ব্যাকগ্রাউন্ড

মুক্তচিন্তার বিশ্ব

আপনার পছন্দের যে কোন কিছু সহব্লগারদের সাথে শেয়ার করতে ও শেয়ার কৃত বিষয় জানতে এখানে ক্লিক করুণ

ফেইসবুকে!

ধর্ম ও সংস্কৃতিতে হিজড়াঃ পর্ব-১

প্রকৃতিতে অহর্নিশি ঘটে চলেছে অসংখ্য ঘটনা। চারদিকে ছড়িয়ে আছে নানা উপাচার। এসবের মধ্যে কোনটাকে বলা হয় স্বাভাবিক; কোনটাকে বলা হয় অস্বাভাবিক। ব্যাপারটা আসলে সংখ্যা ও পরিসংখ্যানের খেলা। বেশিরভাগ মানুষ যেটাকে স্বাভাবিক বলে মনে করে, সেটা স্বাভাবিক হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত হয়। সৃষ্টিকূলের মাঝেও ভিন্নতা রয়েছে। জ্ঞান ও দৃষ্টিভঙ্গির সীমিত পরিধির কারণে আমরা কখনো কখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক কোন কিছুকেও অস্বাভাবিক বলে সাব্যস্ত করে ফেলি। নিজেদের জ্ঞানের পরিধি দিয়ে সবকিছুকে বিচার করা অধিকাংশের প্রবণতা। যাইহোক, মানবকূলে নারী ও পুরুষ বা স্ত্রীলিঙ্গ ও পুংলিঙ্গের বাইরেও যে সকল লিঙ্গ রয়েছে তাঁদেরকে অস্বাভাবিক তকমা লাগিয়ে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করা আমাদের বেশিরভাগের প্রবণতা। হিজড়া জনগোষ্ঠী নারী-পুরুষের পাশাপাশি আরেকটা লিঙ্গের মানুষ। বাংলাদেশ সরকার হিজড়াদের ‘তৃতীয় লিঙ্গ’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। যা এই জনগোষ্ঠীর জন্য বিরাট একটি ঘটনা। স্বীকৃতি ব্যাপারটিতে দুটো বিষয় লক্ষ্যনীয়। প্রথমত, একটি সুস্থ স্বাভাবিক জনগোষ্ঠী যারা জেন্ডার ও যৌনতার দিক থেকে সংখ্যালঘু তাঁদের অস্তিত্বকে “স্বীকৃতি” দিতে হয়! তারমানে স্বীকৃতি পাওয়ার আগ পর্যন্ত তারা অস্বীকৃত ছিলো? স্বীকৃতির প্রতি সম্মান ও কৃতজ্ঞতা রেখে বলছি, স্বীকৃতি ব্যাপারটা কেমন যেনো মানবতার প্রতি অবমাননা। এই জনগোষ্ঠী ছিলো সৃষ্টির শুরু থেকেই। তবুও কেনো স্বীকৃতি দিয়ে অস্তিত্বকে জানান দিতে হবে? দ্বিতীয়ত, “তৃতীয় লিঙ্গ” শব্দ দিয়ে একটি শ্রেষ্ঠত্বের সোপান বা মাপকাঠি তৈরি করা হয়েছে চেতন বা অবচেতনে। তৃতীয় লিঙ্গ বলার সাথে সাথে আমার ভেতর প্রশ্ন জাগে, প্রথম লিঙ্গ কারা আর দ্বিতীয় লিঙ্গ কারা? নারী ও পুরুষের মধ্যে ‘প্রথম-দ্বিতীয়’ ভাগ করে দিয়ে তৃতীয় করা হয়েছে হিজড়াদেরকে। যেনো স্বীকৃতির মধ্য দিয়ে একটা অভেদ্য দেয়াল তুলে দেয়া হলো।  
 
বাংলাদেশের সমাজ তথা বিশ্বে যে কোনো স্থানের সমাজেই নারী-পুরুষের বাইরে যারা আছেন তাঁদেরকে দেখা হয় বঙ্কিমনজরে। সমাজ ও সমাজের তথাকথিত স্বাভাবিক মানুষেরা হাজারটা দেয়াল তুলে সেই মানুষদের আলাদা করে দেয়। এখান থেকেই শুরু হয় বঞ্চনা ও অধিকারহরণের অধ্যায়। যা চলতেই থাকে।      
 
