ব্যাকগ্রাউন্ড

মুক্তচিন্তার বিশ্ব

আপনার পছন্দের যে কোন কিছু সহব্লগারদের সাথে শেয়ার করতে ও শেয়ার কৃত বিষয় জানতে এখানে ক্লিক করুণ

ফেইসবুকে!

ধারাবাহিক উপন্যাস: ঈশ্বরের রহস্যময় হাসি (পর্ব—১০)



















ধারাবাহিক উপন্যাস:

ঈশ্বরের রহস্যময় হাসি (পর্ব—১০)
সাইয়িদ রফিকুল হক

 
তানজিলা এখন খুব মনোযোগ দিয়ে শাড়ি পরছে। সর্বশেষ বাছাইকৃত শাড়িটা তার বিশেষ মনঃপুত হওয়ায় সে খুব আয়েশ করে শাড়িটা পরছে। মাঝে-মাঝে এভাবে শাড়ি পরতে তার খুব ভালো লাগে। একটা সময় সে নিয়মিত শাড়ি পরতো।
সে খুব ভালোভাবে শাড়ি পরতে পারে। এটি তাকে শিখতে হয়েছে। তার দাদিজান খুব ভালো করে শাড়ি পরতে পারতেন। এখনও তিনি এই বয়সেও খুব স্টাইল করে শাড়ি পরেন। তার কাছেই সে শাড়িপরা শিখেছে। অবশ্য তার মা-ও এব্যাপারে যথেষ্ট পারদর্শী। তবে দাদির সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা একটু যেন বেশি।
তানজিলার দাদি একসময় খুব রূপসী ছিলেন। তিনি এখনও জীবিত। তবে বয়সের ভারে তিনি এখন কিছুটা এলোমেলো। আর সবচেয়ে বড় কথা হলো—তিনি সেই ব্রিটিশআমলে এন্ট্রান্স পাস। এটিই তার সবচেয়ে বড় যোগ্যতা। তিনি খুব রুচিশীল ও মার্জিত মহিলা। তার এই শালীনতা ও সুরুচিবোধ তিনি নাতনির মধ্যেও ফুটিয়ে তুলেছেন।
এখনও তিনি বেশ গোছানো আর রসিক।
 
নাতনিকে শাড়িপরা দেখে তিনি পিছন থেকে হঠাৎ বলে উঠলেন, “কেউ দেখবে নাকি বুবু?”
তানজিলা দাদির মুখে এমন কথা শুনে হেসে ফেললো। আর বললো, “না, সেরকম কিছু নয় দাদিজান। আসলে, আজ অনেকদিন পরে অফিসে যাচ্ছি তো—তাই, নিজেকে একটুখানি পরিপাটি করে নিচ্ছি। তাছাড়া, অফিসের লোকগুলোর সামনে সাধারণ বেশে তো আর যাওয়া চলে না। এই অফিসে আমার একটা বড় পদও আছে। অফিসে অনেক কাজ জমে আছে। তাই যাচ্ছি।”
তবুও ওর দাদি হেসে বলেন, “কিন্তু আমার মন যে বলছে—কিছু-একটা হয়তো আছে।”
এবার তানজিলা দাদির দিকে ফিরে শাড়ির কুচিগুলো ঠিকঠাক করে হেসে বলতে লাগলো, “না, সেরকম কিছু তো বুঝতে পারছি না। তবে আজ আমার সাজতে খুব ভালো লাগছে। আর তেমনকিছু যদি কখনও ঘটে যায়—তাইলে তোমাকে তো জানাবোই।” কথা শেষ করে তানজিলা হাসতে লাগলো।
আতিয়া বানু তবুও হাসেন আর বলেন, “হু, কিছু-একটা হবে। আজ কতদিন পরে তোমাকে সাজতে দেখলাম বুবু। আমার যে কী ভালো লাগছে।”
তানজিলা এবার আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে দাদিকে জড়িয়ে ধরলো। আর বললো, “তুমি আমাকে এমন করে ভালোবাসো বলেই তো তোমাকে আমার এতো ভালো লাগে, দাদিজান।”
এবার আতিয়া বানু নিজে ও-কে একটুখানি সাজাতে বসে যায়। তিনি সাধ্যমতো সুন্দরী নাতনিকে আরও রূপসী করে তোলার মহৎকাজে লেগে পড়লেন।
ওর মা এলেন সবশেষে। তিনি ঘুরেফিরে মেয়েকে দেখতে লাগলেন।
আর মেয়ের শাড়িপরা দেখে তিনিও কম অবাক হলেন না। সে শাড়ি পরে। কিন্তু অনেকদিন এর থেকে বিরত ছিল। আজ অনেকদিন পরে সেই স্টাইল ফিরে আসায় তার মনেও আনন্দ।
শাশুড়ির সঙ্গে তিনিও মেয়ের যত্নে লেগে পড়লেন।
দু’জনের আদরে তানজিলা একসময় বলতে থাকে, “হয়েছে মা, আর-কিছু লাগবে না আমার।”
মা বললেন, “লাগবে না কেন? লাগবে। একশ’বার লাগবে। তোকে আজ সাজতেই হবে।”
তানজিলা নিজে যেটুকু সেজেছিল তারউপরে এই দ্বৈত হামলায় সে আরও রূপসী হয়ে উঠতে লাগলো।
আতিয়া বানু হেসে বললেন, “বুবু, আমি কিন্তু তোমার প্রেমে পড়ে যাচ্ছি।”
তানজিলা হেসে ফেললো।
মা হাসিমুখে বললেন, “আজ থেকে তুই যে সাজগোজ শুরু করলি তাতে আমরা সবাই খুশি। এখন থেকে তুই আরও সাজবি। আর নিয়মিত সাজগোজ করবি। তোর এখন সাজারই বয়স। আমার এই কথাটা মনে রাখিস, মা।”
মা-মেয়ের কথার ফাঁকে আতিয়া বানু নাতনিকে হালকা কিছু গহনাও পরিয়ে দিতে ভুল করলেন না।
 
