ব্যাকগ্রাউন্ড

মুক্তচিন্তার বিশ্ব

আপনার পছন্দের যে কোন কিছু সহব্লগারদের সাথে শেয়ার করতে ও শেয়ার কৃত বিষয় জানতে এখানে ক্লিক করুণ

ফেইসবুকে!

দিবাকরের দিবাস্বপ্ন

চারিদিক ঝাপসা। আধো আঁধার। সকাল আটটায় এখনো মনে হয় সুবেহ সাদেক। শীতের সকাল। চারদিকে নিঝুম আলো আঁধারী; ভোরের আলো ফোটার আগেই বের হয়ে যেতে হবে। ফার্মগেটে যেতে হবে সকাল-সকাল। সারাদিনের জন্য যেতে হবে-সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত কাজ। আজব কাজ। ভিক্ষা! ঘুম ঘুম চোখে দিন শুরু করে দিবাকর। কিছুটা পড়ালেখা জানা দিবাকর জানে-দিবাকর মানে সুর্য। আর সারাদিন দিবাকর থাকে সুর্যের নীচে। নাম তার স্বার্থক বলা চলে। সারাদিন শুয়ে থাকে উপুড় কিংবা চিত হয়ে।দুই পা নেই-ট্রেনে কাটা পড়েছে আর দুই হাতও নেই। শুধু মানুষ নামের আজব এক খাঁচা। উরুর নীচে কিছু নেই আর হাত নেই।

ঝনাত করে একটা কয়েন পড়ে-একটু ভারী ভারী মনে হয়। পাঁচ টাকার কয়েন হতে পারে। ঝুন-ঝুন আওয়াজ। দিবাকর ভাবতে থাকে। একলা থাকার এই এক সুবিধা! ভেবে ভেবে দিন পার।আর দেখতে থাকা মানুষ। কিংবা মানুষের চোখ। স্রষ্টার সবচেয়ে সুন্দর সৃষ্টি। হরেক রকমের চোখ। কারো ছোট-কারো বড় কিংবা কারো চোখ মানানসই। কারো বা ভীত চাহনী কিংবা কারো অবাক চাহনী আবার কারো চোরাচোখ। তবে অবাক কান্ড হলো সব শিশুদের চোখ থাকে সুন্দর। তার মানে সব মানুষ এক সময় ছোট থাকে আর যত বড় হতে থাকে চোখে আশ্রয় নেয় দুনিয়ার কুটিলতা। কেমন যেনো অবাক হয়ে ভাবতে থাকে। কিংবা মজা পায়। দিবাকর ভাবে মানুষের চোখ নিয়ে আর মানুষ তাকে টাকা পয়সা দিয়ে যায়। আজব দুনিয়া! মানুষের হাঁটা-হাঁটি নিয়েই ভাবে দিবাকর-কেউ আস্তে কিংবা কেউ জোরে।কেউ ভাবতে ভাবতে এগিয়ে যায়।

ঠিক দুপুর গড়িয়ে গেলে আসে একজন দিবাকরকে খাওয়ানোর জন্য। চেনেনা দিবাকর। কিন্তু তাকে নিয়ে আসে দিয়ে যায় কিংবা খাওয়ায় আর মাঝ শরীরের কাপড় নামক বস্তুটা পরিয়ে দেয়। মাসে-বছরে শরীর ধুইয়ে দেয় পানি দিয়ে। কতো আপন লাগে। কিন্তু দিবাকর কোনোদিন কোনো কথা বলে নাই।জানতে চায় নাই। এই মানুষটা তার কি স্বজন না অনাত্মীয়। সে নিজেও জানেনা। তার কাজ হলো শুয়ে থাকা। টাকা পয়সা সব ওই মানুষটা নিয়ে যায়-আর তার থাকা খাওয়া ফ্রী। দার্শনিক ভাবনা ভাবে দিবাকর। হাত না থাকলে টাকার কোনো দরকার নেই! টাকা হাত দিয়ে দিতে হয়-হাত দিয়ে নিতে হয়-টাকা দিয়ে হাত বাড়িয়ে দাঁড়ালে সওদা মিলে।

