা ১৯৭১ সালে, আজান ও ইকামত দিয়ে প্রকাশ্যে পাকিস্তানকে রক্ষা করার জন্য পাকিস্তানের পক্ষে একেবারে উলঙ্গ হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। এইসময় এদের কোনো লজ্জাশরম বা মনুষ্যত্ব ছিল না। এরা বনের পশুর চেয়ে ভয়ংকর কোনো পশু হয়ে পাকিস্তানী-আর্মিদের সঙ্গে নিরীহ বাঙালিদের ওপর দিনরাত আক্রমণ চালিয়েছিল। বাংলাদেশে প্রায় সমস্ত মাদ্রাসা ১৯৭১ সালে পাকবাহিনীর ক্যাম্প হিসাবে ব্যবহৃত হয়েছিল। এমনকি কতকগুলো মসজিদ পর্যন্ত পাকিস্তানী-আর্মিদের ক্যাম্প হিসাবে ব্যবহৃত হয়েছিল। বিভিন্ন গ্রন্থে এর পক্ষে প্রমাণাদি রয়েছে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের যে-সকল মাদ্রাসা পাকিস্তানী-আর্মিদের নির্যাতন ও যৌননির্যাতনের বড়সড় ক্যাম্প হিসাবে ব্যবহৃত হয়েছিল তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: পিরোজপুরের শর্ষিণাছারছীনা-মাদ্রাসা; চট্টগ্রামের দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম হাটহাজারী-মাদ্রাসা (আজকের হেফাজতিদের আড্ডাখানা); চট্টগ্রামের কাগতিয়া-দরবার ও তাদের মাদ্রাসা; বরিশালের চোরমোনাইয়ের পীরের মাদ্রাসা; ঢাকার লালবাগের মাদ্রাসা, জামেয়া রহমানীয়া মাদ্রাসা ও কামরাঙ্গীচরের মাদ্রাসা; পাবনার পুষ্পপাড়া মাদ্রাসা; বৃহত্তর নোয়াখালী জেলার লক্ষ্মীপুর, রায়পুর ও ফেনীর বিভিন্ন মাদ্রাসা; কুমিল্লার মৌকরা-পীরের আস্তানাসহ বিবিধ মাদ্রাসা। এছাড়া, বৃহত্তর বগুড়া, পাবনা, ফরিদপুর, দিনাজপুর, কুষ্টিয়া, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, ঢাকা প্রভৃতি জেলার মাদ্রাসাগুলোতেও পাকবাহিনী ক্যাম্পস্থাপন করেছিল। তবে সর্বাপেক্ষা বড়সড় ও ভয়াবহ ক্যাম্প স্থাপিত হয়েছিল পিরোজপুরের শর্ষিণাছারছীনা মাদ্রাসা, বরিশালের চোরমোনাইয়ের পীরের মাদ্রাসা ও চট্টগ্রামের হাটহাজারী মাদ্রাসায়। আমি পূর্বে এর দুই-একটি মাদ্রাসার কিছু অপকর্মের কথা বলেছি। এবার আজকে শুধু পিরোজপুরের শর্ষিণাছারছীনা মাদ্রাসার অপকর্মের কথা সবিস্তারে বলার চেষ্টা করবো। পরবর্তীতে কোনো-একসময় অন্যান্য মাদ্রাসার পাপের ইতিহাসও বর্ণনা করবো। তোমরা সবসময় মনে রাখবে: ১৯৭১ সালে, একটা মাদ্রাসাছাত্র কিংবা একটা মাদ্রাসাপাস মোল্লা, মৌলোভী, মওলানা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থন করেনি। এরা সবাই সমর্থন করেছিল তাদের পেয়ারে পাকিস্তানকে। এরা এইসময় অন্ধের মতো পাকিস্তানের পক্ষে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। বাংলাদেশে সেই সময় একটা মাদ্রাসাছাত্রকে দেশের পক্ষে কাজ করতে দেখা যায়নি। এরা হয় রাজাকার, কিংবা আলশামস কিংবা আলবদর হয়েছিল। আর পাকিস্তান-রক্ষা করার জন্য এরা যেকোনো অন্যায় করতে সামান্যতম দ্বিধাবোধ করেনি। এরা ছিল একমাত্র পাকিস্তানের উপাসক।
 
বাংলাদেশের ইতিহাসে পিরোজপুরের শর্ষিণাছারছীনা-মাদ্রাসার সকল ছাত্র, সকল শিক্ষক, সকল মোল্লা, সকল মৌলোভী, সকল মওলানা পাকিস্তানকে রক্ষা করার জন্য নিজেদের জীবনবাজি রেখে রাত-দিন অপকর্ম করেছিল। এদের ঈমানের প্রধান অংশ ছিল এই পাকিস্তান। এদের কাছে তখন এবং আজও একমাত্র পাকিস্তানই ঈমানের মূল চাবিকাঠি। এদের ঈমানের মূলস্তম্ভ এই পাকিস্তান। স্বাধীন বাংলাদেশে এরা আজও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও চেতনার বিরুদ্ধে কাজ করছে।
 
