ব্যাকগ্রাউন্ড

মুক্তচিন্তার বিশ্ব

আপনার পছন্দের যে কোন কিছু সহব্লগারদের সাথে শেয়ার করতে ও শেয়ার কৃত বিষয় জানতে এখানে ক্লিক করুণ

ফেইসবুকে!

দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ কি?

দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ কি?

বিষয়টা সোজা ভাষায় এরকম- কেউ একটি বিষয়ের উপর  প্রস্তাব উপস্থাপন করলো (থিসিস দিল) । আরেকজন সেই প্রস্তাবটির বিপক্ষে প্রতিবাদ করলো অথবা সেই বিষয়ের উপর নতুন একটি প্রস্তাব পেশ করলো  (এ্যান্টিথিসিস দিল)। এই বাদ(Thesis) প্রতিবাদের(Anti-thesis) মধ্য থেকে যে নতুন  অধিকতর গ্রহণযোগ্য সিদ্ধান্তের  উৎপত্তি হয় তা হল synthesis. সিনথিসিসের মাধ্যমে প্রাপ্ত নতুন চিন্তাটি নতুন প্রস্তাব(থিসিস) হিসাবে কাজ করবে আবার একটা পর্যায়ে এর প্রতিপ্রস্তাব(এ্যান্টিথিসিস) আসবে। একইভাবে “থিসিস” ও “এ্যান্টিথিসিসে”র সংশ্লেষণে নতুন থিসিস তৈরী হবে এবং এভাবে প্রগতির বিকাশেষ ঘটে, এই যুক্তি এন্টি যুক্তির নির্যাসের ফসলকেও দ্বান্দ্বিক বস্তবাদ বলা যেতে পারে,  প্রক্রিয়া চলতে থাকবে অনির্দিষ্টকালের জন্য…. এটাই হল দ্বান্দ্বিকতাবাদ।  

ইংরেজি -Dialectical materialism ( দ্বান্দ্বিক বস্তবাদ) ন্যায়শাস্ত্রসম্মত প্রকৃতিবাদ বলতে পারি। 

যেহেতু দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ বিজ্ঞান থেকে শক্তি আহরণ করেছে বা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে জগত ও জীবনের সার্বিক বিশ্লেষণ এবং ব্যাখ্যা দান করে তাই একে বৈজ্ঞানিক বস্তুবাদও বলা হয়। 

সভ্যতার বিকাশের দ্বান্দ্বিক   প্রক্রিয়া চিরন্তন এবং এভাবেই পুরাতন সমাজ ভেঙে নতুন সমাজের জন্ম হবে। সভ্যতা এক স্তর থেকে আরেক স্তরে উন্নীত হবে।

(বি.দ্র. বিষয়টি বিজ্ঞজন আরো সুন্দরভাবে ব্যখ্যা করতে  পারবেন, আমি নিজেরমত মতামত দিয়েছি মাত্র , বিস্তারিত পড়ার সুবিধার্থে ভ্যাসিলি ক্রাপিভিল এর লিখা বাইটির বাংলা অনুবাদ যুক্ত করছি। ) 

Marx and Engels

ছোট্ট একটি উদাহরণ দেই (হয়তো বিজ্ঞজন দ্বিমত করবেন) : ধরুন আমার গৃহিনী নতুন ঘর তৈরীতে দক্ষিনমুখী দরজা রাখার প্রস্তাব করেছে, আমি ঘরটি পশ্চিম দরজার পক্ষে যুক্তিযুক্ত কারন ব্যখ্যা করলাম, আমার যুক্তিতে পশ্চিম দরজা ঘর তৈরী করার কি কি সুবিধা হবে, বিষয়টি পরিবার অন্যান্য সদস্যদের পক্ষ বিপক্ষের মতামত চলতে থাকল, শেষ পর্যন্ত অধিকাংশ সদস্য একটি সিদ্ধান্তে একমত হইলাম যে, ঘরটি উত্তর দরজা করা হইবে, এই সম্মতি ও যুক্তির পাল্টা যুক্ততে একটি স্থির সমাধানে পৌঁছা গেল, এটি একটি #দ্বান্দ্বিক_বস্তবাদ' ) ।  যত পৃথিবী  সামনে এগিয়ে চলবে, এই দ্বান্দ্বিক বস্তবাদের স্থিউরি চলমান ।  

দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের ঐতিহাসিক ভিত্তি: 

উনিশ শতকের প্রথমার্ধে দ্বান্দ্বিক ও ঐতিহাসিক বস্তুবাদের আত্মপ্রকাশের তত্ত্বগত পূর্বশর্তগুলো গড়ে উঠেছিলো। ঊনবিংশ শতকের ধ্রুপদী জার্মান দর্শনের প্রগতিশীল ভাবধারনা, সর্বোপরি হেগেল ও ফয়েরবাখের দর্শন ছিলো দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের তত্ত্বগত উৎসকার্ল মার্কস ও ফ্রিডরিখ এঙ্গেলসের দার্শনিক অভিমত পরিগ্রহ করেছিলো বিপ্লবী প্রলেতারিয়েতের অবস্থান থেকে হেগেলের দ্বন্দ্ববাদ ও ফয়েরবাখের বস্তুবাদের এক সমালোচনাত্মক সমীক্ষার মধ্য দিয়ে। 

 দ্বান্দিক বস্তবাদ কী?   পিডিএফ  লিংক  


একটিমাত্র দর্শন দিয়ে তাবৎ দুনিয়ার যাবতীয় বিষয়কে ব্যাখ্যা করা সম্ভব। মার্কস এর দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের দর্শন পৃথিবীর ইতিহাসকে খুব জোড়ে আঘাত করেছে। বলা যায়, দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের দর্শন পৃথিবীর ইতিহাসকে পাল্টে দিয়েছে অথবা পৃথিবীর ইতিহাস বস্তুবাদের দ্বান্দ্বিক নিয়মে পরিবর্তিত হয়েছে,আর মাক্স শুধু প্রকৃতি থেকে বস্তুবাদের দ্বন্দ্বদর্শনের সূত্রকে আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন। দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের দর্শনের মাধ্যমে সমগ্র জ্ঞানকান্ড মোটা দাগে দুইভাগে ভাগ হয়ে গেছে। তাহল- ভাববাদ(Idealism) ও বস্তুবাদ(Materialism)। 


এখন কথা হলো, দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ যেহেতু বৈজ্ঞানিক এবং মানব সমাজের অন্তঃদ্বন্দ্ব যেহেতু চিরন্তন তাই সভ্যতার বিকাশের এক পর্যায়ে মানুষের আচরণগত মৌলিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে শ্রেণীহীন সমাজ বিকাশ লাভ করতে পারে বস্তুবাদের দ্বান্দ্বিক নিয়মে।



আমরা জানি, বিজ্ঞানে  ধ্রুব সত্য বলতে কিছু নেই।বৈজ্ঞানিক উপায়ে জীবন ও জগতকে ব্যাখ্যা করার জন্য যদি নতুন কোন দর্শনের উদ্ভব ঘটে তাহলে সেটি দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের প্রতিপ্রস্তাব বা নতুন থিউরি হিসাবে দেখা দিবে।তখন প্রস্তাব ও প্রতিপ্রস্তাব থেকে  তত্ত্ব বা দ্বান্দ্বিক উপায়ে  নতুন একটি সিদ্ধান্তের জন্ম হবে। ভ্যতার এই চিরন্তন দ্বান্দ্বিকতা চলতে থাকুন, মানব সমাজ সামনে এগিয়ে যাক, প্রগতির পথ সামনে এগিয়ে চলুক, এ৺৺৺৺ হউক । .. 

