ব্যাকগ্রাউন্ড

ফেইসবুকে!

গোয়েন্দা-গল্প: গোয়েন্দা লালভাই: অধ্যাপক-খুনের রহস্য (তৃতীয় পর্ব)



































গোয়েন্দা-গল্প: গোয়েন্দা লালভাই
অধ্যাপক-খুনের রহস্য (তৃতীয় পর্ব)
সাইয়িদ রফিকুল হক

 
পড়ন্ত দুপুরে আমরা খাবার-টেবিলে বসে উদরপূর্তিতে ব্যস্ত । আমাদের তিনজনের পেটে এখন প্রচণ্ড ক্ষুধা। আর ক্ষুধার রাজ্যে যেন আমরা তিনজন দীর্ঘকাল যাবৎ বসবাস করছি। গোরস্থান থেকে প্রাপ্ত বিভিন্ন আলামত দেখার ইচ্ছে থাকলেও এইমুহূর্তে তা আমরা করতে পারছি না। তাই, আগে জীবন বাঁচাবার কাজে আমরা লেগে পড়লাম।
আমার চাচীমা খাবার পরিবেশন করতে লাগলেন। আমি বাধা দিয়ে তাকে বিশ্রামের জন্য ভিতরে পাঠিয়ে দিলাম। এই কাজটি এবার আমি নিজেই করতে লাগলাম। আমি প্রায় সময় এই কাজটি করি। এটা করতে আমার ভালো লাগে।
আজ বাসায় আমাদের লালভাবি নাই। তিনি খুব সম্ভবত তার বাবার বাড়িতে গিয়েছেন। যদিও এব্যাপারে আমি এখনও লালভাইকে কিছু জিজ্ঞাসা করিনি। শুধু অনুমানে বুঝে নিয়েছি। আর এব্যাপারে কিছু বলার মতো অবস্থাও আমাদের নাই। সবাই আমরা কেসটা নিয়ে খুব চিন্তাভাবনা করছি।
ভাবি বাড়িতে থাকলে আমাদের খাওয়াদাওয়া আরও জাঁকজমকপূর্ণ হয়। তিনি সবসময় পাশে থেকে সবকিছুর তদারকি করে থাকেন। আজ আমি আর আতিক ভাই তার অভাবটা বুঝতে পারলাম।
আমরা তিনজন তাড়াতাড়ি খাচ্ছিলাম। তবে আতিক ভাই সবচেয়ে এগিয়ে। তিনি আরও দ্রুত খাচ্ছেন। তার খাওয়ার স্টাইল দেখে লালভাই বললেন, “একটু ধীরে খাও ভাই। খাবার তো আর পালিয়ে যাচ্ছে না! সব তো টেবিলেই পড়ে থাকবে।”
একথা শুনে তিনি হেসে ফেললেন। তারপর মুখের গ্রাসটুকু হজম করে হেসে বললেন, “গোরস্থানের জিনিসপত্রগুলো দেখার জন্য মনে মনে খুব অস্থির হয়ে রয়েছি। তাই, একটু জোরে হাত-মুখ চালাচ্ছিলাম আরকি!”
খাওয়ার পরে আমরা তিনজন ডাইনিং-রুম পেরিয়ে ভিতরের কক্ষের দিকে প্রবেশ করলাম। এটা লালভাইয়ের পড়ার ঘর। এর তিনদিকে দেওয়ালসংলগ্ন বুক শেলফে বই-আর-বই। এখানে, চারিদিকে শুধু বই। আমাদের লালভাই গ্রন্থপ্রেমিক মানুষ। চাকরির সময়টুকু বাদে তিনি অবসরে বই পড়ে কাটান। বই তার নিত্যসঙ্গী। আর জীবনসঙ্গী বললেও হয়তো ভুল বলা হবে না।
লালভাই তার রুমের দরজাটা একটু চাপিয়ে দিলেন। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “এবার তুই ব্যাগ তিনটা থেকে জিনিসপত্রগুলো আস্তে-আস্তে বের কর তো। আর দেখিস, কোনো জিনিস যেন অসাবধানতায় নষ্ট না হয়।”
আমি জিনিসপত্রগুলো মেঝেতে ধীরে ধীরে ঢালতে লাগলাম। এত জিনিসপত্র দেখে আমাদের তিনজনের চক্ষু চড়কগাছ! হত্যাকারীরা তাদের হত্যাসংক্রান্ত যাবতীয় সরঞ্জামাদিসহ সবকিছু একজায়গায় পূঞ্জীভূত করে ফেলে দিয়েছিল। কিন্তু ওদের ভাগ্য খারাপ। ওদের পাপের সমস্ত আলামত এসে পড়েছে পৃথিবীর সবচেয়ে ঠাণ্ডা মাথার দুর্ধর্ষ গোয়েন্দা আমাদের লালভাইয়ের হাতে।
সেই রক্তমাখা পুতুলটা ব্যতীত আমরা আর যা পেয়েছি তার একটি তালিকা তৈরি করতে লাগলাম। এ পর্যন্ত আমরা গোরস্থানে প্রাপ্ত বস্তা থেকে পেয়েছি: রক্তমাখা একটি হলুদ শাড়ি, রক্তমাখা একটি লাল ব্লাউজ, রক্তমাখা একটি কালো ব্রেসিয়ার, রক্তমাখা একটি লালরঙের পেটিকোট, একটি রক্তমাখা মাঝারি আকৃতির বালিশ, দুইটা বিছানার চাদর (একটা হলুদ রঙের ও আরেকটি গোলাপি), একটা পলিথিনের মধ্যে কাপড়ে মোড়ানো একটা মাঝারি আকৃতির রক্তমাখা ছোরা, রক্তমাখা একটি বই (রাইফেল রোটি আওরত), দুইটি ডায়েরি, রক্তমাখা একটি সালোয়ার ও একটি কামিজ, পুরুষদের ব্যবহার্য একটি রক্তমাখা গেঞ্জি, একটি রক্তমাখা নীল-সাদার সংমিশ্রণের লুঙ্গি, আর মেয়েদের ব্যবহার্য ও ব্যবহৃত একজোড়া স্পঞ্জের স্যান্ডেল।
আমি খুব অল্পসময়ের মধ্যে তালিকাটা তৈরি করে ফেললাম। তারপর লালভাই সব জিনিসপত্র নেড়েচেড়ে খুব মনোযোগ দিয়ে তা দেখতে লাগলেন। এসময় আমরা কেউই কোনো কথাবার্তা বললাম না। তবে একটু দূরে বসে আমরা দুজন নিজেদের মধ্যে কিছু ব্যাপার নিয়ে আলাপআলোচনা করতে লাগলাম। মাঝে-মাঝে আমরাও তাকিয়ে দেখতে লাগলাম জিনিসগুলো।
