ব্যাকগ্রাউন্ড

ফেইসবুকে!

দ্য প্রেট্রিয়ট ও আওয়ামী লীগ


এক।
বাংলার কবি নজরুল ইসলামের মতো ব্রিটিশ কবি রবার্ট ব্রাউনিংয়ের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল না। যদিও প্রতিভাগুণে ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে তিনি পৃথিবীর বিখ্যাত কবিকুল তালিকায় স্থান করে নেন। তার লেখা একটি বিখ্যাত কবিতা 'দ্য প্রেট্রিয়ট'।

প্রেট্রিয়ট কবিতায় কবি ব্রাউনিং দেশপ্রেমিক ও জাতীয় বীরদের প্রতি সাধারণ জনগণের মনের পরিবর্তনশীলতার বিষয়টিকে বাস্তবতার নিরিখে বর্ণনা করছেন। তিনি দেখিয়েছেন সাধারণ জনগণ যেমন দেশপ্রেমিকদেরকে ভালোবেসে মনের সর্বোচ্চ শিখরে স্থান দিতে পারে, তেমনি প্রেক্ষাপট বদলে গেলে চরম ঘৃণায় মাটিতে মিশিয়েও দিতে পারে।

একজন দেশপ্রেমিক যখন জনপ্রিয়তার শীর্ষে থাকে তখন জনগণ তাকে ভালোবেসে মনের সবটুকু উজাড় করে কীভাবে বরমাল্য দিয়ে বরণ করে এবং একবছর পর জনপ্রিয়তার ধ্বস নামলে কীভাবে তার প্রতি চরম ঘৃণা প্রকাশ করে- প্রেট্রিয়ট কবিতায় সেটি বর্ণিত হয়েছে। কবিতার প্রথম কয়েকটি লাইনের অনুবাদ এরকম-

এক বছর পূর্বে রঙ্গিনফুল দিয়ে তার (দেশপ্রেমিকের) আগমনকে বরণ করা হয়েছিল।

তখন গির্জার চূড়াগুলোতে পতাকা টানানো ছিল এবং তাকে (দেশপ্রেমিককে) একনজর দেখার জন্য মানুষ বাড়ির ছাদে পর্যন্ত উঠেছিল।

বংশী বাজিয়ে তার (দেশপ্রেমিকের) আগমন ঘোষিত হয়েছিল।

মানুষের মাঝে কী যে উন্মাদনা!

তখন জনগণ তার (দেশপ্রেমিকের) জন্য যে কোনো কিছু করতে প্রস্তুত ছিল।

কিন্তু এখন সবকিছু পরিবর্তন হয়ে গেছে।

দেশের অবস্থা পরিবর্তিত হয়ে যাওয়ায় তার অপকর্মের জন্যে এখন তাকে পেছনে হাতবেঁধে ফাসির মঞ্চে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে ।

কেউ তাকে এখন আর স্বাগত জানাচ্ছে না বরং পাথর ছুঁড়ে তাকে রক্তাক্ত করছে।

দুই।
সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিপুল জনপ্রিয়তা ও সরকারি লোকজনদের অনাকাঙ্ক্ষিত পৃষ্ঠপোষকতা নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে। এই বিপুল জনপ্রিয়তার প্রথম বলি হয়েছে গণতন্ত্র। নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হলেই যেখানে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিজয়ী হতো, সেখানে ব্যাপক জনপ্রিয়তা থাকার কারণে অতিউৎসাহী হয়ে সরকারি লোকজন অনাকাঙ্ক্ষিত পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

এই পৃষ্ঠপোষকতার সুবাদে আওয়ামী কর্মী-সমর্থকেরা ভোটকেন্দ্রে প্রভাব বিস্তারের যে নজির স্থাপন করেছে তা গণতন্ত্রের জন্য ভালো কোনো উদাহরণ হতে পারে না। এ জন্য কোনো দিনই আওয়ামী লীগকে মূল্য দিতে হবে না, সেকথা হলফ করে বলা যায় না। বিএনপি, জাতীয় পার্টিকে দিতে হয়েছে, আওয়ামী লীগকেও দিতে হতে পারে।

