ব্যাকগ্রাউন্ড

ফেইসবুকে!

পেঁয়াজের দামবৃদ্ধিতে অনেকেই খুশি!



পেঁয়াজের দামবৃদ্ধিতে অনেকেই খুশি!

সাইয়িদ রফিকুল হক

 
বাংলাদেশে এমন অনেকেই রয়েছে—যারা দেশের ভিতরে যেকোনো সমস্যা দেখলে খুব বেশি খুশি হয়। মানুষের আপদবিপদ দেখে এদের মনে ভয়ানক আনন্দের উদ্রেক হয়। এরা মনের আনন্দে মানুষের দুঃখ, কষ্ট ও দুর্দশা দেখে পরম তৃপ্তিতে ঢেকুর তুলতে পারে। এখানে, কারও ঘর পুড়ে যেতে দেখলে কেউ আগুন নিভাতে আসে না—কিন্তু সেই আগুনে স্বার্থের আলুপোড়া দিয়ে খাওয়ার জন্য অনেকেই উদভ্রান্তের মতো ছুটে আসে! যেকোনো সমস্যাকে এখানে নেতিবাচক-ইস্যুতে দেখা হয়। কোনো সমস্যা সমাধানে এদের ইতিবাচক ভূমিকাপালন করতে দেখা যায় না। এরা কিন্তু খুব নামকরা সমালোচক!
 
বাংলাদেশে কতরকম সমস্যা রয়েছে। সমস্যা রয়েছে পৃথিবীজুড়ে। তাই, বলে পৃথিবীর মানুষ বাঙালির মতো কোনো সমস্যা নিয়ে হঠাৎ-হঠাৎ এতো বেশি উত্তেজিত হয়ে ওঠে না। পৃথিবীর অনেক দেশেই নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম ওঠা-নামা করে থাকে। তাই বলে, সেখানে মানুষগুলো কখনো সমস্যা বাড়িয়ে তোলার জন্য চেষ্টা করে না। তারা সবকিছু ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতে গ্রহণ করে থাকে। আর সেখানকার জনসাধারণ ও সরকার মিলেমিশে দেশের সকল সমস্যা দূর করতে উদ্যোগী হয়।
 
সম্প্রতি আমাদের দেশে পেঁয়াজের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধিতে কিছুসংখ্যক মানুষ যেন ভীষণ খুশি! তারা মনের আনন্দে এইব্যাপারে একটাকিছু বলার বা লেখার যেন বিরাট সুযোগ পেয়েছে! এই সুযোগে অনেকেই এখন সরকারকে (ব্যক্তিগত কোনো স্বার্থহানির কারণে বা পূর্বের যেকোনো রাগবশত) প্রতিনিয়ত গালমন্দ কিংবা অযাচিত সমালোচনা করতেও কুণ্ঠাবোধ করছে না। আর বর্তমানে দেশের এক বিরোধীদলীয় রাজনৈতিক দলের নেতা তো এজন্য সরকারের পদত্যাগও চাইলেন! পেঁয়াজের মূল্যবৃদ্ধিতে সরকারের পদত্যাগ দাবি করাটা যে কতটা হাস্যকর—তা যেকোনো বুদ্ধিমান মানুষই উপলব্ধি করতে পারবেন। হয়তো এরা অতিবুদ্ধিমান! তাই, মনে করছেন—সরকার পদত্যাগ করলে পেঁয়াজের দাম কমে যাবে! কিংবা নতুন সরকার এদের বিনামূল্যেও পেঁয়াজ দিতে পারে!
 