লালভাই জিনিসগুলো দেখেশুনে আমাদের মুখোমুখি একটা সোফায় বসে বলতে লাগলেন, “যা ভেবেছিলাম তা-ই। এই কেসেও মেয়েদের সম্পর্ক রয়েছে। আর যেকোনো খুনের সঙ্গে মেয়েদের একটা-না-একটা সম্পর্ক থাকেই। এখানে, যে-সব আলামত আমরা পেয়েছি তার প্রায় সবই খুনীদের। রক্তমাখা গেঞ্জি ও লুঙ্গিটা খুব সম্ভবত নিহত অধ্যাপকসাহেবের। আর ডায়েরি দুটো আজাদ কালামের। তার কিছু প্রমাণও আমি পেয়েছি। আমি ডায়েরি দুইটা খুব মনোযোগ দিয়ে দেখেছি। সেখানে এই খুনের আগের কোনো ঘটনার কথা লেখা নাই। পুরা ডায়েরি দুইটা ঘেঁটে দেখলাম, সেখানে শুধু জমিজমা আর টাকাপয়সার সমস্ত হিসাবনিকাশ রয়েছে। তবে এটাও আমাদের কাজে দিবে। আর এটার দুই জায়গায় শুধু লেখা রয়েছে: ‘আজকাল মামাকে খুব হতাশাজনক অবস্থায় দেখি। তারউপরে কেউ কোনো চাপসৃষ্টি করছে কিনা জানি না। এব্যাপারে তিনি আমাকে কিছু বলছেন না।...মামাকে কেউ মনে হয় হুমকি দিচ্ছে। তার ভিতরে একটা চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে। কিন্তু এখনও তিনি এব্যাপারে আমাকে কিছুই বলছেন না।’ এছাড়া ডায়েরিতে আর-কিছু লেখা নাই।”
তিনি মেঝে থেকে উঠে দাঁড়িয়ে আমার প্রতি ইঙ্গিত করে বললেন, “পরে তুই ডায়েরি দুইটা আরও ভালোভাবে ঘেঁটে দেখবি তো। কোথাও কোনো তথ্য পাওয়া যায় কিনা!”
এরপর লালভাই গভীরভাবে চিন্তায় মগ্ন হয়ে রুমের মাঝখানের প্রশস্ত জায়গাটায় পায়চারী করতে লাগলেন। এভাবে কয়েকবার পায়চারী করতে-করতে তিনি আমার দিকে একবার তাকিয়ে পায়চারী না থামিয়ে বললেন, “আমি এখন যা বলি তুই সবকিছু তাড়াতাড়ি একটা কাগজে নোট কর তো।”
আমি লালভাইয়ের নির্দেশে কাগজ-কলম নিয়ে নোট করতে শুরু করলাম।
তিনি পায়চারী করতে-করতে বলতে লাগলেন, “এই খুনে কমপক্ষে তিনজন অংশ নিয়েছিল। একজন পুরুষ আর দুইজন মহিলা। হলুদ শাড়ি, লালরঙের ব্লাউজ ও কালো-ব্রেসিয়ার একজন মহিলার। আর সালোয়ার-কামিজটা ও তৎসঙ্গে পাওয়া লাল-ব্রেসিয়ার আরেকজন মহিলার। এরা হত্যার অংশীদার কিংবা প্রত্যক্ষদর্শী ও সহযোগী। তবে আমার এই সালোয়ার-কামিজটা ও লাল-ব্রেসিয়ার দেখে মনে হচ্ছে, এটা কোনো কাজের মেয়ের। তার কারণ, এই পোশাকগুলো একটু নিম্নমানের। এখানে, যে মূল খুনী সে পুরুষ। আর সে কিন্তু নিজের কোনো জামাকাপড় বা পোশাকপরিচ্ছদ এইসব আলামতের সঙ্গে রাখেনি। বুঝা যায়, সে খুব ধূর্ত আর সাবধানী। আমরা আজ নিহত অধ্যাপকসাহেবের পুত্রবধূ শাহীনা বেগমের সঙ্গে তার বাড়িতে যে কাজের মেয়েটিকে দেখেছি, এগুলো তার পোশাক নয়। সে বয়সে ছোট। একদম কিশোরী। তার ব্রেসিয়ার পরার বা এতবড় সালোয়ার-কামিজ পরার সুযোগ নাই। এখন আমাদের শনাক্ত করতে হবে যে, ওই সালোয়ার-কামিজ ও লাল-ব্রেসিয়ার, আর হলুদ শাড়ি, লাল-ব্লাউজ আর কালো-ব্রেসিয়ারটি কার? তাহলে, আমরা অতিসহজেই খুনীর কাছে পৌঁছে যেতে পারবো।”
এরপর লালভাই পায়চারী থামিয়ে সোফায় কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইলেন।
লালভাই আমাদের বসতে বলে একটু ভিতরের দিকে গেলেন। এই সুযোগে আমরা দুজন জিনিসপত্রগুলো নাড়াচাড়া করে দেখতে লাগলাম। এসব দেখতে আমাদের যে ভালো লাগে তা নয়। আমরা শুধু লালভাইকে সাহায্য-সহযোগিতা করার জন্য এসব করে থাকি। আর যেকোনো খুনের ঘটনাই আমাদের কাছে অত্যন্ত বেদনাদায়ক।
আতিক ভাই সব জিনিস দেখেশুনে বললেন, “তোমার ভাইয়ের কথাই ঠিক। এই কেসটাতে আমিও ধারণা করছি এখানে কোনো মহিলার হাত রয়েছে কিংবা তার যোগসাজশেই এগুলো হয়েছে।”
আমার মনে হলো তিনি যেন আমার মনের কথাটাই বলেছেন। আমি তার সঙ্গে সহমত প্রকাশ করলাম।
লালভাই ফিরে এলেন একটু পরেই। তারপর তিনি পুনরায় আলামতসমূহ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে বসলেন। তিনি এমনই করেন। একটা বিষয় নিয়ে তিনি বারবার গবেষণা করেন। তিনি মনে করেন, এভাবে কাজ করলে প্রমাণ খুঁজে পেতে সহজ হয়। একবারে হয়তো অনেককিছু চোখে পড়ে না। কিন্তু বারবার প্রচেষ্টার ফলে সেই বিষয়ে বাদ পড়া এমন অনেককিছু আবার নতুনভাবে দৃষ্টিগ্রাহ্য হয়।
