ব্যাকগ্রাউন্ড

মুক্তচিন্তার বিশ্ব

আপনার পছন্দের যে কোন কিছু সহব্লগারদের সাথে শেয়ার করতে ও শেয়ার কৃত বিষয় জানতে এখানে ক্লিক করুণ

ফেইসবুকে!

বাঙালি রেডিমেট-মডারেট-মুসলমানের ঈমানের ভিত্তি



বাঙালি রেডিমেট-মডারেট-মুসলমানের ঈমানের ভিত্তি
সাইয়িদ রফিকুল হক
 
এই দেশে বুঝেশুনে-জেনেশুনে মুসলমান হয়েছে কয়জন? এর সঠিক উত্তর অনেকেই দিতে পারবেন না। কারণ, এর উত্তর জানা থাকলেও কেউ সহজে নিজেকে অপদস্থ করতে রাজী নন। বাংলায় একটা কথা আছে: উপরের দিকে থুথু নিক্ষেপ করলে তা নিজের গায়েই পড়ে। আর কথাটা অতীব সত্য। বাঙালি-মুসলমানের বদনাম অনেক। এই দেশে দেখেশুনে-জেনেশুনে মুসলমান হয়েছে মাত্র  হাতেগোনা কিছুসংখ্যক মানুষ। আর বাদবাকী-বেশিরভাগই ‘হুজুগে মুসলমান’। জানি, কথাটা অনেকে বিশ্বাস করতে চাইবেন না। কিন্তু এটিই সত্য। এরা বাপ-দাদার আমলের বিনিময়ে আর পৈতৃকসূত্রে মুসলমান। আর এরাই বাংলাদেশের নামধারীমুসলমান। এরাই আজকের রেডিমেট মুসলমান। কিন্তু এরা নিজেদের ইমেজবৃদ্ধির জন্য এখন নামধারণ করেছে—মডারেট মুসলমানের! এরা আসলে, চরম  সাম্প্রদায়িক আর দাঙ্গাবাজ। এজন্য অনেকে এদের ‘গোরুখোর’ মুসলমান বলে থাকেন। বাংলাদেশে সাম্প্রতিককালে এই ‘গোরুখেকো-মুসলমানের সংখ্যাই বাড়ছে।
 
ইংরেজি ‘মডারেট’ শব্দটি ভালো অর্থে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু মডারেট মুসলমান বলতে আমরা বুঝি চরম আত্মকেন্দ্রিক, সাম্প্রদায়িক, সংখ্যালঘুবিরোধী ও সংখ্যালঘুনির্যাতনকারী একটি অপশক্তিকে। এরা সমাজে-রাষ্ট্রে ভালোমানুষির ভাবধারণ করে ভালোমানুষ সাজার ব্যর্থ চেষ্টা করে থাকে। ‍কিন্তু কখনও মনেপ্রাণে ভালো হয় না—আর ভালোমানুষ হতেও চায় না। কিন্তু ভালোমানুষির অভিনয়প্রদর্শন করতে এরা কখনও কুণ্ঠাবোধ করে না। একঅর্থে এরা মুসলমানের জার্সি গায়ে অভিনয়কারী মাত্র—কিন্তু কখনও এরা মুসলমান নয়।
 
আসুন, এবার দেখি বাঙালি রেডিমেট-মডারেট-মুসলমানের ঈমানের ভিত্তি বা মূলস্তম্ভ কী-কী?
 