পেঁয়াজের মূল্যবৃদ্ধিতে সরকারের কোনো হাত বা কারসাজি নাই—বরং এখানে পেঁয়াজের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি করে সরকারবিরোধী-ইমেজ গড়ে সরকারবিরোধীদের ফায়দালোটার একটা কুপরিকল্পনা থাকতে পারে। তার কারণ, পেঁয়াজের দাম বাড়লে সরকারের লাভ কী? এতে কি সরকারের দাম বাড়বে? অথবা, এতে সরকারের কোনো ভোট বাড়বে কিনা? না, কক্ষনো না। তবে সরকারকে কেন দোষারোপ করা হচ্ছে? পেঁয়াজের মূল্যবৃদ্ধির সুযোগে সরকারের চোদ্দোগোষ্ঠী-উদ্ধারের অপচেষ্টা করা হচ্ছে। পেঁয়াজের বাজার-নিয়ন্ত্রণের জন্য সরকার যথেষ্ট আন্তরিক। বর্তমানে সরকার, বাজারে পেঁয়াজের মূল্য কমাতে যারপরনাই প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। তবুও সরকারের নগ্নসমালোচনা কাদের স্বার্থে? আর যারা দেশবাসীকে জিম্মি করে মূল্যবৃদ্ধির এই নগ্নখেলা খেলছে—তাদের বিরুদ্ধে এ-পর্যন্ত আমরা কী করতে পেরেছি? আমরা তো বিবেকবান! তবুও ঘরে বসে রয়েছি কেন?
 
পেঁয়াজের মূল্যবৃদ্ধিতে সাধারণ থেকে একেবারে আরও সাধারণ মানুষের কষ্ট বাড়বে। কিন্তু ধনী কিংবা কালোটাকার মালিকদের কোনো সমস্যা নাই। এদেশে এখন এমনও লোক রয়েছে যে—একটি পেঁয়াজের দাম একহাজার টাকা হলেও তাদের কোনো ক্ষতি নাই। এরাই পেঁয়াজের মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে জড়িত। আপনারা এদের চেনেন না? চিনলে এদের কিছু বলেন না কেন? একজন বিবেকবান মানুষ হিসাবে সবারই তো দায়িত্ব-কর্তব্য হলো—দেশ-জনতার স্বার্থবিরোধী কোনো অপকাণ্ড দেখলে দলমত নির্বিশেষে তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো। কিন্তু আমরা কী করেছি, আর কী করছি? বিক্ষুব্ধ মানুষ হিসাবে কয়টি পেঁয়াজের গুদাম আইনশৃঙ্খলাবাহিনীকে দেখিয়ে দিয়েছি? আর কয়টি দেশবিরোধী-মানবতাবিরোধী নরপশু মওজুদদারদের ধরিয়ে দিতে সাহায্য করেছি?
 
ইদানীং আমরা দেখতে পাচ্ছি, চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে টনকে টন পেঁয়াজ (হাজার-হাজার মণ) গুদামে পচে যাওয়ায় সেগুলো এখন চাকতাই খালে ফেলে দেওয়া হচ্ছে। এই পশুগুলো মানুষের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে। এদের বিরুদ্ধে লেখেন না কেন? নাকি এখন আপনাদের কলমের কালি নাই?







গুদামজাত করা পেঁয়াজ এখন এভাবেই ফেলে দেওয়া হচ্ছে! এদের বিরুদ্ধে দেশবাসী কবে রুখে দাঁড়াবে?


সরকার, পেঁয়াজের মূল্যবৃদ্ধিতে কোনো কারসাজি করেছে? না, করে নাই। এগুলো বাংলাদেশের একশ্রেণীর হারামখোর-মওজুদদারদের দুঃস্বপ্নবিলাস। এদের আপনি চেনেন না? চেনেন তো অবশ্যই। তবে লেখেন না কেন এদের বিরুদ্ধে? এদের জন্য মায়া করে লাভ কী?
 