তানজিলা হাসে আর বলে, “দাদিজান, আমি কি মিসওয়ার্ল্ড প্রতিযোগিতায় যাচ্ছি নাকি? আমার এতো সাজগোজ লাগবে না।”
আতিয়া বানু নিজের কাজ করতে-করতে বলেন, “তারচেয়ে বড় কাজে যাচ্ছো, বুবু। আমি চাই এবার তুমি মনের মতো একটা রাজপুত্তর ধরে আনো। আর ধরে আনতে না পারলে আমাদের বলবে আমরা তাকে পাকড়াও করে আনবো। এবার আর-কোনো ভুল হবে না। তোমার পছন্দেই এবাড়িতে সানাই বাজবে।”
তানজিলার মা রেবেকা সুলতানা শাশুড়ির সঙ্গে সুরমিলিয়ে বললেন, “ঠিক বলেছেন মা। আর-কোনো ভুল নয়। আর ভুল তো মানুষ একবারই করে। এবার ভুলশোধরানোর পালা।”
তানজিলা হঠাৎ মনভার করে বললো, “মা, তোমরা ওসব আর বলো না তো। আমি নিজে থেকে ওসব ভুলে যাচ্ছি। আর নতুন জীবনের কথা ভাবছি।”
কথাটা শোনামাত্র আতিয়া বানু খুশিতে খুব জোরে বললেন, “শোকর আলহামদুলিল্লাহ। এই তো চাই বুবু। তুমি আবার আগের মতো জেগে ওঠো। তবেই না বাড়িটা আনন্দে ভাসতে থাকবে।”
এসময় আনন্দে তানজিলার মায়ের চোখ দুটো জলে ভরে উঠতে লাগলো।
 