আমাদের লালভাইয়ের গোয়েন্দাগিরিতে তদন্তের মূলনীতি বা মূলসূত্র হলো পাঁচটি। প্রথমত; যেকোনো খুনের ঘটনার সঙ্গে সবসময় কোনো-না-কোনোভাবে কোনো মহিলা হয়তো খুনের আর নয়তো খুনসৃষ্টির ঘটনার সঙ্গে জড়িত। এখানে, দুই-একজন মহিলা মূলঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো একটি ঘটনাক্রমে জড়িত থাকবেই। দ্বিতীয়ত; খুনের যেকোনো ঘটনার সঙ্গে স্বার্থসংল্লিষ্ট যেকোনো বিষয়, জমিজমা, অর্থসম্পদ, নারীঘটিত বিষয়, তহবিল-তসরুফ ইত্যাদির সম্পর্ক জড়িত থাকবে। তৃতীয়ত; যেকোনো খুনের ঘটনার সঙ্গে পরকীয়া-প্রেমের একটা সম্পর্ক রয়েছে। খুনী বা খুনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যেকারও পরকীয়া-প্রেমের সম্পর্ক থাকতে পারে। চতুর্থত; রাজনৈতিক ও ধর্মীয় হত্যকাণ্ডের বাইরে পৃথিবীর যেকোনো সামাজিক ও পারিবারিক খুনের সঙ্গে আত্মীয়স্বজনের সংশ্লিষ্টতা থাকবেই। পঞ্চমত; কোনো প্রবাসীর স্ত্রী দেশে থাকলে, এবং প্রবাসীর কোনো আত্মীয়স্বজন খুন হলে এর সঙ্গে তার স্ত্রীর বা স্ত্রীর ঘনিষ্ঠ আত্মীয়স্বজনের সংশ্লিষ্টতার সন্দেহ কোনোভাবেই বাদ দেওয়া যায় না। এদের সবসময় সন্দেহের তালিকায় রাখতে হবে।
তিনি এভাবেই তার সূত্রসমূহের মাধ্যমে তদন্তকাজে অগ্রসর হন। তার চিন্তাভাবনা নিরীহ কাউকে হয়রানি কিংবা লাঞ্ছিত করার জন্য নয়। প্রাথমিকভাবে তিনি মনে মনে সবাইকে সন্দেহ করলেও পরে তদন্তসাপেক্ষে শুধু সন্দেহভাজনদের রেখে বাকি সবাইকে তদন্ত থেকে বাদ দেন। তিনি সবসময় তার এই পঞ্চসূত্র মেনে চলেন।
লালভাই তার সর্বশেষ পরীক্ষা-নিরীক্ষাশেষে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “এগুলো এখন একটা বড় বস্তার মধ্যে ভরে রাখো। আপাতত এ-বিষয়ে আমাদের কাজ শেষ। এগুলো তিনটি ব্যাগে আর ভরে রাখার প্রয়োজন নাই।”
আমি অম্লানবদনে লালভাইয়ের আদেশপালন করতে লাগলাম।
কাজের মেয়েটা আমাদের জন্য ইতোমধ্যে চা দিয়ে গেল। আমরা চা-পানে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম।
চায়ে চুমুক দিয়ে লালভাই বললেন, “আগামীকাল আমরা তিনজন আবার ধামরাই যাবো। এবার শুধু অধ্যাপকসাহেবের বাড়ির বাগানে বা আশেপাশে নয়—তার বাড়ির ভিতরেও—মানে অন্দরমহলেও প্রবেশ করবো। আর খুঁটে-খুঁটে সবকিছু দেখবো।”
তার একথা শুনে আতিক ভাই যেন রীতিমতো আঁতকে উঠে বললেন, “আবার ওই বাড়িতে! কিন্তু ওরা তো দরজাই খুলবে না! আর ওরা যদি আমাদের ওপর আবার কোনো হামলা করে?”
লালভাই এতে একটু হেসে বললেন, “আরে, এবার ওদের সে সুযোগ আমরা দিচ্ছি না। আর তুমি এত ভয় পাচ্ছো কেন? এবার আমরা ছদ্মবেশে যাবো। আর তিনজন একসঙ্গেই ছদ্মবেশধারণ করবো।”
তারপর তিনি একটু থেমে বলতে লাগলেন, “তবে শোনো, তোমাদের কাছে ব্যাপারটা খুলেই বলছি। আমি আর সাজিদ ‘দৈনিক সত্যবাণী’র সাংবাদিক হিসাবে সেখানে হাজির হবো। আর তুমি হবে আমাদের বহনকারী বিশ্বস্ত এক রিক্সাওয়ালা। এতে তিনজনেই প্রয়োজনে দাঁড়ি-গোঁফ ব্যবহার করবো। এবার বলো রাজী কিনা?”
এবার আতিক ভাইয়ের মুখে হাসি ফুটে উঠলো। তিনি খুশিতে বললেন, “এবার আমি একশ’বার রাজী। আর ছদ্মবেশের কথা শুনে মনে মনে দারুণ একটা উত্তেজনা অনুভব করছি।”
হঠাৎ লালভাই একটু গম্ভীর হয়ে বললেন, “কিন্তু এখানে একটা সমস্যা আছে। আমরা সেখানে একটা রিক্সা কীভাবে জোগাড় করবো? আমার তো সেখানে পরিচিত কেউ নাই।”
লালভাইয়ের মুখ থেকে একথা শুনে আতিক ভাই বীরত্বের সঙ্গে হেসে বললেন, “শোনো প্রোফেসর, তুমি নিজেকে এতটা একা মনে করছো কেন? আমি তো সঙ্গে রয়েছি। আর আমি তো রাজনীতি করি। এর সুবাদে আশেপাশের সবজায়গায় আল্লাহর রহমতে আমার পরিচিতজন রয়েছে। আমি এখনই একটা রিক্সার ব্যবস্থা করছি।”
আতিক ভাই কথা শেষ করে তখনই কাকে যেন ফোন করলেন। ওপাশ থেকে কারও কথা শুনে তিনি হেসে ফোন রেখে লালভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, “নাও, তোমার রিক্সার ব্যবস্থা হয়ে গেল। আমাদের জন্য আগামীকাল সকাল দশটায় একটা ভালোমানের রিক্সা ধামরাই-বাসস্ট্যান্ডে অপেক্ষমাণ থাকবে।”
লালভাই হেসে বললেন, “তুমি আসলেই একটা কাজের মানুষ। তোমাকে ধন্যবাদ দিয়ে ছোট করবো না।”
 
