ব্যাকগ্রাউন্ড

ফেইসবুকে!

ডাক্তার: সরস আলোচনার শীর্ষে


প্রাকটিস বলতে যা বোঝায় তা আমি কোনোকালেই করিনি। কেন যেন হয়ে ওঠেনি। তবে কিছুদিন একটা চেম্বারে বসেছিলাম। সেও গুণে গুণে দেড় যুগ আগের কথা। সমসাময়িক কালেও কিছুদিন বসেছিলাম এবং সে অভিজ্ঞতার কথা নিয়মিত লিখে জানিয়েছি। নিজের পকেট থেকে রোগীর সেবা দিতে গিয়ে নিজেই অভাবে পড়ে প্রাকটিস ছেড়েছি। ফলে আগের অভিজ্ঞতার কথা বলি-

আমার চেম্বার ছিল মায়া কাননে। লাকি ফার্মেসি। এখনও আছে কী না জানি না। যোগ্যতা বা অভিজ্ঞতার আলোকে ‘ভাল ডাক্তার’ বলতে যা বোঝায় তা হবার সুযোগ আমার ছিল না। তবে ‘হাতযশ’ বলতে যে ‘যদি লাইগ্যা যায়’ বিষয়টি আছে সেটি বোধ হয় আমার ক্ষেত্রে খানিকটা কাজ করেছিল। আশেপাশের পুরানো ডাক্তারদের চেয়ে অজানা কারণে আমার চেম্বারটা একটু বেশিই জমতে থাকল।

চেম্বার প্রাকটিশনারদের নামে যে বদনাম ও ধারণা মানুষের মধ্যে প্রচলিত আছে আমি তা ভাঙ্গার মানসিকতা নিয়ে চেম্বারে ডাক্তারি প্রাকটিস শুরু করলাম। একই চেম্বারে অন-কলে আমার স্ত্রীও নারী রোগী দেখতে শুরু করল।

আমার হাতের লেখা কোনোকালেও ভাল ছিল না। তারপরেও আমি বহুত সাধনা করে পরিষ্কারভাবে প্রেসক্রিপশন লেখা চালিয়ে গেলাম। শুধু তাই নয়, ঔষধ লেখার পরে রোগীর হাতে প্রেসক্রিপশন ধরিয়ে দিয়ে বলতাম, “পড়ে দেখেন, সব বুঝতে পারেন কী না”। রোগী না বোঝা পর্যন্ত তাকে বোঝাতে থাকতাম।

লেখা-পড়া না জানা রোগী হলে তাকে কয়েকবার করে ঔষধ খাবার নিয়ম মুখস্থ করিয়ে দিতাম। রোগীরা তো মহাখুশী। খুশীতে গদগদ হয়ে বলে, স্যার আপনার মতো ডাক্তার হয় না। আপনি একেবারে অন্যরকম। আমিও পুলকিত বোধ করি। এমন নগদ তেল কার না ভালোলাগে!

তো, এক পর্যায়ে দেখলাম- রোগীরা আমার কাছে এসে প্রেসক্রিপশন করান এবং আমার সাহায্যে সেটা খুব ভাল করে মুখস্থ করে নেন। এক পর্যায়ে বলেন, স্যার আমি একটু আসছি, এখুনি এসে ভিজিট দিয়ে প্রেসক্রিপশনটা নিয়ে যাবো। প্রেসক্রিপশনটা রেখেই চলে যায়।

এভাবে বেশ কয়েকবার হলো, দেখলাম প্রেসক্রিপশন নিতে কেউ আর আসে না। একদিন চেম্বারের মালিক বলল, স্যার- আপনার রোগীরাতো সবাই পাশের দোকান থেকে ঔষধ কিনে নিয়ে চলে যায়। এমনে হলে তো আমার ব্যবসা শেষ।

বড় অদ্ভুত জাত আমরা। আমরা অন্যের সমালোচনাটা খুব রসিয়ে রসিয়ে করতে পছন্দ করি, নিজেকে নিজের বিবেকের আয়নায় একবারও দেখি না, সে ক্ষমতাও আমাদের নেই। আত্মসমালোচনা করতে আমরা অক্ষম। আমাদের এ অক্ষমতার কথাও আমরা জানি না। পর-সমালোচনা ও পরচর্চা আমাদেরকে পুরোপুরি গিলে ফেলেছে।

ডাক্তারদের নিয়ে সমালোচনার অন্ত নাই, অথচ এ সমাজে খুব কম মানুষই পাওয়া যাবে যারা একজন খারাপ ডাক্তারের থেকে কিছুটা ভাল মানুষ। বিবেক মরে গেছে তাই আমরা নিজের তুলনাটা করতে পারি না। আত্মসমালোচনা করে নিজেকে অপরাধীর কাঠগড়ায় দাঁড়া করানোর মানসিকতা আমরা ধারণ করি না। তেমন উদারতা আমাদের নেই।

