ব্যাকগ্রাউন্ড

ফেইসবুকে!

গল্পঃ অচেনা আগন্তুক – পর্ব-৪ (শেষ পর্ব)

জামিলের ফিরতে বিকেল চারটে বেজে গেল। বাজারের ভেতরে না ঢুকে সে সোজা রাজিব সিদ্দিকীর বাড়ির দিকে এগিয়ে চলল। দিঘির পাড়ে এসে সকালের দেখা জায়গাটায় আরেকবার চোখ বোলাল। কোন পরিবর্তন চোখে পড়ল না। চারিদকে তাকিয়ে খেয়াল করল কেউ তার উপর নজর রাখছে কী-না। দ্বিতীয় কারও উপস্থিতি নজরে এল না। জামিল বাগান ছাড়িয়ে সামনের দিকে এগিয়ে চলল।
রাজিব সিদ্দিকী মাত্র গোসল সেরে পুকুরের ঘাটে উঠে দাঁড়িয়েছে। হঠাৎ জামিলকে সামনে দাঁড়ানো দেখে   গামছাটা দ্রুত গলায় জড়িয়ে নিল।
জামিল স্মিত হেসে বলল-আজ সারাদিন আপনাদের শহরটা ঘুরে দেখলাম।  
-এই ছোট্ট মফস্বল শহরে আর দেখবার কী আছে! আপনার খাওয়া-দাওয়া হয়েছে?
-হ্যা। ষ্টেশনে একটা হোটেলে খেয়ে নিয়েছি। বাজারে শুনলাম নজুরে না-কী পুলিশ আটকে রেখেছে!
-হ। দারোগারে অনেক রিকোয়েস্ট করলাম কিন্তু শুনলো না। সহজ সরল পোলাডারে আটকাইয়া রাখলো।
-আপনিই তো এখন ওর গার্জিয়ান, যা করার আপনাকেই করতে হবে। জামিল বলে উঠল। 
-চেষ্টা কী কম করছি! দারোগা কইলো জিজ্ঞাসাবাদ শেষ হলে ছাড়বে।
-নজু যা ভীতু ছেলে, দেখেন পুলিশ কাস্টডিতে জিজ্ঞাসাবাদে কি বলতে কী বলে ফেলে! বলেই রাজিব সিদ্দিকীর দিকে তাকালো জামিল। রাজিব সিদ্দিকী জামিলের দিকে ঘুরে তাকালো, চোখে-মুখে চিন্তার ছাপ স্পষ্ট। কিছুক্ষণ পর বলল,
-আপনে ঠিকই বলেছেন। বোকাসোকা ছেলে, কি বলতে কী বলে ফেলে কে জানে! শেষে নিজের বিপদই না ডেকে আনে!
-আমি ভাবছি, আমাকে আর কতদিন এখানে আটকে থাকতে হবে! জামিল হতাশ কণ্ঠে বলল।
রাজিব সিদ্দিকী নিশ্চুপ। জামিল লক্ষ করল লোকটি কিছুটা অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছে। নিঃশব্দে এগিয়ে চলেছে। কাছারিঘরের সামনে এসে তাকে বিশ্রাম নিতে বলে বাড়ির ভেতরে চলে গেল।
একা একা শুয়ে বসে আর ভাল লাগছিল না জামিলের। প্রায় আধা ঘণ্টা বিশ্রাম নিয়ে ভাবল বাইরে বেরিয়ে গ্রামটা ঘুরে দেখা যাক। ঘরের দরজার সামনে আসতেই দেখল বলরাম হালদার পুকুর পাড় ধরে এগিয়ে আসছে। কাছাকাছি আসতেই দু’জনের চোখাচোখি, জামিলের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বাড়ির ভেতরে অদৃশ্য হল সে। আরও কিছুক্ষণ পর বাইরে বেরিয়ে এল জামিল। পেছনে রাজিব সিদ্দিকীর কণ্ঠ শুনে ঘুরে তাকালো। বলরাম হালদারকে আশেপাশে কোথাও দেখা গেল না। তাকে বাইরে দেখে রাজিব সিদ্দিকী জিজ্ঞেস করল-
-কোথাও যাইবেন?
