ব্যাকগ্রাউন্ড

ফেইসবুকে!

গল্প: অন্ধজনে আলো দাও



















অন্ধজনে আলো দাও

সাইয়িদ রফিকুল হক

 
ছেলেপক্ষ একরকম ধরেই নিয়েছিলো যে, আজ মেয়েপক্ষ তাদের ছেলের সঙ্গে মেয়ে বিয়ে দিতে বাধ্য। এমন একটি মানসিকতা নিয়েই আজ তারা রহমতপুরে পাত্রী দেখতে এসেছিলো।
মেয়েটির একটা সমস্যা আছে। সে-কথা মেয়েপক্ষ আগেই ছেলেপক্ষকে জানিয়ে দিয়েছিলো। কিন্তু ছেলেপক্ষ তাদের নিজস্ব ব্যাপারে আগে থেকে কাউকে তেমনকিছু বলেনি।
 
এটা একটা মফস্বল-শহর। তবে এখানকার মানুষের জীবনে এখন আধুনিকতার ছাপ সুস্পষ্ট। আর এখানকার মানুষগুলো দ্রুত বদলে যাচ্ছে। সবাই নিজেদের উপরতলার মানুষ ভাবতে চাচ্ছে। এমন একটা জায়গায় অজানা-অচেনা-পরিবেশে মেয়ের বিয়ের কথা ভাবতে গিয়ে মেয়ের বাবা প্রথমে একটুখানি সংশয়-সন্দেহে ভুগলেও পরে সামাজিক এই প্রথার প্রতি আস্থা রেখে ঘটকের কথায় রাজী হলেন। তবুও তার মনের ভিতরে একটা খচখচানি যেন রয়েই গেল।
 
ছেলেটির নাম আফজাল হোসেন। এই মফস্বল-শহর থেকে অনেকদূরে একটা গ্রামে তার বসবাস। আর সে পেশায় ডিপ্লোমা-ইঞ্জিনিয়ার। তার বংশে সেই একমাত্র এসএসসি-পাস। তার বাপ-দাদারা পুরুষানুক্রমে পরের জমিতে কামলা খাটতো। এই প্রথা ভেঙে জীবনের সংকীর্ণ পরিসর থেকে একমাত্র সে-ই বাইরে আসতে পেরেছে। কিন্তু ঘটক আগে থেকে এসব কথা মেয়ের বাবা কুদরত আলীকে কখনও বলেনি। কিংবা সে আকারে-ইঙ্গিতেও তাকে এসব ঘূণাক্ষরেও জানতে দেয়নি।
এদেশের ঘটকরা সবসময় মিথ্যাকথা বলে থাকে। আর মিথ্যা বলতে এরা বড় ভালোবাসে। তাছাড়া, আমাদের দেশের একপ্রকার অর্বাচীন মনে করে থাকে: বিবাহের সময় মিথ্যা বলা সম্পূর্ণ জায়েজ! এধরনের নেতিবাচক ধারণা ও হীনমানসিকতার কারণেই বিবাহের ক্ষেত্রে আমাদের দেশে ব্যাপক মিথ্যার প্রচলন রয়েছে, এবং অত্যন্ত জাঁকজমকের সঙ্গে এখনও এই মিথ্যাচার চলছে। এই ঘটক সত্য ধামাচাপা দেওয়াদেরই একটা বংশধর মাত্র।
 
গ্রামের সাধারণ লোকের কাছে আফজাল পুরাদস্তুর ইঞ্জিনিয়ার। গ্রামের ঘটকগুলোও তাকে সবজায়গায় ইঞ্জিনিয়ার বলে চালানোর চেষ্টা করে আসছে। যদিও তারা এপর্যন্ত সফল হতে পারেনি। কিন্তু আজ সফল হওয়ার কথা ছিল। কারণ, আজ যে-মেয়েটির সঙ্গে আফজালের বিয়ের কথা পাকাপাকি হওয়ার কথা ছিল তার একটি পা বর্তমানে একটুখানি খোঁড়া। এরও একটি করুণ ইতিহাস আছে। আগে মেয়েটির সেই করুণ কথা বলি।
 
