ব্যাকগ্রাউন্ড

ফেইসবুকে!

ঔরস

সময় গুলো বুঝি মাঝে মাঝে ঝড়ের মত শরীরের উপর বয়ে যায়ৃ।শরীরও গাছের মত দমকা বাতাস আর বৃষ্টির সাথে তাল মিলাতে পারেনা।তখন সেও নিজেকে নিয়তির কাছে সঁপে দেয়;চিন্তার অবকাশ সব-ক্ষণে পাওয়া যায় না।যদিও সে ভাবে হেরে যাওয়া কাজের কথা না,সে আঁকরে থাকতে চায় অথবা ভাল কাঠামো পাওয়া যায় না বলে সে হাসঁ-ফাঁস করে।সে নিজেকে বাতাসের সাথে ছেড়ে দেয়।মাইনুল বুঝতে পারে সময়ের রুপ ।এই তীব্র প্রতিযোগিতায় মানুষ কত অসহায়।দৃশ্যমান প্রতিদ্বন্দী না থাকলেও কত অদৃশ্য প্রতিদ্বন্দীর সাথে লড়ে যেতে হয়।অর্থনীতি মুখ্য এই বিশ্বে মানুষ তার পুর্ব পুরুষদের মত শত্রু দ্বারা নিজস্ব সাম্রাজ্য আক্রণের ভয়ে থাকে।পার্থ্ক্য শুধু আগে মানুষ নিজের ক্ষমতা-স্বপ্ন-আশা ইত্যাদি নিয়ে এত উচ্চ মার্গ পোষণ করতনা;সমাজের সুবিধা প্রাপ্তরা ছাড়া।সভ্যতার আলোক প্রাপ্তিতে ব্যক্তির যেমন ক্ষমতায়ণ ঘটেছে সাথে সাথে জন্ম নিয়েছে ক্ষমতা হারানোর ভয়।তাই বুঝি সভ্যতার শিখরে পৌঁছা রাষ্ট্র গুলোয় সাধারণ নাগরিককেও সহজেই আগ্নেয় অস্ত্র রাখার অনুমতি দেয়।এই সভ্যতার যুদ্ধে সফল হতে হলে ব্যক্তিকে নিজের সাথে এক সার্বক্ষণিক যুদ্ধে লিপ্ত থাকতে হয় উত্তম অনুশীলনের প্রয়োজনে।
এমন দিনে মাইনুলের ফুলার রোডের সিমেন্ট বাঁধা সড়কের ধারে বিশাল শিরীষ তলায় বসে থাকতে ভাল লাগে।হালকা বাতাস আর ঘুরি ঘুরি বৃষ্টির ভেতর মহানগর গোধুলিতে ঢাকা ছেড়েছে মাইনুল।বৈশাখের প্রাক ঝড়-বৃ্ষ্টিতে এই চৈত্রের বিকেলের আকাশে গুমোট আবছায়া।তার একটু শীত শীত লাগছে,সে তার সামনের যাত্রীর দিকে তাকায় ;পন্ঞাশের কোঠার ভদ্রলোকের সামনের সাদা চুল ঘামে ভেজা,ধুসর রঙের হাফ শার্ট ,মাঝারি সাইজের ভুরি-সাদা লোমশ হাতে ডোভ কোম্পানির ছাতা ধরে আছে।মাইনুল মনে করে ‘তার বাবার সবসময় হালকা-পাতলা শরীর ছিল সুদিনে এবং দুর্দিনে।মৃত্যুর সময় সেই একান্নর কালো শরীর আরও কালো মিশমিশে ,গোফ কামানোয় মাড়ির দাঁত নষ্ট হওয়ায় লম্বা গালে টোল পড়ে গিয়েছিল অথবা অত্যাধিক সিগারেট টানার কারণে ও হতে পারে। না মাইনুলের বাবা একান্ন বছর বয়সে যখন মারা যান তখন ঘন কালো চুলের কপালের এক গোছায় পাক ধরেছিল মাত্র;তখন সে আসন্ন এম এ পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিল।বাবার মৃত্যুতে সে নিজেকে বাতাসে ছেড়ে দিয়ে কাজ নিয়ে ঢাকায় চলে আসা,জয়ন্তীর সাথে প্রেম-বিয়ে।
জয়ন্তী প্রেগনেন্ট।বাসা থেকে যখন চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে বের হচ্ছিল তখনও তার গরম লাগছিল;তার উপর গলি থেকে বের হওয়ার সময় কাদাপানি তার জিন্সে এখনও লেগে আছে।বর্ষায় গলিটায় নর্দমার পানি জমে থাকে তার উপর গলির মুখের ডাষ্টবিন অনবরত দু্গন্ধ ছড়ায়।ডাষ্টবিনের কথা আসায় গত কয়েক দিনের পত্রিকার নিউজ গুলো নিয়ে তার ভাবনা আসে;একের পর এক নবজাতক পাওয়া যাচ্ছে ডাষ্টবিন ,ফুটপাত-রাস্তায়।মানুষ হর-হামেশা পশু স্বভাব প্রকাশ করে-এটাও তার একটা বহিঃপ্রকাশ।ভাদ্র মাস পার হলে এখানে সেখানে কুকুরের বাচ্চা পাওয়া যায় ;এখন শীত শেষে পাওয়া যাচ্ছে মানুষের বাচ্ছা!বিষয় টি নিয়ে সে আরও ভাবে।কী পরিস্থিতে জন্ম দাতা অথবা জন্মদাত্রী ঔরসজাত কিংবা গর্ভস্থ সন্তানকে আস্তাকুঁড়ে ফেলে যায়!সমাজ এখন আলগা;তার মনে হয়না এই নগরে পরিচয় সংকটে কেউ সন্তানকে এভাবে ফেলে যাবে!কারণটার সাথে অর্থনৈতিক যোগ আছে।এখন কত প্রতিরোধ এমনকি এবরশন করা যায়;তবে কী বিবেকবোধ!তাহলে এটাতো আরও অবিবেচকের কাজ।সে কোন সদুত্তর পায়না।হঠাৎ বৃষ্টির ঝাপটা আসে;সামনের যাত্রী তড়িঘড়ি করে জানলার ঝাপ নামায়।