তানজিলার একবার বিয়ে হয়েছিলো। এটি তার জীবনে একটা দুর্ঘটনা মাত্র। তার এই বিয়েটা ছিল একটা ভয়ানক বিপদস্বরূপ ভয়ংকর দুর্ঘটনা। খুব স্বল্পকালীন বিয়ে ছিল এটা। তবুও এটা তার জীবনের জন্য ভয়ানক যন্ত্রণাদায়ক ছিল। সে এখন এসব ভুলতে চাচ্ছে।
আপাততঃ ছেলেটার সবকিছু ভালোই ছিল। আর ওরা তানজিলাদের মতো এতোটা ধনী না হলেও সমাজে বেশ মানানসই ছিল।
ছেলেটার নাম আকিব মেহেদী। ওদের একটা বাড়ি আছে ধানমন্ডিতে। সেখানেই ওরা এখনও বসত করে।
তানজিলা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার কয়েকদিন পরে বন্ধুদের সঙ্গে ধানমন্ডির একটা রেস্টুরেন্টে যায়। আর সে ওখানকার একটা নামিদামি রেস্টুরেন্টে বন্ধুদের সঙ্গে এক বিকালে আড্ডা দিচ্ছিলো। আর খাবারও খাচ্ছিলো।
সেদিনই প্রথম আকিব আর ওর মা—তানজিলাকে দেখে মুগ্ধ হয়। তারপর শুরু হয় তাদের বিবাহের জালবিস্তার।
তানজিলার এক বান্ধবীর কাছ থেকে ওদের বাসার ঠিকানাটা জোগাড় করে ওরা বিয়ের তোড়জোড় শুরু করে। বিয়ের কথা শুনে প্রথমে তানজিলার পরিবার হকচকিয়ে গিয়েছিলো। পরে ওদের বিভিন্নস্তরের আত্মীয়স্বজন যখন বলতে লাগলো, মেয়েকে তো একদিন-না-একদিন বিয়ে দিতেই হবে। চিরকাল তো আর তাকে ঘরে রাখা যাবে না। তারপর ওরা একটু নরম হতে থাকে।
ওরা বলেছিল, ওদের ছেলে আমেরিকায় থাকে, বিরাটবড় সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার, একমাত্র ছেলে, খুব ভদ্র ইত্যাদি। সবশুনেও মেয়েকে প্রথমে বিয়ে দিতে রাজী হননি আলমগীরসাহেব। কিন্তু এতে সমর্থন করে তার একমাত্র আপন ছোটভাই জাহাঙ্গীর হোসেন।
সে বলেছিল, “ভাইজান, খুব ভালো ছেলে। এরকম ছেলে সহজে ধারেকাছে পাওয়া যায় না। তাই, এমন ছেলে হাতছাড়া করা ঠিক হবে না।”
অবশেষে তিনি সবার কথায় একপ্রকার রাজী হয়ে ছেলেসম্পর্কে খোঁজখবর নেওয়ার সমস্ত দায়দায়িত্ব দিলেন একমাত্র ছোটভাইটিকে। আর সে কয়েকদিন পরে তাকে জানালো—সব ঠিক আছে।
বিয়ে হয়ে গেল। কিন্তু বিয়ের দিন থেকেই বাঁধলো গণ্ডগোল।
তানজিলা বুঝতে পারলো, এটা একটা নেশাখোর। আর সে ভদ্রবেশীশয়তান। তার ইয়াবা থেকে শুরু করে নানারকম যৌনউত্তেজক দ্রব্যাদি সেবনের অভ্যাস রয়েছে। তার আরও সমস্যা আছে। সে খুব বদমেজাজী আর নারীলোভী। একজনে সে তৃপ্ত নয়।
সে রাতে তানজিলা জীবনে প্রথম ধর্ষিত হলো। তারপর আরও কয়েকদিন। তারপর সে খুব ভালোভাবে বুঝলো—এ-কে দিয়ে তার কোনো কাজ হবে না। সে একদিন ফিরে এলো বাবার বাড়িতে। আর তাদের সব জানালো। সেই থেকে সে বাবার বাড়িতে।
তারপর ওরা আরও জানতে থাকে, এই ছেলেটি শুধু আমেরিকায় থাকতো। এখন আর থাকে না। আর সে কোনো সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারও নয়!
 
সবশুনে আলমগীরসাহেব কিছুটা ভেঙ্গে পড়লেন। তিনি কয়েকদিন অফিসে যেতে পারলেন না।
পরে তিনি আস্তে-আস্তে জানলেন, তার আর-কোনো সন্তান কিংবা কোনো পুত্রসন্তান না থাকায় তার ছোটভাইটি এই ছেলের সঙ্গে তার একমাত্র মেয়ের বিয়ে দিয়ে তাদের কোনোরকমে আমেরিকায় পাঠিয়ে ভাইয়ের সমস্ত সম্পত্তি আস্তে-আস্তে গ্রাস করতে চেয়েছিলো। সেই থেকে তিনি খুব সাবধান হয়েছেন। এই সাবধানতার কারণে তিনি নিজের কোম্পানি থেকে অসৎ-আত্মীয়স্বজন প্রায় সব ছাঁটাই করেছেন। এদের কারও কার্যকলাপই তার আগে থেকে ভালো লাগছিলো না। আর একমাত্র মেয়ের এই ভয়ংকর পরিস্থিতির পর তখন তার ‘ঘরপোড়া গোরু সিঁদুরে মেঘ দেখলে ডরায়’-এর মতো অবস্থা। তবুও তিনি এতোদিন এদের জন্য অনেককিছু করেছিলেন। কিন্তু এরপর তিনি আর দেরি করেননি। একমাত্র মেয়ের চোখের জল তাকে কিছুটা কঠিন হতে বাধ্য করেছে। তিনি কোম্পানির স্বার্থে আগাছাগুলো ঝড়ের গতিতে বিদায় করার চেষ্টা করেছেন। তবুও কিছু রয়ে গেছে। বাকীগুলো তিনি এখন সরাবার চেষ্টা করছেন।
এইসময় ইয়াসিনকে পাশে পেয়ে আলমগীরসাহেব ভীষণ খুশি হয়েছেন। তিনি যেন এতোদিনে আকাশের চাঁদ হাতে পেয়েছেন।
 