 

খ) মার্কসবাদী জ্ঞানতত্ত্ব :

১। মানুষের সামাজিক অনুশীলন উৎপাদন কর্মের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর বাইরেরও অনেক রূপ থাকতে পারে। শ্রেণী সংগ্রাম, রাজনৈতিক, বৈজ্ঞানিক, শিল্পকলা ইত্যাদি।

২। শ্রেণী বিভক্ত সমাজে প্রত্যেকে একটি নির্দিষ্ট শ্রেণীর সদস্য হিসেবে বাস করে, তাই ব্যতিক্রমহীনভাবে ব্যক্তির সব রকমের চিন্তাধারার উপরেই শ্রেণীর প্রভাব বিদ্যমান থাকে।
৩। মানুষের জ্ঞান ধাপে ধাপে নিন্মতর স্তর থেকে উচ্চতর স্তরে বিকাশ লাভ করে।
 
৪। মানুষের সামাজিক প্রয়োগই বহির্জগৎ সম্পর্কে মানুষের জ্ঞানের সঠিকতা যাচাইয়ের একমাত্র মাপকাঠি। সামাজিক প্রয়োগ হলো– বৈষয়িক উৎপাদন, শ্রেণী সংগ্রাম, অথবা বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা–নিরীক্ষার প্রক্রিয়া ইত্যাদি।
 
৫। প্রয়োগে ব্যর্থ হয়েই মানুষ তা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে এবং নিজের চিন্তাকে সংশোধন করে বহির্জগতের নিয়মের সাথে সংগতিপূর্ণ করে তোলে। “বিফলতাই সফলতার জননী।”
 
৬। লেনিন তাঁর ‘হেগেলের “যুক্তিশাস্ত্রের বিজ্ঞান”–এর সংক্ষিপ্ত সার’ লেখায় বলেছেন, “প্রয়োগ (তত্ত্বগত) জ্ঞানের চেয়ে অনেক বড়, কারণ তার যে শুধু সার্বজনীনতার গুণ আছে তাই নয়, তাতে আছে আশু বাস্তবতার গুণও।”
 
৭। দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদী মার্কসবাদী দর্শনের দুটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো– “শ্রেণী প্রকৃতি”, যা প্রকাশ্যেই ঘোষণা করে যে, দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ সর্বহারা শ্রেণীর সেবায় নিয়োজিত এবং “বাস্তব প্রকৃতি”, এতে গুরুত্বের সাথে বলা হয় যে, তত্ত্ব প্রয়োগের উপর নির্ভরশীল, তত্ত্বের ভিত্তিই হচ্ছে প্রয়োগ, আবার তত্ত্ব প্রয়োগের সেবা করে। দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের জ্ঞানতত্ত্বে প্রয়োগের দৃষ্টিভঙ্গীই হলো প্রথম এবং মূল দৃষ্টিভঙ্গী।
 
৮। জ্ঞানের প্রথম পর্যায় হলো– “ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জ্ঞান”। এই পর্যায়ে মানুষ গভীর ধারণা গঠন করতে পারে না, কোন যুক্তিসিদ্ধ সিদ্ধান্তও টানতে পারে না। এর পরের পর্যায় হলো– “ধারণাত্মক জ্ঞান”। এই পর্যায়ে ইন্দ্রিয়লব্ধ জ্ঞানকে মানুষ মস্তিষ্কের ধারণাগুলো (ধারণা, বিচার, অনুমান) দ্বারা বিচার–বিশ্লেষণ করে। বস্তু সম্পর্কে জানার আসল কাজটি হলো ইন্দ্রিয়ানুভূতির মধ্য দিয়ে চিন্তায় পৌঁছানো, ধাপে ধাপে বাস্তব বস্তুর আভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের বিষয়ে, তার নিয়মবিধি সম্পর্কে এবং দুইটি প্রক্রিয়ার মধ্যেকার আন্তঃসম্পর্কের বিষয়ে উপলব্ধিতে পৌঁছানো; অর্থাৎ, যৌক্তিক জ্ঞানে পৌঁছানো।
 
৯। ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জ্ঞান বস্তুর পৃথক পৃথক দিক, বাহ্য রূপ এবং বহিঃসম্পর্কের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। যৌক্তিক জ্ঞান সামনের দিকে একটা বড় ধাপ অগ্রসর হয়ে বস্তুর সমগ্রতা, সারমর্ম ও অন্তঃসম্পর্কে গিয়ে পৌঁছায় এবং পারিপার্শ্বিক জগতে আভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বকে প্রকাশ করে। যৌক্তিক জ্ঞান পারিপার্শ্বিক জগতের বিকাশকে তার সমগ্রতায়, তার সমস্ত দিকগুলির অন্তঃসম্পর্কের মধ্যে আয়ত্ত করতে সক্ষম।
 