শর্ষিণাছারছীনা মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা-প্রিন্সিপাল ও স্বঘোষিত পীর শাহ নেছারউদ্দীন ছিল পাকিস্তানের একনিষ্ঠ গোলাম। এই নেছারউদ্দীন এতোটাই পাকিস্তানভক্ত ছিল যে, সে অনায়াসে বিনাবাক্যব্যয়ে যেকোনো পাকিস্তানীর মূত্রপান করতে রাজী ও খুশি ছিল। পূর্বেই বলেছি, পাকিস্তান এদের ঈমানের মেরুদণ্ড। এই নেছারউদ্দীনের কুলাঙ্গারপুত্র ও ১৯৭১ সালে শর্ষিণাছারছীনা-মাদ্রাসা-প্রধান শাহ আবু জাফর মোহাম্মদ ছালেহ ছিল পাকিস্তানীদের পোষাকুকুর। তার পৃষ্ঠপোষকতা ও সর্বাত্মক সাহায্য-সহযোগিতায় পাক-আর্মিরা ১৯৭১ সালে এই মাদ্রাসায় একটা বিশাল ক্যাম্পস্থাপন করতে সক্ষম হয়। শর্ষিণার এই পিতাপুত্র এতোটাই পাকিস্তানবাদী ছিল যে, এদের প্রেম-ভালোবাসার টানে এই মাদ্রাসায় পাকিস্তানের তৎকালীন সামরিকজান্তা আইয়ুব খান এসেছিল, উপস্থিত হয়েছিল। সেই সময় তারা শর্ষিণামাদ্রাসায় পাকিস্তানের সামরিকজান্তা আইয়ুব খানের নামে ‘আইয়ুব-গেইট’পর্যন্ত বানিয়েছিল! তারা সামরিকজান্তা আইয়ুব খানকে আল্লাহর পয়গম্বর হজরত আইউব আ.-এর চেয়ে বেশি ভক্তি-শ্রদ্ধা করেছিল। নিশ্চয়ই বুঝতে পারছো, এই ধর্মের এই শুয়োরগুলো কোন জঘন্য মানসিকতার অধিকারী ছিল। এরা ১৯৭১ সালে, জেনেশুনে দেশের মানুষের বুকে ছুরি কিংবা পদাঘাত করতে এতোটুকু কার্পণ্য করেনি। আর এরাই নাকি এখন আলেম! মুহাদ্দিস! মুফতী! মুফাস্সির! ইসলামধর্মকে এরা বাপ-দাদার পৈতৃক সম্পত্তি মনে করে থাকে। শর্ষিণাছারছীনা-মাদ্রাসার পাপের ইতিহাস বর্ণনা করলে একশ’ একটা রাত ভোর হয়ে যাবে—তবুও তাদের পাপের কথা শেষ হবে না। শর্ষিণাছারছীনার বর্তমান-পীর শাহ মোহাম্মদ মহিবুল্লাহ তার বাপ-দাদার মতোই একনিষ্ঠ রাজাকার। এই ধূর্তশয়তান এখন নিজেদের অপকর্মের ইতিহাস আড়াল করার জন্য নানাভাবে নিজেদের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোক বলে অপপ্রচারের চেষ্টা চালাচ্ছে। আসল সত্য হলো, এই শর্ষিণাছারছীনা মাদ্রাসা ছিল বাংলাদেশে পাক-আর্মিদের সবচেয়ে বড় ক্যাম্প। এব্যাপারে আমার নিকট বিভিন্ন প্রমাণাদি রয়েছে। পিরোজপুরের স্থানীয় সকল মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযোদ্ধা-কমান্ডার বলেছেন, ‘১৯৭১ সালে এই শর্ষিণাছারছীনা মাদ্রাসা ছিল রাজাকার ও আদলবদর প্রশিক্ষণশিবির।’ এটা বাংলাদেশে রাজাকারদের অন্যতম জন্মস্থান। দুঃখের কথা আরও আছে। ১৯৮০ সালে বাংলাদেশের প্রথম সামরিকজান্তা ও রাজাকারপিতা মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান ভয়ংকর শয়তানীতে লিপ্ত হয়ে একাত্তরের এই যুদ্ধাপরাধী শাহ আবু জাফর মোহাম্মদ ছালেহকে সরকারিভাবে ‘স্বাধীনতা-পদক’ প্রদান করে। বিচারাধীন আসামী হিসাবে এই আবু জাফর ছালেহ ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট পর্যন্ত জেলে ছিল। কিন্তু পাকিস্তানের পোষ্যপুত্র জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতাদখল করে ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের কিছুদিন পরে আবু জাফর ছালেহকে জেল থেকে মুক্তি দেয়। এজন্য বাংলাদেশে জিয়ার অনুসারীরা আজও দেশের বিরুদ্ধে অপকর্ম করছে। ১৯৭৪ সালের এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহে শফিউল আলম প্রধান বলে এক রাজাকারপুত্র ঢাকা-বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘মহসিন হলে’ছাত্রলীগের সাতজন ছাত্রকে প্রকাশ্যে ব্রাশফায়ারে হত্যা করে। ইতিহাসে এটি ‘সেভেন মার্ডার’নামে খ্যাত। বঙ্গবন্ধুর শাসনামলেই এই নরপশুটাকে গ্রেফতার করে বিচার করা হয়। এতে শয়তানের জারজপুত্র শফিউল আলম প্রধানের ফাঁসির আদেশ হয়েছিল। কিন্তু জিয়াউর রহমান ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের পর এই শফিউল আলম প্রধানকেও জেল থেকে বের করে আনে। বাংলাদেশের সকল খুনী, রাজাকার, ধর্ষক, আলবদর, আলশামস ও স্বাধীনতাবিরোধী যেকোনো নরপশুই ছিল জিয়ার পরমাত্মীয়। এই জিয়াউর রহমানের ‘শয়তানী-শাসনামলে’১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের পর থেকে ১৯৮১ সালের ৩০-এ মে পর্যন্ত বাংলাদেশের মানুষকে ‘বঙ্গবন্ধু’শব্দটি বলতে দেওয়া হয়নি। সেই সময় কোনো সংবাদপত্রে বা স্কুল-কলেজের পাঠ্যবইয়ে ‘বঙ্গবন্ধু’শব্দটি লেখা হয়নি। বাংলাদেশের সংবাদপত্র থেকে শুরু করে স্কুল-কলেজের কোনো পাঠ্যবইয়ে শ্রদ্ধার সঙ্গে একবারও শেখ মুজিবুর রহমান শব্দটি লেখা বা উচ্চারণ করা হয়নি। স্কুলে পড়ার সময় দেখেছি, আমাদের সমাজ বইয়ে লেখা হতো: ২৬-এ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করা হয়। কে ঘোষণা করেন? তাঁর নাম নাই। তারপর লেখা হতো ‘যুদ্ধ করে ১৬ই ডিসেম্বর বিজয় অর্জিত হয়’। কাদের বিরুদ্ধে বিজয় অর্জিত হয়েছে তা লেখা হতো না। সেখানে ‘মুক্তিযুদ্ধ, ‘পাকিস্তানী, ‘রাজাকার’শব্দগুলো সজ্ঞানে-সচেতনভাবে বাদ দেওয়া হয়েছিল। সেখানে ‘পাকিস্তানী-হানাদারবাহিনী’র পরিবর্তে ব্যবহার করা হতো অজ্ঞাত ‘হানাদার’ শব্দ। কে বা কারা এই হানাদার? তা সে-সময়কার শিক্ষার্থীরা জানতে পারতো না। তাদের তা জানতে দেওয়া হতো না। তখনকার দিনে স্কুল-কলেজের ছেলে-মেয়েরা সঠিকভাবে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস পড়তে ও জানতে পারেনি। তার কারণ, পাকিস্তান জিয়ার ‘বাপ’ছিল। বাংলাদেশে একটা জিয়াউর রহমানের জন্মই হয়েছিল বাংলাদেশরাষ্ট্রকে ধীরে ধীরে ধ্বংস করার জন্য। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসবিকৃতি ও তা ধ্বংস করার জন্যও জিয়াউর রহমান সবরকমের ব্যবস্থাই করেছিল। জিয়া তার জীবদ্দশায় এই অপকর্মটি খুব নিষ্ঠার সঙ্গে করে গেছে। সে-ই বাংলাদেশের সকলস্তরের মাদ্রাসার রাজাকার, হুজুর ও পাতিহুজুরদের আশ্রয়প্রশ্রয় দিয়েছিল। শর্ষিণাছারছীনাপন্থীরা এই জিয়াউর রহমানকে আজও তাদের খলিফা মনে করে থাকে। আর তারা জিয়ার কথিত ‘মাজার’ জিয়ারত করে থাকে।
 