হিজড়া জনগোষ্ঠী নিয়ে রয়েছে অনেক ভ্রান্ত ধারণা, অপপ্রচার ও অহেতুক ভীতি। কোনো ছেলে বা পুরুষের মাঝে কিছুটা মেয়েলী আচরণ থাকলে বা কমসাহসী হলে তুচ্ছার্থে ও গালি হিসেবে তাকে হিজড়া বলা হয়। এটাই মূলতঃ  গোটা সমাজের দৃষ্টিভঙ্গী। বাংলাদেশে হিজড়া সম্প্রদায়ের রয়েছে নিজস্ব সংস্কৃতি। মূলতঃ যেসব মেয়েলী পুরুষেরা হিজড়া সংস্কৃতিতে চলে আসে তারাই হিজড়া নাম ধারণ করে। আবার কোনো কোনো মেয়েলী পুরুষ হিজড়া সংস্কৃতিতে না এসেও জীবনযাপন করে থাকেন। যাইহোক, পৃথিবীতে এপর্যন্ত প্রায় ৬৫০০০ প্রাণির মধ্যে হিজড়া প্রাণি দেখা যায়। যা মোট প্রাণিকূলের ০.৭ শতাংশ। তাই হিজড়া সম্প্রদায়কে মোটেই প্রকৃতির খেয়াল বা অস্বাভাবিক বলার উপায় নেই। তারাও পুরোপুরি স্বাভাবিক। বাংলাদেশের সমাজ বহুলাংশে চালিত হয় ধর্মীয় অনুশাসন ও ধর্মীয় দৃষ্টিকোণকে প্রাধান্য দিয়ে। তাই, বিভিন্ন ধর্মে ও সংস্কৃতিতে হিজড়াদের উপস্থিতি খোঁজা ও তা পাঠকের সামনে তুলে ধরার জন্যই এই লেখার প্রয়াশ। আশাকরা যায়, এই লেখা থেকে কিছুটা হলেও পাঠকের উপলব্ধি হবে যে, ধর্মেও হিজড়া প্রত্যয়টির উল্লেখ আছে এবং হাজার বছরের ইতিহাস ও সংস্কৃতিও তাঁদেরকে ধারণ করেছে।
 
মূল বিষয়ে যাওয়ার আগে কয়েকটি প্রত্যয়ের সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা পাঠককে বিষয়বস্তু বোঝার ক্ষেত্রে সাহায্য করবে। ইন্টারসেক্স বা উভয়লিঙ্গ, ট্রান্সসেক্সচুয়াল বা রূপান্তরকামি, ট্রান্সজেন্ডার বা রূপান্তরিতলিঙ্গ, ক্রস-ড্রেসিং বা বিপরীত লিঙ্গের পোশাক পরিধান, হিজড়া ইত্যাদি প্রত্যয় গুলোর সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হলো পরবর্তীতে।
 

ইন্টারসেক্স বা উভয়লিঙ্গ

পুরুষ বা নারী কারো কাতারেই যাদেরকে ফেলা যায় না তাঁদেরকে ইন্টারসেক্স বা উভয়লিঙ্গ বলা হয়। এক্ষেত্রে সাধারণত আমলে নেয়া হয় তাঁদের দেহে ক্রোমোজোমের ধরণ, যৌনাঙ্গের আকার, দেহে অণ্ডকোষ ও গর্ভাশয়ের উপস্থিতি ইত্যাদি। ইন্টারসেক্স ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের ক্রোমোজোমের ধরণের চেয়ে ভিন্ন কিছু ধরণ পরিলক্ষিত হয়। যেমনঃ কারো দেহে xxy ক্রোমোজোম দেখা যায়; অর্থাৎ ছেচল্লিশটির স্থলে সাতচল্লিশটি ক্রোমোজোম থাকে। কারো ক্ষেত্রে ক্রোমোজোমের সংখ্যা আটচল্লিশ। ইন্টারসেক্সদের কারো কারো একটি ডিম্বাশয় থাকে, কারো একটি শুক্রাশয় থাকে, কারো একটি ডিম্বাশয় ও একটি শুক্রাশয় থাকে, কারো কারো একই সাথে ক্ষুদ্র পুরুষাঙ্গ ও স্ত্রীজননাংগ থাকে, কারো কারো স্তন থাকে। শরীর ও জননাঙ্গ দেখে তাঁদেরকে নারী বা পুরুষ হিসেবে সাব্যস্ত করা যায় না। ইংরেজিতে এদেরকে বলা হয় হার্মাফ্রোডাইট। শব্দটি এসেছে গ্রীক মিথের চরিত্র হার্মাফ্রোডিটাস থেকে। এ সম্পর্কিত একটি মিথ পরবর্তীতে উল্লেখ করা হয়েছে। ইসলামিক হাদিসে আরবীতে এদেরকে বলা হয়েছে খুনতা। ত্রিপিটকে এদের নাম উভতোব্যঞ্জনকা। এক হিসাব মতে, পৃথিবীর জনসংখ্যার ১.৭ শতাংশ ইন্টারসেক্স[1]।       
 