তানজিলার সাজগোজ শেষ হয়েছে।
তাদের খাসড্রাইভার ইয়াকুব রুমের বাইরে দাঁড়িয়ে বললো, “আপামণি, গাড়ি রেডি। ব্যাগ থাকলে  আমার কাছে দেন।”
তানজিলা বললো, “নারে, আজ কোনো ব্যাগ নাই। তুই নিচে গিয়ে দাঁড়া। আমি এক্ষুনি আসছি।”
তানজিলা দরজার বাইরে আসার আগে দাদিজান ওর কপালে চুমু খেয়ে আদর জানিয়ে দিলেন। সবশেষে ওর মা-ও একই কাজ করলেন। আনন্দে এবার ওর চোখে প্রায় জল এসে গেল।
 
হাসিমুখে বাড়ি থেকে বের হলো তানজিলা।
গাড়িতে উঠেই তানজিলা বুঝতে পারলো—আজ তার খুব ভালো লাগছে। কতদিন পরে যেন তার মনে বসন্তের কোনো ফুল ফুটতে যাচ্ছে। কিন্তু কেন? সে আপনমনে হাসতে লাগলো। আজ সে কেন এতো পাগলামি করতে গেল? বাড়ির লোকগুলো ভাবছে—সে কারও প্রেমে পড়েছে! এসব ভাবতেও তার এখন ভালো লাগছে।
 
ইয়াসিন বিকাল সাড়ে চারটায় গাড়ি থেকে অফিসের সামনে নামলো। সে দ্রুত সিঁড়ি মাড়িয়ে সোজা তিনতলায় উঠে এলো। আর সে বড়সাহেবের রুমের কাছে এসে দাঁড়াতেই দবির হাসিমুখে তাকে সালাম দিয়ে বললো, “স্যার, বড়সাহেব তার আসল খাসকামরায় রয়েছেন। আপনাকে তিনি সেখানে যেতে বলেছেন। আর আপনাকে খবরটা পৌঁছে দেওয়ার জন্যই আমি এখানে এতোক্ষণ দাঁড়িয়ে রয়েছি।”
তারপর সে হাততুলে ইয়াসিনকে বড়সাহেবের খাসকামরাটা দেখিয়ে দিলো।
 
দবিরকে ধন্যবাদ জানিয়ে ইয়াসিন দ্রুতবেগে হেঁটে তিনতলার সর্বশেষ একটা বড়কক্ষের সামনে এসে দাঁড়াতেই পিছন থেকে দবির তাকে বললো, “স্যার, সোজা ভিতরে ঢুকে যান। স্যার বলেছেন আপনার ভিতরে ঢুকতে কোনো পারমিশন লাগবে না।”
কথাটা বলে সে রুমের দরজা খুলে দিলো।
ইয়াসিন তবুও বড়সাহেবের খাসকামরার সামনে এসে দাঁড়িয়ে রইলো।
শেষে দবিরই বড়সাহেবকে বললো, “স্যার, ইয়াসিন-স্যার এসেছেন।”
কথাটা শুনে বড়সাহেব কিছুটা লাফিয়ে উঠে বললেন, “উনাকে এক্ষুনি ভিতরে আসতে বলো।”
ইয়াসিন এবার সালাম দিয়ে ভিতরে ঢুকে পড়লো।
 
