ব্যাকগ্রাউন্ড

মুক্তচিন্তার বিশ্ব

আপনার পছন্দের যে কোন কিছু সহব্লগারদের সাথে শেয়ার করতে ও শেয়ার কৃত বিষয় জানতে এখানে ক্লিক করুণ

ফেইসবুকে!

একজন ফাঁসির আসামীর মৃত্যুপূর্ব আত্মকথন

(১)
আমি এখন নতুন কনডেম সেলে। খুব অল্প দৈর্ঘ্য, বিস্তারের এই সেলে আজ আমাকে নিয়ে আসা হয়েছে। আধা অন্ধকারাচ্ছন্ন সেলে একটা নিভূ নিভূ আলো, একটা স্নানাগার,। বড় বিষন্ন এই গন্তব্যে, অনিবার্য মৃত্যুর অপেক্ষা ছাড়া আর কিছু নয়। আর মাত্র কটা দিন বড় জোর এক সপ্তাহ, পনেরদিন। আমার জীবন কেড়ে নিতে জল্লাতদের দল প্রস্তুতি নিচ্ছে, জার্মানি দড়িতে মাখানো হচ্ছে মাখন আর সবরি কলা। কনডেম সেলের এই চার দেওয়ালে আমার দীর্ঘশ্বাসের প্রতিধ্বনি, মাথা কুঠে বারংবার মরে যাচ্ছে।
অবধারিত মৃত্যুর আগমনে, অখন্ড চঞ্চলতা শরীরকে কিছুতেই স্থির থাকতে দিচ্ছে না। অবুঝ মনের বুঝতে এতটুকু বাকি নেই, নিশ্চিত মৃত্যুর কাছে আমার আগাম পরাজয়।

