ব্যাকগ্রাউন্ড

মুক্তচিন্তার বিশ্ব

আপনার পছন্দের যে কোন কিছু সহব্লগারদের সাথে শেয়ার করতে ও শেয়ার কৃত বিষয় জানতে এখানে ক্লিক করুণ

ফেইসবুকে!

ছোটগল্প: বেহেশতের চাবি হাতে চলে গেল জাহান্নামে




















ছোটগল্প:

বেহেশতের চাবি হাতে চলে গেল জাহান্নামে
সাইয়িদ রফিকুল হক

 
সাইফুল আজ একটু আগে এশার নামাজ পড়ছে। মাগরিবের নামাজের পরে একটুখানি বিরতী দিয়ে সে আবার নামাজ-আদায় করার জন্য জায়নামাজে দাঁড়িয়ে গেল। আর যথারীতি নামাজ শুরু করে দিলো। সে একা-ঘরে নামাজ-আদায় করছে বলে নামাজের আগে ‘ইকামত’ দিলো না। অথচ, এই দেশের মানুষের সুন্নতীআকিদাহ অনুযায়ী একা হোক আর দুই-তিনজনে হোক, ওয়াক্তের ফরজ নামাজ-আদায়ের আগে ইকামত দিয়ে নিবে। কিন্তু সাইফুলরা ও-সবের ধার ধারে না। ওরা ইসলামকে নতুনভাবে আবিষ্কার করতে চায়। আর ওদের মনমতো ইসলামকে সাজিয়ে নিতে চায়।
 
আজ সে একজনকে খুন করতে যাচ্ছে। একটু পরে লোকটিকে সে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে-কুপিয়ে হত্যা করবে। দলের হাইকমান্ডের নির্দেশ মোতাবেক সে আজ এই লোকটিকে কুপিয়ে-কুপিয়ে হত্যা করবে। তাই, সে আগেভাগে এশার নামাজ-আদায় করছে। হতে পারে এটি তার জীবনের শেষ নামাজ। সে একটু পরেই জিহাদী-কাজে নেমে পড়বে। এখানে সে গাজীও হতে পারে, আবার শহীদও হতে পারে। আর এখানে তার হারাবার কিছু নাই। কারণ, সে মনে করে: মরলে শহীদ আর বাঁচলে গাজী! তবে এখানে তার গাজী হওয়ার সম্ভাবনাটাই খুব বেশি। আর তার কারণ, ইতঃপূর্বে সে ঢাকায় এইজাতীয় দুই-একটা অপারেশন ইতোমধ্যে সফলভাবে শেষ করে এসেছে। সেখানে সে সামান্য আহতও হয়নি। প্রকাশ্য-দিবালোকে তারা একটা তরতাজা-যুবককে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে-কুপিয়ে হত্যা করেছে, তবুও কেউ-একজন ওই যুবকটিকে বাঁচাবার কোনোপ্রকার চেষ্টা করেনি। আর এই মফলস্বল-শহরে তার ধরা পড়ার কোনো ভয় নাই। এটি তার নিজের শহর। আর শহর কীসের? কিছুসংখ্যক লোক জোর করে এটাকে শহর বলে থাকে। এখানে, এখনও গ্রামের ছায়াঢাকা-সুনিবিড় পরিবেশ। আর রাতের আঁধারে এখানে মানুষ-মারাটা খুব সহজ মনে হচ্ছে তার কাছে। সে এখানে অপারেশনের এক-মাস আগে থেকে যে-লোকটিকে হত্যা করবে তার বাড়ির কাছাকাছি একটা বাসাভাড়া করে সে বসবাস করছে। অবশ্য এখানে তার আরও নানারকম সাংগঠনিক কাজ আছে। এখানে, তারা বোমা তৈরি করবে। নিজেদের বাড়িতে এসব করলে হঠাৎ লোকজানাজানি হয়ে যেতে পারে। তাই, তাদের এই আগাম সতর্কতা। এই এলাকাটা মফলস্বল-শহর হলেও মানুষের যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে। তারা এখন যারতার কাছে বাসাভাড়া দিতে চায় না। সেইজন্য সাইফুল হাইকমান্ডের নির্দেশে পাশ্ববর্তী নিজেদের সাঁথিয়া-থানা থেকে বাসাভাড়া নেওয়ার সময় নিজের মাকে এখানে নিয়ে এসেছিলো।
 
