ব্যাকগ্রাউন্ড

ফেইসবুকে!

গোয়েন্দা-গল্প: গোয়েন্দা লালভাই: অধ্যাপক-খুনের রহস্য (দ্বিতীয় পর্ব)






































গোয়েন্দা-গল্প: গোয়েন্দা লালভাই
অধ্যাপক-খুনের রহস্য (দ্বিতীয় পর্ব)
সাইয়িদ রফিকুল হক

 
 
আতিক ভাইয়ের হঠাৎ চিৎকার শুনে আমরা দুই ভাই প্রায় একদৌড়ে তার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। অবশ্য লালভাই আমার কিছুটা আগেই সেখানে পৌঁছে গিয়েছেন। তিনি একসময় দৌড়ে চ্যাম্পিয়ন ছিলেন। এখনও আমি তার সঙ্গে দৌড়ে পারি না। ঘটনাস্থলের কাছে গিয়ে আমাদের দুজনেরও চোখ ছানাবড়া!
দেখি, এখানকার ঘন জঙ্গলের মধ্যে একটা বড়সড় রক্তমাখা কাপড়ের পুতুল পড়ে রয়েছে। হঠাৎ দেখলে মনে হবে, একটা ছোট শিশুর মৃতদেহ যেন পড়ে রয়েছে! আর তার পাশে একটা মাঝারি আকৃতির বস্তার মধ্যে আরও কিছু জিনিসপত্র দেখা যাচ্ছে। রক্তের গন্ধে হয়তো শিয়ালগুলো গতরাতে বস্তাটা কামড়ে ছিঁড়ে ফেলেছে। তাই, কিছু-কিছু জিনিস সেখান থেকে বেরিয়ে পড়েছে।
একটু দূর থেকে বস্তার ভিতরে আমরা মেয়েলি কিছু কাপড়চোপড়ও দেখতে পেলাম। আমরা সবাই কিছুক্ষণের জন্য এতসব জিনিসপত্র দেখছিলাম, আর নিজেদের মধ্যে মুখ-চাওয়াচাওয়ি করছিলাম। আমরা যেন ঘটনা দেখে হতবিহ্বল।
একটু পরে লালভাই আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “এসব দেখে তো মনে হচ্ছে ভয়ংকর আলামত। খুব সাবধানে উপরে তুলে আন তো। আর দেখিস, সামনে খুব ঘন জঙ্গল। সাপ-পোকামাকড়ও থাকতে পারে। সেদিকেও একটু খেয়াল রাখিস।”
একথা শুনে আমি একটু সাবধানই হলাম। তবে এসময় পিছন থেকে আতিক ভাই অভয় দিয়ে বললেন, “এখন তো শীতকাল! ভয়ের তেমনকিছু নাই।”
লালভাই তবুও বললেন, “ঢাকায় যে শীত পড়ে! তাই, সাবধানে থাকা ভালো।”
আমি খুব সাবধানে কিছুটা ঢালু পথ বেয়ে নিচে নেমে এসেছি। আর ততক্ষণে আতিক ভাইও আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। আমার সঙ্গে তিনিও কাজে হাত লাগালেন। আমরা সবকিছু উপরে টেনে তুলে দেখি—তা কমপক্ষে আট-দশ কেজি হবে!
লালভাই তার পকেট থেকে তিনটা কালো কাপড়ের ব্যাগ বের করে আমার হাতে তুলে দিয়ে বললেন, “এগুলো তাড়াতাড়ি তিনটা ব্যাগে ভাগ করে ভরে ফেল। আর সঙ্গের বস্তাটাসহ। এখানে দেখাদেখির কোনোকিছু নাই। সবকিছু চোখ বন্ধ করে ব্যাগে ভরে ফেল। তারপর বাসায় নিয়ে ধীরেসুস্থে সবকিছু দেখা যাবে।”
আমি আর আতিক ভাই তা-ই করতে লাগলাম। ইত্যবসরে লালভাই চারপাশটা আরও ভালোভাবে দেখতে লাগলেন। তিনি হয়তো আরও কিছু খুঁজছেন। কিন্তু আর কোনোকিছু না পেয়ে একটু পরে তিনি ফিরে এলেন আমাদের কাছে।
লালভাইয়ের নির্দেশে আমরা কোনোকিছু না-দেখে দ্রুত সবকিছু তিনটা ব্যাগে ভরে ফেললাম। তারপর তিনজনে তা তুলে নিলাম হাতে।
এখানে একটা কথা বলে রাখি: আমাদের লালভাইয়ের সঙ্গে সবসময় রশি, ব্যাগ, ছুরি, কাঁচি, টর্চলাইট, ম্যাগনিফাইং গ্লাস, প্রাইভেট ডিটেকটিভের ব্যক্তিগত পরিচয়পত্র ইত্যাদি থাকে। তিনি গায়ে যে পোশাকআশাকই ব্যবহার করেন না কেন তারউপরে কৌশলগত কারণে সবসময় অফ-হোয়াইট কালারের একটা সুতি-কাপড়ের হাফ-জ্যাকেট পরিধান করে থাকেন। অনেকটা সাংবাদিকদের জ্যাকেটের মতো। এতে অনেক পকেট! কাজের সুবিধার জন্য আমাদের লালভাই সবসময় এমনটি করে থাকেন। লালভাইয়ের এই বিশেষ জ্যাকেটে ভিতরে-বাইরে মিলিয়ে কমপক্ষে ত্রিশটা পকেট আছে। আর এই একইরকম জ্যাকেট আছে তার তিনটি। অফ-হোয়াইট কালারের দুইটি আর কালো-রঙের একটি। অফ-হোয়াইট কালারের জ্যাকেট তিনি শুধু দিনের বেলা পরিধান করেন। আর রাতের বেলা সবসময় পরিধান করেন কালো-রঙেরটি। আবার শীতকালে তিনি মাঝে-মাঝে কালো-রঙের হাঁটুপর্যন্ত লম্বা ওভারকোটও গায়ে দেন। তখন তাকে পৃথিবীর দ্বিতীয় শার্লক হোমস বলে মনে হয়।
 