১. এদের ঈমানের প্রথম স্তম্ভ হলো পাকিস্তান, পাকিস্তান আর পাকিস্তান। আর পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটির অধিবাসী যেকোনো পাকিস্তানীই এদের জীবনের একমাত্র আরাধনার পাত্র। এইজন্য এরা জীবনে-মরণে সবসময় পাকিস্তানের প্রতি চিরআনুগত্যশীল।
২. এদের ঈমানের দ্বিতীয় স্তম্ভ হলো পাকিস্তানের ক্রিকেট খেলোয়াড়গণ। তাই, এরা সারাজীবন মদখোর-মদমাতাল ক্রিকেটার—ইমরান খান, রমিজ রাজা, জাভেদ মিঁয়াদাদ, শহীদ আফ্রিদি, শোয়েব আখতার, ওয়াসিম আকরামদের পূজা করবে—কিন্তু শুধু ভিন্নধর্মাবলম্বী হওয়ায় শচীন টেন্ডুলকারদের গালি দিবে! এই শ্রেণীর নামধারীমুসলমান পাকিস্তানের ক্রিকেট খেলা দেখাটাকেও ‘ইবাদত’ বলে মনে করে থাকে। এজন্য তারা পাকিস্তানের খেলা দেখার সময় ‘নামাজ’ কামাই করতেও দ্বিধাবোধ করে না!
৩. এদের ঈমানের তৃতীয় স্তম্ভ হলো ক্বলবের মধ্যে চিরস্থায়ীভাবে পাকিস্তানকে গেঁথে রাখা। এজন্য এরা স্বাচ্ছন্দ্যে-সুখে-শান্তিতে ভোগে-দখলে ডুবে থেকে সারাজীবন বাংলাদেশে বসবাস করবে—কিন্তু সদাসর্বদা ঈমান রাখবে পাকিস্তানের প্রতি। এরা বাংলাদেশের খাবে-পরবে-ভোগ করবে—কিন্তু ভিতরে-বাইরে আর অন্তরে-ধ্যানে-জ্ঞানে জীবনের সর্বক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠ স্বদেশ মনে করবে পাকিস্তানকে!
৪. এদের ঈমানের চতুর্থ স্তম্ভ-অনুযায়ী—পাকিস্তানের সেনাবাহিনী এদের কাছে ফেরেশতাদের চেয়েও পবিত্র! তাই, এরা এখনও ১৯৭১ সালে বাঙালিদের বিরুদ্ধে পাকিস্তানীদের বর্বরতাস্বীকার করে না। আর এরা এখনও ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে সংঘটিত ‘পাকিস্তানী-আর্মিদের বর্বরতা ও নৃশংসতা’ বিশ্বাস করে না। এরা পাকিস্তানের লম্পট-সেনাবাহিনীকে এদের ঈমানের অন্যতম মূলস্তম্ভ মনে করে থাকে। এইব্যাপারে তারা কারও সঙ্গে আপস করতেও রাজী নয়।
৫. এদের ঈমানের পঞ্চম স্তম্ভ-অনুযায়ী ১৯৭১ সালে পাকিস্তানী-আর্মিদের দ্বারা বাঙালি-নারীদের ধর্ষণের অমানবিক ঘটনা জায়েজ। আর এরা মনে করে থাকে নারীধর্ষণ সবসময় জায়েজ। আর এক্ষেত্রে বিধর্মী-নারী হলে তা আরও বেশি জায়েজ!
৬. এদের ঈমানের ষষ্ঠ স্তম্ভ হলো নিজেদের স্বার্থে মানুষহত্যা জায়েজ। আর কাউকে কাফের, মুরতাদ, নাস্তিক মনে করে হত্যা করলে সওয়াব বেশি। আর এরা মনে করে থাকে: কেউ এভাবে মানুষহত্যা করতে না পারলেও সে যদি এই হত্যাকাণ্ডকে সমর্থন করে তাহলেও তার সওয়াব হবে!
৭. এদের ঈমানের সপ্তম স্তম্ভ হলো বিধর্মী (হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ইত্যাদি) তথা ভিন্নধর্মাবলম্বীদের বিরুদ্ধে সবসময় লেগে থাকতে হবে। আর এদের বিরুদ্ধে নিয়মিত কুৎসারটনা করতে হবে। এদের উপর সবসময় জুলুমনির্যাতন চালাতে হবে। আর তা করতে না-পারলে কমপক্ষে এদের গালিগালাজ করতে হবে।
৮. এদের ঈমানের অষ্টম স্তম্ভ হলো কোনো একটা ছুতানাতা খুঁজে আমাদের প্রতিবেশীরাষ্ট্র ভারতের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে সবসময় গালিগালাজ করতে হবে। আর বাংলাদেশের সমস্ত বিপদাপদের মূলে একমাত্র ভারতকে দায়ী করে তাদের দুষতে হবে। আর একইসঙ্গে হিন্দুদের প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে আর যার-যেমন খুশি গালিগালাজ করতে হবে।
 
এদের ঈমানের এই আটটি মূলস্তম্ভ ব্যতীত আরও কয়েকটি ঈমানপরিচায়ক বা ঈমানদণ্ড রয়েছে। আসলে, এসব এদের চিরস্থায়ী চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। এগুলো হলো:
 