বড়সাহেবের মুখে প্রশান্তির হাসি। তিনি ইয়াসিনের দিকে তাকিয়ে বললেন, “আগে একটু বসুন। আর কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিন। তারপর ফ্যাক্টরির সব কথা শুনবো।”
এরই একফাঁকে বড়সাহেব হাততুলে দবিরকে কাছে ডেকে আস্তে বললেন, “যাও, পাশের হোটেল থেকে তোমার স্যারের জন্য গরম-গরম তন্দুর-রুটি আর কাবাব নিয়ে এসো। আর সঙ্গে ঠাণ্ডা পানীয়। উনি সারাদিন পরিশ্রম করেছেন। এবার একটু সেবাযত্ন করো।”
ইয়াসিন বাধা দিতে গিয়ে পারলো না।
বড়সাহেব তার বাধা তো শুনলেনই না—বরং তিনি বললেন, “আপনি আজ আমাদের কোম্পানির জন্য অনেককিছু করেছেন। এই সম্মান আপনার প্রাপ্য। আর তাই, আপাততঃ এই সামান্য আয়োজন। পরে অবশ্য আরও ভালোকিছু পাবেন।”
ইয়াসিন হেসে বললো, “ধন্যবাদ স্যার। আমার মতো একজন সাধারণ মানুষকে আপনি স্নেহ করেন, এই তো আমার বিরাট পাওয়া।”
বড়সাহেব এবার কিছুটা গম্ভীর হয়ে বললেন, আপনি কবি মানুষ। লেখকও বটে। আপনার মতো সুন্দর করে হয়তো আমি কথা বলতে পারি না। কিন্তু বিশ্বাস করুন, আমি যা বলি মন থেকে বলি। আর আপনি আমার স্নেহকে শ্রদ্ধা করেন জেনে খুব খুশি হলাম। কিন্তু জানেন, ইয়াসিনসাহেব, এই দেশে আজ অনেকে এতোই অকৃতজ্ঞ যে এরা মানুষের আন্তরিক স্নেহের মূল্যও দিতে জানে না। এদের মতো অমানুষের জন্য আজ শুধু আমার একটি কোম্পানি নয়—এই দেশটাও উচ্ছন্নে যেতে বসেছে। এরা দেশের ও দশের শত্রু।”
মনের মতো মানুষ পেলে ইয়াসিন গল্প করতে ভালোবাসে। বড়সাহেবের সুন্দর কথা শুনে তার মনটা একেবারে ভরে গেল। সে আবেগসংবরণ না করে বড়সাহেবের কথার সূত্র ধরে বললো, “স্যার, আপনি অনেক দামি কথা বলেছেন। আর আপনি চমৎকার একটি উদাহরণ দিয়েছেন। গুটিকতক অমানুষের জন্য আজ শুধু আমাদের একটি কোম্পানি নয়—এই দেশটাও ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। কিন্তু আমরা এসব দেখে হাত-পা গুটিয়ে আর বসে থাকতে পারবো না। এদের বিরুদ্ধে এবার আমাদের একযোগে কাজ করতে হবে। দেশের স্বার্থে আর মানুষের প্রয়োজনে সবার আগে আমাদের এই কোম্পানি থেকে সর্বস্তরের দুর্নীতিবাজদের অপসারণ করতে হবে। এদের চিরতরে উৎখাত করতে হবে। এই মিলকারখানা গরিবমানুষের রক্তে গড়ে উঠেছে। তাদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে আর এই কোম্পানি টিকিয়ে রাখার স্বার্থে দুর্নীতিবাজ নিমকহারামদের তাড়াতে হবে। এরা লুটপাট করে এদেশের সব কলকারখানা ধ্বংস করে দিচ্ছে। এবার এদেরই ধ্বংস করতে হবে। এরা মানুষ নয়—মানুষ আর মানবতার শত্রু। এই শয়তানদের কোনো ক্ষমা নাই। এদের ধরতেই হবে, স্যার।”
কথাগুলো হঠাৎ বড়সাহেবের সামনে বলে সে যেন কিছুটা লজ্জা পেলো। আর সে লাজুকভঙ্গিতে বড়সাহেবের দিকে তাকিয়ে বলতে লাগলো, “স্যরি স্যার, আপনি বলেছেন আমরা কবি মানুষ। তাই, কথা বলতে গিয়ে আপনার সামনে আবেগে কিছু কঠিন শব্দ উচ্চারণ করেছি। আপনি কিছু মনে করবেন না, স্যার।”
ইয়াসিনের কথা শেষ হতেই বড়সাহেব তাকে বাহবা দেওয়ার ভঙ্গিতে বললেন, “কীসের এতো মনে করাকরি। আপনি তো ঠিকই বলেছেন। এরা শয়তান। এরা জানোয়ার। এদের শাস্তি হওয়া দরকার। আর আপনি তো আমার ছেলের মতো কথা বলেছেন।”
এবার ইয়াসিন খুশি হয়ে বললো, “স্যার, আপনার ছেলে আছে—তা তো আগে জানতাম না। তাহলে তো ভালোই হলো। এবার থেকে উনি অফিসে আসলে তো আমাদের জন্য খুব ভালো হবে।”
বড়সাহেব এবার শব্দ করে হাসলেন। তারপর বললেন, “আমার কোনো ছেলে নাই। তানজিলা আমার একমাত্র সন্তান। আর আপনি আমার ছেলের কথা বলেছেন। সে তো আপনি। হ্যাঁ, আপনি তো আমার ছেলের মতোই। আসলে, আমি বলতে চেয়েছি, আমার ছেলে থাকলে কোম্পানির স্বার্থে সেও হয়তো এরকমই করতো আর আপনার মতোই এরকম শক্ত কথা বলতো।”
বড়সাহেবের এই স্নেহের সুরে ইয়াসিনের চোখে প্রায় জল এসে যাওয়ার জোগাড় হলো।
আর তখনই কক্ষে প্রবেশ করলো তানজিলা। বড়সাহেব তাকে দেখে উঠে দাঁড়িয়ে আদর করে তার হাত ধরে তার কাছে এনে বসালেন।
বড়সাহেবের দেখাদেখি ইয়াসিনও উঠে দাঁড়িয়েছে। প্রথমে বড়সাহেব এটা খেয়াল করেননি। পরে তা দেখে তিনি ইয়াসিনের উদ্দেশ্যে বললেন, “আহা, আহা, আপনি দাঁড়িয়েছেন কেন? আপনি এবার বসুন তো।”
তারপর বড়সাহেব তানজিলাকে দেখিয়ে বলতে লাগলেন, “এ হচ্ছে আমার রাজকন্যা। আমার কাছে সাতরাজার ধন। আজ অনেকদিন পরে সে আবার অফিসে এসেছে—তাই আমি তাকে একটু সেলিব্রেট করার জন্য উঠে দাঁড়ালাম।”
তানজিলা এসময় চেয়ারে বসে বাবার কাণ্ড দেখে ও কথা শুনে হাসছিলো।
ইয়াসিন বললো, “স্যার, উনি তো আমার অনেক সিনিয়র। আর বসও বটে। তাই...।”
বড়সাহেব ওর মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বললেন, “এখন তো আপনারা দু’জনে সমানসমান। এরই মধ্যে কি আপনি ভুলে গেলেন—আপনাকে তো আমি আজকের দিনের জন্য এই কোম্পানির ডিরেক্টর অব এডমিন বানিয়ে দিয়েছি। দিনতো এখনও শেষ হয়নি। আপনি তো এখনও সেই পদে বহাল রয়েছেন। অতএব, বসুন। বসুন।”
ইয়াসিন এবার বসে পড়লো।
তারপর তিনি মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, “মামণি, এই হলো আমাদের কোম্পানির আজকের ডিরেক্টর অব এডমিন ইয়াসিন কবির। তিনি একজন সাহিত্যিক। ব্লগে আমি তার লেখা এখন নিয়মিত পড়ি। খুব ভালো লেখেন তিনি। আর তিনি কোনো টিনএজারদের লেখক নন। তিনি নবীন কিন্তু সিরিয়াস লেখক। ইদানীং তার লেখা পড়ে আমার মনে হয়েছে—এতোদিনে বাংলাদেশ সত্যিকারের একজন জাতসাহিত্যিক পেতে যাচ্ছে। দেশে এমনই আরও লেখক প্রয়োজন।”
বড়সাহেবের মুখে এতো-এতো প্রশংসা শুনে ইয়াসিন কিছুটা লজ্জায় আড়ষ্ট হয়ে বসে রইলো।
ইয়াসিন সালাম দেওয়ার আগেই তানজিলা তাকে সালামসহ হ্যালো বললো।
ইয়াসিনও হ্যালো বলে তাকে অভ্যর্থনা জানালো।
তানজিলা বড়সাহেবের ডানপাশে বসেছে। আর তার ঠিক সামনেই হাত দুয়েক দূরে ইয়াসিন।
তানজিলাকে দেখে ইয়াসিনের মনে হলো: এরকম রূপকন্যা এদেশে খুব কমই আছে। তার আরও মনে হলো—বাগানে লালগোলাপ ফুটে থাকলেও তা দেখতে এতো সুন্দর লাগে না।
বড়সাহেব বললেন, “এবার আমাদের মিটিং শুরু করি।”
তানজিলা বাবার কথায় হেসে সম্মতি জানালো।
 
