ব্যাকগ্রাউন্ড

ফেইসবুকে!

একজন মানুষের গল্প এবং সংসার

এক

শুরুটা ১৯৯৩ র মাঝামাঝিতে ।অঁজোপাড়া গাঁয়ের একজন রাজনৈতিক ও সমাজ সচেতন ছেলে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শেষ করে পেশাগত শিক্ষার মাঝপথে চাকরীতে ঢুকে। সংসার জীবন নিয়ে তার খুব একটা আগ্রহ ছিল না। এক বন্ধুর কথায় বিগরে যায়। বন্ধু বলেছিল” প্রতিষ্ঠার পর সংসার করলে প্রতিষ্ঠা হবে আর কিছু হবে না”। ঝোঁকের বসে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার আগেই সংসার জীবনে পা বাড়ায়। বর কনে দুজনেই গ্রামের। প্রথম দিকে বুঝতে না পারলেও পরবর্তীতে জানা যায়, কনের পরিবার অসম্ভব রক্ষণশীল এবং ধর্মান্ধ ও তথাকথিত গুরু ভক্ত। রক্ষণশীল পরিবার হলে পরিবারের সদস্যদের স্বাধীনতা কম থাকে। বিশেষ করে বাঙ্গালী সমাজে মেয়েদের। আধুনিক পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়াতে তাদের কষ্ট হয়।মেয়েদের পড়ালেখায় বিধিনিষেধ চলে আসে। দৃশ্যমান মেধাবী না হলে সুপ্ত মেধা অবহেলার শিকার হয়। উচ্চ শিক্ষা বাধাগ্রস্থ হয় এবং হারিয়ে যায় সুপ্ত মেয়েটি শিক্ষকতা করে। শশুর মানে মেয়ের বাবার আবদার মেয়ে শিক্ষকতা চালিয়ে যাবে, প্রয়োজনে মাঝে মাঝে শহরে যাবে। ছেলেটি প্রতাপশালী শশুরকে বলেই ফেলল। বিয়ের পর যদি ম্যাচ করে থাকতে হয় তবে বিয়ের কি দরকার ছিল।আর স্কুলের চাকরীতে আটকে থাকাটা ছেলেটার পছন্দের বাইরে।স্বপ্ন তার বহুদুর্। যা একটা রক্ষণশীল পরিবারে থেকে কল্পনা করাও অসম্ভব।  ছেলেটির শশুর সুবিধা করতে না পেরে, ছেলের আয় রোজগারের দিকে নজর দেয়।তার যুক্তি বর্তমান আয় রোজগারে শহরে  সংসার কষ্টকর হবে।অন্তত কিছুদিন স্কুলের চাকরীটা চালিয়ে যাক।স্বাবলম্বী হলে দেখা যাবে।  যদিও শেষ নাগাদ শশুরের কোন যুক্তিই ধোপে টিকেনি। শুরু হয় অসম মানসিকতার দুই নর নারীর সংসার নামক জীবন যুদ্ধ।

দুই

ছেলেটির চেষ্টা তার বউকে রক্ষণশীলতার বলয় খেকে বের করে আনা। তাকে আধুনিক সমাজের সাথে খাপখাইয়ে পথ চলতে শেখানো। মেয়েটি নন মাংশাসী, এমনকি পিয়াজ রসুন ডিম এতেও অভ্যস্ত না।বাসায় মাংশ আনা বারণ। ছেলেটি তার পরোপুরি উল্টো।অসম মানসিকতার দুজন মানুষের সংসার। উল্লেখ্য বিয়েটি সংগঠিত হয়েছিল আনুষ্ঠানিকভাবে মাত্র পনের দিনের প্রস্তুতিতে।ছেলেটি ভাবতে থাকে কিভাবে মেয়েটিকে নগরজীবনের সাথে খাপখাওয়ানো যায়। ছেলেটি তার মানসিকতা যাচাই করতে থাকে। ছেলেটির একটা সুপ্ত বাসনা ছিল তার জীবন সাথী একজন আইনজীবী হবে বা না’হলে তাকে আইনজীবী হিসাবে গড়ে তুলবে। সেই অনুসারে মেয়েটির পড়া লেখায় আগ্রহ কতটুকু সেটা পরিমাপ করতে থাকে। ছেলেটি প্রাইভেট ফার্মে চাকরী করে। অফিসের নির্ধারিত কোন সময় নাই। মেয়েটি বাসায় একা থাকে। অতিরিক্ত রক্ষণশীলতার কারণে কাজের লোকের ইচ্ছা তার কম। সংসারের সব কাজ নিজে হাতে করে। ঐ সময়ের ধারণা মতে তাকে ”ল” পড়ার পরামর্শ দেয়া হয় এবং সম্মতিক্রমে সব ব্যবস্থা করে দেয়া হয় এবং বইপুষ্তক কিনে দেয়া হয়। ছেলেটির পেশাগত পড়া তখনও শেষ হয় নাই। শেষ হতে কতদিন লাগবে বা অদৌ শেষ করতে পারবে কিনা তার কোন নিশ্চয়তা নাই। উল্লেখ্য রক্ষণশীল হওয়ায় হিন্দু মালিকের বাসা দেখে ভাড়া নেয়া হয়, ছেলেটির অফিস থেকে বেশ দুরে।

