ব্যাকগ্রাউন্ড

মুক্তচিন্তার বিশ্ব

আপনার পছন্দের যে কোন কিছু সহব্লগারদের সাথে শেয়ার করতে ও শেয়ার কৃত বিষয় জানতে এখানে ক্লিক করুণ

ফেইসবুকে!

গল্পঃ দুঃস্বপ্নের ঘণ্টাধ্বনি (১ম পর্ব)

জানালা ও বেড়ার ফাঁক-ফোকর দিয়ে বিচ্ছিরি গন্ধটা ঘরময় ছড়িয়ে পড়লে পেটের ভেতরটা গুলিয়ে উঠলো। বৃষ্টি হলেই এই উৎকট গন্ধটা ঝিল থেকে ডানা মেলে আকাশে, তারপর দৈত্যের মত ছুটে এসে আশপাশের পুরো এলাকা গ্রাস করে নেয়। তখন টিকে থাকাই দায়। ঘরের ভেতরে গুমোট অন্ধকার। কেমন যেন আষ্টেপৃষ্ঠে মিশে আছে ঘরের কোণে কোণে, চারপাশের টিনের বেড়া আর চালের সাথে। বৃষ্টিটা থেমে গেলেই একটা ভ্যাঁপসা গরম ছাড়ে। কী অসহ্য! ইলেক্ট্রিসিটি নেই এক ঘণ্টা হল। বাঁশের সাঁকোর মোড়ে দু’টো কুকুর একটানা চেঁচাচ্ছিল। কে যেন ধমকে উঠল- অ্যাই চুপ, যাহ!
-উফ! আর তো পারা যায় না- মহিদুলের কণ্ঠে বিরক্তি।
-কী পারা যায় না? মহিদুলের দিকে ঘুরে জিজ্ঞেস করল জয়নাব। ছেলেকে তালপাখায় বাতাস করছিল সে।
-গন্ধে তো বমি হওয়ার দশা। এইহানে আর থাকা যাইবো না।
-যাইবা কই? ভাল জায়গায় থাকনের ক্ষ্যামতা আছে? জয়নাব খেঁকিয়ে উঠলো। পরক্ষণেই আবার মোলায়েম স্বরে বলল- থাউক, পোলাডার চিকিতসায় কত টাকা লাগবো! এইটুকুন কষ্ট করলে আমগো কিছু অইবো না।
চৌকিতে ঘুমিয়ে থাকা ছেলের দিকে তাকায় মহিদুল। শীর্ণদেহী ছেলেটির গায়ে হালকা চাঁদের আলো পড়েছে জানালা গলে। জানালার ও-পাশে ঝিল, কচুরিপানায় ভরা। ওখানে অদ্ভুতুরে অন্ধকার চাঁদের আলোর সাথে লুকোচুরি খেলে। সড়সড় করে কী যেন ছুটে গেল কচুরিপানার উপর দিয়ে। বিড়াল কিংবা বেজী হবে হয়ত। পাশের ঘরে মতির বাপ অনবরত কেশেই চলেছে। মহিদুলের মনে হচ্ছিল- ওর বুকের পাঁজরের হাড় ক’খান আজ ভেঙেই যাবে। শেষে বিরক্ত হয়ে বলল,
-দিনরাইত এই লোকটা কাশে তবুও বিড়ি ফোঁকা বন্ধ হয় না। কতদিন কইছি, এইসব ছাইপাশ খাইও না। শরিলে তো হাড্ডি ছাড়া আর কিচ্ছু নাই! 
-যার ভাল হেয় না বুঝলে তুমি বইলা কী করবা? জয়নাব বলল।
-আমার আর কী? চোখের সামনে দেখি, তাই মানা করি।
 আধো-অন্ধকারে জয়নাব ঘুরে তাকায় মহিদুলের দিকে। মহিদুলের শরীর ঘামে চিকচিক করছে।
-একটু চকিডার কাছে আগাইয়া আস। বাতাস লাগবে।
মহিদুল চৌকির গা-ঘেঁষে বসে। জয়নাব তালপাখা দিয়ে জোরে বাতাস দেয়। স্বামী-ছেলে দুজনকেই আরাম দেয়ার চেষ্টা।
-জানু! মহিদুল জয়নাবের দিকে তাকিয়ে ছোট করে ডাক দেয়।
-কি কইবা কও, গরমে ভাল লাগতাছে না। মলিন আঁচলে মুখ মুছে উত্তর দেয় জয়নাব।