১৯৭১ সালে, শর্ষিণামাদ্রাসার প্রতিটি ছাত্র পাকিস্তান-রক্ষার সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। আর তারা একেকটা ‘সহীহ রাজাকারে’পরিণত হয়েছিল। এদের প্রধান কাজ ছিল: মুক্তিযোদ্ধাদের নামধাম পাকিস্তানী-ক্যাম্পে পৌঁছে দেওয়া, মুক্তিযোদ্ধাদের যাবতীয় খবরাখবর রাজাকারদের কাছে সরবরাহ করা, মাদ্রাসার আশেপাশের সমস্ত গ্রাম থেকে হিন্দু-নারীদের ধরে মাদ্রাসায় নিয়ে আসা। হিন্দুদের ঘরবাড়ি লুটপাট করা, এমনকি প্রয়োজনে মুসলিম-নারীদের ধরে এনে পাকিস্তানী-আর্মিদের হাতে তুলে দেওয়া ইত্যাদি।
 
যে-সকল হিন্দুপরিবার সময়মতো ভারতে পালিয়ে যেতে পারেনি—তাদের অবস্থা এইসময় অত্যন্ত শোচনীয় হয়ে পড়েছিল। শর্ষিণামাদ্রাসার ছাত্র নামক শুয়োরগুলো ‘হিন্দু-বৌ-ঝি’দের গণহারে মাদ্রাসায় ধরে নিয়ে আসতো। এরপর এদের ওপর দিন-রাত পাশবিক নির্যাতন চালাতো পৃথিবীর জঘন্য পাকিস্তানী-আর্মি। একেকটা জওয়ান কয়েকবার ধর্ষণ করতো একেকজনকে। এভাবে ওরা কয়েকটা আবার মিলেমিশে-জামায়াতে একেকজনকে ধর্ষণ করতো। এইসময় হিন্দু-নারীদের চিৎকারে-আহাজারিতে বাংলার আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত হলেও ওদের মনে সামান্য দয়ামায়া জন্মাতো না। পাক-আর্মিদের এইসব ধর্ষণের দৃশ্য দেখে শর্ষিণামাদ্রাসার ছাত্ররা বিপুল আনন্দলাভ করতো। ওরা এই শয়তানীঅপকর্মকে বিশেষ সওয়াবের কাজ মনে করে আরও বেশি-বেশি হিন্দু-নারীদের মাদ্রাসায় ধরে আনার জন্য তৎপর হতো। ওরা একাত্তরে হিন্দু-মুসলিম-নারীদের অবাধে ভোগ তথা ধর্ষণ করার জন্য তাদের ‘গনীমতের মাল’বলে অভিহিত করেছিল। একটা শর্ষিণামাদ্রাসার এইজাতীয় পাপের ইতিহাস আর কত বলবো! এই শর্ষিণাদের ‘ছারছীনা-প্রকাশনী’নামে একটা পুস্তক-প্রকাশনের সংস্থা রয়েছে। আরও রয়েছে ‘ছারছীনা দারুচ্ছুন্নাত লাইব্রেরি’নামে একটা আস্তানা। এখানে, তাদের মতাদর্শের বিতর্কিত বইপত্র প্রকাশ ও বিক্রয় করা হয়। আসলে, স্বাধীনবাংলাদেশে এরা একটা নীরব-ঘাতকগোষ্ঠী। এরা আজও ইসলামের নামে নিজেদের বিভ্রান্ত ও মনগড়া মতাদর্শের সাহায্যে আমাদের দেশের যুবসমাজের ‘নীতি-নৈতিকতা-হরণে’র অপচেষ্টা করে যাচ্ছে। স্বাধীনতার এত বছর পরও এরা অত্যন্ত কুকৌশলে দেশের ভিতরে প্রতিনিয়ত রাজাকারি-বীজ বপন করে চলেছে।”
 
এসব কথা শুনে বিপ্লব যথেষ্ট পরিতৃপ্ত। আজ তার মনে অনেক প্রশ্নের উদ্রেক হয়েছে। সে সবকিছু আজ জেনে নিতে চায়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ যে তার জীবনের ইতিহাস। এখানে, তার আগ্রহ সবচেয়ে বেশি।
 