-আপনাদের গ্রামটা একটু ঘুরে দেখি, শুয়ে বসে থাকতে তো আর ভাল লাগছে না। জামিল জবাব দিল।
-একা একা যাইতে পারবেন, না-কি কাউরে লগে দিমু? নজু থাকলে খুব ভাল হইত।
-না, লাগবে না। খুব বেশিদূর তো আর যাব না। আশে পাশে একটু ঘুরে আসি।
-আচ্ছা, সন্ধ্যার আগেই ফিরা আইসেন।
রাজিব সিদ্দিকীর কথায় সায় দিয়ে বেরিয়ে পড়ল জামিল। বাজারে যাবার রাস্তাটিকে ডান দিকে রেখে উল্টাদিকের রাস্তায় হেঁটে চলল। এদিকটায় বাড়িঘরের সংখ্যা কিছুটা বেশি। রাস্তার দু’পাশে গাছপালা ক্রমশ ঘন হয়ে এসেছে। তবে পথটা মোটামোটি নির্জনই বলা যায়। কিছুদূর চলার পরই হঠাৎ মনে হল কেউ যেন তাকে ফলো করছে। জামিল পেছনে ফিরলো, কেউ নেই। ভাবলো এটা তার মনের ভুল। আরও কিছুদূর এগোনোর পর একই রকম অনুভূতি হল। জামিল কান খাড়া করে হাঁটছে, এবার আরও কাছে কারো চলার শব্দ শুনতে পেল। হঠাৎ দাঁড়িয়ে গেল। পেছনে ফিরতেই মনে হল কেউ একজন যেন গাছের আড়ালে লুকিয়ে পড়লো। কী যন্ত্রণা! সামনে একটা বাঁক দেখে চলার গতি কিছুটা বাড়িয়ে দিল জামিল। দু’পাশে ভালমত লক্ষ রাখল। বাঁকটা পার হয়েই বাম দিকে একটা খেড়ের পালা ও কয়েকটা বড় গাছ চোখে পড়তেই গাছের আড়ালে লুকিয়ে পড়লো। কারো দ্রুত চলার শব্দ আসছে, জামিল চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো। চারিদিকে নজর রাখছিল জামিল, হঠাৎ লোকটিকে চোখে পড়লো। তার সোজাসোজি রাস্তায় দাঁড়িয়ে এদিক ওদিক দেখছে; একবার খেড়ের পালার দিকে তাকিয়ে আবার অন্যদিকে ঘুরে গেল। জামিল লোকটিকে দেখেই মনে মনে হেসে ফেলল। লোকটি বেশিক্ষণ দাঁড়ালো না। সে চোখের আড়াল হতেই গাছের পেছন থেকে বেরিয়ে রাস্তায় উঠে এল জামিল। রাজিব সিদ্দিকীর বাড়ির দিকে ফিরে চলল। খুব দ্রুত হেঁটে যাচ্ছিলো, বাড়ির খুব কাছাকাছি আসতেই রাস্তার একপাশ থেকে বেড়ালের ডাক ভেসে এল। পরপর তিনবার। জামিল থমকে দাঁড়ালো, খুব সতর্কভাবে চারপাশে চোখ বোলালো। তারপর বাগানের মধ্য দিয়ে তৈরি সরু রাস্তার দিকে তাকাতেই চোখে পড়লো পথের একপাশে একজন লোক দাঁড়িয়ে। জামিল খুব সন্তর্পণে এগিয়ে গেল সেদিকে।  