বড়সাহেব আন্তরিকতার সুরে বলতে লাগলেন, “ইয়াসিনসাহেব, আজ আপনি যা করেছেন—তাতে কোম্পানি আপনার কাছে কৃতজ্ঞ। আপনার সাহসিকতায় আমাদের এতোদিনের প্রায় অচল হয়ে যাওয়া প্রতিষ্ঠানটি আবার ঘুরে দাঁড়াবে বলে আশা করছি। আপনি আমার সন্তানের মতো আর কোম্পানির একজন বিশ্বস্ত সেনাপতি হিসাবে দায়িত্বপালন করেছেন। এজন্য আমি ব্যক্তিগতভাবেও আপনার কাছে কৃতজ্ঞ। আপনাকে আরও কয়েকদিন ওই ফ্যাক্টরিতে যাতায়াত করতে হবে। এতে হয়তো আপনার কষ্ট হবে। কিন্তু কোম্পানির স্বার্থে আমি আপনার এই সহযোগিতাটুকু চাচ্ছি। আপনার কী মত?”
ইয়াসিন বিনয়সহকারে বললো, “স্যার, এটা আমার সৌভাগ্যের বিষয় যে, আপনি আমাকে এতোবড় একটা দায়িত্ব দিয়েছেন। এই দায়িত্বপালনে আমি আমার সাধ্যমতো চেষ্টা করবো। আর আমাদের জুতার ফ্যাক্টরিটাকে আবার উৎপাদনশীল ও লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করবো। আমাদের চেষ্টা সফল হবেই, স্যার।”
বড়সাহেব হেসে বললেন, “খুব খুশি হলাম আপনার কথা শুনে। যাক, আমি এখন মরেও শান্তি পাবো। আপনার মতো যোগ্যলোক থাকলে আমাদের এই কোম্পানি আর-কোনো বারোভূতে লুটেপুটে খেতে পারবে না। আজ টিভিতে আপনার সাহসিকতা দেখেছি। আপনার বুদ্ধিমত্তায় মুগ্ধ হয়েছি। আর আপনার বক্তব্যে দেশের মানুষ পর্যন্ত অনুপ্রাণিত হয়েছে। এতে আমাদের গ্রুপ অব কোম্পানির সুনাম বহুগুণে বেড়ে গেছে।”
ইয়াসিন কিছু বলতে চাচ্ছিলো। কিন্তু তার আগেই তানজিলা একটু হেসে খুব সুন্দর করে বলতে লাগলো, “আপনার মতো সুন্দরমনের মানুষকে পেয়ে আমরা সত্যি খুব খুশি। বাবা তো অনেক আগে থেকে আপনাকে খুব পছন্দ করেন। আর এটা শুনেই আমি আমার পিএইচডি’র থিসিসটা আপনাকে দেখে দেওয়ার কথা বলি। এতে হয়তো আপনার কষ্ট হবে।”
এবার ইয়াসিন বাধা দিয়ে বললো, “না-না, কোনো কষ্ট নয়। আপনার এই মহৎকাজে নিজেকে সম্পৃক্ত করতে পেরে বরং আমি গর্বিত।”
 