মহিদুল সান্ত্বনার সুরে বলে- তুই চিন্তা করিস না। আমগো দিন এমন থাকবো না। তৈয়ব আলী কইছে ও রোজ সন্ধ্যায় আমারে ড্রাইভিং শিখাইবো। ড্রাইভিংটা শিইখা নিতে পারলে আয়-রোজগার ইনশাল্লাহ বাইড়া যাইবো।
-আগে ড্রাইভিং শিইখা কাজ পাও তো, তারপর দেখা যাইবো। জয়নাব দায়সায়রা উত্তর দেয়।
হঠাৎ আলো জ্বলে উঠলো তখন। ঘরের ভেতরে জমানো অন্ধকারের আবরণটা আচমকাই ছুটে পালালো যেন। মহিদুল অস্পষ্ট স্বরে বলল- বাঁচলাম। মাথার উপর পুরনো সিলিঙ ফ্যানটা একবার কঁকিয়ে উঠে মৃদু গতিতে ঘুরতে শুরু করলো। সেদিকে তাকিয়ে মহিদুল মনে মনে ভাবল একটা নতুন ফ্যান কেনা দরকার কিন্তু জয়নাবের ঝামটা খাওয়ার ভয়ে কথাটা মুখে আনলো না।
পাশ ফিরিয়ে শোয়াতে যেতেই উঠে বসল শান্ত। জয়নাব ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
-কি হইছে বাবা? হিসু করবা?
শান্ত মাথা নেড়ে বলল- হ।
মহিদুল বলল- আসো বাবা, আমি তোমারে নিয়া যাই।
মহিদুল পাঁজাকোলে করে ছেলেকে ঘরের বাইরে নিয়ে যায়। স্যাঁতসেঁতে পথ। পিচ্ছিল আর ছায়া-ছায়া। সরু করিডোরের শেষ মাথায় টয়লেটের টিনের চালের সাথে টিমটিমে আলো জ্বলে। মহিদুল শান্তকে কোলে নিয়ে সেদিকেই যায়।
জয়নাব নিজেই নিজেকে বলে,
-পোলাডা কবে যে আবার হাঁটতে পারবো!
পেছন থেকে মহিদুল জবাব দেয়- দেখিস, একদিন শান্ত ভাল হইয়া যাইবো।
অস্থির হয়ে ওঠে জয়নাব। আর কবে ঠিক হইবো? আগে তো ক্রাচে ভর দিয়া হাঁটতে পারতো, এখন তো তা-ও পারে না।
মহিদুল কোন জবাব দেয় না। জানে, এরপর কিছু বললে জয়নাব ভাসবে। সে বাধ না মানা ঢল থামানোর সাধ্য নেই মহিদুলের।
জয়নাব মহিদুলের দিকে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। মহিদুল অন্যদিকে ফিরে নিজের অসহায়ত্ব ঢাকার চেষ্টা করে মাত্র। জয়নাব বোঝে। মহিদুলের ভেতরেও কষ্ট জমে আছে। সে কাউকে বলতে পারে না।
মহিদুল নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করলো- এহন জ্বর আছে?
জয়নাব উত্তর দেয়- না। সন্ধ্যার পর আর আসে নাই।
মহিদুল আলতো করে ছেলের বাম পা’টায় হাত বোলায়। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে- কী যে হইলো পোলাডার পা’য়! তারপর জয়নাবের দিকে ফিরে বলে,
-তুই চিন্তা করিস না জানু, আমি ওরে একজন বড় ডাক্তার দেহামু। আমগো শান্ত ভাল হইয়া যাইবো।
জয়নাব বড় করে নিঃশ্বাস ফেলে বলে- তাই যেন হয়।
জয়নাবের হঠাৎ নদীর কথা মনে পড়ে। জোয়ার-ভাটা, খেয়াঘাটের কথা। সাঁঝের বেলা গফুর মাঝির দরাজ গয়ায় গান ধরা। আর, নদীর ঐ-পাড়ে টকটকে লাল সূর্যটার ওঠা-নামার কথা।