১. বাইরে হিন্দুদের সঙ্গে সদ্ভাব দেখাবে। কিন্তু ভিতরে-ভিতরে সবসময় তাদের কচুকাটা করার ফন্দিফিকির করবে। আর সবসময় তাদের ‘মালাউন’ বলে সম্বোধন করবে বা গালি দিবে।
২. এরা মদ খাবে, বেশ্যাগমন করবে, মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করবে, আর মিথ্যা বলবে—কিন্তু পহেলা বৈশাখপালন করতে গেলে ধর্ম টানবে!
৩. এরা পরের অশান্তি করে হলেও নিজের স্বার্থ দেখবে। আর নিজধর্মপালনের সময় সবকিছু লণ্ডভণ্ড করবে—কিন্তু সংখ্যালঘুদের ধর্মপালন করতে দেখলে সেখানে জায়েজ-নাজায়েজের প্রশ্ন তুলবে। এরা ধর্মপালনের জন্য টঙ্গির তুরাগ-নদীর তীরে শুয়ে থাকবে, খাওয়াদাওয়া-পিকনিক করবে—কিন্তু হিন্দুসম্প্রদায়ের হোলি-উৎসবের নাম শুনলে নাকসিটকায়! এদের নাক খুব উঁচু! তাই, সবকিছুতে গন্ধ খুঁজে পায়।
৪. এরা ইসলামের একটা বিধিবিধানও মানবে না। এরা নিয়মিত মিথ্যা বলবে, ব্যভিচার করবে, মদ্যপান করবে, খুন-ধর্ষণ করবে—এতে সমর্থনদান করবে, পারজায়িক হবে—তবুও যেকোনো ভালোমানুষকে ভালোবাসবে না। এরা ইসলামধর্ম বোঝে না। কিন্তু ‘হেফাজতে শয়তান’ ঠিকই বোঝে—আর ‘হেফাজতে শয়তান’কে খোঁজে। আর এতে সমর্থন দেয়!
৫. এরা স্কুল-কলেজে-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করলেও ভিতরে-ভিতরে কিংবা ভিতরে-বাইরে সবসময় একেকজন তালেবান—আর সাম্প্রদায়িক, ধর্মান্ধ ও গোঁড়া।
৬. এরা পরস্ত্রীর সর্বস্বহরণ করতে প্রস্তুত! আর এরা নিয়মিত বেশ্যাবাড়িতে ঘুমাবে, উপপত্নী রাখবে, বহুগামী হবে—কিন্তু নিজের স্ত্রীকে বোরকা কিংবা হিজাব পরিয়ে রাখবে!
৭. এদের ধর্মবোধ বোরকা আর হিজাবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। আর এরা ধর্ম বলতে বোঝে নিয়মিত বেশ্যালয়ে যাওয়ার পরও স্ত্রী-কন্যাকে শুধু বোরকা-হিজাব পরালেই যেকোনোমুহূর্তে তার জন্য আটটি বেহেশতের দরজা খুলে যেতে বাধ্য!
৮. হিন্দুসম্প্রদায়ের যে-কেউই এদের কাছে সবসময় একজন ‘মালাউন’ মাত্র। কিন্তু হিন্দুরমণীদের কেউ-কেউ এদের মনোযোগআকর্ষণের প্রধান কেন্দ্র। এরা বাইরে সৎ, ধার্মিক, মিতভাষী—কিন্তু ভিতরে-ভিতরে অধার্মিকের বিরাট মহীরুহ!
৯. এরা আধুনিকরাষ্ট্রে বসবাস করেও স্বপ্ন দেখে ‘হেফাজতি শয়তান’দের ১৩-দফাভিত্তিক শয়তানরাষ্ট্রের! এরা বাইরে শিক্ষিত আর ভিতরে-ভিতরে একেকটা হিংস্র-হায়েনা।  
১০. এদের কেউ-কেউ নিয়মিত রবীন্দ্রসঙ্গীত শোনে—কিন্তু সাহিত্য বলতে বোঝে ইসমাইল হোসেন সিরাজী, গোলাম মোস্তফা, ফররুখ আহমেদ, সৈয়দ আলী আহসান, আল মাহমুদ ইত্যাদি!
১১. এরা ইসলামের কোনোকিছু পালন না করেও সবখানে হিন্দুয়ানি খুঁজে বেড়ায়। ‘বাঙালিয়ানা’ ও ‘বাঙালি-চেতনা’র বিরুদ্ধে এদের ঈমানদণ্ড সবসময় উত্থিত হয়।
১২. কারও সঙ্গে এরা যুক্তিতর্কে না পারলে তাকে ঘায়েল করার সহজ অস্ত্র হিসাবে তাকে কাফের, নাস্তিক, মুরতাদ ইত্যাদি বলে অভিহিত করে (কেউ নিজেকে নাস্তিক না বললেও তারা আক্রমণের সহজ অস্ত্র হিসাবে এটাকে বেছে নিয়ে) তার বিরোধিতা করে থাকে।
১৩. এরা জঙ্গিবাদের সমর্থক, এর পৃষ্ঠপোষক আর ভিতরে-ভিতরে একেকজন জঙ্গি। আর নিদেনপক্ষে সেমি-জঙ্গি। কিন্তু বাইরে ভাব দেখাবে কত না উদার!
১৪. এরা মাঠে-ময়দানে জঙ্গিবাদীকার্যক্রম চালাতে না পারলেও ঘরে বসে ঠিকই এদের নানাভাবে সমর্থন দিয়ে থাকে। এরা জঙ্গিবাদের অন্যতম প্রধান দোসর।
১৫. এরা ১৯৭১ সালে পাকিস্তানীদের ও তাদের এদেশীয় দালালদের যুদ্ধাপরাধকে মনেপ্রাণে হালাল জেনে তার উপর পূর্ণঈমান ধরে রেখেছে। আর তারা বাইরে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের বিচারকে সরাসরি অস্বীকার না করলেও এখন এর প্রয়োজনীয়তা নেই—কিংবা এটি স্বচ্ছ হচ্ছে না—বলে এর বিরুদ্ধে নানারকম গুজব ছড়াতে একবিন্দু অলসতাও করে না।
১৬. এরা ইসলামের নামে জঙ্গিবাদকে আড়াল করতে নানারকম অপপ্রচারের আশ্রয়গ্রহণ করে থাকে। এর একটি হলো রোহিঙ্গানির্যাতনের নামে বিভিন্ন কল্পকাহিনীর প্রচার ও প্রসার।
 