মিনিটখানেক পরে সে আবার দাঁড়িয়ে বললো, “স্যার, আমাদের দেশে হুমায়ূন আহমেদ বলে এক লেখক আছেন। তিনিও তো দেখি সবসময় আওয়ামীলীগের বদনাম করে থাকেন। আর একটু সুযোগ পেলেই খোঁচা মারেন। এর কারণ কী?”
অধ্যাপক লিটু মিয়া স্মিতহাস্যে বলতে লাগলেন, “কারণ আর-কিছু নয়। সব রসুনের মূল বা শিকড় একজায়গায় থাকে। এই হুমায়ূন আহমেদও ছাত্রজীবনে চীনপন্থী ছিল। আর সেও ছাত্রইউনিয়ন করতো। এরা জীবনের শেষঅবধি তাদের মতাদর্শ থেকে কখনো সরে আসেনি। আর হুমায়ূন আহমেদরা সস্তা জনপ্রিয়তা অর্জন করার জন্য আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে নিজের দুই-চারটি গ্রন্থে ধারণ করেছে মাত্র। কিন্তু নিজের জীবনে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও চেতনাকে ঠাঁই দেয়নি। এজন্য হুমায়ূন আহমেদরা সবসময় মুক্তিযুদ্ধের রূপকার বঙ্গবন্ধু, ১৫ই আগস্টের হত্যাকাণ্ড, ২১-এ আগস্টের ভয়াবহ গ্রেনেড-হামলা ইত্যাদি স্পর্শকাতর বিষয়ে চুপ থেকেছে। অবশ্য চুপ থাকেনি। এসব বিষয়ে এরা কখনো-কখনো লেখালেখি করে এগুলোকে বিতর্কিত করার অপচেষ্টা করেছে। তার চূড়ান্ত ভণ্ডামির একটা জলজ্যান্ত দৃষ্টান্ত হলো—তারই লেখা উপন্যাস ‘দেয়াল’। এখানে, এই হুমায়ূন আহমেদ চীনপন্থীদের ‘মুরীদ’হিসাবে নিজেকে প্রকাশ করেছে। এই গ্রন্থে সে ১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধুর নিহত হওয়ার ঘটনাকে নিয়ে পর্যন্ত ব্যঙ্গবিদ্রুপ করতে দ্বিধা করেনি। আসলে, হুমায়ূন আহমেদরা কোনো সাহিত্যিক নয়। এরা হলো যুগের সঙ্গে তালমিলিয়ে চলা সাধারণ লেখক মাত্র। এদের রচনা পড়লেই বুঝা যায়—এদের ভাষা কত দুর্বল ও কাঁচা! এই ভাষা কখনো সাহিত্যমণ্ডিত কিংবা সাহিত্যের ভাষা নয়। হুমায়ূন আহমেদরা বাংলাদেশে একপ্রকার ‘চানাচুর’কিংবা ‘ঝালমুড়ি’মার্কা কথিত সাহিত্যসৃষ্টি করেছে। এর গল্প, উপন্যাস, নাটক ও চলচ্চিত্র ভয়ানক এক পাগলামিতে পরিপূর্ণ। আর বাংলাদেশের একশ্রেণীর আর্থিকভাবে সচ্ছল, ফুর্তিবাজ, আয়েশী-বিলাসী ও পাগলামিতে পরিপূর্ণ ‘টিন-এজার’ সম্প্রদায় এগুলোর খরিদ্দার ও পাঠক-পাঠিকা। এর লেখার মধ্যে জীবনের নিগূঢ় রহস্য, মানবচিত্তের মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা, মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত আদর্শ ও চেতনা, সঠিক ও গভীর জীবনদৃষ্টি, জীবনাদর্শ, জীবনদর্শন, দেশীয় তথা জাতীয় আশাআকাক্সক্ষা ইত্যাদির কোনো প্রতিফলন নাই। কিছুসংখ্যক বিভ্রান্ত ‘টিন-এজারের’দৃষ্টিআকর্ষণের জন্য তার লেখনি। বস্তুতঃ হুমায়ূন আহমেদের পাঠক-পাঠিকা এই ‘টিন-এজার-শ্রেণী’। এখানে, কেউ বয়সে ‘টিন-এজার’আর কেউ-বা মানসিকভাবে ‘টিন-এজার’।
তোমাদের আরেকটি কথা বলে রাখি: বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীসংগঠন জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তান তাদের ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘের নামপরিবর্তন করে তা রাখে—ইসলামী ছাত্রশিবির। আর যুবকদের জন্য তৈরি করে ইসলামী যুবশিবির। ১৯৭৬ সালে, এই ছাত্রশিবিরের পুনর্জন্ম। ১৯৭৭ সালে, জিয়াউর রহমানের পৃষ্ঠপোষকতায় ‘শিবির’প্রকাশ্যে আত্মপ্রকাশ করে। বাংলাদেশে সকলপ্রকার চীনপন্থী কবি-লেখকদেরও একটি প্ল্যাটফর্ম ১৯৭৭ সালে পুনর্গঠিত হয়ে আত্মপ্রকাশ করে। অবশ্য এদের জন্ম আরও আগে। এতদিন এরা যেন সুপ্ত অবস্থায় ছিল। এর নাম ‘বাংলাদেশ লেখক শিবির’। কী ঘৃণিত নাম! এতেই বুঝতে পারছো—চীনপন্থীদের কাছে ‘জামায়াত-শিবির’কোনো সমস্যা নয়—সমস্যা শুধু আওয়ামীলীগ। তাই, এরা শুধু আওয়ামীলীগের বিরোধিতা করে থাকে। এই ‘লেখক-শিবিরে’র সদস্য ছিল—বদরুদ্দীন উমর, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, আহমেদ ছফা, আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ, সৈয়দ আবুল মকসুদ, আনু মুহাম্মদ ইত্যাদি। এই ‘লেখক-শিবির’ চিরদিন বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামীলীগবিরোধী। তোমরা, জীবনে-মরণে এদের থেকে সাবধানে থাকবে। হুমায়ূন আহমেদ এই লেখকশিবিরগোষ্ঠীর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ মিত্র ছিল। এবার নিশ্চয়ই বুঝতে পারছো, হুমায়ূন আহমেদরা কেন সবসময় আওয়ামীলীগের বিরোধিতা করে থাকে।
 
আরেকটি নাম পড়ে গেল। এই দেশবিরোধী ব্যক্তিটি হলো—জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘অর্থনীতি-বিভাগে’র কথিত অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ। সেও জীবনে-মরণে চিরদিন চীনপন্থী। এখনও সে আওয়ামীলীগের বিরুদ্ধে তার সংগ্রাম অব্যাহত রেখেছে। মজার ব্যাপার হলো—এই আনু মুহাম্মদরাও নিজেদের লেখক ভাবে। আসলে, এরা আমাদের দেশের ‘নষ্ট-বাম রাজনীতি’র ফসল। এই চীনপন্থীদের মধ্যে আরেকটি ধূর্তশয়তান হলো—‘দৈনিক ইত্তেফাকে’র ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন। এর মতো বেআদব ও ষড়যন্ত্রকারী—বাংলাদেশে আমি আর দেখিনি। সে ভয়ংকর নরপিশাচ। আর সে মনেপ্রাণে এখনও পাকিস্তানপ্রেমিক ও রাজাকার। কিন্তু এই ধূর্তশয়তান বাঁচার জন্য একসময় আওয়ামীলীগেও যোগদান করেছিল! সে চিরদিন আমেরিকার দালাল ও ‘সিআইএ’র এজেন্ট। শোনা যায়, আমাদের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডেও নাকি তার হাত রয়েছে।
 