(২)
সুপ্রিম কোর্টের রায়ে আমি মৃত্যুদন্ড প্রাপ্ত আসামি, এই সেলই হয়ত আমার শেষ প্রান স্পন্দনের সাক্ষী হবে। পরিযায়ী পাখি হয়ে উড়ে যাবে আমার রুহু বিদগ্ধ নরকের অন্ধ কোন গলিতে। জীবন-মৃত্যুর সন্দিক্ষনে এ জীবনের প্রতি ফিরে ফিরে বড় বেশী মায়া জন্মে, যার কৃতকর্মে জন্য অনুশোচনায় আজ আমি ক্লান্তিহীন কাঁদি। এই যে বেঁচে ছিলাম, কতক্ষন থাকব, এ ভাবনা অনাবরত গ্রাসে, উদগিরনে, অহর্নিশ মৃত্যু জ্বালা জানান দিচ্ছে। আজ দুদিন হল, কেউ কিছু বলছে না। রাতে সেন্ট্রি খাবার দিয় যায়, চোখে তার করুনার চাহুনি। খাবার গলা দিয়ে নামে না। বিধ্বস্ত শরীর মনের করুনায় ঘুমের দেশে যাত্রা করি। হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে যায়, অজানা ঠকঠক শব্দে। হচকিত হয়ে উঠে বসি। চোখের সামনে ভেসে ওঠে নীহারিকার মায়াবি মুখটা। বুকের ভেতর পুরনো ব্যাথাটা মোচড় দিয়ে ওঠে, তরঙ্গায়িত হয় বেসুরো আর্তনাদ। আজ ওকে কেন এত মনে পড়ছে।
দিন তারিখ ঠিক মনে নেই। মনে আছে টুকরো টুকরো মুক্তার দানার মতো চিক চিক করা কিছু স্মৃতি। যা অলস কোন দুপুরে বা নিঃসঙ্গ কোন বিকেলে অন্য রকম এক অনুভূতির জন্ম দেয়। নিয়ে যায় আমাকে দূর থেকে বহু দূরে। ভালোবাসার স্বপ্নীল এক ভুবনে। তখন একটি নামই হৃদয় থেকে উৎসারিত হয়। আর সে হচ্ছো ‘নীহারিকা’ তুমি। হ্যাঁ ‘নীহারিকা’ তোমাকে মনে পড়ছে। এই ভিজে রাত দুপুরে তুমি যেন বৃষ্টির দানার মতো ঝরে পড়ছো আমার সমস্ত সত্ত্বা জুড়ে। তোমার পাঁচ বছরের প্রেমে আমায় দিয়েছিলে, বেপরোয়া জীবন থেকে মুক্তি। মনে আছে তোমার? খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স ভর্তির সুবাদে তোমার আমার পরিচয়, বন্ধুত্বে শুরু , ক্রমে জড়িয়ে যাই প্রেমে। ছোটবেলা থেকে ডানপিঠে স্বভাবে অভ্যস্থ আমি, বিভিন্ন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় কোন না কোন ভাবে জড়িয়ে যেতাম। ক্যাম্পাসেও চলতে থাকে আমার এই পরিবর্তনহীন চলাফেরা। দিনে দিনে, তোমার অজস্র ভালবাসার অভিমানি আঘাতে, কাঠ কয়লা মত পুড়ে আমি, ছাই ভস্মের মত তোমাতে দ্বিকবিদ্বিক উড়তে থাকি। কেন্দ্রিভূত হই তোমার বৃত্তায়নে।
মানুষ বরাবরই বন্দি হয়ে যায় ভালোবাসার মহাজালে। সেটা শূন্য থেকে শতক বয়স হোক, অনুভূতিতে হোক, ঘৃণা কিংবা অপরাগতায়, হোক সে চরমপন্থি কিংবা বিকৃতমনা খুনি। কোন না কোন ভাবে সে, কোন না কোন সময় ভালবাসার মায়ায় বাধা পড়ে। ভালবাসার গনতান্ত্রিকতায়, এক নান্দনিক প্রেমের কাছে আমিও ধরা দেই। যেখানে নীহারিকা আর আমি কাটাতাম ভালবাসার স্বপ্ন আবাদে ঘর সাজানোর সপ্তরঙা পরিকল্পক হিসেবে সারাবেলা। লেখালেখি পড়াপড়ির সূত্রে আমাদের ঘনিষ্ঠতা হয় লাইব্রেরিতে। বিষখালি নদীর পাড়ের এ ছিপছিপে মেয়েটি পড়ালেখায় পাল্লা দিতো আমার সাথে। স্বপ্ন অস্তিত্বের সমুদ্রে স্নানের মাঝেও আমরা কখনো ভুলতাম না এ্যাডাম স্থিথ, এল রবিনস, কে কে ডুয়েট কিংবা পল স্যামুয়েলসনকে। এসব লেখকের অর্থনীতির থিওরির জটিলতায়ও আমাদের অভিসারী মনের ভাললাগার আলোতে ঘাটতি পরতো না কখনো। ভালবাসার পাথর পাহাড় গলে কখনো তা বিবাদে রূপ নিতো। আমি অল্পতে অভিমানি নারীর তনুতে তৃষ্ণার আগুন জ্বালাতাম, তাতে তার মনশরীর জ্বলে-জ্বলে একসময় তুলতুলে পারদ হয়ে গলে পরতো।
(৩)
মাস্টার্সে ভর্তির কদিন আগে অপারিজতা হল ছেড়ে নিয়তির পরিজায়ী মেঘেরা যেমন দৌঁড়ে যায় স্বজনাকাশে, তেমনি নীহারিকা যায় তার বাড়িতে।

