ব্যাকগ্রাউন্ড

মুক্তচিন্তার বিশ্ব

আপনার পছন্দের যে কোন কিছু সহব্লগারদের সাথে শেয়ার করতে ও শেয়ার কৃত বিষয় জানতে এখানে ক্লিক করুণ

ফেইসবুকে!

নগরপিতা আনিসুল হকের প্রস্থান। একটি সোনালী অধ্যায়ের সমাপ্তি।


সৌম্যকান্তি মানুষটার সাথে প্রথম পরিচয় বিটিভির অনুষ্ঠানের মাধ্যমে! সেই ছোটবেলাতেই লোকটার বাঁচনভঙ্গি দেখে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকতাম টিভি সেটের দিকে! এত্ত সুন্দর করেও কথা বলা সম্ভব? তারপর কোথায় যেন হারিয়ে গেলেন! পরে ওনার জবানিতেই শুনেছিলাম এরশাদের শাসনামলের মাঝামাঝির দিকে ওনাকে সহ আরো কিছু উপস্থাপক-উপস্থাপিকাকে ক্যান্টনমেন্টে ডেকে নিয়ে বিটিভিতে এক অনুষ্ঠানে ছাত্রদের আন্দোলন সংগ্রাম বন্ধ করে পড়াশুনায় মনোনিবেশ করার আহবান জানানোর কথা বলা হয়েছিল। উনি রাজি হন নাই অন্যায়ের সাথে আপোষ করার জন্যে! সেই সেনা শাসনামলের দুঃসহ সময়েই উনি প্রমান রেখেছিলেন ওনার ঘাড়ত্যাঁড়া স্বভাবের। এরপর বন্ধ হয়ে যায় ওনার জন্য বিটিভির দরজা! আর উনিও নিজের ক্যারিয়ার সাজাতে ব্যবসায় মনোনিবেশ করেন। যেখানে হাত দিয়েছেন সোনা ফলিয়েছেন। রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিজের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে গেছেন সাফল্যের স্বর্ণশিখরে। উজ্জ্বল করেছেন বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের নাম! কিন্তু সেই সময়টায় যেন ছিলেন অনেকটাই পর্দার অন্তরালে।  


 

ওনাকে আমরা আবার টিভির পর্দায় দেখলাম ১৯৯৬ সালে। মাত্রই বিএনপির সাজানো নির্বাচন নস্যাৎ করে, জনতার মঞ্চের মাধ্যমে দেশের আপামর জনসাধারণের আন্দোলনে ভোটের অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে! নির্বাচনের ঠিক আগে বিটিভিতে ‘সবিনয়ে জানতে চাই’ অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়েছে। সকল রাজনৈতিক দলের প্রধান নেতাদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে সেই অনুষ্ঠানে! ১৫ বছরের সামরিক স্বৈরশাসন আর ৫ বছরের বিএনপি’র রাজনৈতিক স্বৈরশাসনে দেশে রাজাকারদের রাজাকার বলা নিষেধ! সবাই যেন ভুলেই গেছে ৭১’র বীর শহীদদের আত্মত্যাগ ও আপামর জনগণের নির্যাতন নিপীড়ণের কথা! সেই সময়ে রাজাকার শিরোমনি, যুদ্ধাপরাধী দল জামায়াতে ইসলামীর সেই রমরমা অবস্থা! পুরো দেশ জুড়ে আলোচনা জামায়াত সামনের নির্বাচনে অনেক আসন নিয়ে সংসদে প্রতিনিধিত্ব করতে যাচ্ছে! জামায়াতের নেতারা সেই ‘সবিনয়ে জানতে চাই’ অনুষ্ঠানে আঁতর মেখে, পাঞ্জাবি, মাথায় পাকি টুপি পরে খোঁশ মেজাজে হাজির হয়েছিল ঝলমলে চেহারায়! তাদের দুঃস্বপ্নেও চিন্তা ছিল না তাদের রেকর্ড ভঙ্গকারী আসনে বিজয়ী হওয়ার দিবাস্বপ্নে এক ঘাড়ত্যাঁড়া লোক কিভাবে পানি ঢেলে দেবে! তো রাজাকার শিরোমনি নিজামীও ছিল সেই অনুষ্ঠানে আত্মপ্রত্যয়ে বলীয়ান হয়ে! ঘুনাক্ষরেও কল্পনা করতে পারে নাই কি আজাব নেমে আসছে তাদের উপরে!