চীনপন্থীদের ত্রুটির কোনো শেষ নাই। এরা কখনো শুদ্ধ হতে পারবে না। শামসুর রাহমান আমাদের আধুনিক কবিদের মধ্যে প্রসিদ্ধ একজন। তিনি স্বাধীনতার পক্ষে অনেক কবিতা লিখেছেন। একসময় মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে লড়াইসংগ্রামও করেছিলেন। কিন্তু নিজের সীমাবদ্ধ বৃত্ত থেকে তিনিও বেরিয়ে আসতে পারেননি। তিনি একটি কবিতা লিখেছেন ‘ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯’। অর্থাৎ, এটি ১৯৬৯ সালের আমাদের ‘ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানে’র প্রেক্ষাপটে রচিত। তিনি এখানে সালাম, বরকত প্রমুখের কথাসহ কত কী বলেছেন! কিন্তু তিনি আসল কথাটাই বলেননি। আর ‘বঙ্গবন্ধু’র নাম নেননি! ১৯৬৯ সালে, বঙ্গবন্ধুসহ সকল রাজবন্দির মুক্তির দাবিতে, আর শুধু বঙ্গবন্ধুর মুক্তির জন্য এমন একটি বিশালবিরাট আন্দোলন হয়েছিল। সেই সময় বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষ আমাদের বঙ্গবন্ধুকে ভালোবেসে শ্লোগান দিয়েছিলেন: ‘জেলের তালা ভাঙ্গবো, শেখ মুজিবকে আনবো’। আমাদের শামসুর রাহমানও চীনপন্থী হওয়ার কারণে একই ভুল করেছেন। তিনি বঙ্গবন্ধুকে বাদ দিয়ে ‘ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯’কবিতা লিখেছেন। আর এই একই ভুল করেন দেশবরেণ্য চলচ্চিত্রকার ও জনপ্রিয় লেখক জহির রায়হান। তিনি মুক্তিযুদ্ধের সময় নির্মাণ করেন বিখ্যাত ও হৃদয়স্পর্শী ‘স্টপ জেনোসাইড’ নামক চলচ্চিত্রটি। কিন্তু তিনি এখানে বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের কিছু অংশ বা তার একটা ছবি পর্যন্ত প্রদর্শন করতে ভয়াবহ কার্পণ্য করেছেন। কারণ, তিনি ‘চীনপন্থী-কম্যুনিজমে’র সঙ্গে জড়িত হওয়ায় নিজেদের বৃত্তের বাইরে আসতে পারেননি। এখানে, একটা জরুরি কথা বলে রাখছি: আমাদের প্রত্যেকের মাঝে-মাঝে জহির রায়হানের ‘স্টপ জেনোসাইড’চলচ্চিত্রটি দেখতে হবে। তাহলে, আমাদের মুক্তিযুদ্ধের কথা বেশি-বেশি মনে পড়বে। আজ সন্ধ্যার পরে আমরা একটা বড়পর্দায় এখানে সবাই মিলেমিশে এই ঐতিহাসিক ‘স্টপ জেনোসাইড’দেখবো। আমার কাছে মনে হয়: এই চলচ্চিত্রটি আমাদের প্রতিদিন না হলেও মাসে অন্তত কয়েকবার কিংবা একবার দেখা উচিত। তাইলে, মহান মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ-চেতনার প্রতি সবার বিশ্বাস সুদৃঢ় ও মজবুত হবে। আর আমরা প্রতিনিয়ত বাংলাদেশরাষ্ট্রের প্রধান শত্রু রাজাকারদের ঘৃণা করতে শিখবো।”
 
কথাটা শোনামাত্র সবাই আনন্দে হাততালি দিয়ে উঠলো। অধ্যাপক লিটু মিয়া মোলায়েম হাসিতে তাদের সঙ্গে আনন্দে শামিল হলেন।
 
বিপ্লবের মনের অনেক প্রশ্ন আজ যেন সঠিক ভাষা ও যথাযথ উত্তর খুঁজে পেয়েছে। তার মুখের অভিব্যক্তি দেখে তা সহজেই বুঝা যাচ্ছে। তার চোখে-মুখে ফুটে উঠেছে দারুণ আনন্দভাব। সে এতোদিন এই প্রশ্নগুলো মাথায় চেপে ঘুরে বেড়াতো। কিন্তু কারও কাছে এতো বলিষ্ঠ ভাষায় সহজ উত্তর খুঁজে পায়নি।
 
‘স্টপ জেনোসাইড’চলচ্চিত্রটি দেখার জন্য আগেভাগে সমস্ত ব্যবস্থা করে রাখছে অধ্যাপক রায়হান ও বিপ্লব। তারা খুব ভক্তিসহকারে যন্ত্রপাতি গুছিয়ে রাখলো।
 
একটু পরেই মাকিদ সটান দাঁড়িয়ে বললো, “স্যার, সেদিন আপনি ওসমানীর একটা ঘটনা বলেছিলেন পরে বলবেন, আজ যদি সম্ভব হয়...।”
লিটু মিয়া একটু হেসে বললেন, “কোন ঘটনা?”
মাকিদ সরলভাবে বললো, “স্বাধীনতার শত্রুরা বলে থাকে: ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে পাকবাহিনীর আত্মসমর্পণের সময় নাকি সেখানে জেনারেল ওসমানীকে ইচ্ছাকৃতভাবে রাখা হয়নি! আসলে কি তাকে রাখা হয়নি? নাকি তিনি নিজেই থাকেননি। এইব্যাপারটা যদি আজ আমাদের একটু বুঝিয়ে বলতেন, স্যার।”
 
