ব্যাকগ্রাউন্ড

মুক্তচিন্তার বিশ্ব

আপনার পছন্দের যে কোন কিছু সহব্লগারদের সাথে শেয়ার করতে ও শেয়ার কৃত বিষয় জানতে এখানে ক্লিক করুণ

ফেইসবুকে!

ভূত ‍সমাচার

আমাদের গ্রামে সর্বশেষ ভূত দেখা গিয়েছিল নারায়নের ঠাকুর্দার শ্রাদ্ধ্যের দিন থেকে প্রায় বছরখানেক। আর তখনই ভূতদের নিয়ে যুগের পর যুগ চলমান মিথ্যাচারের অবসান হয়েছিল। বিভিন্ন গল্প, উপন্যাস কিংবা ইতিহাসে ভূতদের নিয়ে যেসকল তথ্য-উপাত্ত হাজির করা হয়েছিল তা একটি বৃহৎ ষড়যন্ত্রেরই অংশ। এমন একটা নিরীহ প্রাণীকে মানুষ কি ভয়ঙ্করভাবেই না রুপায়িত করেছে। মানুষ তার নিশংষতা ভূতের উপর দিয়ে চালিয়ে দিয়েছে যুগের পর যুগ। নারায়ণের দাদা মারা না গেলে এ মিথ্যাচার হয়তো আরও কয়েক শতাব্দী চলত। এ কথার সত্যতা খুঁজতে আমাদের একটু পেছনে যেতে হবে।  

নারায়নের ঠাকুরদার বয়স হয়েছিল প্রায় সোয়াশত বছর। অস্তি, চর্ম ছাড়া শরীরে আর কিছু ছিল না। দেখেই মনে হতো কোন মিশরিয় মমী নারায়ণদের বসার ঘরের ছোট খাটে গুটিশুটি মেরে শুয়ে আছে। ইতিহাসে বর্নিত ভূতের যে বাহ্যিক রুপ পাওয়া যায় নারায়নের দাদা তা জীবদ্দশায়ই লাভ করেছিলেন। ছোটবেলা থেকেই আমরা ভূতের ভয়ের পরিবর্তে নারায়নের ঠাকুর্দার ভয় পেয়ে বড় হয়েছি। জীবন্ত মমী যখন হাঁটা শুরু করে তখন তখন ভূতের ভয় বলে কিছু থাকে না, তার ভয়েই আমরা পালাতাম। এমন ভয়ংকর চেহারাতে সম্ভবত যমেরও অরুচি ছিল, তাই শত বছর পেরোনের পর আরও সিকি শতাব্দী চলে গেলেও নারায়নের ঠাকুরদাকে যম নাগাল পাচ্ছিল না। কিন্তু একদিন হঠাত করে ঠাকুরদার ঘুমের ভেতর যমরাজ তার কর্ম সম্পাদন করে আমাদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পুরণ করেছিল। এ কাজটি করার জন্য আমরা বেশ কয়েকদিন ভগবান ভুলে যমরাজের উপাসনা করেছি। তবে আমরা নিশ্চিন্ত ছিলাম যে ঘুমের ভেতর এ কাজ না করলে যমরাজের বাপেরও এমন কাজ করার সাধ্য ছিল না। তবু আমাদের হিরো যমরাজই এ কাজটা করেছিল বিধায় আমিসহ আমার সব বন্ধু বান্ধব তার প্রতি কৃতজ্ঞই থাকলাম।   

সেদিনের ঘটানটি আমাদের কাছে ছিল নেহায়াৎ অনাকাঙ্ক্ষিত। আমরা ছেলে ছোকরারা ভেবেছিলাম তার মৃত্যুতে মনে হয় সবাই আনন্দোৎসব করবে কিন্তু আমাদের গ্রামজুড়ে যে শোকযাত্রা শুরু হল তা দেখে অবাকই হচ্ছিলাম। এই মমীটাকে আরো কিছুদিন বাঁচিয়ে রাখলেই বোধ হয় গ্রামের অনেক সমৃদ্ধি ঘটত। আমরা কি আর তখন জানতাম আমাদের গ্রামের স্কুল, কলেজ, মন্দির, শ্মশানঘাট সবই তার গাটের পয়সা থেকে করা হয়েছিল! বরং নারায়ণকে ভ্যা ভ্যা করে কাঁদতে দেখে ন্যাকামোই মনে হচ্ছিল। এই মমী ঘরে রাখার জন্য কেউ কাঁদে! কোথায় মমী থাকবে পিরামিডে না তা না করে তারা রেখেছে বসার ঘরে। তাদের রুচি নিয়েই আমাদের সন্দেহ হচ্ছিল।