এদিকে দবির গরম তন্দুর আর কাবাব নিয়ে এলো।
বড়সাহেব হেসে বললেন, “মিটিং চলবে। আবার খাওয়াদাওয়াও চলবে।”
এরপর তিনি ইয়াসিনকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “তবে আপনি আগে খেয়ে নিন। আপনার খাওয়াটা আগে জরুরি। পরে আমরা ফাঁকে-ফাঁকে কথা বলবো।”
 
বয়স হওয়ায় বড়সাহেব এসব খাবার খান না। এসব ইয়াসিনও জানে। তাই, সে খাওয়ার ব্যাপারে বড়সাহেবকে কিছু-একটা বলতে গিয়েও আর বললো না। তার কাছে এসব লোকদেখানো ভদ্রতাপ্রদর্শনের কোনো মূল্য নাই। ইয়াসিন সবসময় যা করার তা মন থেকেই করে থাকে।
সে মনে-মনে ভাবছিলো—তানজিলাকে খাবারে অংশগ্রহণ করতে বলবে কিনা। তার মনের ভিতরে বিরাট একটা দ্বিধাদ্বন্দ্বও কাজ করছিলো। জীবনে প্রথম দেখা তাদের। তারউপরে সে আবার অসামান্য রূপসী আর রাজকন্যা! শেষে সে সকল দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাটিয়ে বলেই ফেললো, “ম্যাডাম, আপনি যদি আমার সঙ্গে খাবারে একটু অংশ নেন—তাহলে আমি খুশি হবো। অবশ্য আপনার যদি কোনো আপত্তি না থাকে।”
এবার তানজিলা নিজে থেকে সোৎসাহে হেসে বললো, “হ্যাঁ, আমি তো খেতে চাই। আপনার খাবার দেখে আমার ভীষণ লোভ হচ্ছে। কিন্তু আপনার যদি আপত্তি থাকে!”
ইয়াসিন এতে কিছুটা অবাক হয়ে জানতে চাইলো—তার মানে?
তানজিলা মোহনীয় ভঙ্গিতে হেসে বললো, “আমি খেতে বসলে আপনার ভাগে যদি কম পড়ে!”
ইয়াসিন এবার হাসতে-হাসতে বললো, “না-না, কম পড়বে না—বরং আপনি খেলে আমি খুশি হবো।”
বড়সাহেব ওদের কথার ফাঁকে বললেন, “এবার তাহলে আমি কয়েক মিনিটের জন্য আমার অফিস থেকে ঘুরে আসি।”
তিনি বাইরে বেরিয়ে গেলেন। দবিরও তার সঙ্গে রয়েছে।
 