দুপুরের খাঁ-খাঁ রোদে চারদিকটায় এখন মানুষজন খুবই কম। তবুও আমাদের লালভাই বারবার চারিদিকে সতর্কতার সঙ্গে তাকাতে লাগলেন। শেষে বললেন, “আমাদের, এই জায়গাটা দ্রুত ত্যাগ করতে হবে। এখন আমাদের হাতে অধ্যাপক-খুনের এমনকিছু আলামত এসে গেছে যে—তাতে আমরা খুনীদের টার্গেটে পরিণত হতে পারি। আর কালবিলম্ব নয়। চলো সবাই। এখান থেকে আমাদের এখনই সটকে পড়তে হবে। আমি নিশ্চিত যে, খুনীরা ইতোমধ্যে আমাদের পিছনে লেগে গেছে।”
 
তার কথা শুনে হঠাৎ আমি খুব ভয় পেয়ে গেলাম। বুকটা দুরু-দুরু করতে লাগলো আমার। এমনিতে একটু আগে ওই মহিলার হাবভাব আমার মোটেও ভালো লাগেনি। ওসিসাহেবের আচরণও কেমন যেন সন্দেহজনক! লালভাই কী ভাবছেন কে জানে!
গোরস্থান থেকে আমরা তিনজন একসঙ্গে বেরিয়ে এলাম। তারপর বাসায় ফেরার জন্য মনোযোগ দিয়ে হাঁটতে লাগলাম।
 
আমরা তিনজন পাশাপাশি হাঁটছি। এমন সময় ঘটলো একটা বিপত্তি। একটা আঠারো-উনিশ বছরের ছেলে দ্রুতবেগে সাইকেল চালিয়ে আমাদের সামনে একটা চিঠি ফেলে মুহূর্তের মধ্যে যেন কোথায় হাওয়া হয়ে গেল! আমরা পিছনফিরে তাকে ভালোভাবে দেখার কোনো সুযোগই পেলাম না। আর সে এত দ্রুতগতিতে সাইকেল চালিয়েছে যে, তাকে ধরা তো দূরে কথা—তার ছায়াটুকু পর্যন্ত একনজরের বেশি আমরা কেউই দেখতে পাইনি!
ঘটনার আকস্মিকতায় আমরা একেবারে তাজ্জব বনে গিয়েছি। ছেলেটা যেন ঝড়ের গতিতে এসেছিল! আবার চলেও গেছে তদপেক্ষা বেশি গতিতে! সে যেন কোনো সাক্ষাৎ শয়তানের দূত!
আমাদের বুঝতে বিলম্ব হলো না যে, খুনীরা সবকিছু ধামাচাপা দিতে এখনও খুব সক্রিয়। আর অচেনা আগুন্তুকের এই ঝটিকা আগমনে কিছুটা হতবাক হয়েও লালভাই আমাদের দুজনের দিকে তাকিয়ে খুব আস্তে-আস্তে বললেন, “এই কেসে সবেমাত্র বিপদের সূচনা হলো। সামনে আরও কী যে আছে—তা কে জানে!”
কথাটা শেষ করে তিনি একটুখানি হাসলেন। তবে তিনি খুব সাহসীমানুষ। ভয়ডর কখনো তাকে স্পর্শ করতে পারে না। তার পূর্বপুরুষেরা ১৯৭১ সালে, এই দেশের স্বাধীনতার জন্য প্রাণপণ মুক্তিযুদ্ধ করেছেন। তিনি তো তাঁদেরই প্রকৃত উত্তরাধিকারী। আসলে, আমাদের গোয়েন্দা লালভাই একজন নবপ্রজন্মের মুক্তিযোদ্ধা।
 