আমরা যখন নিজেদের মধ্যে কথাবার্তায় ব্যস্ত তখন দরজার কলিংবেল বাজার শব্দ শুনলাম। দরজা খুলতে আমিই ছুটে যাচ্ছিলাম। কিন্তু লালভাই আমাকে বাধা দিয়ে বসতে বললেন। তিনি নিজে উঠে গিয়ে দরজা খুলে ভিতরে নিয়ে এলেন একজন বিশ-একুশ বছরের যুবককে। ছেলেটি কিছু বলার আগেই লালভাই তাকে আমাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন।
বললেন, “এ হচ্ছে অধ্যাপক-খুনের প্রধান আসামী আজাদ কালামের আপন ছোটভাই আজাদ রায়হান। ও-কে আমি ডেকে এনেছি। এজন্য একটু আগে ও-কে ফোন করেছিলাম। ওর কাছে যদি কোনো তথ্য থাকে তাহলে আমাদের উপকার হবে। আর যেকোনো প্রয়োজনীয় কথাবার্তা সামনাসামনি বসে বললে সবচেয়ে ভালো হয়। এজন্যই আসলে ও-কে ডেকেছি।”
লালভাই সরাসরি কাজের কথায় চলে গেলেন। তিনি রায়হানের দিকে তাকিয়ে বললেন, “প্রথমে সংক্ষেপে তোমার একটু পরিচয় দাও। তারপর আমাদের কিছু প্রশ্নের জবাব দিবে।”
রায়হান মলিনমুখে বললো, “আমার নাম আজাদ আবু রায়হান। সংক্ষেপে আজাদ রায়হান। আমার বড়ভাইয়ের নাম আজাদ আবুল কালাম। সংক্ষেপে আজাদ কালাম। আমরা দুই ভাই। আর আমাদের একজন বড় বোন রয়েছেন। তার বিবাহ হয়েছে বছর চারেক আগে। আমাদের মা জীবিত নেই। বাবা এখনও জীবিত আছেন। আর আমি বর্তমানে ঢাকাবিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যে দ্বিতীয় বর্ষে অনার্সে পড়ছি।”
“এবার বলো এই খুনের ঘটনায় তোমার কাকে সন্দেহ হয়?”—লালভাই আচমকা তাকে প্রশ্ন করলেন।
একথা শুনে সে মাথানিচু করে কিছুক্ষণ কী যেন ভাবতে লাগলো। শেষে আমাদের দিকে মুখ তুলে বললো, “আমার কাউকে সন্দেহ হয় না। আমি খামাখা কাকে সন্দেহ করবো? আর কার নাম বলবো? তবে আমার মনে হয়, আমাদের কোনো আত্মীয়স্বজন জড়িত থাকলেও থাকতে পারে। তবে এদের কারও নাম আমি বলতে পারবো না। কে যে জড়িত তা আমি আসলে জানি না। আর-একটা কথা, এই খুনের সঙ্গে আমার ভাইয়ের কোনো সম্পর্ক নাই। এব্যাপারে আমি একেবারে নিশ্চিত। সে এরকম কোনো অমানুষ নয়। আমার মরহুম মামাজান তাকে খুব বেশি বিশ্বাস করতেন। সে কখনো মামার বিশ্বাসভঙ্গ করেনি। মামার জমিজমা থেকে শুরু করে ব্যাংকের সকল হিসাবনিকাশও আমার ভাই দেখাশোনা করতো। বিশেষ করে আমার মামাজানের একমাত্র পুত্র শ্রদ্ধেয় আবুল বাশার সরকার সাহেব মামার ওপর রাগ করে অস্ট্রেলিয়ায় চলে যাওয়ার পর থেকে মামার সবকিছু দেখাশোনার দায়দায়িত্ব বর্তায় আমার এই ভাইয়ের ওপর। এতে নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন, মামাজান আমার ভাইকে কতখানি বিশ্বাস করতেন।”
“তোমার একমাত্র মামাতো ভাই কী কারণে পিতার ওপর রাগ করে হঠাৎ অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমালেন?”—একটু খুলে বলবে কি?
লালভাইয়ের একথা শুনে সে ধীরে ধীরে বলতে লাগলো, “মামা সবসময় চাইতেন তিনি এই প্রকৃতির সান্নিধ্যে বেঁচে থাকবেন। এজন্য তিনি এখানে বাড়ি করেছেন। তার একটি স্বপ্ন ছিল তিনি এখানে বড়সড় একটা কৃষিখামার গড়ে তুলবেন। এজন্য তিনি ধামরাইয়ের ওই বাড়িটা থেকে মাইল তিনেক দূরে মানে একটু ভিতরে একসঙ্গে একশ’ এগারো বিঘা জমি কিনেছেন। এই জমি ক্রয়ে কোনোপ্রকার ঘাপলা নাই। কিন্তু তা সত্ত্বেও, স্থানীয় কিছুসংখ্যক টাউট ও হাউজিং কোম্পানির ভূমিদস্যুদের সঙ্গে মামার একটা বিরোধ হয়। আর এই বিরোধের জের ধরে ওরা মামার বিরুদ্ধে দুইটি মামলাও দায়ের করে। এখানে, বলে রাখি মামার ওই মামলা পরিচালনা করার সময় স্থানীয় ধামরাই-থানার ওসি গোলাম মওলা মামার কাছে যাতায়াত শুরু করে। ওর আচার-ব্যবহার দেখে মামাও তাকে নিজের ছেলের মতোই মনে করতেন। এভাবে, বর্তমান ওসি আমাদের পরিবারের একজন হয়ে ওঠেন।”