এই দেশে মডারেট-মুসলমানদের ইমাম হলো—ড. আসিফ নজরুল, ড. তুহিন মালিক, ড. পিয়াস করিম (পরলোকগত), দৈনিক প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান, দৈনিক ‘আমার দেশ’ পাকিস্তানের সম্পাদক মাহমুদুর রহমান, ‘নিউ এজ’ পত্রিকার সম্পাদক নুরুল কবির, ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম, লেখক-নামধারী ভণ্ড হাসনাত আব্দুল হাই, সাংবাদিক-নামধারী সাংঘাতিক মাহফুজউল্লাহ, এটিএন বাংলার চেয়ারম্যান ও ইসলামের নামে বিবিধ জঙ্গিবাদীঅনুষ্ঠানের উদ্যোক্তা ড. মাহফুজুর রহমান, কবি-নামধারী আব্দুল হাই শিকদার, কলামনিস্ট-নামধারী ও ‘চিন্তা’ পত্রিকার সম্পাদক ফরহাদ মজহার, ‘অধিকার’ নামক এনজিও এবং রাষ্ট্রবিরোধী ম্যাগাজিনের কথিত-সম্পাদক আদিলুর রহমান খান, কবি-নামধারী ভণ্ড আল মুজাহিদী, টক-শো দালাল ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ, টক-শো গলাবাজ ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা, টক-শো ব্যাপারী ব্যারিস্টার পারভেজ আহমেদ, টক-শো গলাবাজ ও বিএনপি-নেতা মেজর আখতারুজ্জামান (অব.) ইত্যাদি।
 
এই রেডিমেট-মডারেট-মুসলমানরা একেকটি ঘাপটিমেরে থাকা শয়তান। এরা সবসময় মুখোশের আড়ালে দিনযাপন করে থাকে। এদের জীবনের কোথাও কোনোভাবে ইসলামের কোনোকিছুই খুঁজে পাওয়া যাবে না। কিন্তু ভিতরে-ভিতরে এরা একেকটি আস্ত-কাটমোল্লা।
 
 


 
সাইয়িদ রফিকুল হক
মিরপুর, ঢাকা, বাংলাদেশ।
০৪/০৫/২০১৭
 

ছবি
সেকশনঃ সাধারণ পোস্ট
লিখেছেনঃ সাইয়িদ রফিকুল হক তারিখঃ 10/05/2017 02:56 PM
সর্বমোট 241 বার পঠিত
ফেসবুকের মাধ্যমে কমেন্ট করুণ

সার্চ