ইয়াসিন দেখলো, তার প্লেটে পর্যাপ্ত খাবার রয়েছে। দু’জনের চেয়ে বেশি মানুষ এগুলো খেতে পারবে।
সত্যি, আজ দুপুরে তার তেমনকিছুই খাওয়া হয়নি।
দবির আগে একটা প্লেট সাজিয়ে দিয়েছিলো। এবার ইয়াসিন তার থেকে আরও একটা প্লেট সাজাতে লাগলো। সে নিজের হাতে আগে তানজিলার প্লেটটা সাজিয়ে দিয়ে বললো, “নিন ম্যাডাম, শুরু করুন।”
তানজিলা হঠাৎ মনভার করে বললো, “এতো ম্যাডাম-ম্যাডাম বললে তো আমি খাবো না।”
ইয়াসিন একথা শুনে হেসে বললো, “তবে আপনাকে কী বলে ডাকবো?”
তানজিলা এবার খুব সুন্দর করে হেসে বললো, “কেন আমার নাম ধরে ডাকবেন। হ্যাঁ, আমার নাম ধরেই আপনি ডাকবেন। আর এই অফিসে এটা শুধু আপনার জন্য পারমিটেড।”
ইয়াসিন বললো, “বেশ, তা-ই হবে।”
তারপর সে কী যেন একটুখানি ভেবে বললো, “তাহলে তো আপনাকে ওপাশে অতদূরে বসে খাওয়া ঠিক হবে না। ঠিক আমার মুখোমুখি আর কাছাকাছি বসতে হবে। নইলে পরপর মনে হবে।”
এতে তানজিলা ফিক করে হেসে সে তার বাবার চেয়ারটা অনেকখানি সরিয়ে নিজেরটা এগিয়ে ইয়াসিনের ঠিক মুখোমুখি বসলো।
 
ওরা খাচ্ছিলো। বেশ আনন্দে আর তৃপ্তিসহকারে। ফাঁকে-ফাঁকে কথাও হচ্ছে।
তানজিলা একফাঁকে বললো, “আমাকে হঠাৎ অফিসে দেখে আপনার খারাপ লাগছে নাতো?”
ইয়াসিন মুখতুলে হেসে বললো, “না-না, এতো আপনারই অফিস। তবে আমি আপনাকে দেখে ভীষণ অবাক হয়েছি।”
তানজিলা সঙ্গে-সঙ্গে বললো, “কেন-কী জন্যে?”
এবার ইয়াসিন একটু সময় নিচ্ছে। কথাটা সে কীভাবে তাকে বলবে—তা যেন সে ভেবে পাচ্ছে না।
এতে তানজিলা খাওয়া বাদ দিয়ে ইয়াসিনের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে।
ইয়াসিন একটু পরে কোনোরকম ভান না করে বললো, “কিছু মনে করবেন না—আপনি এতো সুন্দর! আর একটা পরীর চেয়েও সুন্দর! আর আমার অনুমানের চেয়েও কয়েকগুণ বেশি সুন্দর। তাই, আপনাকে আজ প্রথম দেখে আমি যারপরনাই মুগ্ধ হয়েছি।”
তানজিলার খাওয়া বন্ধ হয়ে গেছে। সে এতোক্ষণ চুপ করে ইয়াসিনের কথা শুনছিলো।
তারপর ইয়াসিন খেতে-খেতে আবারও বলতে থাকে, “কোনো মানুষ যে এতো সুন্দর হতে পারে তা আমার আগে জানা ছিল না। আপনাকে দেখে আমার সে ভুল আজ ভাঙ্গলো। সত্যি বলছি, আর এখনও ভাবছি: মানুষ এতো সুন্দর হয়!”
এসব শুনে তানজিলা একটু শব্দ করে হেসে বললো, “এবার খান তো। কাবাব-তন্দুর সব তো ঠাণ্ডা হয়ে যাবে। আর এগুলো ঠাণ্ডা হয়ে গেলে মজা লাগে না।”
তানজিলা নিজেও একটা তন্দুর খেয়ে ফেললো! আর সে খাওয়া শেষ করে বললো, “আমি আপনার কাছে কৃতজ্ঞ। কারণ, আপনি আমাকে খেতে বলায় আজ অনেকদিন পরে আমি একটা আস্ত তন্দুর হজম করতে যাচ্ছি!”
বড়সাহেব রুমে ঢুকে একথা শুনে বললেন, “খুশি হলাম মা। তুমি যে একটা তন্দুর খেতে পারো সে কথা আমিও তো ভুলেই গিয়েছিলাম। আজ আবার বিশ্বাস ফিরে পাচ্ছি।”
 
 
(চলবে)
 
 
সাইয়িদ রফিকুল হক
মিরপুর, ঢাকা, বাংলাদেশ।
 
 

ছবি
সেকশনঃ সাহিত্য
লিখেছেনঃ সাইয়িদ রফিকুল হক তারিখঃ 10/10/2017 03:49 PM
সর্বমোট 199 বার পঠিত
ফেসবুকের মাধ্যমে কমেন্ট করুণ

সার্চ