সে এখন নিজেদের বাড়িতে নামাজ পড়ছে। এটা সাঁথিয়া-থানা। নামাজ শেষ করে সে বেড়া-থানায় প্রবেশ করবে। এখন এই এলাকায় যাতায়াত-ব্যবস্থার খুব উন্নতি হয়েছে। তাই, অল্পসময়ে সে নিজের ভাড়া করা বাসায় পৌঁছে যাবে। সেখানে আরও তিনজন যুবক আসবে। আর চাপাতি-সহ অস্ত্রশস্ত্র সব ওই বাসায় রয়েছে। অপারেশন ভালোভাবে শেষ হলে তারা আবার নিজেদের বাড়ি ফিরে যাবে।
 
আজ তার মরার কোনো সম্ভাবনা নাই—এমন একটা ধারণা আজ সকাল থেকে তার মনে জন্ম নিয়েছে। পরকালের জন্য তবুও সে আজ তার জীবনের আখেরি-সালাত ভেবে তা আদায় করছে। সে অনেক সময় নিয়ে নামাজ আদায় করছে। আর তার মনোযোগ এখন নামাজে নাকি সে কীভাবে লোকটাকে কুপিয়ে-কুপিয়ে হত্যা করবে, তা-ই ভাবছে। তার এই ভাবনা খুবই পবিত্র! সে ইসলামের স্বার্থে মানুষ খুন করে! আর দেশে ইসলাম-কায়েমের জন্য সেই পাকিস্তান-আমল থেকে তার দল দিনরাত প্রকাশে-অপ্রকাশ্যে কতরকমের পরিশ্রম আর রাজনীতি করছে। কিন্তু তাতে কোনো কাজ হচ্ছে না। তারা একাত্তরের রাজাকার বলে এদেশের প্রকৃত-দেশপ্রেমিক লোকজন তাদের এখন ভোটও দিতে চায় না। আর তাদের তরফ থেকে সবসময় অনেকরকম লোভের-লাভের আশা থাকাসত্ত্বেও দেশের সাধারণ ভোটাররা তাদের ভোট দিতে চায় না। শুধু কিছুসংখ্যক দালাল তাদের ভোট দিয়ে থাকে। কিন্তু এতে কোনোভাবেই রাষ্ট্রক্ষমতা-করায়ত্ত করা যাবে না। এটা তারা এখন খুব ভালোভাবে বুঝে গেছে। তাই, তার দল ইসলামের স্বার্থে নামে-বেনামে-ছদ্মনামে তাদের মতো মরদে মুজাহিদদের দিয়ে গুপ্তঘাতকদল গঠন করেছে। এরা হলো ইসলামের সৈনিক!
 
 
সাইফুল এই কাজে একজন আঞ্চলিক-কমান্ডার। সাধারণতঃ আগে সে যখন আঞ্চলিক-কমান্ডার ছিল না, তখন সে অপারেশনে যেতো, কিন্তু আজও তাকে যেতে হবে। কারণ, আজ তারা যে-লোকটিকে হত্যা করবে তিনি এই এলাকার সর্বজনশ্রদ্ধেয় একজন বীর-মুক্তিযোদ্ধা এবং রাজাকারবিরোধী স্থানীয় জাগরণমঞ্চের মুখপাত্র। আর তার দাপটে এই এলাকায় কোনো জঙ্গীফঙ্গী কিংবা রাজাকাররা মিছিল পর্যন্ত করতে পারে না। কাজেই তাদের দলের হাইকমান্ড এই লোকটিকে আর বাঁচিয়ে রাখতে নারাজ। তার একমাত্র উপযুক্ত শাস্তিস্বরূপ ইতোমধ্যে তার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ড-ঘোষণা করা হয়ে গেছে। এর আগে তারা তাকে একাধিকবার লিখিত ও মৌখিক হুমকি-ধমকি দিয়েছে, কিন্তু তাতে কোনো কাজ হয়নি। লোকটি তাদের ধমককে মোটেই পাত্তা না দিয়ে নিজের মতো কাজ করে যাচ্ছেন। আর তিনি চিরপ্রতিজ্ঞাবদ্ধ: তার এলাকায় রাজাকারের সামান্যতম চিহ্ন পর্যন্ত রাখবেন না।
 