ট্রান্সজেন্ডার বা রূপান্তরিতলিঙ্গ

জেন্ডার বা লিঙ্গ সামাজিকভাবে আরোপিত একটি পরিচয় যা কতগুলো আলাদা আলাদা নারীসুলভ বা পুরুষসুলভ কার্যাবলী ও আচরণের দ্বারা একজনের নারী বা পুরুষ পরিচয়কে প্রতিষ্ঠিত করে। যেমন- বাংলাদেশের সাপেক্ষে পরিবারের রান্নাবান্নার কাজ একজন নারীর উপর বর্তায়। তাই নারী রান্না করেন। পুরুষরা রান্না করলে সমাজ বঙ্কিম দৃষ্টিতে দেখে। কখনো কখনো কটূ কথা বলতেও ছাড়ে না। আবার গাছে চড়ে ফল পাড়া সমাজের দৃষ্টিতে সাধারণত একজন পুরুষকে শোভা পায়। কিন্তু একজন মেয়ে যদি গাছে চড়ে, তাকে গেছোমেয়ে বলে কটাক্ষ করা হয়। অর্থাৎ একজনের জন্ম, দৈহিক পরিচয় ইত্যাদির সাথে মিল রেখে সমাজের ঠিক করা কাজ, আচার-আচরণ দিয়ে একজনের জেন্ডার প্রতিষ্ঠিত হয়। একটি মেয়ে শিশু জন্ম নিলে তার জন্য হাড়িপাতিল, পুতুল ইত্যাদি কেনা হয়। আবার একটি ছেলে শিশু জন্মালে তার জন্য প্লাস্টিকের খেলনা গাড়ি কেনা হয়। শিশুর জন্মের পর থেকেই পরিবার ও সমাজ মিলে একটি শিশুর ভিতর তার জেন্ডার প্রোথিত করে দেয়।
 
ট্রান্সজেন্ডার বা রূপান্তরিতলিঙ্গ বলতে বোঝায় জন্মের সময়কার জেন্ডারের সাথে যার আচরণ মিলে না, অর্থাৎ যারা দৈহিকভাবে পুরুষ হলেও মানসিকভাবে নারী কিংবা দৈহিকভাবে নারী হলেও মানসিকভাবে পুরুষ। যেসব নারীর জেন্ডারের প্রকাশ পুরুষের মতো তাদেরকে ট্রান্সম্যান বা রূপান্তরিতপুরুষ এবং যেসব পুরুষের জেন্ডারের প্রকাশ নারীর মতো তাদেরকে ট্রান্সওম্যান বা রূপান্তরিতনারী বলা হয়। সমাজের আরোপিত লিঙ্গভিত্তিক আচার-আচরণের বিপরীত আচার-আচরণ ও মানসিক অবস্থা ধারণ করেন ট্রান্সজেন্ডারগণ।
 
মহাভারতে বর্ণিত অর্জুনের বৃহন্নলা চরিত্রটি ট্রান্সজেন্ডার চরিত্র। এমনিভাবে ইলা রাজা, শিখণ্ডী, ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মোহিনী রূপ ইত্যাদি ট্রান্সজেন্ডার চরিত্রের উদাহরণ। ইসলামে ট্রান্সওম্যানদের বলা হয় মুখান্নাতুন। বৌদ্ধধর্মে এদেরকে বলা হয় পাণ্ডাকা এবং বাংলাদেশে এদের নাম হিজড়া।     
  

ট্রান্সসেক্সচুয়াল বা রূপান্তরকামি

ট্রান্সজেন্ডারদের মধ্যে কেউ কেউ যৌনাঙ্গগুলোও পরিবর্তন করেন। যেমন হরমোন থেরাপি নিয়ে শারীরিক গঠনে পরিবর্তন আনা, অপারেশনের মাধ্যমে স্তন তৈরা করা বা কেটে ফেলা, পুংজননাংগ অপারেশন করে কেটে ফেলা দেয়া ইত্যাদি সেক্সচুয়াল বা যৌনতা সংশ্লিষ্ট পরিবর্তন যারা করে থাকেন তাদেরকে ট্রান্সসেক্সচুয়াল বা রূপান্তরকামী বলা হয়। ট্রান্সওম্যানদের চুল বয়কাট করা, ট্রান্সম্যানদের চুল বড় রাখা বা পরচুলা পড়াও ট্রান্সসেক্সচুয়ালদের মধ্যে দেখা যায়। বাংলাদেশের হিজড়াদের অনেকেই ভারতে গিয়ে কৃত্রিম স্তন তৈরি করা, হরমোনাল থেরাপি নেয়া, পুংলিঙ্গ কেটে ফেলা ইত্যাদির মাধ্যমে আরো বেশি মাত্রায় মেয়েলী হওয়ার চেষ্টা করেন।
 