রাতের খাবার শেষে শুয়ে শুয়ে কিছুক্ষণ আজকের পত্রিকা পড়ছিলো জামিল। ষ্টেশন থেকে গত চারদিনের কয়েকটা পত্রিকা কিনে এনেছে। কোন পত্রিকায়ই এখানকার খুনাখুনির খবর নেই। জলজ্যান্ত একটা মানুষ খুন হয়ে গেল, আরেকজন নিখোঁজ; কোন পত্রিকাই নিউজ করলো না! মোবাইল ফোনটা হাতে নিতেই হঠাৎ মনে হল জানালায় একটা মুখ উঁকি দিয়েই আবার সরে গেল। এখানেও তার উপর নজর রাখা! পত্রিকা থেকে মুখ না সরিয়েই আড়চোখে জানালার দিকে লক্ষ রাখলো সে। বেশ কিছুক্ষণ কেটে গেল, কাউকে দেখা গেল না। হঠাৎ আবার কেউ উঁকি দিল। কয়েক সেকেণ্ড মাত্র, তারপর উধাও হল।
জামিল মনে মনে হাসলো। গতকাল রাতে, আজ সকালে দিঘির পাড়ে তার উপর নজর রাখা, বিকেলে গ্রামের পথে তাকে অনুসরণ করা আবার এখন উঁকিঝুঁকি মারা! এসবের মাকে কী? জামিল আলো নিভিয়ে দিল। খানিকক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে খুব সন্তর্পণে বেরিয়ে নিঃশব্দে ঘরের পাশ ঘেঁষা গাছটার আড়ালে দাঁড়াল। বেশ কিছুক্ষণ কোন সাড়াশব্দ নেই। জামিল ওখানেই দাড়িয়ে রইলো। একটু পর কাছে কোথাও একটা চাপা গোঙানির শব্দ শুনতে পেল। জামিল কিছুক্ষণ অপেক্ষা করল। শব্দের উৎসটা বোঝার চেষ্টা করল। কোথায় যেন বিড়াল ডেকে উঠলো। পরপর তিনবার। জামিল খেয়াল করল ডাকটা পুকুর ঘাটের দিক থেকেই আসছে। নিঃশব্দে সেদিকে এগিয়ে গেল।
সকাল দশটা। লোকজনের হৈ-চৈ শুনে বাড়ির ভেতর থেকে বেরিয়ে এল রাজিব সিদ্দিকী। কাছারিঘরের সামনে এসে থমকে দাঁড়াল। অনেক লোকের জটলা, সম্মুখভাগে দাঁড়িয়ে গফুর দারোগা।   
-আপনারা এত সকালে!  
-আসামী ধরতে এসেছি। ঝটপট উত্তর দিল গফুর দারোগা।
-খুনির পরিচয় কি জানা গেছে? রাজিব সিদ্দিকী জিজ্ঞেস করলো।  
-দারোগা মাথা ঝাঁকিয়ে বলল-হ্যা।
-খুনী কে?
-খুনী তো আমার সামনেই দাঁড়িয়ে আছে। গফুর দারোগা একটা হাতকড়া রাজিব সিদ্দিকীর সামনে তুলে ধরল।
রাজিব সিদ্দিকী প্রথমে ভড়কে গেলেও খুব অল্প সময়ের মধ্যেই নিজেকে সামলে নিল। সে গফুর দারোগার উদ্দেশ্যে বলল- এসবের মানে কী? আপনে কি কইতে চান আমি খুনী?
-কমিশনার সাব, আর আড়াল করে লাভ নাই। আমরা কনফার্ম না হয়ে আসিনি।
রাজিব সিদ্দিকী বেশ জোরের সাথেই বলল- ভুল করতাছেন দারোগা সাব।
-দ্যাখেন, দিঘি থেকে কিন্তু মেয়েটার লাশ তোলা হয়েছে। অলরেডি পোস্টমোর্টেমের জন্য পাঠানো হয়েছে। দারোগা বলে উঠল।
-তাতে কী হয়েছে? কোথাও থেকে লাশ পেলেই কি প্রমাণ হয় যে আমি খুন করেছি?
জটলার পেছন থেকে সামনে এগিয়ে এল জামিল আহসান। রাজিব সিদ্দিকীকে উদ্দেশ্য করে বলল- কমিশনার সাব আপনার গলা থেকে মাফলারটা সরান তো।
রাজিব সিদ্দিকী কিছুটা অবাক হয়ে জামিলের দিকে তাকাল। কিছুক্ষণ পর বলল- আপনি!