“তোমার মামাতো ভাই কখন অস্ট্রেলিয়ায় যান?”—লালভাই আবার প্রশ্ন করলেন।
রায়হান নিজেকে একটু গুছিয়ে নিয়ে বলতে লাগলো, “মামার বিরুদ্ধে ভূমিদস্যুদের মামলার বছরখানেক আগেই আমাদের মামাতো ভাই বিদেশে পাড়ি জমান।”
লালভাই একটুখানি গম্ভীর হয়ে বললেন, “আচ্ছা ভালো। এবার একটু বলো তো, এই ওসিসাহেব কেমন মানুষ?”
রায়হান এবার মনমরা হয়ে বললো, “তাকে তো আমরা নিজের ভাইয়ের মতোই মনে করতাম। তার সঙ্গে আমার অনেকবার দেখা হয়েছে। কখনো তাকে আমার খারাপ মনে হয়নি। কিন্তু এবার কেন যে তিনি খুনের অভিযোগে আমার ভাইকে গ্রেফতার করলেন! তাকে আসামী বানালেন। এমনকি এ-খবর শোনার পর আমি যখন তাকে ফোন করেছিলাম তখন তিনি আমাকে বললেন, ‘তোমার  ভাইয়ের হাতেই তোমার মামা খুন হয়েছেন। গত কয়েকদিন আগে সে তোমার মামার কাছে পাঁচ লক্ষ টাকা দাবি করেছিল। বেচারা দেয়নি বলে তাকে নির্মমভাবে খুন করেছে। আর-একটা কথা বলে রাখি, এই খুনের সঙ্গে তোমারও নাকি সংশ্লিষ্টতা রয়েছে তা আমাদের থানার দারোগাসাহেব খুঁজে পেয়েছেন।’ তারপর তিনি প্রসঙ্গ পাল্টে জানতে চাইলেন, ‘তা তুমি এখন আছো কোথায়?’ এরপর তার কথা শুনে আমি ভয়ে ফোনলাইন কেটে দিয়েছিলাম। আর ওই মোবাইল-সিমও বন্ধ করে রেখেছি।”
লালভাই কিছুক্ষণ কী যেন ভাবতে লাগলেন। তারপর বললেন, “তুমি এখন থাকো কোথায়?”
সে বললো, “আমি এক বন্ধুর বাসায় উঠেছি। আগে বঙ্গবন্ধু-হলে থাকতাম। আপনার জ্ঞাতার্থে আরও বলছি: আমি ঢাকা কলেজে পড়ার সময় থেকে একটা মেসে থাকতাম। টাকা পাঠাতেন মামা। মানে আমার ভাইয়ের মাধ্যমে। এরপর আমি ইন্টারমিডিয়েট পাস করে ঢাকাবিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলে মামা আমাকে হলে উঠতে বললেন। আমি তা-ই করলাম। আর টাকা পাঠাতেন আমার এই  মামা। আমার বড়ভাই কালাম জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর থেকে মামাজান খুব খুশি হয়েছিলেন। তাহলে, তার বিষয়সম্পদ সবকিছু কালাম ভাই দেখাশোনা করতে পারবে। এরপর থেকে আমার ভাই এখানে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে ও মামার সবকিছু দেখাশোনা করতে লাগলো। এজন্য মামা তাকে খুব বেশি স্নেহ করতেন। আর সেও মামাকে পিতার মতো ভক্তি-শ্রদ্ধা করতো। আপনি হয়তো জানেন না, আমাদের মা মারা গিয়েছেন প্রায় এগারো বছর আগে। এরপর তিনিই আমাদের পিতার আদরে মানুষ করেছেন। আমাদের বড় বোনটিকে তিনি ভালো একটা পরিবারে বিবাহ দিয়েছেন। আমাদের বাবা একটু বাউণ্ডুলে স্বভাবের। তিনি তাবলিগ-জামাতের নামে চিল্লা দিয়ে বছরের বেশিরভাগ সময়ই এখানে-সেখানে পড়ে থাকেন। আমাদের বাড়ি কাছেই। এই তো মানিকগঞ্জে। কিন্তু আম্মা মারা যাওয়ার পর থেকে বাবা আর সেখানে থাকতেন না। তিনি চিল্লা থেকে কখনো আমাদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ করতে এলে আমাদের এই মামার বাড়িতে এসে উঠতেন। সবকিছু মিলিয়ে এই মামা আমাদের জীবনে সবচেয়ে বেশি আপনজন হয়ে উঠেছিলেন। তাই, আপনিই বলুন, এরকম একজন মহান আত্মীয়কে কেউ খুন করতে পারে? আমার বিশ্বাস হয় না স্যার। সেইজন্য আপনাকে সবকিছু তদন্ত করে দেখতে বলেছি। আর আপনার প্রাপ্য সম্মানী আমরা দিয়ে দিবো।”
তার শেষের কথাটা শুনে আতিক ভাই বললেন, “ও-সব নিয়ে এত ভাবনার কিছু নাই। আগে মহান স্রষ্টার কাছে প্রার্থনা কর, যেন আমাদের লালভাই এই তদন্তে সফলকাম হন।”
ছেলেটি এবার কাঁচুমাচু হয়ে বললো, “সে তো অবশ্যই।”
“আচ্ছা তোমার মামাতো ভাই কি তার পিতাকে খুন করতে পারেন? তোমার কী মনে হয়? আর এব্যাপারে তুমি আমার কাছে কোনোকিছু গোপন করবে না।”—লালভাই কথাটা বলে রায়হানের মুখের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন।
 