মেয়েটির নাম সানজিদা আফরিন। তারই বিয়ের কথাবার্তা চলছে। সে ঢাকার একটা নামকরা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স-পাস করে এখন এমএ-শ্রেণীতে পড়ছে। এইরকম একটি সময় বাংলাদেশের প্রায় সব মেয়ের মা-বাবাই একটু চিন্তিত হয়ে পড়ে। কারণ, মেয়েপক্ষ মনে করে থাকে, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া-অবস্থায় মেয়েকে বিয়ে দিতে না পারলে সমাজের চোখে মেয়ের বয়স বেশি হয়ে যাবে। আর বেশি-বয়সের মেয়েকে বিয়ে দিতে এদেশে খুব সমস্যা। এদেশের অধিকাংশ মা-বাবা তাই মেয়েকে পড়ালেখা-অবস্থায় বিয়ে দিয়ে এই জটিল বিষয়টি এড়ানোর চেষ্টা করে থাকে। তার গুরুতর কারণ হলো—এদেশে মেয়ের বয়স একটু বেশি হলে একেবারে মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যায়। তাকে সমাজের অপ্রয়োজনীয় জিনিস বলে মনে করা হয়ে থাকে। তাই, এই মফস্বল-শহরের একটি মেয়েপক্ষ ভালোপাত্রের সন্ধানে এখন একটুখানি সজাগ হয়ে উঠেছে। কিন্তু তাদের মেয়েটি হঠাৎ খোঁড়া হয়ে যাওয়ায় তাদের মানসিক-চাপটা আরও বেড়ে গেছে।
 
আফরিন ঢাকায় তার এক দুষ্সম্পর্কীয় খালার বাসায় থেকে পড়তো। দিনগুলো তার ভালোই   কাটছিলো। শুধু পড়ালেখার সময়টা সে রাজধানী-শহরে থাকতো। আর বাকীটা সময় কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় ছুটি হলেই সে আবার নিজেদের মফস্বল-শহরে ফিরে আসতো। এখানে, তার জন্ম হয়েছে। আর শৈশব, কৈশোর ও যৌবনের প্রথম দিনগুলোও অতিবাহিত হয়েছে। এই ছোট্ট শহরটা তার কাছে ভালোই লাগে। এখানে, তার বেশ কয়েকজন মনমতো বান্ধবী আছে। সে বাড়িতে এলে তারা কয়েকজন নিয়মিত এখানে ছুটে আসতো। এভাবে কদিন একসঙ্গে তাদের সময়টা ভালোভাবে কাটতো। হঠাৎ সেখানেও যেন এখন কিছুটা ছন্দপতন ঘটেছে। তার এই দুর্দিনে তাকে দেখে পিঠটান দিয়েছে তার কয়েক বান্ধবী। তবুও আফরিন ওদের ভালোবাসে।
 
বছরখানেক আগে আফরিন একদিন ঢাকা থেকে বাড়িতে ফিরছিলো। রাস্তায় সেদিন গোলযোগ থাকায় বাসটা তাদের মফস্বলে ঢুকতে দেরি করছিলো। এভাবে সন্ধ্যা পেরিয়ে গেলে সে তাড়াতাড়ি বাড়িতে ফেরার জন্য উদগ্রীব হয়ে ওঠে। কিন্তু রাস্তার জ্যাম যেন কিছুতেই ছাড়তে চায় না।
 