সেই ‘সবিনয়ে জানতে চাই’ অনুষ্ঠানে আমরা আবার দেখলাম আমাদের সেই স্মিত হাস্যমুখী আনিসুল হককে! উনি ওনার স্বভাবজাত স্মিত হাসি দিয়ে ভরাট গলায় উপস্থিত জামায়াতি নেতা, যুদ্ধাপরাধী নিজামীর কাছে জানতে চাইলেন, ‘নির্বাচিত হলে আপনারা কি শরীয়া আইন চালু করবেন?’ নিজামী গভীর প্রত্যয় নিয়ে বলেছিলেন 'নিশ্চয়ই'। উপস্থাপক আনিসুল হক আবারও সবিনয়ে জানতে চাইলেন 'তাহলে আপনারা বলছেন নির্বাচিত হলে আপনারা গলা কাটা, হাতকাটার মতো শাস্তি কায়েম করবেন দেশের আইন এবং সংবিধানের বিরুদ্ধে গিয়ে?' আত্মপ্রত্যয়ে বলীয়ান নিজামী যেন এবার একটু ভিরমি খেল! আমাদের সবার প্রিয় আনিসুল হক সুশীলতার স্রোতে গা না ভাসিয়ে দৃঢ় প্রত্যয়ে সেই অনাহক সময়েই রাজাকার শিরোমনি নিজামীর কাছে জানতে চেয়েছিলেন একাত্তরে বাংলাদেশ বিরোধী ভূমিকার জন্য, গণহত্যার জন্য তারা লজ্জিত কিনা, ক্ষমা চান কিনা। অনুষ্ঠানে উপস্থিত জামাতের যুদ্ধাপরাধী তিন নেতার কাছে এই প্রশ্নের কোন উত্তর ছিলোনা সেদিন! বাকি অনুষ্ঠানে নির্বোধের মতো বসেছিল এই বেকুবের দল, পারলে নিজেরাই নিজেদের হাত কামড়াতো লাইভেই, সেই অনুষ্ঠানে হাজির হওয়ার অনুশোচনায়! ফলাফল? জামায়াতিরা সেই সময় পর্যন্ত তাদের সবচেয়ে নির্লজ্জ্ব হারের মুখোমুখি হয়েছিল জাতীয় নির্বাচনে। দেশের মানুষ আনিসুল হকের প্রত্যয়ে সাড়া  দিয়ে জানান দিয়েছিল, বাঙ্গালী একাত্তর ভুলে নাই! বাঙ্গালীকে একাত্তর ভোলানো যাবে না! সেই একই অনুষ্ঠানে হাজির হয়ে বিএনপির বদরুদ্দোজা চৌধুরী দম্ভ করে বলেছিল, 'তারা নির্বাচনে হেরে যাওয়ার কথা চিন্তাই করছেন না, আগামী কুড়ি বছরেও তাদের কেউ হারাতে পারবে না।’ এরপরের ইতিহাস তো সবারই জানা! ২১ বছর পর জননেত্রী শেখ হাসিনার যোগ্য নেতৃত্বে বাংলাদেশের ক্ষমতায় আসীন হল, স্বাধীনতা আন্দোলনে নেতৃত্ব প্রদানকারী দল বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ। এই যে আজকে আমরা গলা ফাঁটিয়ে বঙ্গবন্ধুর জয়গান গাই, স্বাধীনতার পক্ষে কথা বলি গর্ব করে কোন ভয়ে ভীত না হয়েই; তার জন্যে কি আনিসুল হকের সেই জাতীয় নির্বাচনের  মোড় ঘুরিয়ে দেয়া অনুষ্ঠানের কোনোই অবদান ছিল না!


এরপর আবার পর্দার অন্তরালে! মাঝে আমরা তাকে দেখি বিজিএমইএ’র সভাপতি হিসেবে, এরপর দায়িত্ব নিয়েছিলেন ব্যবসায়ীদের সংগঠন এফবিসিআই’র প্রধান হিসেবে। ২০১৫ সাল। ঢাকা সিটি কর্পোরেশনকে দুইভাগ করে উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন করা হলো। দক্ষিণের মেয়র পদে কে নমিনেশন পেতে যাচ্ছেন তা আমরা জানতাম আগে থেকেই! কিন্তু কে পাবেন উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মেয়রের জন্য আওয়ামীলীগের নমিনেশন? জননেত্রী শেখ হাসিনা চমক দেখালেন। দলীয় সর্বোচ্চ ফোরামের পছন্দের ব্যক্তির ব্যক্তিগত ত্যাগের কথাকে, রাজপথের অবদানের কথা পাশ কাটিয়ে মনোনয়ন দিলেন আমাদের সবার প্রিয় আনিসুল হককে। আমরা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের বাসিন্দারা নড়েচড়ে বসলাম। এবার ম্যাজিক দেখার পালা। নির্বাচিত হয়েই একের পর এক ম্যাজিক দেখাতে শুরু করলেন। উচ্ছেদ করলেন প্রভাবশালীদের দখলে থাকা সরকারি রাস্তার জায়গা। কাউকে পরোয়া করলেন না! জননেত্রী শেখ হাসিনা যে তাকে ব্ল্যাংক চেক দিয়ে রেখেছিলেন আগেই!