আজকের অপারেশনে তার সঙ্গে থাকবে তিনজন বড়মাপের খুনী। কারণ, তারা যে লোকটিকে হত্যা করবে তিনি এই এলাকার বিশিষ্ট একজন মুক্তিযোদ্ধা। আর তিনি সরাসরি একাত্তরের মুক্তিযোদ্ধা। তাছাড়া, লোকটি এলাকায় একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য নানাভাবে প্রবল জনমত গড়ে তুলেছেন। তিনি স্থানীয় জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিলের সেক্রেটারি ছিলেন। এছাড়াও তিনি স্থানীয় উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি। তার দাপটে পাকিস্তানপন্থীরা ঠিকভাবে মিছিল করতে পারে না। তার দলেরও অনেকেই তার প্রতি বীতশ্রদ্ধ। তার জন্য দলীয় টাউটগুলো এলাকায় চাঁদাবাজি, রাহাজানি, ধাপ্পাবাজি ইত্যাদি শয়তানী করতে পারে না। দলের ভিতরের আবর্জনাতুল্য এই ভেজালশ্রেণীও তার উপর ক্ষেপে আছে। দলের কোনা ষণ্ডাকে পাত্তা দেন না এই লোকটি। আর তার সাহস এই এলাকায় সর্বজনবিদিত। একাত্তরের রণাঙ্গনে তিনি ছিলেন সবচেয়ে সাহসীপুরুষদের একজন। কয়েকবার মারাত্মকভাবে আহত হয়েও মুক্তিযুদ্ধ বাদ দিয়ে তিনি কখনও একদিনের জন্যও বাড়ি ফিরে আসেননি। এলাকায় তিনি হাশেম-মাস্টার নামে পরিচিত। একসময় তিনি স্থানীয় হাইস্কুলের হেডমাস্টার ছিলেন। সেই থেকে এলাকাবাসী সবাই তাকে হাশেম-মাস্টার বা মাস্টারসাহেব বলে ডাকে। তিনি এলাকার সব মানুষের প্রিয়পাত্র। শোনা যাচ্ছে, এবার উপজেলার চেয়ারম্যানপদে একমাত্র প্রার্থী তিনিই হবেন। দল থেকে নাকি তাকেই মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। আর এতেই তার দলের ভিতরের মুখচেনাশয়তানগুলো একেবারে ক্ষেপে গেছে। তবে তিনি এসব পাত্তা দেন না।
 