রায়হান এবার খুব ভেবেচিন্তে বলতে লাগলো, “তাহলে, আপনাকে আরও কয়েকটি কথা বলি। আমার মামা খুব ভালোমানুষ ছিলেন। আর ছিলেন খুব হিসেবী। তিনি সারাজীবন খুব হিসাবনিকাশ করে চলেছেন বলে এত বিষয়সম্পদ করতে পেরেছেন। আমার জানামতে, তিনি প্রচণ্ড সৎমানুষ ছিলেন। সরকারি কলেজের চাকরির পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন বই-পুস্তক-গাইড লিখে টাকাপয়সা আয় করতেন। আর সংসার-খরচের টাকা বাঁচিয়ে তিনি জমিজমা ক্রয় করতেন। এটা ছিল তার নেশার মতো। এতদিন তার স্ত্রী তাকে এই মহৎকাজে সাহায্য-সহযোগিতা করেছেন। কিন্তু চার বছর আগে তিনি মারা যাওয়ার পর থেকে মামা খুব একা আর নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েন। আমার মামার আর-কোনো ছেলেমেয়ে না থাকায় তিনি বাড়িতে প্রায় একাকী থাকতেন। তার কোনো মেয়ে ছিল না বলে  তিনি একমাত্র ছেলের বউকে খুব ভালোবাসতেন। আর ছেলের ঘরের ছেলে-মেয়ে দুটো তো বলতে গেলে তার জান ছিল। আমার মামী মারা যাওয়ার পর থেকেই পরিবারের সম্পূর্ণ হিসাবনিকাশের দায়দায়িত্ব এসে অর্পিত হয় আমার ভাইয়ের ওপর। সে নিষ্ঠার সঙ্গে এই দায়িত্বপালন করে চলছিলো। আমাদের মামাতো ভাই আবুল বাশার সাহেব পিতার মতো দূরদর্শী কিংবা সঞ্চয়ী নন। তিনি বিলাসী জীবনযাপনে অভ্যস্ত। সেইজন্য তিনি ধামরাইয়ে বসবাস করতে আগ্রহী ছিলেন না। কিন্তু মামা তাকে সেখানে বাস করতে কখনো জোরজবরদস্তি করেননি। এমনকি মামা তাকে কয়েকবার পরামর্শ দিয়েছেন ঢাকায় গিয়ে থাকতে। ঢাকার মিরপুরে মামার একটি ১৩০০ বর্গফুটের ফ্ল্যাট রয়েছে। সেটি বর্তমানে ভাড়া দেওয়া আছে। ঢাকার তিনটি প্লটের সঙ্গে এটাও দেখাশোনা করে আমার বড়ভাই কালাম। মামা যে বাশার ভাইকে ঢাকায় গিয়ে বসবাস করতে বলেছেন—তা আমি একাধিকবার নিজের কানে শুনেছি। কিন্তু আমাদের বাশার ভাইয়ের ইচ্ছা ছিল ঢাকায় মামার যে তিনটি প্লট আছে তা ডেভেলপারদের হাতে তুলে দেওয়া। এতে একদিকে নগদ প্রচুর টাকা পাওয়া যাবে অন্যদিকে কয়েকটি ফ্ল্যাটও পাওয়া যাবে। এসব চিন্তাভাবনা করে তিনি সবসময় চাইতেন তার পিতার তিনটি প্লট ডেভেলপারদের হাতে তুলে দিয়ে নগদ টাকাপয়সা আর একাধিক ফ্ল্যাটের মালিক হতে। কিন্তু মামা এসবের একেবারে ঘোরবিরোধী ছিলেন। সেই থেকে তাদের মধ্যে প্রথম বিরোধের সূত্রপাত। এভাবে একসময় তাদের বনিবনা আরও বাড়তে থাকে। আর মামী বেঁচে না থাকায় আমাদের এই মামাতো ভাইটি আরও বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠেছিলেন। আরেকটি কথা, আমার মামা এই ডেভেলপার-কোম্পানি বা হাউজিং-কোম্পানিকে দু’চক্ষে দেখতে পারতেন না। এসব নিয়ে তাদের মধ্যে বিস্তর মতপার্থক্য থাকলেও বাশার ভাই কখনো মামার সঙ্গে অশোভন আচরণ প্রকাশ করেননি। আর সবকিছু বিবেচনা করেও আমার কাছে মনে হয়েছে, আমাদের বাশার ভাই কখনো তার বাবাকে খুন করতে পারেন না। আসলে, খুনটা অন্য কেউ করেছে। আর এসব করে সে আমার ভাইকে ফাঁসিতে ঝুলাতে ও বাশার ভাইকেও ফাঁসাতে চাইছে।”
“তোমার মামাতো ভাই কী করতেন?”
লালভাইয়ের এই প্রশ্ন শুনে সে কিছুক্ষণ চুপ থেকে শেষে বলতে লাগলো, “তিনি ঢাকার একটি প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি থেকে বিবিএ-এমবিএ করেছিলেন। কিন্তু কোনোদিন চাকরি করা তো দূরের কথা চাকরির একটা দরখাস্ত লিখেছিলেন কিনা সন্দেহ! আসলে, তিনি কর্মঠ নন, এবং নিজে কোনোকিছু করার মতো ছেলে ছিলেন না। তাই, মামার একমাত্র সন্তান তথা পুত্র হওয়ার সুবাদে তিনি সবকিছু নিজের হাতে পেতে চাইতেন। তিনি কোনো কাজের ছেলে নন। শুধু জেদের বশে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন। তাও প্রায় তিন বছর হয়ে গেল। হঠাৎ মামা খুন হলেন! কবে যে তিনি দেশে ফিরবেন!”
লালভাই কিছুটা চিন্তিত হয়ে বললেন, “তোমার মামাতো ভাইয়ের সঙ্গে তোমার ভাবীও কি তোমার মামার সবকিছু ডেভেলপারদের হাতে তুলে দেওয়ার পক্ষপাতী ছিলেন?”
রায়হান এবার সরাসরি বললো, “না। তা আমি দেখিনি। আমার কখনো তাকে সেরকম মনে হয়নি। বিশেষত তিনি এব্যাপারে মামার সঙ্গে কখনো কথা বলেননি। আর তিনি আমার মামাতো ভাইয়ের মতিগতি জানতেন। তাই, তিনি মামার সবকিছু তার হাতে তুলে না দেওয়ারই বরং পক্ষপাতী ছিলেন। সম্ভবত এসব বিষয় নিয়ে এবং আরও কোনো ব্যাপারে তার সঙ্গেও আমার এই মামাতো ভাইয়ের বিরাট মতপার্থক্যের সৃষ্টি হয়। এজন্য তিনি এই দুজনের ওপর রাগ করেই বিদেশে পাড়ি জমান। আমি এব্যাপারে এর বাইরে আর-কিছু জানি না। হয়তো কালাম ভাই এর চেয়ে বেশি জানে।”
 