তিন।
সারাদেশের সমস্ত ব্যবসা-বাণিজ্য, কাজকর্ম, ঠিকাদারি, সাপ্লাই ইত্যাদি আওয়ামী লীগ এবং তার অঙ্গসংগঠনের লোকজন যেভাবে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে প্রভাব বিস্তার করে নিয়ন্ত্রণ করছে তা ভয়াবহ। প্রতিটি অফিসের চারিদিকে আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের লোকজন পাহারা বসিয়ে সমস্ত টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করছে, চাঁদাবাজি করছে। কাউকে কিছু করতে দিচ্ছে না; আওয়ামী লীগ হলেও না, মুক্তিযোদ্ধা পরিবার হলেও না, মুক্তিযোদ্ধা হলেও না। এসব অন্যায়-অনাচার মানুষের মনে একটা ভয়াবহ আওয়ামী বিরোধী মনোভাবের জন্ম দিচ্ছে।

ভূঅভ্যন্তরে তপ্ত লাভা যেমন তোলপাড় করতে থাকে কিন্তু ভূপৃষ্ঠ থেকে তা বোঝা যায় না, মানুষের মনের আওয়ামী বিরোধী এ ক্ষোভটাও তেমন; মানুষের মনে তোলপাড় তুলছে কিন্তু তা প্রকাশিত হচ্ছে না। ভূগর্ভস্থ লাভা যেমন ভূপৃষ্ঠের দুর্বল স্থান পেলে সেখান দিয়ে উদগীরণ হয়ে সবকিছু জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে নিঃশেষ করে দেয়, কোনো একটা দুর্বল মুহূর্তে মানুষের মনের পুঞ্জিভূত ক্ষোভও তেমনিভাবে উদগীরণ হয়ে আওয়ামী লীগের জন্য কাল হয়ে দাঁড়াতে পারে।

চার।
আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা বর্তমানে কতটা আছে সে বিষয়ে সন্দেহ আছে। জনপ্রিয়তাটা মূলত জননেত্রী শেখ হাসিনার এবং সেটাকেই পুঁজি করছে আওয়ামী লীগ। জননেত্রী শেখ হাসিনাকে বাদ দিলে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি'র মধ্যে পার্থক্য করাটা বোধহয় দুষ্কর। নেত্রীর বয়স হয়েছে, তিনি অবসরে যাবেন। ফলে সর্বক্ষেত্রে এভাবে অনাকাঙ্ক্ষিত কুপ্রভাব বিস্তার করে, জনমনে ঘৃণা কুড়িয়ে আওয়ামী লীগ তার ভবিষ্যৎকে কতটা ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিচ্ছে সেটা বিবেচনা করার কেউ আছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে না বরং সব আছে লুটপাট এবং খাওয়ার ধান্দায়।

পাঁচ।
দেশের অনেক উন্নয়ন হচ্ছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই, কিন্তু এ উন্নয়ন মূলত ইনফ্রাস্ট্রাকচারগত উন্নয়ন। কোনো নৈতিক উন্নয়ন কোথাও হচ্ছে না। নৈতিকতার ভিত্তি শক্ত করার মতো যে ব্যবস্থাগুলি নেওয়া হচ্ছে সেগুলি পর্যাপ্ত নয়। ফলে উন্নয়নের নামে যা হচ্ছে তা মূলত কংক্রিটের জঙ্গল। নৈতিক ভিত্তি দুর্বল থাকায় এ উন্নয়নের ভার তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে পারে।