লালভাই চিঠিটা মাটি থেকে তুলে আমার হাতে দেওয়ার আগে নিজে একবার পড়ে নিলেন। তারপর আমার দিকে চেয়ে বললেন, “এবার তুই এটা জোরে-জোরে পড়।”
আগেরবার, লালভাই পড়ার সময় আমি একফাঁকে চিঠির একটু দেখতে পেয়েছিলাম। এবার পুরা চিঠিটা হাতে পেয়ে আমি দারুণভাবে শিহরিত। আর এই শিহরণ ভয়ের না রোমাঞ্চকর—তা আমি জানি না।
হাতে লেখা সাদামাটা একটা চিঠি। কিন্তু হুমকিতে ভরপুর!
 
আমি সরবে চিঠিটা পড়তে লাগলাম:
 
শোন শালা গোয়েন্দার বাচ্চা গোয়েন্দা,
 
এখানে বেশি গোয়েন্দাগিরি করবি না। ভালো চাইলে তোরা তাড়াতাড়ি এখান থেকে পালিয়ে যা। আর এই বাড়ির সামনে তোদের যেন আর কখনো না-দেখি। আর গোরস্থান থেকে যে-সব জিনিসপত্র চুরি করেছিস তা যথাস্থানে রেখে আয়। নইলে, সামনে তোদের ভীষণ বিপদ। গুলিতে তোদের বুক ঝাঁঝরা করে দেবো। জান বাঁচাতে চাইলে তিনজনের হাতের সব জিনিস ফেলে রেখে খুব তাড়াতাড়ি পালা এখান থেকে। যা, এখনই পালিয়ে যা।
 