অধ্যাপক লিটু মিয়া হঠাৎ গম্ভীর হয়ে পড়লেন। এরপর তিনি ধীরস্থিরভাবে বলতে লাগলেন, “প্রথমেই বলি—তিনি জেনারেল নন। তিনি-ওসমানী কখনো জেনারেল ছিলেন না। এটা দেশের মূর্খ জন-সাধারণ বলে থাকে। আর তাকে ‘জেনারেল’বলে হাইলাইটও করে থাকে স্বাধীনতার শত্রুরা। তিনি জেনারেল নন। তিনি ছিলেন একজন কর্নেল মাত্র। তিনি কর্নেল ওসমানী। তাকে কেউই জেনারেল পদ, পদবী ও খেতাব দেয়নি। তার কারণ, জেনারেল পদ ও পদবী পেতে হলে যে-ধরনের সামরিক সরঞ্জামাদি ও সৈন্যসামন্ত থাকতে হয়—সেই সময় তা বাংলাদেশে ছিল না। পাকিস্তান-আর্মিতে বাঙালিদের মধ্যে তিনি ছিলেন সবচেয়ে বড়পদের অফিসার—‘কর্নেল’পদধারী। তাই, ১৯৭১ সালে, আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময় তাকে ‘মুক্তিবাহিনী’র প্রধান হিসাবে নিযুক্ত করা হয়েছিল। তাকে এই পদে নিয়োগদান করা হয়েছিল। তিনি ১৯৭১ সালের ১৭ই এপ্রিল তৎকালীন নবগঠিত স্বাধীন বাংলার ‘অস্থায়ী-সরকারে’র অধীনে একজন সামরিক-কর্মকর্তা ছিলেন। তিনি এই সরকারের অধীনে চাকরিজীবী ছিলেন। আর তিনি কখনোই মুক্তিযুদ্ধের ‘সর্বাধিনায়ক’নন—কিংবা নন কোনো ‘সিএনসি’। তার কারণ বলছি: যেকোনো দেশের সেনাবাহিনীর বা সামরিক-বাহিনীর একেকজন প্রধান থাকেন। যেমন: কেউ সেনাবাহিনীর প্রধান, কেউ বিমানবাহিনীর প্রধান, আবার কেউ-বা নৌবাহিনীর প্রধান। আর এদের সবার উপরে সর্বাধিনায়ক হিসাবে থাকেন সেই দেশের প্রেসিডেন্ট বা প্রধানমন্ত্রী। তিনি বা তারাই হলেন তার দেশের সামরিকবাহিনী বা সশস্ত্রবাহিনীর সর্বাধিনায়ক। আর তখন এই পদে সমাসীন ছিলেন স্বাধীন বাংলার অস্থায়ী-সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও আমাদের আসল রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাই, ওসমানীর এই পদ ও পদবী নিয়েও বিভ্রান্তিসৃষ্টি করেছে স্বাধীনতাবিরোধীচক্র। এবার বলছি—তিনি কেন ঐতিহাসিক ১৬ই ডিসেম্বর সোহরাওয়ার্দী-উদ্যানে হাজির হননি।
   
মুক্তিযুদ্ধ-বিশেষজ্ঞ, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও ঐতিহাসিকদের মতে, তিনটি কারণে কর্নেল ওসমানী ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর পাকিস্তানী-আর্মিদের আত্মসমর্পণের সময় ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী-উদ্যানে উপস্থিত ছিলেন না। কারণগুলো হলো:
 
প্রথমত; কর্নেল ওসমানী বিশেষ কাজে ১৬ই ডিসেম্বর পর্যন্ত সিলেটের বিভিন্ন রণাঙ্গনে অবস্থান করছিলেন। পাকিস্তানী-আর্মিদের আত্মসমর্পণের বিষয়টি দুই-একদিন আগে থেকে তোড়জোড় শুরু হলেও বাংলাদেশের স্বার্থে তা একেবারে গোপন রাখা হয়েছিল। আর এটি তদারকি করছিল মিত্রবাহিনী তথা ভারতীয় বাহিনী। ১৬ই ডিসেম্বর আত্মসমর্পণের বিষয়টি একেবারে আকস্মিক। আর এই আত্মসমর্পণ নিয়ে দেশীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে নানারকম ষড়যন্ত্র হতে পারে ভেবে—মিত্রবাহিনী এইদিনই পাক-আর্মিদের আত্মসমর্পণ গ্রহণে রাজী হয়। আর হঠাৎ করে আনুমানিক বিকাল চারটার সময় এটি শুরু হয়েছিল। তবুও ঢাকা থেকে ওয়ারলেসের মাধ্যমে ওসমানীকে বেশ আগেই খবর দেওয়া হয়েছিল—যাতে তিনি বিশেষ বাহনযোগে পাকিস্তান-আর্মিদের আত্মসমর্পণস্থলে হাজির হতে পারেন। আর ইচ্ছে করলে তিনি ভারতীয় বিমানবাহিনীর একটা হেলিকপ্টারযোগে কিংবা বিশেষ বিমানে ১৬ই ডিসেম্বর ঢাকায় আসতে পারতেন। কিন্তু তিনি আসতে রাজী হননি। অনেক চেষ্টা করেও তাকে ঢাকায় আনা যায়নি।
 