সাইফুলের নামাজ পড়া প্রায় শেষ। এমন সময় তার ঘরের দরজার কড়া নাড়তে লাগলো তার মা। আর সে বারবার কড়া নাড়তে-নাড়তে বলতে লাগলো, “ও সাইফুল, কী করছিস বাপ? এট্টু দরজাডা খুলবি? তোর সঙ্গে একখান কতা ছিল বাপ!”
মায়ের কথা শুনে সাইফুল তাড়াতাড়ি পার্শ্বসালাম ফিরিয়ে নামাজ শেষ করে দরজা খুলে খুব শান্তভাবে বললো, “কী জন্যি ডাকতিছো? তাড়াতাড়ি কও মা, এট্টু পরে আইজ আমি একখান অপারেশনে যাবো।”
ওর মা বললো, “কীসের অপারেশন বাপ?”
সাইফুল বললো, “কাফের মারার অপারেশন! আইজ একটা কাফের মারবো মা। এই কাফেরটা ইদানীং খুব বাড়াবাড়ি করছে। আর ইসলামের ভীষণ ক্ষতি করছে!”
তারপর সে একটু থেমে মায়ের দিকে চেয়ে বললো, “থাক, এসব শুইনে তোমার কোনো কাম নাই। এহন কও তুমি কী জন্যি আইছো?”
ওর মা কিছুক্ষণ নিশ্চুপ থেকে বললো, “কাজ কিছু না। তোর বাপের বুকের ব্যথাডা আইজ আবার এট্টু বাড়ছে। তাই কইছিলাম কি একটা ডাক্তার আনলি বালো হইতো না?”
সাইফুল এবার গম্ভীর হয়ে বললো: “আমি ফিরে এসে রাতে ডাক্তার নিয়ে আসবো। এখন পারবো না। আর তুমি এহন যাও। আমার কিছু কাম আছে।”
মহিলা তবুও গেল না। সে ছেলের মুখের দিকে আবার কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললো, “তা বাপ আইজ কাকে মারবি? লোকটার নাম কী?”
সাইফুল আবার গম্ভীর হয়ে বললো: “তোমার এসব শুইনে কাম নাই মা। তুমি এহন ঘরে যাও।”
ওর মা তবুও নাছোড়বান্দা হয়ে মনভার করে বললো, “আমারে কইলে কী দোষ হবি? আমি কি কারও কইতে যাবো? আমি তো তোর সব খবরই রাহি বাপ!”
সাইফুল কী যেন ভেবে খুব স্বাভাবিকভাবে বললো, “লোকটার নাম হাশেম-মাস্টার। একজন মুক্তিযোদ্ধা। কিন্তু ইসলামের শত্রু!”
ওর মা এবার কিছুটা উদ্বিগ্ন হয়ে বললো, “এই লোকটাতো ইলাকায় খুব জনপ্রিয়। ওরে মারলি শেষে কুনো বিপদে পড়বি নাতো বাপ?”
সাইফুল মাকে অভয় দিয়ে বলে, “কিচ্ছু হবে না মা। আর কেউ কিছু বুঝতেও পারবে না। কারণ, ইলাকায় ওদের পার্টির ভিতরে এখন গ্রুপিং চলছে। এই সুযোগে আমরা ও-কে শেষ করে দেবো। আর ও-কে মারতে আমাদের বড়-জোর দশ মিনিট লাগবে।”
সব শুনে তবুও ওর মা বলতে থাকে: “এইরকম একজন জনপ্রিয় মানুষ। তারে মারবি? আর শুনছি: লোকটা নাকি খুব ভালো। পাঁচ-ওয়াক্ত নামাজও পড়ে!”