মেয়রের ব্যক্তিগত ক্যারিশমার একটা উদাহরণ দেই আপনাদের! আমাদের বাসার সামনের রাস্তা বড় করা হবে! এলাকার কেউ তাদের জায়গা ছাড়বে না! একদিন শুনলাম আম্মা আমাদের বাসার সামনের রাস্তার পাশে থাকা জমির দেয়াল ভাঙ্গাচ্ছেন! বললাম, কাহিনী কি? আম্মা বললেন, কেউ জায়গা ছাড়তে রাজি না, আমি না ছাড়লেও হয়, কিন্তু মেয়র ছেলেটা এত্ত কষ্ট করছে, রাস্তা বড় হলে তো আমাদেরই লাভ, তাই আমার জমি ছেড়ে দিয়েই শুরু করলাম! দেখি! আমি মহিলা মানুষ হয়ে নিজের জমি ছাড়তে পারলে এলাকার আর সব হ্যাডমেরা শরমের চোটে হলেও জায়গা ছাড়বে, নাহলে মেয়র তো রাস্তা বড় করবেই- তাদের তখন জরিমানা দিয়ে রাস্তার জন্য অবৈধ দখল ছাড়তে হবে! আমি বললাম, আম্মা! আমাদের তো অবৈধ দখল না! নিজেদের জমি! আম্মা বললেন, ব্যাপার না! রাস্তা বড় হলে সবারই লাভ! আমিই শুরু করি না কেন! এরপর আসলেও একেরপর এক জমির মালিক, বাড়িওয়ালারা দখল ছেড়েছিলেন! সেই রাস্তা আজকে বিশাল বড় হয়ে গেছে, না কোন হুমকিতে না! মেয়রের একক ক্যারিশমায়! মানুষের বিশ্বাস ছিল এই লোকটা পারবে, এই লোকটা কিছু করতে চায়। কিন্তু হায়! আমাদের প্রিয় মেয়র আপনিই চলে গেলেন না ফেরার দেশে!


আমাদের দেশে মেয়রদের নগরপিতা বলে ডাকা হয়! কিন্তু এই গালভরা নামের স্বার্থকতা দেখতে পেয়েছিলাম খুব কাছ থেকে দেখা বরিশালের মেয়র শওকত হোসেন হিরণ সাহেবের মধ্যে, আর আমাদের ঢাকা উত্তরের মেয়র আনিসুল হকের মধ্যে! যথার্থই যেন ওনারা হয়ে উঠেছিলেন নগরের পিতা। বরিশাল শহরে যারা গিয়েছেন, তারা আমার এই কথার সমর্থন করবেন নির্দ্বিধায়! আর ঢাকা উত্তরের নগরপিতাকে তো আমরা দেখেছি আমাদের চোখের সামনেই! একজন যথার্থ পিতার মতোই সমস্যা কবলিত নগরের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে এগিয়ে চলেছেন, শাসন ও পরম মমতা- দুইয়ের এক অবাক করা মিশেলে! প্রয়োজনে যেমন চরম কঠোর হতে দেখেছি আমরা ওনাকে, তেমনি মানুষের দুর্দশায় আবেগে আক্রান্ত হতে দেখে অবাক হই নি এই বিচিত্র গুণের অধিকারী মানুষটিকে। নেত্রী মানুষ চিনতে ভুল করেন নি! যোগ্য লোকের হাতেই তুলে দিয়েছিলেন ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের চাবি।