১০। ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জ্ঞান, নিম্ন পর্যায়ের জ্ঞান; আর যৌক্তিক জ্ঞান, উচ্চতর পর্যায়ের। উভয় প্রক্রিয়াই জ্ঞানলাভের একক প্রক্রিয়ার অংশ। ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জ্ঞান ও ধারণাত্মক জ্ঞান গুণগতভাবে পৃথক, কিন্তু পরষ্পর থেকে বিচ্ছিন্ন নয় – প্রয়োগের ভিত্তিতে তারা ঐক্যবদ্ধ।
১১। একজন মানুষের জ্ঞান কেবল দুটি অংশ নিয়ে গঠিত। একটি হলো “প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা”, অপরটি হলো “পরোক্ষ অভিজ্ঞতা”।
 

১২। জ্ঞানের প্রক্রিয়ায় বহির্জগতের বিষয়গুলির সঙ্গে যোগাযোগ হলো প্রথম ধাপ। এটা ইন্দ্রিয়ানুভূতির পর্যায়ের অন্তর্গত, অর্থাৎ “ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জ্ঞান”। দ্বিতীয় ধাপটি হলো ইন্দ্রিয়লব্ধ তথ্যগুলিকে সাজিয়ে ও পুনর্গঠন করে সেগুলির সংশ্লেষণ করা। এটা ধারণা, বিচার, অনুমান পর্যায়ের অন্তর্গত, অর্থাৎ “ধারণাত্মক জ্ঞান”। ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য তথ্যগুলি যখন খুব সমৃদ্ধ (অসংলগ্ন নয়) ও বাস্তবানুগ (ভ্রান্ত নয়) হয়, একমাত্র তখনই সেগুলি সঠিক ধারণা ও যুক্তি গঠনের ভিত্তি হতে পারে।

 
১৩। ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জ্ঞানের উপর ধারণাত্মক জ্ঞান নির্ভরশীল। তাই ধারণাত্মক জ্ঞান নির্ভরযোগ্য। এখানে উল্লেখ্য যে, ভাববাদীরা ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জ্ঞানের উপর ধারণাত্মক জ্ঞানের নির্ভরশীলতা মানেন না। আবার কেউ কেউ বলেন ক্ষুধা, যৌনতা, ঈশ্বরের ধারণা সহজাত। কিন্তু মার্কসবাদী দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ এমন ধারণাগুলোকে খারিজ করে। মানুষের শরীরে রাসায়নিক পরিবর্তনের ফলেই ক্ষুধা লাগে, আর তা সে অনুভব করে ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমেই, তাই এটি সহজাত ধারণা নয়। এবার আসা যাক যৌনতার প্রশ্নে, একটি নির্দিষ্ট সময়ের পর মানুষের শরীরে পরিবর্তন আসে, তার যৌন অঙ্গগুলো তখন সপ্রতিভ হয়ে উঠে। এই পরিবর্তনের জ্ঞান মানুষ ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমেই গ্রহণ করে, আর এসময়ে তার যৌন অঙ্গে (যে সব অঙ্গ যৌন অনুভূতি প্রকাশ করে) হাত বা অন্যকোন কিছুর স্পর্শে যৌন অঙ্গের আকার–আকৃতি পরিবর্তিত হয়, যা মূলত রাসায়নিক পরিবর্তন, এই পরিবর্তনের জ্ঞানও কিন্তু মানুষ তার ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমেই গ্রহণ করে, তা সহজাত নয়। আর ঈশ্বরের ধারণা, পুরোপুরিই ভাববাদী ধারণা, এটি কখনোই সহজাতভাবে থাকে না, বরং পারিপার্শ্বিক অবস্থায় তা মানুষের মনে জায়গা করে নেয়, আর তা মানুষ ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমেই গ্রহণ করে, তাও সহজাত নয়। এটি কেবলই ভাববাদীদের দ্বারা প্রচারিত, প্রকাশিত। এই ভাববাদী, প্রতিক্রিয়াশীলদের ভ্রান্ত ধারণাগুলোর মধ্যে “খৃষ্টীয় কমিউনিজম” বা “ইসলামিক সোস্যালিজম”–এর ধারণা অন্যতম।
 