ট্রেন টঙ্গী ষ্টেশন ছেড়েছে,মাইনুল বগির ভিতর তাকায় যাত্রী কম ,মুখোমুখি চার জনের সিটে তারা দুজন।বয়স্ক লোকটি ঘুমাচ্ছে,সে তার হাতের ওমেগার কপি ঘড়িতে দেখে সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা।জয়ন্তীকে বাসায় একা রেখে আসা ঠিক নয় কিন্তু উপায় নেই চাকরিটা তার বদলানো খুব দরকার।মেগা সিটি গুলোর সাথে পাল্লা দিয়ে একে ঢাকার জীবন-যাপন ব্যায় বাড়ছে তার উপর সরকারের পে স্কেল প্রাইভেট ফার্মের চাকুরেদের আরও কোণটাসা করে ফেলেছে।বর্তমান ফার্মে থেকে ভাগ্যের পরিবর্তন সম্ভব নয় বুঝে গেছে অথবা ম্যানেজমেন্ট তাকে পরোক্ষভাবে বুঝিয়েছে।জয়ন্তী শোয়ার ঘরে একটা ফুটফুটে শিশুর ছবি ঝুলিয়েছে।ঘুম থেকে উঠে সুন্দর মুখ দেখলে আগত সন্তানও নাকি ঐ রকম সুন্দর হবে।পোষ্টারের বাচ্চাটা ছেলে না মেয়ে মইনুল বুঝতে পারেনা,সে জয়ন্তীকে জিজ্ঞেস করে।জয়ন্তী রাগে কটমট করে উত্তর দেয়’কেন ?মেয়ে হলে তুমি খুশি হবেনা। সে হেসে  ড্রইং রুমে গিয়ে  নির্বিষ্ট মনে টিভি দেখতে থাকে আসন্ন ঝড় হতে রেহায় পেতে।
মাইনুল চট্রগ্রাম ভিত্তিক একটি ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পনিতে পরীক্ষা দিতে যাচ্ছে।সারা দেশের মানুষের সমস্ত দৌড়াদৌড়ি ঢাকা-চট্রগ্রাম;তবে এক সময় ঢাকা থেকে চট্রগ্রামে মানুষের প্রয়োজন বেশি ছিল যা অনেক হ্রাস পেয়েছে।মধ্যবিত্তের স্ব্যাস্থ্য বৃদ্ধির সাথে সাথে এই দৌড়াদৌড়ি দেশের বাহিরে বাড়ছে।সকাল দশটায় ইন্টারভ্যু।সে রাতে ষ্টেশন রোডের মধ্যমানের হোটেল গুলোর কোন একটি নন-এসি রুমে উঠবে ।গোধুলি ট্রেন চট্রগ্রাম পৌছাঁতে পৌছাঁতে মধ্যরাত হবে।
মাইনুলের তন্দ্রা আসে।ট্রেন ফেনী ষ্টশনের আগে ঝড়ের কবলে পড়ে;সেই ঝড়ে ট্রেন আর আগাতে পারেনা,রেল লাইন উপড়ে গেছে।ট্রেন আর যাবেনা,এখন সকাল সাড়ে আটটা এখান থেকে আগ্রাবাদ বাসেও আড়াই ঘন্টার পথ।তাপরও সেভ করা ,ড্রেস বদলানো।সে কী পারবে ইন্টারভ্যু ফেস করতে!সে হাঁস-ফাঁস করে,বিড় বিড় করে বলে “আমি অনাগত সন্তানের দাস ,আমি এভাবে আস্তাকুঁড়ে ফেলতে পারবনা।সে আমার ঔরসের;আমি আমার ঔরসের কাছে বন্দী।এই চাকরি আমার ঔরস –জাত সন্তানের ভবিষ্যৎ ,আমি আমার সন্তানের কাছে হারতে পারিনা। সে ঢুকরে উঠে।“হঠাৎ প্লাট-ফরমের কুলি –টোকাই এর হাঁকে মাইনুলের ঘুম ভাঙে। তার শরীর ঘামে ভেজা,সে বুঝতে পারে ট্রেন চট্রগ্রাম পৌচেছে।ঘড়ি দেখে রাত সাড়ে এগারটা।এক অনিশ্চিত দিনের সম্ভাবনা নিয়ে নিজের ঔরসের দায় যুগপৎ স্বপ্ন-দুস্বপ্নের ক্রিয়ায় কর্ণফুলীর নিশি হাওয়াটার গভীরে মাইনুল ঢুকতে পারেনা।
 

ছবি
সেকশনঃ গল্প
লিখেছেনঃ Likhon Chowdhury তারিখঃ 19/06/2018 11:41 AM
সর্বমোট 103 বার পঠিত
ফেসবুকের মাধ্যমে কমেন্ট করুণ

সার্চ