পেঁয়াজ পচনশীল দ্রব্যসামগ্রী। এগুলো দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করে রাখা যায় না। আপনারা সরকারকে দোষারোপ না-করে কয়েকদিন একটু ভালোমানুষ হ’ন না—পেঁয়াজ খাওয়া কয়েকদিনের জন্য একটু ছেড়ে দিন। তখন বুঝা যাবে—আপনারা কতটা দেশপ্রেমিক! পেঁয়াজ না-খেলে কী হয়? এই মওজুদদার নামক নরপশুশ্রেণীকে একটু শিক্ষা দেওয়ার জন্য হলেও আপাতত কয়েকদিন পেঁয়াজ খাওয়াটা নাহয় ছেড়ে দিন।
 
লিখতে হলে এই দেশের কালোবাজারি, সুদখোর, ঘুষখোর, মওজুদদার, মুনাফালোভী ও সর্বস্তরের অসৎ-ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে লিখুন। নাকি এরা আপনাদের আত্মীয় হয়? সরকার দেশের ভিতরে জনগণের জানমাল বাঁচাতে সামান্য দুই-চারটা সন্ত্রাসী-খুনীকে ‘ক্রসফায়ারে’ দিলে—অমনি চারিদিকে আপনাদের চিৎকার ও চেঁচামেচি শুরু হয়ে যায়—দেশে গণতন্ত্র নাই—মানুষের অধিকার নাই—দেশ এখন রসাতলে! তাইলে, এই দেশে পেঁয়াজের মূল্যবৃদ্ধি করার দুঃসাহস এরা পাবে না কেন? আর এই দেশে এদের আশ্রয়প্রশ্রয় দেওয়ার তো লোক আছে। দয়া করে, এদের রাজনৈতিক কোনো পরিচয় জানতে চাইবেন না। এই নরপশুদের আবার রাজনীতি কী? এরা দেশ-জাতির শত্রু।
 
বাংলাদেশের একশ্রেণীর মানুষ সবকিছুতে আজকাল রাজনীতি খুঁজে বেড়ায়। এরা খুব ঘাপটিমেরে থাকা ও সুবিধাবাদী লোক। এদের সহজে চিনতে পারা যায় না। এরা ভয়ানক বর্ণচোরা, আর পেঁয়াজ-ব্যাপারীদের মতো খুব ধূর্ত।
 
আপনাদের চোখে—যত দোষ—নন্দ ঘোষ সরকার! যেকোনো সমস্যা ও ইস্যুকে পুঁজি করে আপনারা সরকারকে দুই-চারটা গালি দিতে পারলেই মনে করেন-দেশউদ্ধার হলো! আর এভাবে বুঝি দেশে সরকারের পতন হবে! তাই, পেঁয়াজ নিয়ে সরকার-পতনের এই সস্তা লেখালেখি!
 
আমি সরকারের পক্ষে বলছি বলে—সরকারের লোক তা কিন্তু নয়। গঠনমূলক সমালোচনা সবসময় সাদরে গৃহীত হয়। কিন্তু সমালোচনার নামে সরকারবিরোধী-ব্যক্তিগত আক্রোশ মিটানো, রাজনৈতিক অসন্তুষ্টির কারণে পেঁয়াজের ওপর ভর করে সরকারের বিরুদ্ধে বিষোদগার, ভুয়াতথ্য দিয়ে জাতিকে বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টা করাটা—নিজের নৈতিকতার মানদণ্ডকে মানুষের কাছে অগ্রহণযোগ্য করে তোলে। আশা করি, আপনারা বিষয়টি বুঝবেন।
 
মনে রাখবেন: স্যাটায়ার বা বিদ্রুপাত্মক রচনা সবাই লিখতে পারে না। আপনি যেকোনো একটা অজুহাতে ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে গালি দিলেন! নিজদেশের প্রধানমন্ত্রীকে গালি দিলেন! দেশের একজন মন্ত্রীকে অহেতুক তুচ্ছতাচ্ছিল্য করলেন—এটা স্যাটায়ার হলো না। এটা হলো ভাঁড়ামি। আর এটা বেআদবিও বটে। আপনি যদি সুকৌশলে কারও মন্দটাকে সূক্ষ্ণ (কখনো স্থূল নয়) বিদ্রুপের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলতে পারেন—তবেই তা স্যাটায়ারের মর্যাদা পাবে। আবারও বলছি: স্যাটায়ার সবাই লিখতে পারে না। সবার দ্বারা স্যাটায়ার লেখা হয় না। আর স্যাটায়ার লেখা এতো সহজও নয়।
 