১৪। অভিজ্ঞতা থেকেই জ্ঞানের সূচনা – এই হলো “জ্ঞানতত্ত্বের বস্তুবাদ”। যার মানে হলো – জ্ঞান সহজাত নয়, অভিজ্ঞতার মাধ্যমেই মানুষ জ্ঞান লাভ করে। জ্ঞানকে গভীরতর করা দরকার, জ্ঞানের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য পর্যায় থেকে ধারণাত্মক পর্যায়ে উন্নীত করা প্রয়োজন – এটাই “জ্ঞানতত্ত্বের দ্বন্দ্ববাদ”। এর মানে হলো– দ্বান্দ্বিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে জ্ঞানকে উচ্চতর স্তরে পৌঁছানো, যাতে যৌক্তিক জ্ঞানলাভ সম্ভব হয়।
 
১৫। অভিজ্ঞতাবাদীদের মতে, “জ্ঞান নিম্নতর, ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য পর্যায়ে থেমে থাকতে পারে এবং শুধুমাত্র ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জ্ঞানই নির্ভরযোগ্য।” কোনরূপ বিশ্লেষণ ছাড়া এমন “অভিজ্ঞতাবাদ” কেবল ঐতিহাসিক ভুলের পুনরাবৃত্তি করতেই শেখায়।
 
 

১৬। ধারণাত্মক জ্ঞান নির্ভর করে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জ্ঞানের উপর এবং ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জ্ঞানকে উন্নীত করতে হয় ধারণাত্মক জ্ঞানে – এটাই হচ্ছে “দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের জ্ঞানতত্ত্ব”।

 
১৭। ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য থেকে ধারণাত্মক পর্যায়ে জ্ঞানের দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদী ধারা জ্ঞানের একটি ছোট প্রক্রিয়ার (যেমন– কোন একটিমাত্র বস্তু বা কাজ জানার) বেলায় যেমন সত্য; তেমনি জ্ঞানের একটা বৃহৎ প্রক্রিয়ার (যেমন– একটা গোটা সমাজকে, বা একটা বিপ্লবকে জানার) বেলায়ও সত্য। যা এই প্রক্রিয়ার সার্বজনীনতা প্রকাশ করে।
 

১৮। প্রয়োগ থেকে জ্ঞানের শুরু হয় এবং প্রয়োগের মাধ্যমে অর্জিত জ্ঞানকে আবার অবশ্যই প্রয়োগে ফিরে আসতে হবে। জ্ঞানের উচ্চতর স্তরে পৌঁছানোর জন্য ও নির্ভুলতার জন্য অর্জিত জ্ঞানকে বারংবার প্রয়োগে যেতে হয়।

 

১৯। প্রত্যেক প্রক্রিয়াই তার আভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও সংগ্রামের কারণেই এগিয়ে যায় ও বিকাশ লাভ করে (বিপরীতের ঐক্য) এবং মানুষের জ্ঞানের গতিও সেই সাথে এগিয়ে যাওয়া ও বিকাশলাভ করা উচিৎ।