১৫ দিন বাদে নীহারিকা ফিরে আসে,
সেদিন ছিল শ্রাবনের প্রথম সকাল, নীহারিকা পরিচয়হীন মানুষের মত, প্রথম আমাকে এড়িয়ে যায়। বিন্দু বিন্দু শিল্পিত মন দিয়ে গড়ে ওঠা এক প্রেমিক হৃদয় দিয়ে এমনভাবে নীহারিকাকে কোনদিন ভেবে দেখিনি। অলৌকিক আপ্লুত প্রেমহীনতায় মুষড়ে পড়ে আমার অবুঝ হৃদয়। আমায় চরম ভাবে ক্লেদাক্ত করতে থাকে, অসংখ্য সন্দেহের ডালপালা জন্ম নেয় আমার মনাঞ্চলে। আমি ক্রমশ হতাশায় ডুবে যেতে থাকি, বিবর্জিত হতে থাকে জেগে ওঠা অহং। বিশ্বাস, অবিশ্বাসের খোলনলচে দিনের পর দিন কাটতে থাকে। সহস্রবারের জিঞ্জাসায়ও, নীহারিকা নির্বিকার। দুমাস অতিবাহিত হয়।

(৪)
অবশেষে একটা চিঠি আসে, খান জাহান আলী হল, ৩২৪ নং রুমের ঠিকানায়। যেখানে নীহারিকা
লিখেছিল, মৃত্যুঞ্জয়, আজ আমার ইচ্ছের পিন্ডদান, মুূমূর্ষু পিতার মুখ আর মায়ের বিবর্ণ চেহারায়। পূর্ব নির্ধারিত পাত্রের সাথে আমার বিয়ে। আমাকে কোনদিন জানানোর এতটুকু প্রয়োজন পড়েনি, তাদের। তাদের অযাচনীয় ইচ্ছেতে, আজ আমি বলি উৎসর্গিত কোন অবোধ পশু।

চিঠির বাকিটুকু পড়ার প্রয়োজন হয়নি। দিন তিনেক আগের লেখা চিঠি। গত এক সপ্তাহ যাবত নীহারিকার ক্যাম্পাসে অনুপস্থিতির কারন জানা গেল। বিদর্ভ হৃদয়ের সঙ্গিনীর নিঃশব্দ বিদায়ে বিষন্ন বিকেলের অস্থমিত সূর্যে বেদনার পালক গুলো, রিণরিণে শব্দ তোলে আমার পৃথিবীর সমস্থ দুরহ্য কোনে কোনে। প্রলয়কারী আকাশ ভাঙ্গা কষ্টের মাঝে দেখি মৃত্যুমুখরতা। রঙ্গিন স্বপ্নগুলো, নির্নিমেষ ধুরসিত হয়, মিলিয়ে যায় দূর মহাকাশে। দূর্বোধ্য নরকের অচেনা গলিতে, শুনি, মৃত্যু বিভীষিকার বজ্রকন্ঠের একটানা চিৎকার। টিপটি আটা বোতলে বন্দি জীবন, এই শূন্য ঘরে, আমি নির্বাসিত। আজ দুঃখ আমার মজ্জাগত ক্যান্সার, কড়া নাড়ার
মতো কেউ নেই, শুধুই অসীম শূন্যতার দীর্ঘশ্বাস।

(৫)
এক মাসের ছুটিতে ক্যাম্পাস বন্দ হয়ে যায়, সবাই নিজের ঠিকানায় ফিরে যেতে থাকে, আমি একা রয়ে যাই, খাজা হল, রুম নং ৩২৪-এ।
কালের অসম বিবর্তনে, মনের নান্দনিকতা ক্ষয়ে যেতে থাকে, ব্যার্থতার হলাহলে, অদমিত সবুজের বুকে ক্রমশ জন্ম নিতে থাকে এক স্বপ্নদ্রোহী, সন্ত্রসী। জাগতে থাকে, কষ্টের লেলিহানে, প্রতিশোধের দাবানল। পশু প্রবৃত্তির সত্ত্বা, ক্রমশ মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। নেশার আতুর ঘরে, বিকট এই প্রেম, প্রত্যাখ্যাতে আমি বদলে যাই বীভৎস প্রতিহিংসায়।