বিবেক জাগ্রত থাকলে বোঝা যেতো আমরা প্রত্যেকেই প্রকৃতপক্ষে কতোটা খারাপ। অন্যের বড় বড় অপকর্মগুলোও দেখা যায় না কিন্তু ডাক্তারের সামান্য ত্রুটিটুকুও বড় হয়ে চোখের সামনে ভাসে- পার্থক্যটা এখানে। সরাসরি সেবারসাথে জড়িত থাকার কারণে এটা পুরোপুরি দৃষ্টিগোচর হয়।

অনেকেই আছেন তারা যে যোগ্যতা ও ভ্রান্ত ধারণা নিয়ে ডাক্তারদের কড়া সমালোচনা করেন, সে যোগ্যতা ও ধারণা নিয়ে ঐ মানুষগুলি একজন ডাক্তারের জুতা ব্রাশ করারও যোগ্য নন। শুভঙ্করের ফাঁকি দিয়ে এদেশে প্রকৃত বড় না হয়েও অনেক বড় যায়গা আঁকড়ে ধরে থাকা যায় বলে অনেক ক্ষুদ্র মানুষই বিশাল বড় বনে আছেন। তাদের বুলি সমাজের কাছে বিশ্বাসযোগ্য। এটা এ সমাজের দুঃখ। আর এ দুঃখ আছে বলেই এ সমাজে ডাক্তাররা যেমন সমালোচিত, তেমনি অনেকেই অনেকভাবে ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত। যে বঞ্চনার শেষ নাই।

সমাজের অনেক ক্ষুদ্র মানুষও অনেক ক্ষুদ্র মানসিকতা ধারণ করে আছে, জঘন্য সব কাজকর্ম করছে- তাদের অপকর্মটাও চোখের আড়ালে থেকে যায়, তারাও ডাক্তারদের কঠোর সমালোচক। হঠাৎ কাঁচা পয়সা হওয়া লোকজন ডাক্তারদের সমালোচনা করে সহজেই বাহবা পেতে চায়, নিজেরা জাতে ওঠে।

আমলা-কামলা, মন্ত্রী-সান্ত্রী, পাইক-পেয়াদা, শিল্পী-তবলচী সবাই কঠোর ভাষায় ডাক্তারদের সমালোচনা করে বাহবা পেয়ে নিজের অপকর্ম ঢাকার কৌশল প্রয়োগ করে যুধিষ্ঠির হবার তালে ব্যস্ত। প্রকৃত ভালর জন্য কেউ কথা বলছেন বলে প্রতীয়মান হয় না, সমালোচকরা প্রায় সবাই-ই ডাক্তারদের চেয়ে অনেক বেশি খারাপ কাজে লিপ্ত।

ডাক্তাররা তুলনামূলকভাবে ভাল মানুষ বলেই অনেক অন্যায্য বাজে কথা শোনার পরেও তারা অনেক ধৈর্যধরে তা সহ্য করে যায়। সমাজের প্রতিটা রন্ধ্রে রন্ধ্রে অন্যায়। এগুলি এমনি এমনি হচ্ছে না। এসব অপকর্ম মানুষই করছে। অথচ এসব ব্যাপারে আমরা কতোটুকু সমালোচনামূখর?

এই যে পাহাড়সম অপকর্মের কারণে সমগ্র সমাজটা আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে এটার জন্য যারা দায়ী, তাদের সমালোচনা আমরা কতটুকু করতে পারি? যারা এসব খারাপ কাজ করছে, অপকর্ম করছে, তার উচিৎ জবাব দিতে গেলে অপকর্মকারীরাই দুনিয়ায় ভূমিকম্প তুলে ফেলবে, যার সাথী হবেন আমার-আপনার মতো অনেকেই। কারণ, তাদের অপকর্মের সাথী হলেও লাভের সম্ভাবনা আছে। অথচ ডাক্তারদেরকে কেউ একচুল ছেড়েও কথা বলে না। কারণ, ডাক্তাররা ভদ্রলোক, তাদের প্রতিশোধ নেবার সম্ভাবনা নাই। ডাক্তারদের নামে অপ্রাসঙ্গিক কথা বলেও পার পাওয়া যায়, অন্য কোথাও পার পাওয়া যায় না, তারা উল্টো একহাত দেখিয়ে দিতে পারে। ফলে আমরা অন্য সবখানে পুতু পুতু, গর্জন যা, তা সব ডাক্তারের কাছে এলেই।