সাইফুল এবার কিছুটা উত্তেজিত ভঙ্গিতে বলতে থাকে, “তাতে কী? নামাজ পড়লে কী? কাফেরের আবার নামাজ কী? আর এই লোকটা ১৯৭১ সালে বহু পাকিস্তানী-আর্মিকে নৃশংসভাবে হত্যা করিছে। আর সে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের একনিষ্ঠ-সেবক: রাজাকার-আলবদর-আলশামসদের উপরও নাকি ভয়াবহ অত্যাচার চালিয়েছিলো। আর তুমি কি সব ভুলে গেছো নাকি মা? আমার মরহুম দাদাজান শহীদ শামসুজ্জামান পরামাণিক হত্যার পিছনেও তো এই লোকটার হাত ছিল। একাত্তরে আমার শ্রদ্ধেয় দাদাজান ছিলেন একজন আদর্শবান-রাজাকার। আর তিনি ছিলেন অত্র ইলাকার একজন জাঁদরেল-রাজাকার। পাকিস্তানের জন্য তিনি একাত্তরে শহীদ হয়েছেন। আর আমিও সেই মহান শহীদ শামসুজ্জামানের নাতি। আমি ও-কে এবার ছাড়বো না মা। ও-কে আইজ মরতেই হবি। ওর জন্য ইসলামের বিরাট ক্ষতি হচ্ছে।”
তারপর সে একটু থেমে মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বললো, “এই যে আব্বা আইজ পঙ্গু হয়ে ঘরে বসে আছে। আর সবসময় একখান হুইল-চেয়ারে বসে চলাফেরা করে তা কী জন্যি? এই লোকটার জন্যি মা, এই লোকটার জন্যি। সে আমার নিরীহ বাপকে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে সোনাপদ্মা হাইস্কুলের সামনে বহু লোকজনের উপস্থিতিতে লোমহর্ষক অত্যাচার করেছিলো। সেদিন তো আব্বা মারাই যেতো। যদি অনেকগুলো টাকা-পয়সা দিয়ে আব্বাকে ছাড়ানো না হতো। ওই লোকটা দুপুরে খাওয়ার জন্য বাড়ি যেতেই আজিজ কাকা মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে আব্বাকে ছেড়ে দেয়। এই নিয়ে লোকটা পরে আজিজ কাকাকেও মেরে ফেলতে চাইছিলো। কিন্তু আজিজ কাকাতো খুব চালাক। তিনি আগেই ইলাকায় আওয়ামীলীগের একটা পদ নিয়ে বসে ছিলেন। তার জন্যিইতো আব্বা আজও বেঁচে আছেন।”
সব শুনে ওর মা বললো, “আল্লাহর নাম নাও বাপ। আল্লাহর দয়া না থাকলি তোমার আজিজ কাকাও কিছু করতে পারতো না।”
এবার মায়ের সামনে তার ঈমানের দুর্বলতাপ্রকাশ পাওয়ায় সে যেন কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে বললো, “সে তো জানি মা, আল্লাহর হুকুম ছাড়া তো গাছের পাতাডাও নড়ে না।”
এবার ওর মা বললো, “তবুও বাবা, লোকটাকে ছেড়ে দেওয়া যায় না?”
সাইফুল এবার দৃঢ়তার সঙ্গে বললো, “না মা, না। এইরকম একজন কাফেরকে আর বাঁচিয়ে রাখা যায় না। আমাগরে দলের হাইকমান্ডের নির্দেশ মা। এটা মানতেই হবে। তুমি আমাকে এই পবিত্র কাজে আর বাধা দিয়ো না। শুধু দোয়া করবে যেন আগের মতো এবারও সফল হয়ে ঘরে ফিরে আসতে পারি। তুমি তো জানো মা, আমি ঘরে বসে থেকেও মাসে চল্লিশ-পঞ্চাশ হাজার টাকা বেতনের মতো মাসে-মাসে পাই কী জন্যি? এই জন্যি? কাফের মারার দায়িত্ব আমার উপর। এই যে বাড়িতে দোতলা উঠতিছে, তা কীভাবে? হাইকমান্ডের টাকায় মা। হাইকমান্ডের টাকায়। আর ইসলামের সেবা করার জন্য আমি এসব টাকা-পয়সা পাচ্ছি। আর এসবই আল্লাহর নেয়ামত মা।”
ওর মা আর কিছু না বলে সোজা নিজের ঘরে চলে গেল।
 