গতকাল থেকে সবচেয়ে বেশি অবাক হয়েছি যারা গত সিটি নির্বাচনে এই লোকটাকে নির্বাচিত করতে মনেপ্রাণে, ফেসবুকের ওয়ালে বাঁধা দিয়েছে, সেই মানুষগুলোও আজ কেঁদে বুক ভাসাচ্ছে! জনগণের জন্য কাজ করার ক্ষমতা এতই বিশাল যে ওনার বিরোধীরাও ওনার বিরুদ্ধে বলার মত কিছু খুঁজে পাচ্ছে না আজ! আমাদের রাজনীতিকেরা যদি এই ঘটনা দেখেও কিছু শিক্ষা নেন! জনগণের জন্য কাজ করলে জনগণ মনে রাখে! সেই লোকের মৃত্যুতে আজ গুলশান-বনানী এলাকায় অন্ততঃ দুইটি বাসায় সেলিব্রেশনের জন্য মদের বোতল খোলা হয়েছে বলে জানি! সিটি কর্পোরেশনের অসাধু চক্রের কালোহাতের থাবা থেকে নগরের মানুষকে রক্ষায় অহর্নিশি কাজ করে গেছেন আমাদের মেয়র। দুর্নীতিবাজদের জীবনধারণ করে দিয়েছিলেন প্রায় অসম্ভব! এই জন্যেই কিনা জানি না, কয়েকদিন আগে হঠাৎ করে আমাদের স্বাধীনতার পক্ষের মানুষদের মধ্যে গুজব ছড়িয়ে পড়লো যে, মেয়র আনিসুল হক নাকি আসলে অসুস্থ না, এবং উনি নাকি সিঙ্গাপুরে যেয়ে সদ্য পদত্যাগী প্রধান বিচারপতির সাথে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছেন! এই জন্যেই নাকি জননেত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশন থেকে দেশে ফেরার পথে লন্ডনে যাত্রা বিরতি করলেও ওনাকে দেখতে যান নি! তো এই গল্পের মূল গল্পকার কে সেটা আমি জানি না, কিন্তু যারা এটা আমার কানে দিয়েছেন, তারা সবাই স্বাধীনতার স্বপক্ষের আপোষহীন মানুষজন। ওনাদের উদ্দেশ্য নিয়ে আমার কোন প্রশ্ন নেই, কারণ ষড়যন্ত্রকারীরা যে বসে নেই হাত-পা গুঁটিয়ে সেটা আমরা সবাইই জানি ও বুঝি! তাই তাদের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা অস্বাভাবিক ছিল না! কিন্তু যারা এই গুজবের হোতা তাদের চিহ্নিত করা প্রয়োজন! কারণ, এরা কি এই গুজব স্বাধীনতার স্বপক্ষের মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে এমন একটা পরিস্থিতি সৃষ্টি করলো কিনা, যাতে পরবর্তীতে কোন লেজিট কন্সার্নেও যেন আর কেউ সাড়া না দেয়, সেটাও খুঁজে দেখা দরকার! এই ব্যাপারটাকে এত সহজে দেখলে চলবে না!


নগরপিতা আনিসুল হক চলে যাওয়ায় আমাদের যে অপূরণীয় ক্ষতি হলো, তা বলার অপেক্ষা রাখে না! আমাদের আসলে ভাগ্যটাই খারাপ। যখনি কোন মানুষ আমাদের জীবনে বদল আনার চেষ্টা চালান, তাকে প্রাকৃতিক বা কোন ষড়যন্ত্রের বলি হয়ে জীবনের মায়া ত্যাগ করতে হয়! মেয়র আনিসুল হক আরেকটু সময় পেলেই ওনার কৃত পরিকল্পনাগুলোকে বাস্তবে রূপদানের চিত্র আমরা দেখতে পেতাম ওনার জীবদ্দশাতেই। কিন্তু সেই সৌভাগ্য আর আমাদের হলো না। ঢাকা উত্তরের বাসিন্দাদের জন্য আজ এক অমাবস্যার আঁধার ঘনিয়ে আসা সময়। আমরা হারিয়েছি আমাদের ব্যক্তিগত অভিভাবককে, আমাদের নগরপিতাকে। ভালো থাকুন ওপারে আনিসুল হক সাহেব! আপনাকে চিরদিন মনে রাখবেন ঢাকার, তথা দেশের মানুষেরা! জয় হোক আনিসুল হকের।

ছবি
সেকশনঃ সাম্প্রতিক বিষয়
লিখেছেনঃ বটতলার উকিল তারিখঃ 01/12/2017 08:22 PM
সর্বমোট 209 বার পঠিত
ফেসবুকের মাধ্যমে কমেন্ট করুণ

সার্চ