 
২০। প্রয়োগে ভুল চিন্তাধারা, তত্ত্ব ও পরিকল্পনা প্রমাণিত হলে এর সংশোধনের পাশাপাশি বিপ্লবীদের নিজেদের মাঝেও তদরূপ প্রয়োজনীয় পরিবর্তন ঘটানোয় পারদর্শী হতে হবে। তাদের অবশ্যই দৃঢ়তার সাথে নিশ্চিত হতে হবে যাতে প্রস্তাবিত নতুন বিপ্লবী কর্তব্য ও নতুন কাজের কর্মসূচীগুলি পরিবর্তিত পরিস্থিতির সাথে সংগতিপূর্ণ হয়।
২১। প্রায়ই দেখা যায় চিন্তা বাস্তবের পিছনে পড়ে আছে। কারণ মানুষের জ্ঞান বহু রকম সামাজিক অবস্থার দ্বারা সীমাবদ্ধ থাকে। যাদের চিন্তা বাস্তব অবস্থার পরিবর্তনের সাথে পরিবর্তিত হয় না, তারা গোরামীবাদে ভোগে ক্রমেই জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং পরবর্তীতে “দক্ষিণপন্থী সুবিধাবাদ” হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এদের আমরা “ডান বিচ্যুতি” হিসেবে চিহ্নিত করে থাকি।
 
২২। উপরে উল্লিখিত “গোরামীবাদ” যেমন “ডান বিচ্যুতি”র দিকে নির্দেশ করে, ঠিক তেমনি আমরা ‘বাম’ বাগাড়ম্বরেরও বিরোধী। এই ‘বামপন্থীদের’ চিন্তাধারা বাস্তব প্রক্রিয়ার বিকাশের একটা নির্দিষ্ট পর্যায়কে ছাড়িয়ে যায়। যে আদর্শ কেবল ভবিষ্যতেই বাস্তবায়ন করা সম্ভব, বর্তমানের মধ্যে তার কোন সম্ভাবনা নাই, অথচ তারা সেই আদর্শকে বর্তমানে রূপ দেওয়ার জন্য গলদঘর্ম হয়। ফলে এরা জনগণের অধিকাংশের বর্তমান প্রয়োগ ও বর্তমান বাস্তবতা থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে ফেলে এবং কার্যকলাপে “হঠকারী” হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। একে আমরা “বাম বিচ্যুতি” হিসেবে চিহ্নিত করে থাকি।
 

২৩। প্রত্যেকটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার বিকাশ হচ্ছে আপেক্ষিক এবং সেজন্যে অনাপেক্ষিক সত্যের অন্তহীন প্রবাহে বিকাশের কোন একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ের একটা বিশেষ প্রক্রিয়া সম্পর্কে মানুষের জ্ঞান; অর্থাৎ, অসংখ্য অনাপেক্ষিক প্রক্রিয়ার মাঝে একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া সম্পর্কে মানুষের জ্ঞান কেবল আপেক্ষিক সত্যকে প্রকাশ করে। অসংখ্য আপেক্ষিক সত্যের যোগফলই অনাপেক্ষিক সত্য; অর্থাৎ, অসংখ্য পৃথক–পৃথক প্রক্রিয়া সম্পর্কে মানুষের জ্ঞান অনাপেক্ষিক সত্যকে প্রকাশ করে।

 
 

২৪। দুনিয়াকে পরিবর্তন করার জন্য সর্বহারাশ্রেণী ও বিপ্লবী জনগণের সংগ্রামে নিম্নলিখিত কর্তব্যগুলির পরিপূরণ অন্তর্ভুক্ত–

“বস্তুগত জগতের পরিবর্তন সাধন এবং সেই সঙ্গে নিজেদের মনোজগতের পরিবর্তন সাধন – নিজেদের জ্ঞানার্জন – ক্ষমতার পরিবর্তন সাধন এবং মনোগত ও বস্তুগত জগতের পারস্পরিক সম্পর্কের পরিবর্তন সাধন।”

 
 

২৫। যেদিন সমগ্র মানবজাতি স্বেচ্ছায় এবং সচেতনভাবে নিজেকে এবং জগৎকে পরিবর্তন করবে, সেদিনই শুরু হবে বিশ্ব–কমিউনিজমের যুগ। আর তা তখনই সম্ভব যখন শ্রেণীর বিলোপ সম্ভব হবে।

 
 