ক্রস-ড্রেসিং


তুয়ারেগ উপজাতির নেকাব পরিহিত পুরুষ



স্কার্ট পরিহিত স্কটিশ


ঐতিহ্যগত ভাবে সাহারা মরুভূমিতে বসবাসকারী মুসলিম তুয়ারেগ (Tuareg) উপজাতির পুরুষরা নেকাব পরিধান করে। সেখানে নারীরা সব কিছুর মালিক। নারীপ্রধান পরিবারতন্ত্র চালু রয়েছে তুয়ারেগ উপজাতির মধ্যে। নারীরা মুখ খোলা রাখে। কারণ পুরুষরা তাদের সৌন্দর্য দেখতে চায়। পুরুষরা কৌশোর থেকে মুখ ঢেকে রাখে। শুধুমাত্র তাদের মা, বউ ও প্রেমিকারা তাদের চেহারা দেখতে পায়। এই তাদের সংস্কৃতি। আবার স্কটিশ পুরুষরা ঐতিহ্যবাহী পোশাক হিসেবে স্কার্ট বা ঘাগড়া পরিধান করে। সারাবিশ্ব জুরে মেয়েরা শার্ট, প্যান্ট, টি-শার্ট ইত্যাদি পরিধান করে। এই উদাহরণগুলো কোনোটাই আমাদের আলোচনার বিষবস্তুর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ক্রস-ড্রেসিং বা বিপরীত লিঙ্গের পোশাক পরিধানের উদাহরণ নয়। কেননা এগুলো প্রচলিত সংস্কৃতির সাথে যায় এমন পোশাক পরিচ্ছেদ। তবে জেন্ডার ডিসফরিয়া (Gender Dysphoria) বা জেন্ডার অতৃপ্তির কারণে যারা বিপরীত লিঙ্গের পোশাক পরিধান করেন তাদেরকেই আমরা ক্রস-ড্রেসার বলবো। যেমন- ট্রান্সওম্যান শাড়ি, চুড়ি, লিপস্টিক ইত্যাদি পরিধান করেন তার জেন্ডার তৃপ্তির জন্য। আবার যারা ট্রান্সম্যান আছেন, তারাও শার্ট, প্যান্ট জাতীয় পুরুষালী পোশাক পরিধান করেন। ক্রস-ড্রেসিং এর পুরো ব্যাপারটিই জেন্ডার ডিসফরিয়া বা জেন্ডার অতৃপ্তির সাথে সম্পর্কিত।
 

হিজড়া

ভুল দেহে জন্ম নেওয়া অর্থাৎ পুরুষের শরীরে নারীর মন নিয়ে জন্মানো মানুষগুলোকে বাংলাদেশে হিজড়া বলা হয়। সে অর্থে তারা ট্রান্সওম্যান বা রূপান্তরিত নারী। ইন্টারসেক্সচুয়াল বা উভয়লিঙ্গ যারা তাদেরকেও হিজড়া নামে ডাকা হয়। তবে বাংলাদেশে হিজড়াগণ সাধারণত ট্রান্সওম্যান বা রূপান্তরিত নারী। জন্মগতভাবে এঁরা পুরুষ। কিন্তু জীবনের একটা সময় তাদের দেহে ও মনে পরিবর্তন এসেছে। তাই বেছে নিয়েছেন হিজড়া জীবন। মহাভারতের প্রধান চরিত্র অর্জুনের “বৃহন্নলা” বেশ এর সাথে সাজুয্য রেখে তাদেরকে ডাকা হয় বৃহন্নলা। মহাভারতের আরেক চরিত্র “শিখণ্ডী”র নামানুসারে কখনো তাদের ডাকা হয় “শিখণ্ডী”। বাংলাদেশ সরকার নাম দিয়েছেন “তৃতীয় লিঙ্গ”। আবার কেউ ডাকেন “নপুংসক” কিংবা “উভয়লিঙ্গ” নামে। বিভিন্ন ধর্মে ও বিভিন্ন দেশের সংস্কৃতিতে রয়েছে এদের বিভিন্ন নাম। আরবীতে উভয় লিঙ্গ বা ইন্টারসেক্সচুয়ালদের বলা হয় “খুনছা”, নপুংসকদের ডাকা হয় “মুখান্নাছুন”। বৌদ্ধধর্মে উভয়লিঙ্গদের নাম “উভাতোব্যঞ্জনাকা” আর নপুংসক ও মেয়েলী পুরুষদের ডাকা “পাণ্ডাকা বা পণ্ডক” নামে। ভারতে কোথাও ডাকা হয় “হিজড়ে”, কোথাও “আরাবানি”, কোথাও “জোগাপ্পা”। থাইল্যান্ড-এ কাথই, লেডিবয় ইত্যাদি নামে ডাকা হয়। ইন্দোনেশিয়ায় ওয়ারিয়া নামে ডাকা হয়। হিজড়াদের নিয়ে প্রচলিত আছে বিভিন্ন গল্প, মিথ, সত্য-মিথ্যে কথা আর তাদের যৌনজীবন নিয়ে রয়েছে অসীম কৌতুহল। সাথে সাথে কতগুলো ভ্রান্ত ধারণা প্রচলিত আছে সাধারণ মানুষের মাঝে।
 