তিন

তখনও তাদের ঘরে কোন সন্তান সন্ততি আসেনি।দিন চলতে থাকে। চলতে থাকে পড়ালেখা, এগুতে থাকে সংসার জীবন। এর মধ্যে মেয়েটি ‘ল” একপার্ট পাশ করে ফেলে। ছেলেটিও ফাইনাল পার্টের প্রথম পার্ট পাশ করে। মেয়েটি সেকেন্ড পার্টে ভর্তি হবে। কিছু কাগজের জন্য ঢাবির রেজিষ্ট্রার ভবনে যায়।সেখান থেকে ফিরে এসে মেয়েটি বিমর্ষ বিষন্ন। কয়েকদিন পর ছেলেটি জানতে পারল মেয়েটির ডিগ্রি সার্টিফিকেট সঠিক নয় যা কিনা মেয়েটিরও জানা ছিল না। তাকে যে কপি দেওয়া হয়েছিল তা সে সঠিক বলেই জানত। যা তাকে কলেজ থেকে দেয়া হয়েছিল।পরবর্তীতে জানা যায়, মেয়েটির বড় ভাই তার এক বন্ধুর যোগসাজসে পরিবারকে না জানিয়ে নকল সোর্টিফিকেট জোগার করে। এমনকি ফেল করার সংবাদও মেয়েটিকে এবং পরিবারকে জানায়নি।পড়ালেখার সমস্ত দায়িত্বই ছিল তার ভাইয়ের তত্ত্ববধানে। এটা একধরণের প্রতারণা। মেয়েটি অপরাধ বোধে ভুগতে থাকে। জীবন প্রবাহ থেমে যাওয়ার জোগার। সারাক্ষণ কান্নাকাটি, মুছরে যাওয়া অবস্থা। ছেলেটি তখন আরও সতর্ক। যাতে এ থেকে কোন দূর্ঘটনার সুত্রপাত না হয়। নো প্রবলেব, নো টেনশন। এটা নিয়ে কোন প্রকার টেনশন করার সুযোগ ছেলেটির নেই। সাড়াদিন অফিস। সুযোগ পেলে বেড়াতে নিয়ে যাওয়া স্বাভাবিকতায় ফিরিয়ে আনা।বন্ধুদের সাথে আড্ডা। কখনও রাজনৈতিক কখনও সামাজিক কখনওবা সাংস্কৃতিক। ততদিনে ঢাবিতে পড়ার সুযোগ শেষ। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। কোন কলেজে ভর্তি হয়ে থাকতে হবে এবং পরীক্ষার সময় পরীক্ষা।তারমানে মেয়েটি তখন  এইস এসসি পাশ।প্রতিষ্ঠা পেতে গেলে তাকে অনেক পথ পারি দিতে হবে। হয়তো এই ধাক্কটা মেয়েটির জীবনে শাপে বর হয়ে আসে। তাকে খুব দৃঢ় প্রত্যয়ী মনে হয়। ছেলেটিও সাহস জোগায় নাথিং ইমপসিবল। গু এহেড।

চার

এরই মধ্যে মেয়েটি মা এবং ছেলেটি বাবা হয়েছে। তার মানে সংসারজীবন আরোও কঠিন হওয়া শুরু হয়ে গেছে। সন্তান বড় হচ্ছে। চাহিদা বাড়ছে। বাড়ছে সাংসারিক ব্যস্ততা। নিরব যুদ্ধ চলছে মনের ভিতরে এবং বাইরে।ছেলেটি বাবা হওয়ার পর পড়ালেখার ব্যাপারে আরও সিরিয়াস। সন্তানকে একটা সন্মানজনক পরিচিতি পাইয়ে দিতে হবে স্কুলে ভর্তি হওয়ার আগেই। সাড়াদিন অফিস, সাড়া রাত পড়ালেখা। পরীক্ষার সময় বাসা ছেড়ে হোটেলে থাকা। গ্রুপে পড়ালেখা করা ব্লা ব্লা।অবশেষে ছেলেটি বর্তমানে বাবা তার কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌছতে সক্ষম হয়। মা, মেয়ে ঘরসংসার নিয়ে ব্যস্ত। স্কুল, নাচের স্কুল, অংকন স্কুল, বিভিন্ন প্রতিযোগীতা ইত্যাদি। মেয়ে আর ঘরসংসার মায়ের সব। মায়ের পড়ালেখার ফুসরত নেই।কিন্তু মনের ভেতর প্রতারণার শিকার হওয়াটা মাঝে মাঝে উঁকি দেয়।