গাড়ি থেকে সে যখন নামলো তখন রাত ন’টার বেশি বাজে। সে তার বাবাকে কষ্ট না দেওয়ার জন্য নিজেই বাড়িতে ফেরার উদ্যোগ নেয়। রাতে এসময় এখানে ভালো গাড়ি পাওয়া যায় না। আর দিনটা ছিল স্থানীয় হাটের দিন। তাই, রাস্তাঘাটে সেদিন খুব ভিড় ছিল। সে উপায়অন্তর না দেখে একটা ডিজেল-চালিত ভ্যানে উঠে পড়লো। আর এখানেই ঘটলো তার জীবনের চরম বিপর্যয়। ভ্যানটা কিছুদূর এগুনোর পর একটা বড়গাড়িকে সাইড দিতে গিয়েই হঠাৎ উল্টে গেল। আফরিন আছড়ে পড়লো রাস্তার একপাশে। সে শরীরের বিভিন্ন জায়গায় আঘাত পেয়েও বেঁচে গেল। কিন্তু তার ডান-পাটা ভেঙ্গে গিয়েছিলো। চিকিৎসা করিয়েছিলো ভালোই। কিন্তু পা-টা চিরদিনের জন্য একটু খোঁড়া হয়ে গিয়েছে। তার চিকিৎসকরা বলেছিলো—তার আঘাতটা খুব ভয়ানক ছিল।
আফরিন এজন্য চলাফেরার সময় মাঝে-মাঝে এখনও একটা ক্রাচ ব্যবহার করে থাকে। তবে কয়েকজন বিশেষজ্ঞ-ডাক্তার বলেছে—এভাবে নিয়মিত চিকিৎসা করাতে থাকলে নাকি তার পা-টা আরও ভালো হয়ে উঠবে। একদিন সে স্বাভাবিক হয়েও উঠতে পারে। তবুও আফরিনের পরিবার এখনও কোনো ভরসা পায় না।
 
সেই থেকে আফরিন একটু চুপচাপ আর খুব মনমরা হয়ে থাকে। তার বাড়ির লোকজন এখন প্রায়ই বলাবলি করে থাকে, সে শিক্ষিত-মেয়ে। একটা ভালোছেলে দেখে তাকে বিয়ে দিতে পারলে তার মন ভালো হয়ে যাবে। বিশেষ করে, তার মা সবসময় তার বিয়ে নিয়ে খুব ব্যতিব্যস্ত। বাড়ির লোকদের কথায় সে তেমনকিছু বলে না। আসলে, এই সমাজে মেয়েদের অনেককিছুই বলার ও করার থাকে না। এখানে, সমাজ কথা বলে। আর সমাজ বলে কথা। তাই, যেমন করেই হোক, একটা মেয়েকে বিয়ে দিতেই হবে। আর তাকে যেনতেন-একটা বিয়ে দিয়ে হলেও তার বিয়ে-না-হওয়ার মতো কলংকমোচন করতে হবে। আর সমাজের চোখে বিয়ের সময় বলে নাকি একটা কথা আছে। তাই,  সমাজ বলে: মেয়েদের যত তাড়াতাড়ি পারা যায় বিয়ে দিতে হবে। সমাজ এখানে মেয়েদের মন বোঝে না। অনেক শিক্ষিত-মেয়েও সমাজের এই যাঁতাকলে পড়ে আজকাল ভয়াবহভাবে নিঃশেষ হচ্ছে। তবুও সমাজের কোনো দায় নাই—বোধোদয় নাই। আর এই নিয়ে বিবেকজাগ্রত হয় না কারও মধ্যে।
 
একটা দুর্ঘটনায় বিবাহের বাজারে আফরিনের দাম হঠাৎ অনেক কমে গেছে। নইলে তার মতো সুন্দরী-মেয়েকে বিয়ে করার জন্য অনেকেই ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠতো। আর তার মতো সুন্দরী-মেয়ে এই মফস্বলে খুব কম আছে। তবে আফরিন একেবারে ভেঙ্গে পড়েনি। সে স্থানীয় হাইস্কুলে শিক্ষকতা করার জন্য তার জীবনবৃত্তান্ত জমা দিয়েছে। সে ইংরেজি-সাহিত্যের ছাত্রী। তার মতো মেয়েকে এই স্কুলও চায়। সেও এখানে সেবা দিতে রাজী। কিন্তু বিবাহের ব্যাপারে তার বলার কিছু নাই। এখানে, সমাজই যেন সব। আর কিছুদিন পরে তার মাস্টার-ডিগ্রী ফাইনাল পরীক্ষা। কাজেই, তাকে এখন বিয়ে করতেই হবে। নইলে রাতারাতি তার বয়স বেড়ে যাবে!
 