দ্বিতীয়ত; কর্নেল ওসমানী ছিলেন ছোটখাটো একজন সামরিক অফিসার। আর তার তুলনায় ভারতীয় বাহিনীর নেতৃত্বদানকারী অফিসারগণ বড়-বড় পদের অধিকারী ছিলেন। তিনি এদের সঙ্গে কাজ করতে রাজী হননি। তৎকালে তারচেয়ে বড়পদের কোনো অফিসার ছিলেন না বলে তাকে মুক্তিবাহিনীর অধিনায়ক এবং বিমানবাহিনীর আরেক মধ্যমমানের অফিসার এ.কে. খন্দকারকে উপপ্রধান হিসাবে নিয়োগদান করা হয়েছিল। তোমরা সবসময় মনে রাখবে: এরা ছিলেন ১৯৭১ সালের ১৭ই এপ্রিল গঠিত ‘মুজিবনগর-সরকারে’র নিযুক্ত ব্যক্তিবর্গ।
 
তৃতীয়ত; ওসমানী ভারতীয় বাহিনী তথা মিত্রবাহিনী কর্তৃক আত্মসমর্পণের ঘটনাটিকে ভালো চোখে দেখছিলেন না বিধায় তিনি এই মহতী অনুষ্ঠানে থাকতে বা আসতে রাজী হননি। এই হলো আসল সত্য। তাকে কেউই ঢাকায় আসতে বাধা দেননি বা কোনোকিছুই তার অগোচরে করা হয়নি। তিনি স্বেচ্ছায় ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী-উদ্যানে হাজির হননি।
 
তোমাদের কাছে আরও-একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা এখানে বলে রাখছি: ১৯৭৫ সালে, আমাদের ‘বঙ্গবন্ধু-হত্যাকাণ্ডে’র সময় এই ওসমানী নীরব-দর্শকের ভূমিকাপালন করেছিলেন। এমনকি তিনি বঙ্গবন্ধুর খুনীদের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে তুলতেও কোনোরকম দ্বিধাবোধ করেননি। এই বিষয়ে তোমরা বাংলাদেশের বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ ড. মুনতাসীর মামুন স্যারের লেখা বইগুলো পড়বে। তাহলে, বাংলাদেশের সঠিক ইতিহাসের সন্ধান পাবে।”
 
অধ্যাপক আবু কায়েস কিছুক্ষণ আগে এই সভায় উপস্থিত হয়ে সবার সঙ্গে বসে ছিল। এবার সে আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে উঠে দাঁড়িয়ে করতালি শুরু করলো। তার দেখাদেখি সবাই একযোগে দাঁড়িয়ে তাদের গুরুজীকে অভিনন্দিত করলো।
 
অধ্যাপক কায়েস বললো, “স্যার, আপনি আজ ইতিহাসের সবচেয়ে সত্য আর ধারালো কথাগুলো আমাদের সামনে বলেছেন। কিন্তু, এই সত্য আজকাল কেউই বলতে চায় না। সবাই শুধু স্বার্থনেশায় সুবিধাবাদীদের সঙ্গে তালমিলিয়ে চলতে চায়। আপনি আজ আমাদের জ্ঞানের চক্ষু খুলে দিয়েছেন। আপনি অত্যন্ত সাহসিকতা ও বিচক্ষণতার সঙ্গে ইতিহাসের কঠিন সত্যকে সহজ-সরল ভাষায় তুলে ধরেছেন। এজন্য সবার পক্ষ থেকে আপনাকে জানাই অতীব অভিনন্দন।”
 
এরপর আবারও করতালি শুরু হলো। এই করতালি শুধু ভালোবাসার। এখানে, কারও কোনো লোভ বা লাভের হিসাব নাই।
 
সন্ধ্যার পরে অধ্যাপক লিটু মিয়া সবাইকে নিয়ে ঐতিহাসিক ‘স্টপ জেনোসাইড’ চলচ্চিত্রটি দেখতে বসলেন। এইসময় সমগ্র রুমটাতে পীনপতন নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে। ওরা সবাই যেন ফিরে গেছে সেই ১৯৭১ সালে!
 
 
(চলবে)
 
 
সাইয়িদ রফিকুল হক
মিরপুর, ঢাকা, বাংলাদেশ।
রচনাকাল: ২০১৪ খ্রিস্টাব্দ।
০২/১২/২০১৯
 
 
 

ছবি
সেকশনঃ মুক্তিযুদ্ধ
লিখেছেনঃ সাইয়িদ রফিকুল হক১ তারিখঃ 02/12/2019
সর্বমোট 1118 বার পঠিত
ফেসবুকের মাধ্যমে কমেন্ট করুণ

সার্চ