বিগত কিছুদিন যাবৎ পেঁয়াজ নিয়ে কিছুসংখ্যক মানুষ যা-ইচ্ছে তা-ই লিখছে। এইসব লেখার মধ্যে সামান্যতম গবেষণা নাই। মূল্যবোধের বালাই নাই। দেশপ্রেমের চিহ্ন নাই। সেখানে আছে শুধু যত দোষ—নন্দ ঘোষ—দেশের সরকার। আর যত পারো—সরকারকে গালি দিয়ে যাও! ভাবখানা আজ সবার এমন—আমরা স্বাধীন দেশের নাগরিক—কে আমাদের কী বলবে? আর আমাদের কাছে স্বাধীনতার মানে হলো—তুমি অন্যের কাপড় জোর করে টেনে ধরবে—কিন্তু সে তা রক্ষা করতে পারবে না। তাহলে, তোমার গণতান্ত্রিক অধিকার নাকি বিঘ্নিত হবে! তোমাকে, অন্যের সম্মানহানি করার অবাধ সুযোগ ও সুবিধা দিতে হবে—তাই না?
 
এই দেশের মানুষগুলো যদি এতো সস্তা আর এতো আবেগপ্রবণ না হতো—তাহলে, এই দেশটা সিঙ্গাপুর কিংবা জাপান হতে বেশিদিন লাগতো না। আর সবকিছুতে আমরা অচিরেই সিঙ্গাপুর কিংবা জাপানের চেয়ে এগিয়ে থাকতাম। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো—আমরা আজও ভালোকে ‘ভালো’ আর মন্দকে ‘মন্দ’ বলতে শিখিনি। আজ আমরা সাদা-কালোকে এক করে ফেলেছি—আর এক করে দেখছি! পেঁয়াজের মূল্যবৃদ্ধিতে অনেককে ঠোঁট বাঁকা করে—হেঃ হেঃ হেঃ করে হাসতে দেখেছি! আর বলতে শুনেছি: এবার সরকার বেকায়দায় পড়েছে!
 
দেশের ভিতরে একশ্রেণীর অধিক মুনাফালোভী-শুয়োর সর্বস্তরের জনসাধারণকে জিম্মি করে পেঁয়াজের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি করেছে—এরা চিরদিন দেশ-জাতির শত্রু। এই নরপশুদের বিরুদ্ধে আমরা কি কোনোদিন মাঠে নেমেছি কিংবা প্রতিবাদসভা-সেমিনার করেছি কিংবা একদিনও এদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছি? তা না-করে আমরা ঘরে বসে শুধু সরকারকে দুই-চারটা গালি দিয়ে আজ দেশউদ্ধার করতে চাচ্ছি! হায় রে, আমাদের লোকদেখানো দেশপ্রেম!
 
দেশের প্রয়োজনে সরকারের যেকোনো ভুলসিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আমাদের গঠনমূলক সমালোচনার অধিকার রয়েছে। কিন্তু আমরা যেন পেঁয়াজের মূল্যবৃদ্ধি করে জনগণকে কষ্ট দেওয়া শয়তানচক্রের সঙ্গে সরকারকে গালমন্দ করে নিজেদের দীনতাকে আরও প্রকটভাবে ফুটিয়ে না-তুলি। আর এই হোক: আমাদের আজকের দেশগড়ার শপথ।
 
জয় হোক মানুষ আর মানবতার। জয় হোক বাঙালি-জাতির।
 
 
সাইয়িদ রফিকুল হক
১৮/১১/২০১৯

ছবি
সেকশনঃ সাম্প্রতিক বিষয়
লিখেছেনঃ সাইয়িদ রফিকুল হক১ তারিখঃ 18/11/2019 11:08 PM
সর্বমোট 202 বার পঠিত
ফেসবুকের মাধ্যমে কমেন্ট করুণ

সার্চ