ছুটি শেষে, সবাই ক্যাম্পাসে ফিরে আসে,
আমি নিহারিকার পদাঙ্ক অনুসরন করতে শুরু করি, ক্লাস রুম, লাইব্রেরী, ক্যাফেটরিয়া কিংবা হল, সর্বত্র। নীহারিকা, আমার এমন চলাচলে ভীত, সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। ও মেসে থাকতে শুরু করে। ক্লাস রুমের বাইরে যাওয়াও বন্দ করে দেয়। বিভিন্ন সময়, বিভিন্ন ভাবে ও আমার সাথে কথা বলার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু আমি সব ছেড়ে আমার নিজের মধ্যেই আটকে রই।

(৬)
এভাবে, আরও কিছু দিন কাটে,
শরতের শিশির ভেজা এক মধ্যরাতে, নেশায় চুর আমি, হল থেকে বেরিয়ে পড়ি। উদেশ্য নীহারিকা মেস। পায়ে পায়ে আলকাতরা মিল পৌছে যাই। নিঃশব্দ পায়ে, ওর দরজায় কড়া নাড়ি। কিছু সময় পার হয়, ওর ঘরের বাতি জ্বলে ওঠে। দরজা খুলে আমায় দেখে হতবাক হয়ে যায়। আমি সজোরে ওর গলা চেপে ধরে ঘরে ঢুকে দরজা বন্দ করে দেই। শ্বাসরোধ হয়ে আসে ওর, চোখ দুটো ফেটে বেরিয়ে আসার উপক্রম হয়। ওকে থামাতে গিয়ে বেশ কয়েকটা চড়-থাপ্পর দেয়ার পর আমার মধ্যে জাগ্রত হয় ভয়ানক কামজ অনুভূতি। আমি ওর মাথায়, বুকে, সংবেদনশীল যাবতীয় অঙ্গে প্রচণ্ড প্রহার করতে থাকি। চোখে পড়ে, ওর সিদুর রাঙ্গানো সিঁতি, যা বেহায়া বেশ্যার খরিদ্দার আকর্ষনের উপকরন মনে হয়।
আমি ওর স্থির দেহে আরো দু ঘা বসিয়ে দিয়ে ওর উপর উপগত হই। তারপর সঙ্গম শুরু করি। আমার মধ্যে যে এত জৈবিক ক্ষমতা আছে তা আগে কখনই বুঝতে পারি নি। সত্যি বলতে কী, এই নতুন অভিজ্ঞতা আমাকে অভূতপূর্ব এক আনন্দ দিলো।

হলে ফিরে আসি, পরেরদিন দুপুরে পুলিশ আমাকে হাত কড়া পরিয়ে নিয়ে যায় জেলে। ওদের কাছে জানতে পারি, ধর্ষন ও আত্মহত্যায় সয়হতাকারি মামলায় আমাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ময়না তদন্তে বেরিয়ে আসে, ওই রাতে ধর্ষিত হবার পর, নীহারিকা সিলিং ফ্যানে ওরনা পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করে।
নিজের অপরাধ বোধ উপলব্দি করি, বুক ফাটা স্বজন হারা কষ্টে, লজ্জ্বা, ঘৃনায় নিজেকে গুটিয়ে ফেলি জেলের অন্ধকার সেলে। সেচ্ছাচারিতার, চরম সাজায় পঁচেগলে বারংবার মৃত্যুর কাছে পৌঁছয়ে যাই। মৃত্যুরও বোধ করি আমার জন্য কোন করুনা হয় না, তাই আজও আমি বেঁচে আছি।
(৭)
সেই থেকে ১১ টি বছর আমি, জেলের ঘানি টেনে চলেছি। ম্যাজিট্রেট, উকিল, পুলিশ এদের নিয়ে আমার ১১ বছরের পথ চলা। সুপ্রিম কোর্ট আমার মৃত্যু দন্ডাদেশ বহাল রেখেছে। রাষ্ট্রপতির কাছে, প্রান ভিক্ষার আবেদন ঝুলে আছে।