ইতোমধ্যে আমাদের গৃহসাথী নুরজাহান চা-বিস্কুট দিয়ে গেল। আমরা এর সদ্ব্যবহার করতে লাগলাম। আমাদের অনুরোধে রায়হানও চা-পান করতে লাগলো।
চা-পানের ফাঁকে-ফাঁকে আমাদের মধ্যে আগের মতো কথাবার্তাও চলতে লাগলো। আমরা রায়হানের নিকট থেকে আরও জানতে পারলাম, সে মাঝে-মাঝে তার ওই মামার বাড়িতে বেড়াতে কিংবা অন্যকোনো প্রয়োজনে গেলে দুই-এক রাতের বেশি কখনো থাকতো না। পড়ালেখার ক্ষতি হবে ভেবে অধ্যাপকসাহেবও তার এই ভাগ্নেকে এখানে বেশি সময় ধরে রাখতে চাইতেন না। তাই, লালভাই যখন স্বহস্তে বস্তা খুলে তাকে ওইসব রক্তমাখা শাড়ি-কাপড় ও সালোয়ার-কামিজ দেখালো তখন সে এগুলো কার—তা শনাক্ত করতে পারলো না। এতে আমরা দারুণভাবে আশাহত হলাম।
 
এতে লালভাই কোনোপ্রকার মনখারাপ না করে সবশেষে রায়হানকে রক্তমাখা ‘রাইফেল রোটি আওরত’ বইটি দেখিয়ে বললেন, “এটা কি চিনতে পারছো?”
বইটা দেখেই রায়হান প্রায় লাফিয়ে উঠে বললো, “হ্যাঁ, এটা তো মামার বই। আর বইটা মামার খুব প্রিয় ছিল। তিনি এটা বারবার পড়তেন। কিন্তু আপনারা এটা পেলেন কোত্থেকে?”
লালভাই একটু হেসে বললেন, “সেসব পরে জানবে। তদন্তের স্বার্থে এখন এসব না জানাই ভালো।”
একথা শুনে রায়হান চুপ করে রইলো। আর চা-পান করতে লাগলো।
 