সেদিন আকাশটা কিঞ্চিৎ মেঘলা ছিল। রাতের বেলায় নারায়ণদের বাড়িতে রামায়ণ পাঠ হবে সঙ্গে ভূরিভোজও হবে তাই আমরা সদলবলে নারায়ণদের সদ্য মমীমুক্ত বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলাম। আমাদের কেউ নেমন্তন্ন না করলেও গ্রামের কারো বাড়ীতে খানাপিনার খবর শুনলে আমরা নিজ দায়িত্বেই চলে যেতাম। সেদিনও তাই যাচ্ছিলাম, কিন্তু শ্মশানের যে দিকটাতে নারায়নের ঠাকুরদাকে পোড়ানো হয়েছিল সেদিক থেকে এক মাঝবয়সী বনেদী চেহারার মানুষ আমাদের ডাক দিল। পরিস্কার শুনতে পেলাম ভদ্রলোক বিলু, ফটিক, বলাই বলে ডাকছিল। আমাদের তিন জনের নাম তিনি কীভাবে জানলেন তা নিয়ে মাথা ঘামানোর আগেই ভদ্রলোকের দিকে হাঁটা শুরু করলাম। তার গায়ে মিষ্টি সুগন্ধ চারপাশকে কেমন সজীব করে তুলেছে। সামনে গিয়েই তার পরিচয় জানতে চাইলাম,

তিনি জানালেন তার নাম পরাণ বন্দোপাধ্যায়, তিনি নাকি নারায়নের ঠাকুরদা বলেই কাঁধের ঝোলা থেকে বাতাসা আর লেবেনচুষ বের করে খেতে দিলেন। এরকম অপরিচিত লোকের এমন অমায়িক ব্যবহার দেখে সত্যি আমরা অবাক হয়েছিলাম। লেবেনচুষ মুখে দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে উনি বলল এখন আর আমি মানুষ নই। গতকাল থেকে ভূত হয়ে গেছি। মরার পর বেশ কয়েকদিন মানুষই ছিলাম, পরিপুর্ন ভূত হতে কিছুটা সময় লেগেছে। স্থির চোখে তিনি আমাদের দিকে তাকিয়ে আছেন। ভয়ে মুখ দিয়ে রাম রাম করছি। তিনি আমাদের এ দশা দেখে মাথায় হাত রাখলেন। বললেন ভূতরা খুবই নিরীহ প্রানী, তারা কখনো কাউকে ভয় দেখায় না, মিথ্যা কথা বলে না। কারণ এগুলো করলেই তারা আবার মানুষ হয়ে যাবে। ভূত থেকে মানুষ হওয়াকে তারা খুবই অসম্মাজনক মনে করে।

ভূতদের আত্ম-সম্মানবোধ অনেক প্রবল, তাই তারা এমন হীন কাজ কখনো করে না, পারলে মানুষের উপকার করে না পারলে ক্ষতি করে না। ভয় দেখানোর মতো এমন ছেলে মানুষী কোন বাচ্চা ভূতও করে না। ঠাকুরদা আরো বললেন তিনি মাত্র কালকে ভূত হয়েছেন সে হিসেবে ভূত সমাজে তিনি এক নবোজাত শিশু। মানুষ মরলেই ভূত হয় না, ভূত হওয়ার কিছু আলাদা যোগ্যতাও লাগে। শিশু ভূতদের অনেক কঠিন সাধনা করতে হয়।  ২০০ বছর যাবত তাদেরকে শেখানো হয় কীভাবে মানুষকে ভয় না দেখিয়েও লোকালয়ে থাকা যায়। ভূত বলে যাদের চালানো হয় তারা আসলে মানুষ, ভূতের ছদ্মবেশ ধরে। কখনোতো কোন ভূতকে মানুষ মানুষ খেলতে দেখি নি।
ভূতরা ভূতই তারা এসব পছন্দ করে না। একারণে ভূতদের বলা হয় এ মহাবিশ্বের সেরা জীব। কিন্তু মানুষ তাও নকল করে ফেলেছে। ভূতদের নকল করা মানুষের প্রিয় স্বভাব। ঠাকুরদা আরো জানালেন ভূতদের নকল করা তার প্রিয় স্বভাব ছিল জীবদ্দশায়। চিন্তা করে দেখলাম আমরাওতো ভূত ভূত খেলি। কখনোতো কোন ভূতকে মানুষ মানুষ খেলতে দেখি নি।


চলবে......

ছবি
সেকশনঃ সাধারণ পোস্ট
লিখেছেনঃ জটিল বাক্য তারিখঃ 10/09/2017 05:26 PM
সর্বমোট 730 বার পঠিত
ফেসবুকের মাধ্যমে কমেন্ট করুণ

সার্চ