আফরিনের বাবা কুদরত আলীসাহেব সরকারি চাকরি থেকে এখনও অবসরগ্রহণ করেননি। আরও বছর কয়েক তার চাকরি আছে। তিনি স্থানীয় খাদ্যবিভাগে চাকরি করেন। একটি মধ্যমমানের চাকরি তার। আর সংসারে মাত্র দুটি ছেলেমেয়ে তার। তবুও সমাজের চাপে অবসরে যাওয়ার আগে তিনিও মেয়েকে বিবাহ দেওয়ার জন্য এখন একটুআধটু চেষ্টা চালাচ্ছেন।
তবে মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে তার চেয়ে বেশি আগ্রহী স্থানীয় ঘটক রশিদ মোল্লা। সে প্রায়ই কুদরতসাহেবকে নানাভাবে ভালোপাত্রের সন্ধান দেওয়ার জন্য প্রলোভন দিচ্ছিলো। এতে কুদরতসাহেব কিছুটা রাজী হয়ে আজ বাড়িতে পাত্রকে আনার জন্য বলেছিলেন। তাদের সঙ্গে কিছুটা প্রাথমিক আলাপআলোচনার কথা বলেছিলেন। কিন্তু ঘটক একেবারে বিবাহের প্রস্তুতি নিয়ে এসেছিল।
 
কুদরতসাহেব মাগরিবের নামাজ নিয়মিত মসজিদে আদায় করে থাকেন। এখানেই পেশাদার-ঘটক রশিদ মোল্লার সঙ্গে তার পরিচয় হয়েছিলো। শুরু থেকেই এই লোকটাকে তার তেমন-একটা পছন্দ হয়নি। কিন্তু ঘটক-লোকটা তাকে প্রায় প্রতিদিন জ্বালাতন করতো। আজ একরকম বাধ্য হয়েই তিনি ঘটকের প্রস্তাবে রাজী হয়ে ছেলেপক্ষকে তার বাড়িতে আসতে বলেছিলেন।
 
বাড়িতে ছেলেপক্ষ আসবে শুনে আফরিনদের বাড়িতে আজ খুব যে লোকসমাগম হয়েছিলো—তা নয়। কিন্তু তার নিকটাত্মীয়রা প্রায় সবাই এখানে উপস্থিত হয়েছিলো। সবাই কুদরতসাহেবকে খুব করে ধরেছিলো, এই ছেলের সঙ্গেই যেন তাদের মেয়েকে বিবাহ দেওয়া হয়। এলাকার সাধারণ লোকজনও বলছিলো: ছেলে নাকি বিরাট ইঞ্জিনিয়ার! আর সে সরকারি চাকরিজীবী! কিন্তু কুদরতসাহেব তাতেই রাজী হননি। তিনি আগে ছেলেটাকে ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করতে চান। তারপর ধীরস্থিরভাবে সেই কঠিন সিদ্ধান্তটা নেবেন।
 
 
আজ মেয়ে দেখতে আফজালের সঙ্গে তার বড় ভগ্নিপতিসহ কয়েক বন্ধুও এসেছিলো। আর সঙ্গে ছিল সেই ঘটক রশিদ মোল্লা। তারা একরকম বিয়ের প্রস্তুতি নিয়েই এসেছিলো।
ছেলেটা নাকি স্থানীয় বিদ্যুৎঅফিসে সরকারি চাকরি করছে। সামনে নাকি তার প্রমোশন হবে। এসব শুনে কুদরতসাহেব তেমন-একটা আগ্রহবোধ করলেন না। তবুও তিনি ঘটকের চাপাচাপিতে ছেলেটিকে দেখতে রাজী হয়েছিলেন।
কথায়-কথায় তিনি যখন শুনলেন, ছেলেটা হাফ-ইঞ্জিনিয়ার! আর সে একটা প্রাইভেট ইনিস্টিটিউট থেকে ডিপ্লোমা-ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করেছে। তখনই তার মাথাটা কেমন ঘুরে গেল। সামান্য একটা এসএসসি-পাস ছেলের সঙ্গে তার এতো পড়ালেখা জানা মেয়েকে বিয়ে দিতে তার মন কিছুতেই সায় দিচ্ছিলো না। তিনি ভীষণ ভাবনায় পড়ে গেলেন। কিন্তু নিজের মাথাটা স্থির রাখতে ভুললেন না।
 