গফুর দারোগা বলে উঠল- ইনি ডিবি ইন্সপেক্টর জামিল আহসান। পুরো ছকটাই আমাদের সাজানো। আরও আছে।  
জামিল স্মিত হাসল। জটলার দিকে মুখ করে বলে উঠল- হাসান, সামনে এসো।
ভিড় ঠেলে সামনে এসে দাড়ালো সেই ভিক্ষুক। যাকে গত কয়েকদিন ধরে এলাকার বিভিন্ন জায়গায় দেখা গেছে। ছদ্মবেশটা খুলে ফেলতেই দেখা গেল বছর পচিশের এক যুবক দাঁড়িয়ে। 
দারোগা আবার বলল- কী হল কমিশনার সাব, গলা থেকে ময়াফলারটা সরান!
রাজিব সিদ্দিকী কিছুক্ষণ ইতস্তত করে অবশেষে গলা থেকে মাফলারটা খুলে ফেলল।
জামিল প্রশ্ন করল- আপনার গলায় ঐ ক্ষতগুলো কীসের?
রাজিব সিদ্দিকী নিরুত্তর।
জামিল বলে উঠল- গতকাল গোসলের পর আপনার গলায় এই দাগগুলো দেখেই আমার সন্দেহ হয়েছিল। তারপর নজু এবং কাল রাতে বলরাম হালদারের জবানবন্দিতে বাকীটা পরিষ্কার হয়েছে।
রাজিব সিদ্দিকী এদিক-ওদিক তাকিয়ে কি যেন খুঁজছিলো। ঠিক তখনই কয়েকজন কনস্টেবল বলরাম হালদারকে হাতকড়া পরিয়ে সামনে হাজির করল। রাজিব সিদ্দিকী বলরাম হালদারকে হাতকড়া পরিহিত অবস্থায় দেখে কিছুটা হতাশ হলেও নিজেকে খুব শান্ত রাখল।
রাজিব সিদ্দিকীর দিকে তাকিয়ে জামিল বলল- বলরাম বাবুকে আমার পিছনে লাগিয়েছিলেন, তাই না?
জামিলের দিকে কটমট করে তাকিয়ে রাজিব সিদ্দিকী বলল- আমি কাউরে কারো পিছে লাগাই নাই। আর শোনেন, আপনারা আমার বিরুদ্ধে কিছুই প্রমাণ করতে পারবেন না।
গফুর দারোগা এবার বলল- চলেন, আপনার যা বক্তব্য কোর্টে বলবেন।
জটলার মধ্য থেকে নজু মিয়া সামনে এসে দাঁড়ালে গফুর দারোগা নজু মিয়ার উদ্দেশ্য বলল- নজু, তুমি এখন মুক্ত। যেখানে খুশি যেতে পারো।
পুলিশের দলটি রাজিব সিদ্দিকী ও বলরাম হালদারকে নিয়ে বাজারের দিকে এগিয়ে চলল। আসামী নিয়ে পুলিশের ভ্যানটি চলে গেলে জামিল সাজু মিয়ার চায়ের দোকানে গিয়ে বসলো। তাকে দেখে উপস্থিত লোকজনের মধ্যে চলমান কথাবার্তা থেমে গেল হঠাৎ। সাজু হেসে জিজ্ঞেস করে- স্যার, চা দেব এক কাপ?
জামিল হেসে বলল- দাও।
চা শেষ করে উঠে পড়লো জামিল। রিকশার উদ্দেশ্যে কিছুটা পথ এগোতেই হঠাৎ রাস্তার একপাশ থেকে বিড়ালের ডাক শোনা গেল, পরপর তিনবার। জামিল সেদিকে ঘুরে দেখল- হাসিমুখে এগিয়ে আসছে হাসান।

আগের পর্বঃ
অচেনা আগন্তুক – পর্ব-১
অচেনা আগন্তুক – পর্ব-২
অচেনা আগন্তুক – পর্ব-৩

ছবি
সেকশনঃ গল্প
লিখেছেনঃ নিভৃত স্বপ্নচারী তারিখঃ 20/09/2017 01:46 PM
সর্বমোট 1041 বার পঠিত
ফেসবুকের মাধ্যমে কমেন্ট করুণ

সার্চ