সেন্ট্রির সেলের তালা খোলার শব্দে, বাস্তবে ফিরে আসি, দেখি সকালের ঝাপসা আলো। সাবান, সুগন্ধি, নতুন তোয়ালে দিয়ে সেন্ট্রি বলে, সুন্দর করে গোসল করে নিন। বুঝতে বাকি থাকে না, আজই এ পৃথিবী ছেড়ে আমাকে চলে যেতে হবে।। আমি শেষ স্নানটা সেরে ফেলি।
কিছুক্ষন পর কর্তব্যরত পুলিশ অফিসার আসে, পকেটের কাগজটা পড়তে শুরু করে। যেখানে আমার রাষ্ট্রপতির কাছে প্রান ভিক্ষার আবেদন, প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। পরক্ষনে জিঞ্জাসা করে, আমার শেষ ইচ্ছার কথা।
জন্ম দিয়ে, রক্তপ্রবাহের প্রতিটি শ্রেণীতে মিশে থাকা অনিবার্য বাতাস, বিন্দু বিন্দু মমতার মন দিয়ে গড়ে ওঠা এক সুস্থ সন্তানের হৃদয় দিয়ে এমনভাবে স্নেহময়ী মাকে কোনদিন ভেবে দেখিনি। আজ মাকে বড় বেশী দেখতে ইচ্ছে করছে।
সেলের ঝাপসা আলোর মাঝে, ঠাহর করা পড়ন্ত বিকেলে, আত্মীয়, স্বজনেরা, আমার সাথে দেখা করতে আসে, আমি স্বজনদের ভিড়ে, আমার মায়ের মুখটা খুজতে থাকি।
মা বাকরূদ্ধ, অপলক তাকিয়ে থাকে আমার মুখ পানে। মাকে বলি, মা আমায় ক্ষমা করে দিও। তোমার মায়া, মমতা এ জীবনে আমার আর পাওয়া হল না। এই অবাধ্য, বিকৃত মনা খুনি ছেলের জন্য, তুমি আর কেঁদোনা, মা। মায়ের দুচোখ বেয়ে অশ্রুধারা অবিরত গড়িয়ে পড়তে থাকে। পুলিশ হাতকড়া টানতে থাকে, আমি ফিরতে থাকি সেলে, পিছন ফিরে ফিরে দেখি। মা হাত বাড়িয়ে ডাকছে, খোকা ফিরে আয়, ফিরে আয়। পুলিশ, জোরে জোরে হাতকড়া টানে, মা ক্রমশ, চলে যেতে থাকে, আমার দৃষ্টিসীমানার আড়ালে। ইট-পাথর আর লোহার এই দেশে, মায়া মমতাহীন মানুষের মাঝে, আমি হারিয়ে ফেলি, আমার জন্মধাত্রী মাকে।
সন্ধ্যায়, বৈষ্ণব এসে গীতার শ্লোক পাঠ করে শুনিয়ে যায়।
হরেক রকম খাবার নিয়ে হাজির হয় সেন্ট্রি। খাশির বিরিয়ানি, ইলিশ মাছের ঝোল, মটরশুটির ডাল, চিংড়ি মাছের ভর্তা আরো কত কি। মনে পড়ে যায়, মায়ের হাতের এমন কত রান্না চেটেপুটে খেয়েছি। মাঝে মধ্যে এমন খেয়ে ফেলতাম যে, দম ছাড়তে কষ্ট হত, সেদিন মা খুব বকাবকি করত। উদ্ভুদ মৃত্যুমুখতায়, বিলাসি এসব খাবার, আজ আমার গলধকরন হয় না।
অনিবার্য, আগত মৃত্যুর দুঃস্বপ্নে আবার বিভোর হয়ে পড়ি। দেখি, পুলিশ, জেলার, জল্লাদেরা আমায় ঘিরে মৃত্যুবৃত্ত তৈরি করেছে। তিন জল্লাদ আমার কয়েদি পোশাক ছাড়িয়ে, থান কাপড় পরাচ্ছে। তারপর টানতে টানতে নিয়ে চলেছে, ফাঁসির কাষ্ঠের দিকে। আমি মায়ের কোল থেকে কেড়ে নেওয়া দুধে বাচ্চার মত চিৎকার করতে থাকি। আমার চিৎকার মায়ের কাছে পৌঁছয় না, কারাগারের পাথর দেয়ালে, বাঁধা পেয়ে পুনঃপুন আমাতে ফিরে আসে। ওরা আমায় ফাঁসির কাষ্ঠে তোলে, মুখো মন্ডলে বাঁধে কালো কাপড়, গলায় পরায় দড়ি । এক, দুই, তিন বলে, জেলার রুমাল উঁচু থেকে মাটিতে নামায়। আমি, সদর্পে চেঁচিয়ে উঠি, আমি মরতে চাইনা, আমি বাঁচতে চাই, আমি বাঁচতে চাই। আমার চিৎকার কারা ফটক ছাড়িয়ে, প্রকম্পিত হয়, আকাশে-বাতাসে।
স্বম্ভিত ফিরে পেয়ে দেখি, আমি এখনও বেঁচে আছি। পরম শ্রদ্ধায়, ঈশ্বরকে স্মরন করি, হে বিধাতা, ক্ষমা পাওয়ার মত কোন অপরাধ আমি করিনি । তবুও, আমায় আরও কিছু দিন এই আশ্চর্য সুন্দর পৃথিবীতে বেঁচে থাকার শেষ সূযোগ দাও।
আমার হাতে বোধ হয় আর বেশী সময় নেই, আনুমানিক রাত সাড়ে দশটায় আমায় ওরা ফাঁসির দড়িতে ঝুলাবে।