আফরিন ইংরেজি-সাহিত্যে কৃতিত্বের সঙ্গে অনার্স-পাস করেছে। আর কিছুদিন পরেই সে এমএ-পাস করবে। কুদরতসাহেব ভাবতে লাগলেন: তার মেয়েটা কত বই পড়েছে! বাড়িতে এখনও তার কত বই পড়ে রয়েছে! এলাকার স্কুলশিক্ষকগণ তাকে কৃতীছাত্রী হিসাবেই জানে এবং চেনে। তিনি মেয়েকে জলে ফেলে দিতে রাজী হলেন না। এমন একটা মেয়েকে তিনি একটা অর্বাচীনের হাতে তুলে দিতেও পারবেন না। তার বুকের ভিতরটা কেমন যেন একটা অব্যক্ত ব্যথায় মোচড় দিয়ে উঠলো। তিনি তাল সামলে সঠিক সিদ্ধান্তের দিকেই এগুতে লাগলেন।
শুধু এই একটি কারণই নয়। আরও কারণ আছে। ছেলেটি যখন আজ আফরিনদের বাড়ির গেট দিয়ে ঢুকছিলো তখন সে তার বন্ধুদের কাছে ইয়ার্কি করে বলছিলো, “ল্যাংড়া-মেয়েকে বিয়ে করলে লাভ আছে। জায়গাজমি পাওয়া যাবে। আর এদের বশে রাখাও বেশ সুবিধা। তাছাড়া, আরও কত সুযোগ আছে!”
সেই সময় গেটের পাশে দাঁড়ানো কুদরতসাহেবের আপন ছোটভাই এসব নিজের কানে শুনেছিলেন। আরও কারণ আছে। ছেলেটি কুদরতসাহেবের ড্রইংরুমে ঢুকে দেওয়ালে টাঙ্গানো কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধার ছবি দেখে বন্ধুদের উদ্দেশ্যে বলছিলো, “এরা মনে হয় ধার্মিক না। নইলে দেওয়ালে কেউ এভাবে প্রাণির ছবি ঝুলিয়ে রাখে!”
 
কথাটা শোনামাত্র কুদরতসাহেব ও তার বড়ছেলে শাহীন পরস্পর মুখচাওয়াচাওয়ি করতে লাগলেন। কিছুক্ষণ পরে তারা বুঝলেন, এরা অন্ধ। জগতের শোভনসুন্দর জিনিসগুলো এদের চোখে আজও ধরা পড়েনি। এদের মধ্যে রয়েছে সীমাহীন অন্ধত্ব। তাই, এদের মধ্যে কোনো জীবনসৌন্দর্য নাই। সামান্য একটা সরকারি চাকরির জোরে আজ এরা তার মেয়েকে বিবাহ করতে চায়। এদের মধ্যে আজও জাগ্রত হয়নি জীবনসৌন্দর্য, মনুষ্যত্ব, শিষ্টাচার, বিবেকবোধ আর আত্মসংযম। তাই, এদের কাছে তার কন্যাকে বিবাহ দিলে তার অপরাধই হবে। এসময় কুদরতসাহেবের অন্তরাত্মা ভিতরে-ভিতরে ভয়ানক বিদ্রোহী হয়ে উঠলো। তিনি ধীরস্থিরভাবে একটা সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হলেন।
 