চা-পান শেষে লালভাই রায়হানকে বিদায় জানালেন। তবে তাকে বলে দিয়েছেন, সে যেন তার বর্তমান ঠিকানা অন্যকোনো বন্ধুবান্ধব কিংবা পরিচিতজন কাউকে না জানায়। আর ধামরাই-থানার ওসি গোলাম মওলা কোনো কৌশলে তাকে কাছে ডাকলেও সে যেন তাতে সাড়া কিংবা তার অন্য যেকোনো ফাঁদে পা না দেয়। এব্যাপারে রায়হান সম্মত হয়েছে।
 
রায়হান চলে যাওয়ার পর লালভাই আবার ঘরময় পায়চারী শুরু করলেন। আর ইঙ্গিত করলেন আমাকে আবার কাগজ-কলম নিয়ে বসার জন্য। আমি তৈরি হয়ে গেলাম। আমার ডানদিকে বসা আতিক ভাই এই খুনের কেসটা নিয়ে পত্রিকায় আর-কোনো নতুন কিছু বের হয়েছে কিনা তা আজকের কয়েকটি ভালোমানের দৈনিক পত্রিকা ঘেঁটে-ঘেঁটে দেখছেন। আতিক ভাই এই কাজটি বেশ নিষ্ঠার সঙ্গে করে থাকেন।
লালভাইয়ের নির্দেশে আমি দ্রুত লিখতে শুরু করলাম:
গোরস্থান থেকে প্রাপ্ত দুই মহিলার পোশাকের মধ্য থেকে অন্তত একজন মহিলার কাপড়চোপড় শনাক্ত করতে হবে। এই খুনের সঙ্গে কারও-কারও ব্যক্তিগত লোভ ও লাভের হিসাবনিকাশ রয়েছে। পুরুষ খুনীটার নেতৃত্বে এই খুনটা সংঘটিত হয়েছে। এর সঙ্গে কোনো-একজন মহিলার পরকীয়াপ্রেম জড়িত থাকতে পারে। তবে অধ্যাপকসাহেব নিরীহ ও ভালোমানুষ। আর এই ভালোমানুষির সুযোগ গ্রহণ করেছে খুনীচক্র। আর খুনীরা পুলিশের সহায়তায় তাড়াহুড়া করে নিহত ব্যক্তির লাশের ময়নাতদন্তসহ তা অতিদ্রুত দাফন করার মধ্য দিয়ে নিজেদের অসহায়ত্ব প্রকাশ করেছে। আগামীকাল এই বিষয়গুলোর ওপর আমাদের খুব জোর দিতে হবে। আশেপাশের লোকজনের সাক্ষাৎকার নিতে হবে। আর সবশেষে সঠিক সিদ্ধান্ত।
 
তারপর তিনি পায়চারী থামিয়ে সোফায় বসলেন। আর আমাদের আগামীকালের পরিকল্পনা বুঝিয়ে দিলেন। আতিক ভাইকেও নির্ধারণ করে দিলেন তার পোশাক। আমারটাও ঠিক করে দিলেন। আর ঠিক করে নিলেন নিজেরটাও।
 
আজকের রাতে আমি ভিতরে-ভিতরে দারুণ একটা উত্তেজনা অনুভব করতে লাগলাম। আমার মনোভাব বুঝতে পেরে লালভাই হেসে বললেন, “তুই আজকের রাতটা আমার এখানেই থেকে যা। আর কম্পিউটার অন করাই আছে তুই এখন আমাদের পত্রিকার কাজে লেগে পড়। আমি একটু বই পড়বো। কথা শেষ করেই তিনি বই পড়ায় নিমগ্ন হলেন।
আতিক ভাই পত্রিকার খোঁজখবর শেষ করে আমাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বাসায় চলে গেলেন। কিন্তু রাতে আমার কিছুতেই ঘুম আসছিল না। কখন, কীভাবে খুনীরা ধরা পড়বে তা-ই শুধু ভাবছিলাম। আরও ভাবছিলাম কখন সকাল হবে? 
 

(চলবে)


সাইয়িদ রফিকুল হক
মিরপুর, ঢাকা, বাংলাদেশ।
০৫/০২/২০১৯

ছবি
সেকশনঃ গল্প
লিখেছেনঃ সাইয়িদ রফিকুল হক১ তারিখঃ 08/02/2019 11:05 PM
সর্বমোট 2402 বার পঠিত
ফেসবুকের মাধ্যমে কমেন্ট করুণ

সার্চ