(৮)
এভাবে, কোনদিন আমি নিজের বেঁচে থাকার আকুতি করিনি। এই আপাত সরলতায় যেকোন ঘটনাকে বিধৃত করার ক্ষমতা অনেকদিন হারিয়েছি আমি। দ্রুত বাড়তে থাকা নাগরিক কলেবর আর বক্র জীবনবোধের প্রবল চাপ সামলাতে গিয়ে দেখার চোখ নির্মলতা হারিয়েছে বহুদিন। বলার ঠোঁট হারিয়েছে সোজাসুজি কথা বলার ক্ষমতা। আছে শুধু ঘটে যাওয়া সময়ের স্খলন। অনুভব করি, দিনের প্রথম আলোর মেদুরতা। দুপুরের ক্লান্তি আর চুরি যাওয়া আলোর বিকেল। রাত জুড়ে নিঃসঙ্গতা ক্রমশ ভারি হয়। আমি হারিয়ে ফেলি আরও একটা রোদেলা দিন। মাঝে মাঝে কে যেন জানান দেয়, পুণ্যতোয়া আলোর কথা- যে আলোয় ছায়া পড়ে না। আমি খুঁজে ফিরি সেই আলো। খুব কাছাকাছি পৌঁছয়ে যাই, কিন্তু ছোঁয়া হয় না। এই ছোঁয়ার প্রবল আকুতি আছে, তাই আমি এখনো বেঁচে আছি। দুচোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে, বারবার মনে হয় –‘ এই অনিন্দ্যসুন্দর পৃথিবীর, অসীম আনন্দ ছেড়ে, আজ আমার শেষ বিদায় হবে! হয়ত, আমার হাতে আর বেশী সময় নেই, জল্লাদের দল আসবে, অল্প কিছুক্ষন পর আমার ফাঁসি...........

ছবি
সেকশনঃ গল্প
লিখেছেনঃ সৌরভ সরকার তারিখঃ 27/02/2017 06:18 PM
সর্বমোট 1631 বার পঠিত
ফেসবুকের মাধ্যমে কমেন্ট করুণ

সার্চ