ইনফ্রাস্ট্রাকচারগত উন্নয়ন করে আত্মতৃপ্তি পাওয়া যায়, জনমনে স্থান করে নেওয়া যায় না। এখন পর্যন্ত দেশের সবচেয়ে বেশি ইনফ্রাস্ট্রাকচারগত উন্নয়ন করেছে এরশাদ এবং জাতীয় পার্টি। নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হওয়ায় জাতীয় পার্টি জনভিত্তি তৈরি করতে পারেনি, ফলে আজ তাদের এই অবস্থা। আওয়ামী লীগ যতটুকু জনভিত্তি তৈরি করেছিল এই দফায় সর্বক্ষেত্রে অনাকাঙ্ক্ষিত কুপ্রভাব বিস্তারের ফলে সে জনভিত্তি চরমভাবে দুর্বল হতে শুরু করেছে। ভবিষ্যৎটা শঙ্কার‌ই বটে।

আওয়ামী লীগের মনে রাখতে হবে, যে সরকারি কর্মকর্তাদের সাথে মিলেমিশে তারা দুর্বৃত্তায়নে অংশ নিচ্ছে এ দায় শুধুমাত্র আওয়ামী লীগকেই বহন করতে হবে। সরকারি কর্মকর্তারা সুযোগ বুঝে ঠিকই পরবর্তী প্রবাহের সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে যাবে, দায় থাকবে আওয়ামী লীগের কাঁধে। বরাবরই তাই হয়ে এসেছে, ভবিষ্যতেও তাই হবে। কোন সরকারি কর্মকর্তা কখনো দোষী সাব্যস্ত হয় না।

ছয়।
ছাত্রলীগ বলে মূলত এখন কিছু নেই, এটা একটা ব্যবসায়ী লীগ হয়ে গেছে। যেখানেই ব্যবসা-বাণিজ্য, ঠিকাদারি, লেনদেন, সাপ্লাই সবখানেই ছাত্রলীগের ক্যাডার। এরকম ছাত্র রাজনীতি দেশের থেকে উঠিয়ে দেওয়াই বোধহয় মঙ্গল।

ছাত্রলীগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বেরিয়ে পড়েছে, তারা অর্থ চিনে গেছে, অর্থের নেশায় তারা বুঁদ হয়ে আছে, তারা অর্থের পেছনে ছুটছে। এদের পৃষ্ঠপোষকতা দিচ্ছে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা। একেক এলাকার একেক ছাত্রলীগ নেতা মানে একেকজন প্রতিমন্ত্রী। তাদের ব্যবহার খারাপ, তারা মানুষকে সম্মান দিচ্ছে না, মানুষকে অপমান করছে, মানুষের অধিকার হরণ করছে।

সাত।
মন্ত্রিপরিষদে দুয়েকজন মন্ত্রী ক্ষেত্রবিশেষে কিছু ভালো কাজ করলেও সার্বিকভাবে তা আশাব্যঞ্জক নয়। অধিকাংশ মন্ত্রী অযোগ্য এবং নিষ্কর্মা। তারা কাজকর্ম বোঝেই না, এরা কোনদিন বুঝবে বলেও মনে হয় না।

মন্ত্রীরা সারা দেশের জন্য কিন্তু বর্তমান মন্ত্রীদের চর্চা দেখলে মনে হয়, তারা যে এলাকা থেকে নির্বাচিত হয়ে আসছে, তাদের দায় শুধু সেই এলাকার জন্য। এগুলি অযোগ্যতার লক্ষণ।

আট।
সাবধান হওয়ার সময় আছে, ফলে সাবধান হওয়াই উত্তম। আওয়ামী লীগ এবং তার অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলো যেভাবে সারাদেশে কুপ্রভাব বিস্তার করে মানুষের থেকে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে সেদিকে নজর দেওয়া উচিত।

দেশে সুশাসন দরকার। এই সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য মানুষ আওয়ামী লীগের উপরেই ভরসা করে, আর কার‌ও উপরে নয়। ফলে সে দায় আওয়ামী লীগকে নিতে হবে। নেবে কি?

ছবি
সেকশনঃ সাধারণ পোস্ট
লিখেছেনঃ যুক্তিযুক্ত তারিখঃ 03/06/2019 12:14 PM
সর্বমোট 196 বার পঠিত
ফেসবুকের মাধ্যমে কমেন্ট করুণ

সার্চ