ইতি
তোদের যম
 
এত বিপদের মধ্যেও লালভাই খুব শান্তভাবে আমাদের দিকে চেয়ে বললেন, “ব্যাপারটা বুঝলে? আমাদের হাতে খুনীদের সবকিছু এসে গেছে। ওরা এখন খুব বেপরোয়া। আমাদের খুব সাবধানে থাকতে হবে। প্রয়োজনে ওরা আমাদের হাতের জিনিসপত্র ছিনিয়ে নেওয়ারও চেষ্টা করতে পারে। তাই, এখন থেকেই সবাই সাবধান হও।”  
একথা শোনার পর আতিক ভাই তার ছোট ব্যাগটা আমার হাতে দিয়ে বললেন, “এটা তুমি রাখো। আমাকে খালি হাতে থাকতে দাও। যাতে কেউ ধারে-কাছে আসামাত্র দুই-একটাকে খালি হাতেই ঘায়েল করতে পারি।”
লালভাই বললেন, “তোমার বুদ্ধিটা খুব ভালো হয়েছে। হুমকি দিয়ে ওরা কিন্তু বসে থাকবে না। এতসব আলামত আমাদের হাতে এসে পড়ায় ওদের এখন মাথা খারাপ। তার মানে, গোরস্থানেও কেউ আমাদের ওপর সার্বক্ষণিক নজর রেখেছিল। আর আমরা এখনও ওদের নজরদারিতে। ওদের এই নজরদারির শৃঙ্খলা ভেঙে আমাদের বেরিয়ে যেতে হবে।”
কথা শেষ করে তিনি আমাদের দিকে চেয়ে পুনরায় বললেন, “একটা রিক্সাভ্যান পেলে ভালো হতো। দ্রুত আমাদের বাসস্ট্যান্ডে যেতে হবে। এখানে থাকাটা আমাদের জন্য আর একমুহূর্তও নিরাপদ নয়। হেঁটে যাওয়ায় রিস্ক আছে। এতে বিলম্ব হবে। ওদের সেই সুযোগটা দেওয়া যাবে না। আর ওদের চিঠির ভাষা দেখেছো? একেবারে মাস্তানি ভাষা। ওরা যেকোনো খারাপ কাজ করতে পারে। তাই, আমাদের এখনই আরও সাবধান হতে হবে।”
আতিক ভাই হাঁটার ফাঁকে-ফাঁকে বলতে লাগলেন, “এসব ঘটনা থানায়ও জানানো যাবে না। তার কারণ, ওসি আমাদের সঙ্গে একবার কথা বলারও প্রয়োজন মনে করলো না। তাই, যা করার আমাদেরই বুঝেশুনে করতে হবে। আর ভয় পেলে চলবে না।”
তারপর তিনি লালভাইয়ের দিকে চেয়ে বললেন, “ভয়ের কিছু নাই। আমি তোমার সঙ্গে আছি প্রোফেসর।”
আতিক ভাইয়ের কথায় মাথা ঝুঁকে আমিও সম্মতি জানালাম।
বলতে-না-বলতে আমরা একটা রিক্সাভ্যান পেয়ে গেলাম। তিনজনে প্রায় লাফিয়ে উঠে পড়লাম এতে। কোনোরকম ভাড়া না মিটিয়েই এতে উঠেছি আমরা। ভাড়া মিটানোর মতো সময় আমাদের হাতে এখন নাই।
ভ্যানচালককে একটু জোরে ভ্যান চালাতে বললেন লালভাই। তার কথা শুনে আতিক ভাই চারিদিকে সতর্কদৃষ্টিতে বারবার চোখ বুলাতে লাগলেন। আর আমি ভ্যানের মাঝখানে তিনটি ব্যাগ আগলিয়ে বসে রয়েছি। এগুলো কিছুতেই হাতছাড়া করা যাবে না।
আমার এখন ভয়-ভয় লাগছে। তবে গা-কাঁপছে না। আবার কেমন যেন একটা উত্তেজনাও অনুভব করছি।
লালভাই শুধু একবার বললেন, “আমাদের রিভলবার দুটো সঙ্গে আনা উচিত ছিল।”
আতিক ভাই মনখারাপ করে বললেন, “ঠিক তা-ই। খুব ভুল হয়ে গিয়েছে। আমি ভেবেছিলাম, তোমারটা তো সঙ্গে রয়েছে।”
লালভাই এই বিপদের মধ্যেও একটু হেসে বললেন, “আর আমি ভেবেছি, তোমারটা বুঝি সঙ্গে আছে।”
এসব কথাবার্তা শুনে আমার সতর্কতাও একটু বেড়ে গেল।
 
রাস্তার পাশে দুটো লাঠি পড়ে ছিল। লালভাই ভ্যানচালককে একটু থামতে বললেন। তারপর লাঠি দুটো দ্রুত কুড়িয়ে এনে একটা নিজে রাখলেন। আরেকটি তুলে দিলেন আমাদের বডিবিল্ডার আতিক ভাইয়ের হাতে। ছ’ফুট উচ্চতার আতিক ভাই লাঠিটা শক্তভাবে কৌশলে হাতে ধরে রাখলেন। এবার আমার মনে সাহস ফিরে আসতে লাগলো। তবুও তো আত্মরক্ষার জন্য আমরা কিছু-একটা জোগাড় করতে পেরেছি।
বড় রাস্তায় উঠার একটু আগে দেখি দুটো মোটর সাইকেল দ্রুতগতিতে আমাদের ভ্যানের কাছে এগিয়ে আসছে। দুটো মোটর সাইকেলে দুজন করে মোট চারজন মানুষ রয়েছে। ওদের হাবভাব যে ভালো নয়—তা দেখেই বুঝা যাচ্ছে। প্রত্যেকের মাথায় কালো হেলমেট থাকায় এদের কাউকে পুরাপুরি চেনার বা দেখার কোনো উপায় নাই। শুধু এদের চোখ দুটো দেখা যায়।
 