একটা ঘর আর উঠোন ছিল। নদীর ঠিক পাড়েই। ঘরের সামনে সবজী মাচা- ঝিঙে-শশা-লাউ। কত কী! বুকের ভেতর হু-হু করা একেকটা জোনাক-জ্বলা সন্ধ্যার কথাও মনে আসে। আরেকটা কথা কখনো ভোলে না জয়নাব- উথাল-পাথাল ঢেউ। নদী-পাড়ের হেলে পড়া নারিকেল গাছটা যেদিন ভেঙে পড়লো, শান্তর সে-কী কান্না! কিছুই তো নেই এখন আর। জয়নাব জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকে- অন্ধকারের দিকে।
-জানু!-
-হুম।
-কী ভাবতাছোস?
-কিছু না।
-তুই দুই রাত ধইরা ঘুমাস নাই, আইজ একটু ঘুমা। রাইত তো অনেক হইল। 
-ঘুমানের কী উপায় আছিলো? দুইডা রাইত ধইরা পোলাডা জ্বর আর ব্যথায় চিক্কইর পাড়ছে, তুমি কী ঘুমাইতে পারছিলা? আমি ওর পাশে আছি, তুমি ঘুমাও। বিহান বেলা গাড়ি নিয়া বাইর হইতে অইবো না?     
মহিদুল মেঝেতে পাটি বিছিয়ে শুয়ে পড়ে। পাশ ফিরে শোয়ার আগে একবার জয়নাবের দিকে ঘুরে তাকায়। জয়নাব জিজ্ঞেস করে- কিছু কইবা?
-শ্যাষ রাইতের দিকে আমারে তুইল্যা দিস। আমি ওর পাশে থাকুম, তুই একটু ঘুমাইয়া নিতে পারবি।
-আচ্ছা দিমুনে, তুমি এহন ঘুমাও।
একটু পর আবার ঘুরে জিজ্ঞেস করলো- কাইল তুই কামে যাবি?
-হ। কাইল না গেলে কামডা মনে হয় আর থাকবো না।
-তাইলে তাড়াতাড়ি ফিরা আসিস।
-হ। তাড়াতাড়িই ফিরুম।
সারারাত জেগে থেকে ভোরের দিকে মাথাটা বালিশে রাখতেই রাজ্যের ঘুম এসে ভর করলো জয়নাবের চোখে। মহিদুল তাকে আর ডাকলো না। রাত পোহাতেই সে বেরিয়ে পড়লো। ঘরে বসে থাকার উপায় আছে? একদিন ঘরে বসে থাকলে পেটে ভাত জুটবে না। ছেলেটার মুখের দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিঃশব্দে ঘর থেকে বেরুলো। দরজাটা আলতো করে ভেজিয়ে রাখলো। 
বাঁশের সাঁকোটা পেরুলেই মহাজনের গ্যারেজ। মহিদুল রিকশা নিয়ে গ্যারেজের মুখে আসতেই দেখতে পেল তৈয়ব হনহন করে হেঁটে আসছে। মনে হচ্ছে মেজাজ তিরিক্ষি। কাছাকাছি আসলে মহিদুল জিজ্ঞেস করলো-
-কী ব্যাপার, তোমারে এমন লাগতাছে কেন?
তৈয়ব তর্জন-গর্জন করতে করতে বলল- দিলাম হালারে মুখের উপর না কইরা। তৈয়ব কারো হুকুমের গোলাম না।
মহিদুল হেসে জিজ্ঞেস করে- কী হইছে? কারে না করছ?
তৈয়ব সমান তেজ দেখিয়ে বলে- কারে আবার? যেই হালার গাড়ি চালাইতাম। হুমুন্দির পুত মনে করছে আমারে কিইনা নিছে!
-এত রাগ হইলে চলে? চাকরি করতে হইলে মালিক তো কিছু কথা হুনাইবোই।
-দুরো মিয়া! এত-পুতু পুতু করলে সবাই তোমার মাথায় কাঠাল ভাইঙা খাইবো। মনে জোর রাখবা মিয়া, তুমিও কম কিসে!
রাগের মাথায় বললেও তৈয়বের কথাগুলো বড় ভাল লাগলো মহিদুলের। সে হাসলো এবং একই সঙ্গে তৈয়বের কথার সমর্থনেই যেন টুং-টাং বেল বাজিয়ে রাস্তায় নামলো। তখন ধূলো উড়ছে। পরিচ্ছন্ন কর্মীরা রাস্তা ঝাট দিতে নেমেছে। মহিদুল গামছা দিয়ে ধূলো তাড়ায় আর একটু দূরে ইশারা করে দাঁড়িয়ে থাকা সওয়ারীর দিকে এগিয়ে যায়।