২৬। প্রয়োগের মাধ্যমে সত্যকে আবিষ্কার করতে হবে এবং আবার প্রয়োগের মাধ্যমে সত্যকে যাচাই এবং বিকশিত করতে হবে। ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জ্ঞান থেকে শুরু করতে হবে এবং তাকে সক্রিয়ভাবে ধারণাত্মক জ্ঞানে উন্নীত করতে হবে। তারপর ধারণাত্মক জ্ঞান থেকে শুরু করতে হবে এবং বিষয়ীগত ও বিষয়গত এই উভয় জগৎকে পরিবর্তন করার জন্য সক্রিয়ভাবে বিপ্লবী প্রয়োগ পরিচালনা করতে হবে।

প্রয়োগ, জ্ঞান, আবার প্রয়োগ এবং আবার জ্ঞান – এই প্রক্রিয়ার পুনরাবৃত্তি ঘটতে থাকে অন্তহীন চক্রাবর্তে এবং প্রত্যেকটি চক্রাবর্তের সাথে সাথে প্রয়োগ ও জ্ঞানের অন্তর্বস্তুটি উচ্চতর স্তরে উত্তীর্ণ হয়। এই হলো দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের সমগ্র “জ্ঞানতত্ত্ব”। এই হলো জানা এবং করার “দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদী তত্ত্ব”।।

মার্কসীয় বস্তবাদ: 

মানুষের চেতনা, তার চিন্তা প্রভৃতি সবকিছুই বস্তুর গতির নিয়ম দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। এই দর্শনের মতে মানব-মস্তিষ্কের কার্যাবলীর দ্বারা মানবমনের চিন্তাধারা, ভাবসকল, অনুভুতি, কল্পনা সবকিছুই নিয়ন্ত্রিত হয়। মনের কোন স্বাধীনতা নেই।  এই দর্শন নিয়ন্ত্রকবাদের সমর্থক। তাই এই দর্শনের চিন্তাধারা ডায়ালেকটিক চিন্তাধারার পরিপন্থি।

কিন্তু এর পরে রাসায়নবিজ্ঞানের উন্নতির ফলে এবং পদার্থ বিজ়ঙ্গানের নতুন নতুন আবিষ্কারের ফলে মানুষের চিন্তাধারা পরিবর্তন হয়। হেগেলীয় দ্বন্দ্ববাদের ফলে কতিপয় দার্শনিক দ্বান্দ্বিক পদ্ধতি অবলম্বন করে জগতের চিন্তার ও ইতিহাসের গতি অনুসরণ করতে প্রবৃত্ত হন।

এই দিকে ইংল্যান্ডের বিখ্যাত বৈজ্ঞানিক ডারউইন ক্রমবিকাশবাদ প্রচার করায় মানুষের চিন্তার গতি আমূল পরিবর্তিত হয়। যান্ত্রিক চিন্তাপদ্ধতির জায়গায় ও ডারউইনীয় ক্রমবিকাশের চিন্তাপদ্ধতি বৈজ্ঞানিকেরা ও দার্শনিকেরা অনুসরণ করতে প্রবৃত্র হন।  চিন্তাজগতে এই সব ঐতিহাসিক বিপ্লবের ফলে মার্কসীয় দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের উদ্ভব হয়।

মার্কস ও এঙ্গেলস বিশেষভাবে হেগেলের ও ফায়ারবাকের দার্শনিক মত দ্বারা প্রভাবান্বিত হয়েছিলেন। পরে অবশ্য তাঁরা দেখতে পান ডারউইনের ক্রমবিকাশ বাদ তাঁহাদের দার্শনিক মতের সমর্থক।

বস্তুর চেতনার পূর্বগামী অথবা চেতনা বস্তুর পূর্বগামী, এই সমস্যা সমাধান করাই হলো দার্শনিকদের প্রধান কাজ। ভাববাদী দার্শনিকগণ বলেন চেতনাই বস্তুর পূর্বগামী। অন্যদিকে বস্তুবাদী দার্শনিকেরা বলেন যে বস্তুই চেতনার পূর্বগামী।

https://www.facebook.com/skmizan

ছবি
সেকশনঃ রাজনৈতিক
লিখেছেনঃ zeroooo তারিখঃ 07/10/2017 04:24 AM
সর্বমোট 312 বার পঠিত
ফেসবুকের মাধ্যমে কমেন্ট করুণ

সার্চ