কয়েক মিনিট পরে সাইফুলের কাছে একটা ফোন-কল এলো। আর সাইফুল এপাশ থেকে ফোনদাতার উদ্দেশ্যে বলতে লাগলো: “ওয়া আলাইকুম আসসালাম। না, না, সব ঠিক আছে। না-না কোনো চিন্তা নাই। আমি শহীদ রাজাকার শামসুজ্জামানের নাতি। আর আমার বাবাও একজন জাঁদরেল-রাজাকার ছিলেন। কাজেই সবকিছু ঠিকঠাক মতোই হবে। আইজ আমাগরে হাতে আরেকখান বেহেশতের টিকিট মানে বেহেশতের চাবি আসপি। আর আমরা এভাবে নিয়মিত বেহেশতের চাবি জোগাড় করতেই থাকপো। আসসালামু আলাইকুম, আমীরসাহেব।”
সে হাসতে-হাসতে ফোন রেখে দিলো।
 
 
হাশেম-মাস্টারের আজ সকাল থেকে মনটা ভালো নেই। তাই তিনি পাশের গ্রামে একটা বিয়ের দাওয়াতে যাননি। অবশ্য তার পরিবারের সকল সদস্য সেখানে গিয়েছে।
সন্ধ্যার পরে অনুষ্ঠান। বাড়ির সবাই তবুও বিকালের দিকেই অনুষ্ঠানস্থলে চলে গেছে। আর আগেভাগে না গেলে আনন্দ মাটি হয়ে যাবে।
বাড়িটা এখন প্রায় একদম খালি। অনেক বড় বাড়ি। তার বাপের আমল থেকে আছে দোতলা বিল্ডিং। তাছাড়াও তিনি নিজে দুটি বড় টিনশেড তৈরি করেছেন। এছাড়াও আছে ঘোড়ার একটা আস্তাবল। আছে আরও একটি ঘর। এখানে বিবিধ পশুপাখি থাকে।
 
এই বাড়ির গেট বলতে তেমন শক্তমজবুত কিছু নেই। অনেক বড় বাড়ি হওয়াতে তিনি দেওয়াল দেওয়ার কথা এখনও ভাবতে পারেননি। তবে বাড়ির চারদিকে শক্ত-বাঁশের প্রাচীর আছে। তার জীবনটা হুমকির সম্মুখীন। তবুও তিনি নির্বিকার। তিনি খুব সাহসীমানুষ। তবে ইদানীং একটু সতর্ক হয়েছেন। তাই চারজন দেহরক্ষী থাকে তার সঙ্গে। কিন্তু কেউ তা বুঝতে পারে না। তিনি কাউকে এইব্যাপারটা বুঝতে দিতেও চান না। আর তার পরিবারের খাস-লোকজন ছাড়া আর-কেউ এদের কথা জানেও না এবং এদের কাউকেই চেনেও না। তার চার-বডিগার্ড সবসময় তার নিরাপত্তার কাজে নিয়োজিত। তার বড় ছেলে শহরে থাকে। তার পরামর্শেই তিনি এই ব্যবস্থাগ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছেন। ছেলের জোর-দাবি তিনি কিছুতেই অগ্রাহ্য করতে পারেননি।
 