ঘটনাটা এখানেই শেষ হতে পারতো। কিন্তু আফজালের সঙ্গে আসা, কয়েক বছর না-ধোওয়া একটা জিন্সের প্যান্ট পরিহিত একটা ছেলে সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে শাহীনের দিকে তাকিয়ে বলতে লাগলো, “ভাই, দেওয়ালে এসব কী আজেবাজে ছবি টাঙ্গিয়েছেন। এগুলো এহন সরান। আমগো ইঞ্জিনিয়ারসাহেব এসব পছন্দ করেন না। দয়া করে এসব তাড়াতাড়ি সরান।”
আর আফজাল এসময় পায়ের উপর পা তুলে আজকের দৈনিক পত্রিকাটা খুব আয়েশ করে পড়ার চেষ্টা করছিলো। এইমুহূর্তে তাকে এলাকার কোনো রাজা-বাদশাহ মনে হচ্ছিলো।
এসব দেখে শাহীন ভিতরে-ভিতরে খুব উত্তেজিত হয়ে ওঠে। কুদরতসাহেব ব্যাপারটা আঁচ করতে পেরে ছেলেকে তাড়াতাড়ি ভিতের পাঠিয়ে দিলেন। তিনি ভাবলেন, এদের সঙ্গে কোনোপ্রকার দুর্ব্যবহার করলে এলাকার লোক তাদের খারাপ ভাববে। কেউ ছেলেপক্ষের দোষ ধরবে না। তারা শুধু মেয়েদের বদনাম করতে ভালোবাসে। সেজন্য তিনি ছেলেকে কোনোকিছু করতে তো দিলেনই না বরং নিজেও খুব শান্তভাবে সবকিছু মোকাবেলা করতে লাগলেন। আর তখনই তিনি মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলেন—যাদের জীবনে মহৎ কোনোকিছু নাই—তাদের সঙ্গে তিনি কখনও আত্মীয়তা করবেন না।
 
কুদরতসাহেব তাড়াতাড়ি বাড়ির ভিতরে গেলেন। আর গিয়ে দেখলেন, আফরিনকে সামান্য সাজগোজ করিয়ে তাকে পাত্রপক্ষের সামনে আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছিলো। তিনি মেয়েকে সব খুলে বললেন। বাবার কথা শুনে আফরিন হাসলো। আর সে হেসেই বললো, “বাবা, তোমার সঙ্গে আমি একমত। আর আমি জানি, তুমি আমাকে কখনও জলে ফেলবে না।”
এরপর কুদরতসাহেব আর দেরি করলেন না—তিনি মেহমানদের দুপুরের খাবার খাইয়ে দ্রুত বিদায় করে দিলেন। কিন্তু মেয়েকে এদের সামনে পর্যন্ত আনলেন না। তার মেয়ের সম্মানরক্ষা করার জন্য তিনি সবকিছু করতে সদাপ্রস্তুত।
 
তারপরও ঘটক রশিদ মোল্লা অনেককিছু বলার চেষ্টা করছিলো। আর সে ছেলের প্রশংসায় তখনও বারবার পঞ্চমুখ হচ্ছিলো। কিন্তু শাহীনের মারমুখীভাব দেখে সে আর দাঁড়াতে সাহস পেলো না।
 
কুদরতসাহেব বুঝলেন, দেশটা আজ অন্ধলোকে ভরে যাচ্ছে। এরা আজকাল সবখানে শুধু স্বার্থ খোঁজে। লোভে পড়ে এই ছেলেটা আজ তার মেয়েকে বিবাহ করতে চেয়েছিলো। তার মেয়ের তুলনায় এই ছেলেটা শুধু অযোগ্যই নয়—একেবারে অপদার্থও বটে। মেয়েটা আজ একটুখানি খোঁড়া হয়েছে বলে এলাকার ঘটক এখন যাকেতাকে তার মেয়ের সঙ্গে সম্বন্ধ করার কথা বলছে। মেয়েটার কষ্টের কথা ভেবে কুদরতসাহেবের বুকের ভিতরটা ব্যথায় আবার একটুখানি মোচড় দিয়ে উঠলো।
 