মোটর সাইকেল আরোহীরা আমাদের ভ্যানের কাছে এগিয়ে এসে আমার হাত থেকে ব্যাগগুলো ছিনিয়ে নেওয়ার মতলব করছে। ওরা কাছাকাছি আসতেই লালভাই নিজে পুরা প্রস্তুত হয়ে আতিক ভাইকে ইশারা করতেই তিনি এগুতে থাকা বামদিকের হোন্ডারোহীর কোমরে সজোরে একটা ঘা বসিয়ে দিলেন। আর ডানদিকেরটাকে আঘাত করলেন লালভাই। সঙ্গে সঙ্গে দুদিক থেকে রাস্তার দুপাশে ছিটকে পড়ে গেল হোন্ডারোহীরা। ওদের উঠতে এবার কিছুটা সময় লাগবে।
 
লালভাই এই সুযোগে আমাদের ভ্যানচালককে আরও স্পিড বাড়িয়ে দিতে বললেন। ছেলেটা তা-ই করলো। আর দেখলাম, আমাদের ভ্যানচালক ছেলেটা সাহসী। সে ভীতুপ্রকৃতির নয়।
হোন্ডারোহীরা পড়ে গিয়েও পড়িমড়ি করে উঠে আমাদের দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করছে। এসব দেখে লালভাই আরও সতর্ক হয়ে আমাকে ব্যাগ তিনটা আরও শক্তভাবে ধরে রাখতে বললেন। আমি আল্লাহর নামে তা-ই করতে লাগলাম। তবে এইসময় আমরা বড় রাস্তার কাছাকাছি এসে পড়েছি।
 
হোন্ডারোহী-সন্ত্রাসীদলের একটা ছেলে কোমরে হাত দিয়েছে। তা দেখে লালভাই বললেন, “ওরা পিস্তল কিংবা রিভলবার থেকে গুলি চালালে আমরা সঙ্গে-সঙ্গে ভ্যানে কাত হয়ে শুয়ে পড়বো। কিন্তু ছেলেগুলো তা আর করলো না। হয়তো এখনও ওদের সেরকম কোনো নির্দেশ দেওয়া হয়নি। কিন্তু পোটলাগুলো ওদের হাতছাড়া হয়ে যাওয়ায় ওরা যে ভীষণভাবে মর্মাহত—তা ওদের চেহারা ও আচরণ দেখেই বুঝা গেল। এখন আমাদের মুখে বিজয়ীর হাসি।
 
বাকি রাস্তাটুকুতে আমাদের আর কোনো বিপদাপদ হলো না। আমরা দুই-তিন মিনিটের মধ্যে বড় রাস্তায় উঠে এলাম।
ভ্যানচালককে আমি দ্রুত ভাড়া মিটিয়ে দিয়েছি। এই কাজটা সবসময় আমার ওপর ন্যস্ত থাকে। আজও তার ব্যত্যয় ঘটেনি।
বাসস্ট্যান্ডে আসার পর লালভাই আমার হাত থেকে ব্যাগ তিনটা নিজের হাতে নিয়ে বললেন, “এসো, তাড়াতাড়ি একটা বাসে উঠি। আমরা দ্রুত একটা বাসে উঠলাম। সাভারে পৌঁছুতে এখন আমাদের আর বেশি সময় লাগবে না।”
 
গাড়িতে উঠেও আমাদের মধ্যে সতর্কভাব বজায় রইলো। এতক্ষণে আমরা বুঝে গিয়েছি যে, আমাদের প্রতিপক্ষ যেকোনোমূল্যে আমাদের নিকট থেকে গোরস্থানে প্রাপ্ত যাবতীয় আলামত ছিনিয়ে নিতে চাইছে। আর ওরা হয়তো তাড়াহুড়া করে অধ্যাপক-খুনের সমস্ত আলামত গোরস্থানে এনে ফেলেছিল। কিন্তু এখন শীতকাল হওয়ায় একদিনে তা আগের মতো অক্ষত রয়েছে। বর্ষাকাল হলে হয়তো রাতের বৃষ্টিতে সকল আলামত ধুয়েমুছে সাফ হয়ে যেত। কিন্তু সৌভাগ্য আমাদের আর দুর্ভাগ্য ওদের।
 