আজ ঘুম থেকে উঠতে দেরী হয়ে গেল জয়নাবের। গত দু’দিন কাজে যেতে পারেনি সে। বেগম সাহেবের ফোন এসেছিলো। কেউ কী আর জয়নাবের কথা শুনবে! তারা প্রতিদিনের কাজের জন্য টাকা দেয়, কামাই দিলে মানবে কেন? জয়নাব ছেলের কপালে হাত দিয়ে দেখে জ্বরটা আর নেই। কিছুটা স্বস্তি পায়। বাইরে তাকিয়ে দেখে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি পড়ছে। এই বৃষ্টিতে কোনভাবেই যাওয়া যাবে না। জয়নাব ছেলেকে খাবার খাইয়ে বৃষ্টি থামার অপেক্ষায় বসে থাকে।
শ্রাবণ মাস। সকাল থেকেই অঝোর ধারায় ঝরছে। এখন দিনের বেশির ভাগ সময়ই ঝরে। মাঝে মধ্যে একটু কমে মাত্র। চৌকির উপরে বসে বৃষ্টি দেখছে শান্ত। জানালার ফাঁক গলে বৃষ্টির ছাট এসে লাগে ওর চোখে-মুখে। লতানো কলমি আর হেলেঞ্চায় ছাওয়া ঝিলটার মাঝখানে কিছুটা ফাঁকা জায়গা। বড় বড় বৃষ্টির ফোঁটা পড়ছে সেখানে। সেদিকেই একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে শান্ত। ঝিলটির ওপাশেই শহরের অভিজাত এলাকা, বড় বড় অট্টালিকায় ঠাঁসা।
ঘরের পাশ-ঘেঁষা ঝিল আর তার উপরে বর্নীল আকাশটাই শান্তর জগত। ঝিলের ও-পাড়ে সারি সারি উঁচু-নিচু ভবন থেকে নির্গত সব মলমূত্র এসে মিশে এই ঝিলেই। প্রায় সবসময়ই দুর্গন্ধ ছড়ায়। এখানে যখন ওরা প্রথম আসলো, খুব কষ্ট হত। এখন অভ্যেস হয়ে গিয়েছে। টিনের তৈরি দশ বাই আট এই ঘরটিতে আসবাব পত্র বলতে কেবল মাত্র একটি পুরনো কাঠের চৌকি, কয়েকটি অতি প্রয়োজনীয় রান্নার পাত্র, বাসন-কোসন আর বাঁশের বেড়ার সাথে ঝুলানো তিন জনের কাপড়চোপর।
বাবা বেরিয়ে গেছে সেই কাকভোরে। প্রতিদিনই যায়; রিকশা নিয়ে শহরময় ঘুরে বেড়ায় জীবিকার সন্ধানে। আর মা, সে-ও চলে যায় একটু বেলা গড়ালে। ফিরে আসতে দুপুর পেরিয়ে যায়। এই পুরো সময়টা জুড়ে শান্তর একরকম বন্দী জীবন। বয়স আর কত? নয় কি দশ। ওর বয়সী ছেলে-মেয়েরা মাঝে মধ্যে উঁকি দেয় ঘরে। ও পর্যন্তুই। কেউ ওর সাথে খেলে না। ওদের সাথে খেলার মত শারীরিক সক্ষমতা নেই শান্তর। হাঁটতে পারে না। ওর বাম পা’টায় শক্তি নেই একেবারেই। ওঝা-বদ্যি-ঝাড়ফুক কম করেনি বাবা-মা। কিছুতেই কিছু হয়নি। প্রায় রাতেই মা কাঁদে। বাবা কিছু বলে না, কেবল গুম মেরে বসে থাকে। 

চলবে......

ছবি
সেকশনঃ গল্প
লিখেছেনঃ নিভৃত স্বপ্নচারী তারিখঃ 11/10/2017 08:31 PM
সর্বমোট 705 বার পঠিত
ফেসবুকের মাধ্যমে কমেন্ট করুণ

সার্চ