ছেলেপক্ষকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার পর ঘরে প্রবল প্রতিরোধের সম্মুখীন হলেন কুদরতসাহেব। তার স্ত্রী তাকে শুনিয়ে বারবার বলতে লাগলেন, “ছেলেটা তো ভালোই ছিল। দেখতে মন্দ নয়। আর লম্বাচওড়া আছে। তারউপরে সে একটা সরকারি চাকরি করে। এমন পাত্র হাতছাড়া করা তার ঠিক হয়নি।”
কুদরতসাহেব হেসে বললেন, “দেখো, আমিও তো বিবাহের জন্য রাজী হয়েছিলাম। কিন্তু তার আচরণগুলো দেখে মনে হলো—সে এখনও মানুষ হয়ে ওঠেনি। সে কোনো শিক্ষিত ছেলে নয়। সামান্য ডিপ্লোমা-ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের জোরে সে হয়তো একটা সরকারি চাকরি পেয়েছে। সেটি সত্য। কিন্তু আরও বড় সত্য হলো—সে এখনও মানুষ হয়নি। এমন একটি অশিক্ষিত-ছেলের সঙ্গে আমি কী করে নিজের একমাত্র মেয়েকে বিবাহ দেই? তাছাড়া, আমাদের মেয়েটি তো মানুষ। আমি জেনেশুনে তাকে একটা পশুর হাতে তুলে দিতে পারি না। আজকালকার বাজারে ঘুষ আর তদবিরের জোরে এমন অনেকেই এখন সরকারি চাকরি পাচ্ছে। এতে অবাক হওয়ার কিছু নাই। এসব অন্ধদের সঙ্গে আত্মীয়তা না করাই ভালো। এরা এখনও নিজের জীবনে ফুল ফোটাতে পারেনি।”
তবুও তার স্ত্রী কোহিনুর আক্তার বলতে লাগলেন, “আজকাল পড়ালেখা দিয়ে কী হবে? সরকারি চাকরি আর টাকাই এখন সব। এখন সবাই এসবই দেখে। তোমার মতো লোক এখনকার সমাজে অচল। তুমি তো ঘুষের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও ঘুষ খাচ্ছো না। এতে লাভ কী?”
 
স্ত্রীর মুখে এসব কথা শুনে কিছুক্ষণ হা করে তাকিয়ে রইলেন কুদরতসাহেব। তারপর আপনমনে ভাবলেন: দুনিয়াতে এরাও অন্ধ। টাকাপয়সার বাইরে আর কিছু দেখে না। এরা চোখ থাকতেও আজ এতো অন্ধ! মানুষজন এভাবে আজকাল এতো অন্ধ হতে থাকলে দুনিয়া চলবে কীভাবে?
  
সন্ধ্যার আগে কুদরতসাহেবের শ্যালক এসে বারবার বলতে লাগলো, “ভাইজান, আমাদের সিদ্ধান্তে কোনো ভুল হচ্ছে নাতো? একটু আগে ঘটকসাহেব আমাকে ফোনে জানিয়েছে, এখনও ছেলেপক্ষকে রাজী করানো যাবে। তারা এতে কিছু মনে করেনি। আর বিয়েশাদীতে নাকি এসব হয়েই থাকে। মুরুব্বিদের কাছে শুনেছি, লক্ষ-কথা না হলে নাকি বিয়েই হয় না। তাই বলছিলাম, আপনি যদি আরেকবার ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্তটা নিতেন!”
কুদরতসাহেব খুব শান্তভাবে তার শ্যালকের মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, “তুমি আসলে কী বলতে চাও? সরাসরি বলো তো।”
তখন সে বললো, “ভাইজান, ছেলেটা সরকারি চাকরি করে। তারউপরে ইঞ্জিনিয়ার। তার সামান্য ভুলটুল থাকতেই পারে। তাই, এমন একটা ছেলেকে হাতছাড়া করা কি ঠিক হবে?”
কুদরতসাহেব তাকে ঠাস করে চড়-মারার মতো বললেন, “তুমি অন্ধ! তাই, সমাজের অমানুষদের নিষ্ঠুর চেহারাটা দেখতে পাও না। তোমার চোখ আছে সত্য। কিন্তু তুমি আজও অন্ধ। সামান্য টাকাপয়সা ছাড়া আর-কিছু দেখতে পাও না। আমার মেয়েটি কত পড়েছে! আর কত ভালো ছাত্রী সে। একটা অ্যাকসিডেন্টে সমাজের চোখে হয়তো তার মূল্য কমে গেছে। কিন্তু আমার কাছে তার মূল্য আগের মতোই রয়ে গেছে। আমি এখন আমার মেয়েকে এইরকম একটা ছেলের সঙ্গে বিয়ে দেবো না। যদি কখনও ভালো কোনো ছেলে পাই তাহলে তখন তা দেখবো। এখন তুমি যাও।”
লোকটা আর কোনো কথা বলার সাহস পেলো না। সে কিছুটা আশাহত হয়ে চলে গেল।
 