ওরা যে মাথামোটা-লোক তা আমরা বুঝতে পেরেছি। তবে ওরা যে এখন ভয়ংকর হিংস্র হয়ে উঠেছে—তারও আমরা হাতেনাতে প্রমাণ পাচ্ছি। সামনের দিনগুলোতে আমাদের লালভাইকে আরও সতর্ক থাকতে হবে। তার চিন্তায় আমি বিচলিত হয়ে পড়লাম। তিনি হয়তো আমার মনোভাব বুঝতে পেরে কয়েকবার আমার দিকে তাকালেন আর শেষে বললেন, “ভাবনার কিছু নাই। গোয়েন্দাদের জীবনে এমন সব ঘটতেই থাকবে। আর এসব মোকাবেলা করেই আমাদের টিকে থাকতে হবে। অবশ্য আমাদের একটা বড় ভুল হয়ে গিয়েছে সঙ্গে অন্তত একটা রিভলবার না রেখে।”
 
লালভাই বাসে উঠে এতক্ষণ কী যেন ভাবছিলেন। এই প্রথম তিনি মুখ খুললেন। তারপর তিনি আবার আগের মতো চুপচাপ বসে রইলেন। তিনি সামনের সিটে একজন লোকের সঙ্গে বসেছেন। আর, আমি আর আতিক ভাই বসেছি তার পিছনে পাশাপাশি দুই সিটে। আমরা নিজেদের মধ্যে আলাপআলোচনা চালাচ্ছিলাম।
 
আতিক ভাই বললেন, “আজ থেকে আমাদের অনলাইন দৈনিক পত্রিকা ‘দৈনিক সত্যবাণী’ আবার চালু করবো। এতদিন পত্রিকাটা আলসেমি করে ফেলে রেখেছিলাম। এইসব অপরাধীকে শায়েস্তা করতে হলে আমাদের নিজস্ব একটা দৈনিক পত্রিকা হাতে থাকা ভালো।”
তারপর তিনি একটু থেমে আমার দিকে তাকিয়ে আবার বলতে লাগলেন, “ভাবছি, আমি এর সম্পাদক হিসাবে থাকবো। কারণ, তোমার ভাইয়ের তো সময় নাই। আর তুমি হবে এর একমাত্র সহকারী সম্পাদক। আজ থেকেই আমি তোমাকে এই পদে নিয়োগ করলাম। আসলে, পত্রিকাটা এখন থেকে তুমিই চালাবে। আমরা দুজন শুধু অভিভাবক হয়ে তোমার উপরে থাকবো।”
কথাটা শুনে আমি যেন তাজ্জব হয়ে গেলাম। হঠাৎ এতবড় একটা দায়িত্ব! আমার যেন নিজের কানকে বিশ্বাস হচ্ছিলো না। তার কারণ, আমাদের আতিক ভাইয়ের সম্পাদিত অনলাইনভিত্তিক দৈনিক সত্যবাণী পত্রিকাটা ঢাকা-শহরে ভালো একটা ইমেজসৃষ্টি করতে পেরেছে। আর আমি হবো সেই পত্রিকার একজন সহকারী সম্পাদক! অবশ্য আমি ইতঃপূর্বে দুই-একটি পত্রিকায় সংবাদকর্মী হিসাবে কাজ করেছি। তবুও...।
আতিক ভাই ধীরে ধীরে আরও বললেন, “তুমি হয়তো ভাবছো, তুমি এতবড় দায়িত্বপালন করতে পারবে না। আসলে, তা নয়। আমার মন বলছে, তুমি পারবে। আর তোমাকে পারতেই হবে।”
তার উৎসাহে আমি একটু হেসে অবশেষে বললাম, “পারবো ভাই, আপনারা পাশে থাকলে পারবো, ইনশা আল্লাহ।”
হঠাৎ লালভাই সামনে থেকে বললেন, “তোকে পারতেই হবে।”
সামনে থেকে লালভাই যে আমাদের সব শুনেছেন—তা বুঝতে পেরে আমরা দুজনে অবাক হলাম।
তিনি আমাদের মনোভাব বুঝতে পেরে বললেন, “তোমরা হয়তো ভাবছো, আমি তোমাদের এত আস্তে বলা কথা কীভাবে শুনলাম! আরে, এইজন্যেইতো আমরা গোয়েন্দা। আমাদের নার্ভগুলো অন্য সবার চেয়ে একটু আলাদা।” বলে তিনি হাসতে লাগলেন।
লালভাই যখন আমাকে খুব বেশি স্নেহ করেন তখন তুই বলে সম্বোধন করেন। আর যখন তার স্বাভাবিক স্নেহ থাকে কিংবা লোকজনের সামনে তিনি আমাকে তুমি বলেই সম্বোধন করে থাকেন।
বাসের একটা লোক আমাদের পাশের সিট থেকে নেমে গেলে লালভাই তার জায়গায় এসে আমাদের পাশাপাশি বসলেন। আর বললেন, “আতিকের ধারণা-ভাবনা যাই বলি না কেন—তা একেবারে সঠিক। সমাজবিরোধী-অপরাধীদের শায়েস্তা করার জন্য আমাদের নিজের একটা দৈনিক পত্রিকা থাকা জরুরি। দেশে অনেক দৈনিক আছে। কিন্তু এদের বেশিরভাগই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে দেশবিরোধী-শয়তানী অপকর্মে নিয়োজিত। এজাতীয় শয়তানদের সংবাদ ও যাবতীয় নিউজসমূহ জনমনে বিভ্রান্তি ছড়াতে পারে। আর কোনো-কোনোক্ষেত্রে তা ছড়াচ্ছেও। এদের এই অপতৎপরতার বিরুদ্ধে আমাদের দৈনিক সত্যবাণী রাষ্ট্র ও সমাজকে রক্ষা করতে পারবে বলে আমি মনে করি। তাই, তুই আজ থেকেই কাজে লেগে যা।”
আমি এবার ভিতরে-ভিতরে মানসিক প্রস্তুতিগ্রহণ করতে লাগলাম।
একটু পরে আমার দিকে চেয়ে লালভাই আবার বললেন, “তুই তো ইতিহাসে অনার্স ও এমএ ডিগ্রী অর্জন করেছিস। তারপর নিয়মিত বাংলা ও ইংরেজি সাহিত্য অধ্যয়ন করছিস। তোকে দিয়ে এ-কাজ হবে। আর তা হতেই হবে।”
লালভাইয়ের এই উৎসাহে ও সমর্থনে আমার মনোবল আরও বেড়ে গেল। আমিও মনে মনে শপথ নিলাম: আজ থেকে নতুনভাবে ‘দৈনিক সত্যবাণী’ গড়ে তোলার প্রচেষ্টা চালাবো।
আতিক ভাই আমার দিকে চেয়ে হেসে বললেন, “সাজিদ মনে হয় একটা কথা জানো না!”
আমি একটু অবাক হয়ে বললাম, “কী?”
তিনি বললেন, “আমাদের এই পত্রিকার মালিক কিন্তু তোমার লালভাই।”
সত্যি, এবার আমি দারুণভাবে উত্তেজিত ও বিস্মিত। একথা আমার আগে কখনো জানা ছিল না।
আর একথা শুনে আমাদের লালভাই হেসে বললেন, “মালিক হলেও পত্রিকাটা এবার চালাতে হবে তোমাদের।”
 