তিনি জঙ্গীফঙ্গীদের নিকট থেকে একাধিকবার হুমকি-ধমকি পাওয়ার পর থেকে থানায় গিয়েছিলেন জিডি করতে। মনে একটা বিরাট কষ্ট নিয়ে থানায় তিনি একটা জিডিও করেছিলেন। কিন্তু ক’দিন পরে তিনি বুঝতে পারলেন, থানা-পুলিশে কোনো কাজ হবে না। এরা তার জীবনের সামান্যতম নিরাপত্তাও দিতে পারবে না। এদের কাজকর্ম তার কাছে ভালো মনে হয়নি। সেই থেকে তিনি নিজের জীবনের নিরাপত্তার দায়িত্ব তার নিজের কাঁধেই তুলে নিয়েছেন।
যে-চারজন যুবক তার দেহরক্ষীর দায়িত্বপালন করছে তারা চরাঞ্চলের মানুষ। এরা খুব সাহসী। আর খুব সাংঘাতিক। আর তারা হাশেম-মাস্টারকে জীবন দিয়ে ভালোবাসে।
এশার নামাজ পড়ে সামনের দোতলার বারান্দায় বসে ছিলেন হাশেমসাহেব। তিনি এলাকার রাজনীতি নিয়ে খুব ভাবছিলেন। এমন সময় তিনি খুট করে কিছু একটা খোলার শব্দ শুনতে পেলেন। আর  তিনি দেখতে পেলেন: তার বাড়ির বাঁশের গেটটা আস্তে-আস্তে খুলে যাচ্ছে। আর সেখানকার আবছা আলোতে তিনি আরও দেখলেন তিনজন মানুষ বাড়ির ভিতরে ঢুকছে। একটু পরে আরও একজন ঢুকলো। খুব সাবধানে তারা বাড়ির ভিতরে ঢুকেছে।
তিনি অনেকটা অন্ধকারে বসে আছেন। তাকে কেউ সহজে দেখতে পাবে না। কিন্তু তিনি ওদের সবকিছু দেখতে পাচ্ছেন। আর স্পষ্ট বুঝতে পারছেন ওদের মতিগতি।
তিনি বুঝতে পারলেন এরা চারজনই জঙ্গী। আর তারা তাকে হত্যা করতেই বাড়ির ভিতরে ঢুকেছে। তবুও তিনি নির্বিকার। তিনি কিছুই বললেন না কিংবা কিছুই করলেন না। শুধু মনোযোগ দিয়ে ওদের সবকিছু দেখছেন।
দেখলেই বুঝা যায়, চারজনই মাদ্রাসার ছাত্র। স্বল্প আলোতেও দুজনের মুখের দাড়ি স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। আর বাকী দুজন একেবারে ক্লিন-সেভ! তারা লোকের চোখে ধূলো দেওয়ার জন্য সাধারণ মানুষের মতো প্যান্ট-শার্ট পরে এসেছে। ওরা যখন যেমন আর তখন তেমন ছদ্মবেশ নিয়ে থাকে। আর এইব্যাপারে ওরা স্বয়ং ইবলিশ শয়তানকেও হার মানাতে পারবে।
সবকিছু দেখেও তিনি নিরুত্তাপচিত্তে আগের জায়গায় চুপচাপ বসে রইলেন। কারণ, তিনি জানেন:  বিল্ডিংয়ের নিচতলার কলাপসিবল-গেট ভেঙ্গে ঢুকে তাকে মারতে ওদের কমপক্ষে আধাঘণ্টা লাগবে। আর তার আগেই তার লোকজন একটাকিছু করতে পারবে। তিনি একাত্তরের বীর-মুক্তিযোদ্ধা। তার ভয় কী? আর ভয় যদি পেতেই হয় তাহলে, এই দেশে রাজাকাররা ভয় পেতেই থাকবে। তারা একাত্তরের পাপী। ভয়ডর শুধু তাদের জন্য। তার সততা ও সাহসের জন্য এলাকার তরুণরা তাকে খুব ভালোবাসে। তাদের ভালোবাসার দাবিকে সম্মান জানিয়ে তিনি স্থানীয় ‘জাগরণমঞ্চে’র মুখপাত্রের দায়িত্বপালন করছেন।
তার বাড়ির গেট থেকে তার থাকবার বিল্ডিংটা বেশ দূরে। তাদের বাড়ির সামনে একটা বড়সড় লন রয়েছে। এটা পেরিয়ে তারপর বিল্ডিংটার কাছে আসতে হবে।