কুদরতসাহেব ভাবতে লাগলেন: এরা সব অন্ধ। এদের চোখে লোভের পর্দা পড়েছে। এরা তাই চোখে দেখতে পায় না। সামান্য কটি টাকা দিয়ে এরা আজ মানুষবিচার করতে চাচ্ছে। তিনি কিছুতেই এদের সঙ্গে তাল মেলাবেন না।
 
কুদরতসাহেব খুব মনখারাপ করে আজ দিনের অবশিষ্ট সময়টুকু বাড়িতে বসে রইলেন। আর মাগরিবের নামাজ আজ তিনি ঘরেই আদায় করলেন। আজ তার কিছুতেই মসজিদে যেতে ইচ্ছে করছিলো না। ওই ঘটকটার চেহারা দেখতেও এখন তার লজ্জা করছে।
 
মাগরিবের নামাজশেষে কুদরতসাহেব মুনাজাত করে বলতে লাগলেন: প্রভু, দুনিয়ার মানুষ আজ অন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ঘরে-বাইরে আজ সবখানে শুধু অন্ধত্ব! লাভের হিসাব কষতে এখন সবাই ব্যস্ত। আজ সবাই শুধু স্বার্থচিন্তায় ব্যস্ত। সামান্য অর্থ দিয়ে আজ মানুষপরিমাপ করা হয়। এই সমাজ আজ অচল হয়ে যাচ্ছে। এখানে, দিন-দিন বাড়ছে মানুষের অন্ধত্ব। প্রভু, তুমি অন্ধজনে আলো দাও। এই অন্ধদের তুমি অন্ধত্ব থেকে মুক্ত করে দাও। জগতের মানুষগুলোর অন্তরচক্ষু তুমি খুলে দাও। এরা যেন মানুষের ভালো-মন্দ বুঝতে পারে। এদের মধ্যে একটু বিবেকজাগ্রত করে দাও। এদের মনের মধ্য থেকে মিথ্যা দূর করে সত্যউপলব্ধি করার শক্তি দাও। প্রভু, তুমি অন্ধজনে আজ একটু আলো দাও। আমীন।
 
কুদরতসাহেব মুনাজাত শেষ করে উঠবেন এমন সময় তাকে জড়িয়ে ধরলো আফরিন। তারপর সে হেসে বললো, “বাবা, আজ আমি খুব খুশি হয়েছি। তোমার কাজে আমি ভীষণ খুশি হয়েছি, বাবা। আর তুমি বাবার মতোই কাজ করেছো। আমার জীবনটাকে তুমি নষ্ট হতে দাওনি।”
মেয়েকে জড়িয়ে ধরে কুদরতসাহেব কেঁদে ফেললেন। তার চোখে যেন এখন বাঁধভাঙা-জল!
 
আফরিন একটু পরে বাবাকে জড়িয়ে ধরে বললো, “বাবা, আমাকে তুমি বোঝা মনে করোনি বলে তোমাকে অশেষ ধন্যবাদ। আজ তোমাদের একটি কথা বলে রাখছি: যেদিন কেউ একজন আমার এই খোঁড়া-পা দেখে আমাকে ভালোবেসে জীবনসঙ্গী করতে চাইবে—আমি শুধু তাকেই বিবাহ করবো। আর নয়তো কখনও বিবাহই করবো না। কিন্তু তুমি কখনও কারও কথায় আমাকে জলে ফেলে দিয়ো না, বাবা।”
এবার আফরিনের চোখে জলধারা নেমে এলো। ঠিক যেন আষাঢ়ের জলধারা।
 
কুদরতসাহেব মেয়ের মাথায় হাত বুলাতে-বুলাতে বললেন, “তা-ই হবে মা। আমি আজ থেকে এমন ছেলেই তোর জন্য খোঁজ করবো।”
 
বাবার এই কথাটা শুনে আফরিন হেসে ফেললো।
 
 
 
সাইয়িদ রফিকুল হক
১৭/০২/২০১৮
 
 

ছবি
সেকশনঃ গল্প
লিখেছেনঃ সাইয়িদ রফিকুল হক১ তারিখঃ 04/04/2019 12:44 PM
সর্বমোট 749 বার পঠিত
ফেসবুকের মাধ্যমে কমেন্ট করুণ

সার্চ