আমরা নিরাপদেই সাভার বাসস্ট্যান্ডে এসে নামতে পারলাম। পথে আমাদের ওপর আর কোনো হামলার প্রস্তুতি কেউ করেছিল কিনা তা জানতে না পারলেও একপ্রকার স্বস্তিতে আমরা এখন বাসায় ফিরে যাচ্ছি। তবে এখনও সতর্কতার কোনো ঘাটতি নাই। আমাদের চোখকান সবসময় খোলা রয়েছে। আমরা যে বিশ্ববিখ্যাত গোয়েন্দা তথা গোয়েন্দাসম্রাট শার্লক হোমসের উত্তরসূরী।
 
গোরস্থান থেকে প্রাপ্ত সমস্ত আলামত দেখার জন্য আমাদের সবার মন ছটফট করছে। তাই, আমরা যে যার বাসায় না গিয়ে লালভাইয়ের বাসায় একত্রিত হলাম। কিন্তু ব্যাগ খোলার মতো ইচ্ছে থাকলেও সামর্থ্য কারও নাই। কারণ, ক্ষুধায় আমাদের পেটের ভিতরে কেমন যেন করছে! আমরা হাত-মুখ ধুয়ে তাই আগে খেতে বসলাম।
 
 
(চলবে)
 
 
সাইয়িদ রফিকুল হক
মিরপুর, ঢাকা, বাংলাদেশ।
২৫/০১/২০১৯
 
 

ছবি
সেকশনঃ গল্প
লিখেছেনঃ সাইয়িদ রফিকুল হক১ তারিখঃ 01/02/2019 08:44 PM
সর্বমোট 890 বার পঠিত
ফেসবুকের মাধ্যমে কমেন্ট করুণ

সার্চ