হিজড়া একটি সংস্কৃতি, যেখানে গোত্র প্রধান একজন গুরুমা। পরিবার, সমাজ তথা চারপাশের আমাদের মতো স্যাডিস্ট মানুষদের অবিরাম ঘৃণা আর তাচ্ছিল্যের হাত থেকে বাঁচতে এঁরা আশ্রয় নেয় গুরুর কাছে। মাথাগোঁজার স্থান হয় হিজড়া-ডেরা। মানবেতর জীবন যাপনের সাথে চলে আপস আর আপস। হিজড়া সংস্কৃতির অংশ হিসেবে ভিক্ষা করা, বাজারের দোকানপাট থেকে “ছল্লা” তোলা, নতুন শিশু ও বিয়ে বাড়িতে আশীর্বাদ করা উপলক্ষে নাচ-গান করে টাকা তোলা ইত্যাদি করে চলে তাদের জীবন জীবিকা। প্রতিটি হিজড়া সদস্যের জীবনে রয়েছে করুণ ও নির্মম কাহিনী। বাবা-মা-ভাই-বোন সবাইকে ছেড়ে গুরুমায়ের কাছে একপ্রকার দিন চালিয়ে নেওয়ার জীবন তাদের। জোটেনা শিক্ষা, চিকিৎসা, মমতার স্পর্শ। তাই যথাযথ সামাজিকীকরণের অভাবে তাদের মধ্যে হিংসাত্মক মনোবৃত্তি দেখা যায়। এর জন্য দিন শেষে তাদেরকেই দোষ দেয় ভদ্র সমাজ। অথচ কাছে ডেকে কখনো কোনদিন কেউ বলে না “কি তোমার দুঃখ বোন আমার?”
 
হিজড়াদের কেউ কেউ লিঙ্গচ্ছেদন করে থাকে। যাদেরকে বলা হয় “ছিন্নি”। অনেকেই ভারতে গিয়ে এই কাজটি করে আসে। শারীরিক দিক থেকে কিছু পরিবর্তন করে কেউ কেউ আরেকটু বেশি মেয়েলী হয়ে ওঠে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এদের লৈঙ্গিক পরিচয়ের কারণে তারা উত্তরাধিকার সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হয়। অন্যান্য নাগরিকের মতো সকল অধিকার ভোগ করতে পারে না। বাংলাদেশ সরকারকে সাধুবাদ জানাতে হয়, কারণ ২০১৩ সালের ১১ নভেম্বর সরকার হিজড়াদেরকে “তৃতীয় লিঙ্গ” হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। কিন্তু আরো অনেক পথ বাকি আছে তাদের পরিপূর্ণ নাগরিক হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে এবং সকল বৈষম্যের অবসান করে একটা সুন্দর জীবনের অধিকারী হতে।      

                                                                                                                                               [চলবে...]
[1] Fausto-Sterling, Ann (2000), Sexing the Body: Gender Politics and the Construction of Sexuality. New York: Basic Books. ISBN 0-465-07713-7

ছবি
সেকশনঃ সাধারণ পোস্ট
লিখেছেনঃ বাবুর বাবা তারিখঃ 30/08/2017 10:39 AM
সর্বমোট 688 বার পঠিত
ফেসবুকের মাধ্যমে কমেন্ট করুণ

সার্চ