পাঁচ

শুরু হয় ত্রিমাত্রিক যুদ্ধ। ঘরসংসার, মেয়ের দেখভাল, নিজের পড়ালেখা। সংসারে সাহায্য করার মত কেউ নেই। সবটাই নিজেকে করতে হয়। এর মধ্যে মেয়ের সমস্ত কিছু ঠিক রেখে পড়ালেখা। অসম্ভব মানসিক দৃঢ়তা না থাকলে কাজটা করা অস্ভব। মেয়ের স্কুল তাও আবার ইংলিশ মিডিয়াম, ক্লাশ, কোচিং, বিভিন্ন স্থানে নাচের অনুষ্ঠাণ এর মধ্যে  বিএ পাশ, মাস্টার্স পাশ, এলএলবি, এলএলএম, উকালতির সনদ পরীক্ষার কোচিং পরীক্ষা, মেয়ের ওলেভেলস, এলেভেলসের প্রস্তুতি সব চলতে থাকে একসাথে। চরম ব্যস্ততম জীবন। সাহায্যের জন্য শুধু একটি গাড়ীই ভরসা। বাবা সংসারের কর্মকাণ্ডে অপরাগ তার চাকরীর কারনে। তার সহযোগীতা শুধুই খরচ যোগান দেয়া। একজন মা একজন গৃহীনি কতটুকু কষ্ট করতে পারে এবং কতটুকু মানসিক দৃঢ়তা থাকলে ঘরসংসারে সামলিয়ে এতকিছু করতে পারে তা না দেখলে বিশ্বাস করা বা অনুধাবন করা মুশকিল।এটা জীবন সংগ্রাম ও সফলতার একটা দৃষ্টান্ত হতে পারে।দৈনন্দিন কর্মসূচীর মধ্যে ছিল ঘুম থেকে উঠে ঘরদোর পরীষ্কার করা > কাপঢ় ধোঁয়া > সকালের জলখাবার তৈরী করা > মেয়েকে স্কুলের জন্য তৈরী করা > মেয়েকে স্কুলে পৌছে দেয়া > দুপুরের খাবার রেডি করা > মেয়েকে স্কুল থেকে নিয়ে আসা > নিজে খেয়ে এবং মেয়েকে খাইয়ে কোচিংএ নিয়ে যাওয়া > নিজের কোচিং পড়া লেখা > সন্ধার পর বা রাতে ঘরে ফিরে রাতের খাবার তেরী করা ব্লা ব্লা এবং পরের দিনের প্রস্তুতি নেয়া। পাশাপাশি আত্মীয়স্বজনদের সমাদর, প্রয়োজনে হাসপাতাল ডাক্তার ব্লা ব্লা। (চলবে)

ছয়

মেয়ের স্কুলের পড়া শেষ এখন ইউনিভার্সিটিতে পড়ে। মা জজ কোর্ট থেকে এখন সুপ্রীম কোর্টে/ হাইকোর্টে।বাবা যথারীতি চাকরী করে। এখন পরিবারের তিন জন সদস্য স্ব স্ব কাজে ব্যস্ত। মেয়ের ইউনিভার্সিটি, মায়ের কোর্ট বাবার অফিস। সময় একেক জনের একেক রকম। কিন্তু গৃহকর্মী না থাকাতে মায়ের কাজের কমতি নেই। ঘর সংসারের কাজে বাকি দুই সদস্য মেয়ে ও বাবা আগের মতই। মায়ের কাজ যথারীতি ঘুম থেকে উঠা > ঘরদোর পরিষ্কার করা > কাপড় ধোঁয়া > সকালের খাবার বানানো > মেয়ের জন্য দুপুরের খাবার তৈরী করে যাওয়া > কোর্ট থেকে ফিরে রাতের খাবার তৈরী করা ব্লা ব্লা।

# লাইফ স্টীল ইজ বিউটিফুল, নো বোরিং, নো টেনশন, এভরি বডি আর বিজি দ্যায়ার উন বিজিনেস।এটাই সংসার জীবন। বেশ আছে ভাল আছে। ( জার্নি ১৯৯৩ খেকে ২০১৮)। পরিবর্তীত পরিস্থিতিতে এখন আর খাবার দাবারের কোন সীমাবদ্ধতা নাই বললেই চলে। মানসিকতার পরিবর্তন হয়েছে লক্ষ্যনীয় মাত্রায়। ধর্মান্ধতা পরিহার করে বউটি এখন আধুনিক মানুষ।ধর্মীয় আচার মানলেও গোরামী নেই। বৈষয়িকতায় ঝোঁক নাই বল্লেই চলে। যেমন অন্যের আছে আমার নেই, আমি কেন ভাড়া বাড়ীতে থাকব, তোমার বন্ধুদের ফ্ল্যাট বাড়ী গাড়ী আছে আমার নেই, চঙচঙা দাবী কাপড় গা ভর্তি গয়না এসবে কোন আসক্তি নেই মা-মেয়ের। কোন বাড়তি আবদারের মুখোমুখি হতে হয়নি পঁচিশ বছরেও।যখন যেমন তখন তেমন এটাই জীবন।“ Life is full of satisfaction”.

ছবি
সেকশনঃ সাধারণ পোস্ট
লিখেছেনঃ নিরব তারিখঃ 12/07/2018 06:00 PM
সর্বমোট 526 বার পঠিত
ফেসবুকের মাধ্যমে কমেন্ট করুণ

সার্চ