চারজন মানুষ এগিয়ে আসছে। তাকে হত্যা করার যাবতীয় প্রস্তুতি তাদের শেষ। আর তিনি তা বুঝেও গেছেন।
মিনিটখানেক পরে বাঁশের গেটটা আটকে গেল। এবার কোনো শব্দ হয়নি। তিনি বুঝলেন, পাকা হাতের কাজ। তিনি যখন এসব ভাবছেন আর তখনই শুনলেন দুটো আ্যালসেসিয়ান কুকুরের ডাক। কুকুর দুটো ঝাঁপিয়ে পড়লো চার আগন্তুকের উপর। ওরা কিছু বোঝার আগেই ওদের দফারফা শেষ। কুকুর দুটো ওদের খুব খাতির করেছে। দুজন ঘটনাস্থলেই মারা গেছে। আর বাকী দুজনকে তাদের  মাথা দেহ থেকে কুড়ালের এককোপে বিচ্ছিন্ন করে ফেললো চার বিশ্বস্ত-প্রহরীর দুজন।
হাশেম-মাস্টারের বড় ছেলেই কুকুর দুটোকে ঢাকা থেকে চড়া দামে কিনে এনেছেন। বাপের জন্য তার খুব মায়া। এমন একজন বাপ তার—এজন্য সবসময় তার গর্ব হয়।
চার জঙ্গীই মারা গেছে। ওরা এখন বাংলার সবুজ ঘাসের বুকে শুয়ে আছে। আর বেহেশতের চাবি হাতে ওরা এখন জাহান্নামে যাওয়ার অপেক্ষায়।
হাশেমসাহেব এবার দোতলা থেকে নিচে নেমে এলেন। তার মুখে এখন অন্যরকম হাসি। হয়তো ভাবছেন: তিনি আরও কিছুদিন ‘জাগরণমঞ্চে’র নেতৃত্ব দিতে পারবেন।
চার-প্রহরীর একজন হাশেম-মাস্টারের সামনে এসে বললো, “চাচাজী, সব খতম। শয়তানগুলোকে আমরা জাহান্নামে পাঠিয়ে দিয়েছি। এবার...।”
হাশেম-মাস্টার চোয়াল শক্ত করে তাদের উদ্দেশ্যে বললেন, “শাবাশ ব্যাটা শাবাশ। এভাবেই তোমাদের দেশের জন্য কাজ করতে হবে। দেশের শত্রুরা হলো আদিআসল কাফের। এদের হত্যা করতে কখনও যেন তোমাদের হাত না কাঁপে। আর এদের হত্যা করতে একদণ্ডও বিলম্ব করবে না। আর কোনোকিছুর লোভে কখনও এদের ছাড় দেবে না। তোমরা হলে নবপ্রজন্মের মুক্তিযোদ্ধা। এবার থেকে এলাকায় আমি তোমাদের পথ দেখাবো। আর আমাদের একজন মানুষকেও ওদের হাতে মরতে দেবো না। তার আগেই আমরা ওদের খতম করে ফেলবো। আমাদের আবার একাত্তরের চেতনায় জেগে উঠতে হবে। আর আমাদের নিরাপত্তার দায়িত্ব আমাদেরই গ্রহণ করতে হবে।”
তারপর তিনি একটু থেমে ওদের নির্দেশ দিলেন, “লাশগুলো এখনই কৌশলে বড় রাস্তার পাশে ফেলে রাখো। ওদের প্রেরক বাপেরা ওদের দেখে শিউরে উঠবে।”
চারপ্রহরী ওদের কাজে নেমে পড়লো। আর তারা কুকুর দুটোকে সঙ্গে নিয়ে চারজনের লাশ নিরাপদে বড় রাস্তার পাশে ফেলে রাখলো।
মাস্টারসাহেব একটু দূরে দাঁড়িয়ে সবকিছু দেখছিলেন। আর তিনি ভাবছিলেন: এভাবেই আগামীদিনগুলোতে কাফেরদের শায়েস্তা করতে হবে। আর ওদের হাতে এখন থেকে সবসময় ধরিয়ে দিতে হবে একখানা করে জাহান্নামের টিকিট!
 
 
 
 
সাইয়িদ রফিকুল হক
মিরপুর, ঢাকা, বাংলাদেশ।

ছবি
সেকশনঃ গল্প
লিখেছেনঃ সাইয়িদ রফিকুল হক তারিখঃ 28/06/2017 09:33 AM
সর্বমোট 1568 বার পঠিত
ফেসবুকের মাধ্যমে কমেন্ট করুণ

সার্চ