অনেক যায়গাতেই মানুষ যেচে গিয়ে অন্যায়ভাবে টাকা দিয়ে আসেন এবং যাদেরকে টাকা দেন তাদেরকে আবার হুজুর হুজুরও করেন, আর ডাক্তারদেরকে ন্যায্য টাকা দিতে গেলেও তাদের কলিজা ফেটে চৌচির হয়ে যায়। শক্তিশালী যায়গায় প্রতিবাদের ক্ষমতা প্রয়োগ না করে দুর্বল যায়গায় ক্ষমতা প্রয়োগ করার মানসিকতা খুবই দুর্বল ও নীতিহীন মানসিকতা। এই মানসিকতায় আক্রান্ত সমাজের প্রায় প্রতিটি মানুষ। হয়ত আমি-আপনিও তার বাইরে নই। আমি নিজেকে প্রশ্ন করে দেখি আমি কি, আপনিও নিজেকে প্রশ্ন করে দেখুন, আপনি কি? আমরা কতোটা ভাল চিন্তা করছি সে বিবেচনা করার দরকার আছে বৈকি!

বহুবার এদেশ দুর্নীতিতে সেরা হয়েছে। আজও সেরার কাছাকাছি অবস্থানে। কারা করেছে এ দুর্নীতি? চুরি, ডাকাতি, হত্যা, রাহাজানি, জবর-দখল, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, ঘুষ, নীতিহীনতা সমগ্র সমাজকে গ্রাস করে ফেলেছে। এর কতোটুকুর জন্য ডাক্তাররা দায়ী। সিভিল প্রশাসনের কোথাও ডাক্তার নেই। তবে এ জন্য দায়ী কারা? ডাক্তাররাও তো তাদেরই দ্বারা বঞ্চিত। মানুষের প্রকৃত সেবা দেবার জন্য জাতীয় পর্যায়ে মূল বাধা ডাক্তাররা নন, বাধাটা অন্যখানে। সে হিসেবটা কি আমরা কখনও করে দেখি?

রাস্তায় মোটা অঙ্কের টাকা কুড়িয়ে পেলে যদি কেউ তা না দেখে তবে সে টাকা ফেরত দেবার মানসিকতা এ সমাজে কয়জন রাখেন? আমরা নিজেরা কতটা ভাল মানুষ আর কি মানসিকতা পোষণ করি সেটা বোঝাবার জন্যই উদাহরণটা দিলাম। যে সমাজের মানুষেরা এরকম অর্থ পেয়ে ফেরত দিয়ে দেন এবং ফেরত দেবার মানসিকতা রাখেন, সে সমাজের ডাক্তারদের নামে আমাদের দেশের মতো এমন বদনাম নেই। ফলে বদনামটা শুধু সেবা অপ্রাপ্তির সাথেই সম্পর্কিত নয়, এরসাথে সেবা অপ্রাপ্তির মূল যায়গাটি বিশ্লেষণ করে বের করার অক্ষমতাও দায়ী। অন্যের সমালোচনা করে নিজে বড় সাজার মানসিকতাও এরসাথে সম্পর্কযুক্ত। সুতরাং সমস্যাটা সার্বিক।

দুর্গন্ধযুক্ত লাশের উপরে আতর ছিটিয়ে লাভ হয় না। দুর্গন্ধ ছড়াতেই থাকে। এ সমাজটাও দুর্গন্ধযুক্ত, শুধু ডাক্তাররা ইচ্ছে করলেও এখানে ভাল কাজ করতে পারবেন না, সেটা সম্ভবও না। সেটি যারা প্রত্যাশা করেন তারা ভাল বিশ্লেষক নন। সমাজের সার্বিক মানসিকতা সমাজের এ দুর্গন্ধ টিকিয়ে রাখার জন্য অনেকাংশে দায়ী। সবকিছু আমলে না নিয়ে গড়পড়তায় শুধু ডাক্তারদের সমালোচনা করা তেমনই এক মানসিকতার পরিচায়ক। আমরা সবাই ফলাফল নিয়ে ব্যস্ত, কেউ-ই কারণ খুঁজে দেখতে অভ্যস্ত নই। সে জন্য যে মানসিক সুস্থতা লাগে তাও আমাদের নেই।

অসুরের পূজা করে দেবতার আশীর্বাদ পাওয়া যায় না। আমরা সবাই অসুরের পূজারী। আমরা কেউ-উ দেবতার আশীর্বাদের যোগ্য নই।

- রি-পোস্ট

ছবি
সেকশনঃ সাধারণ পোস্ট
লিখেছেনঃ যুক্তিযুক্ত তারিখঃ 10/07/2018 02:53 PM
সর্বমোট 598 বার পঠিত
ফেসবুকের মাধ্যমে কমেন্ট করুণ

সার্চ