দিবাকর কখন ঘুমায় কিংবা কখন জেগে থাকে আজকাল সে নিজেও বুঝেনা; বস্তিতে যাওয়ার সময় দিবাকর যায় একটা বেয়ারিং্যের গাড়ী দিয়ে। কর্কশ সুরে খস খস শব্দ নিয়ে দিবাকেরের গাড়ী এগিয়ে যায়। দিবাকর শুয়ে থেকে হাসে-দিবাকরের হাসি। সাথের মানুষটা তাকে বস্তিতে রেখে টাকা-পয়সা গুনে গুনে নিয়ে দিবাকরকে খাওয়া-দাওয়া করিয়ে চুলে সুগন্ধী তেল মেখে বিড়ি টানতে টানতে বের হয়ে যায়। ফিরে শেষ রাতে-মাঝে মাঝে দিবাকরের খুব শখ হয় চাঁদ দেখতে কিংবা আকাশ দেখতে। তখন সে গড়িয়ে গড়িয়ে চলে যায় কপাটহীন দরজা দিয়ে ঘরের বাহিরে। নিজের সাথে নিজে কথা বলে। একা একা।
-তোর বাড়ি কোনে রে দিবাকর।
-কোনো নদীর পারে এক বটগাছের পাশ দিয়ে যে রাস্তা চলে গেছে, সেখান দিয়ে দুইটা বাড়ী পরে।
-ধুর! তোর তো কোনো বাড়ী নেই রে দিবাকর।
-আছে রে আছে-তোরে দেখাবানি! যাবি?
-না যাবোনা। ছায়া উত্তর দেয়।
-নদী দেখপানে!
-না যামুনা। নদীতে স্ত্রোত থাকে-টেইনে নিয়ে যাবেনে।
-সাতার দিমু।
-ধুর বোকা! আমার তো হাত নেই-হাত না থাকলি সাঁতার দিবা কেমনে?
-তাও ঠিক। ছায়াকে অনেক মানবিক মনে হয় দিবাকরের।
-তুই অনেক ভালারে।
-আমি তো ভালাই।
-তোর বাড়ি কনে রে?
-তোর বাড়ি আমার বাড়ী এক বাড়ী।
-কি বলস? দিবাকর কিঞ্চিত উত্তেজিত।
-হা রে মোদের এক মা।
-এক মা! দিবাকরের চোখে পানি চলে আসে। আহা ! মা। আবছা আবছা মনে পড়ে। মা! ধনেকালি শাড়ী। নাকে নোলক। টাইট খোঁপার চুল। শক্ত-পোক্ত মানুষ। দিবাকরের হাত-পা হারানোর দিনে জড়িয়ে ধরে কান্না!
-আমার পুলা টেরেইনে কাটা পড়ছে-তোমরা আমার পুলারে বাঁচাও।

তারপরে কিছু মানুষ ধরাধরি করে কোথাও নিয়ে যাচ্ছে। দিবাকরের কিছুই মনে নেই। শুধু মনে আছে সে তলিয়ে যাচ্ছে-অন্ধকারে-লাল রক্ত-হাত নাড়ানো যাচ্ছেনা-দিবাকরের কান্না পায়না। কেমন আরাম আরাম লাগে! সুখ সুখ লাগে।ঘুমে তলিয়ে যায়!ঘুম ভাঙ্গে এক সকালে। চোখে সুন্দর চশমা পরা ডাক্তার আপা তাকে দেখতে এসে চিতকার দিয়ে উঠে।
-সে তাকাচ্ছে-বাচ্ছাটা বেঁচে আছে-বেঁচে আছে!তুমি কথা বলতে পারো। কথা বলো। দিবাকর চুপ হয়ে যায়। মেয়েটা অনেকক্ষন তাকিয়ে থাকে। চোখের পানে।মেয়েটার চোখ থেকে পানি গড়িয়ে নামছে।সেই ডাক্তার আপাই একদিন তার নাম দেয়-দিবাকর। এক নার্সের দিকে তাকিয়ে বলে-কি সুন্দর চোখ-যেনো সুর্য! ওর নাম দিলাম সুর্য-না দিবাকর। নার্সটা ঠোঁট বাঁকিয়ে বলেঃ
-কেমন হিন্দু হিন্দু নাম!
-ধুর নামের আবার হিন্দু-মুসলমান কি? ওরে দিলাম বাংলা নাম।

নার্সটা গজ গজ করতে করতে চলে যায়! আরো কিছুদিন পরে কিছু অপরিচিত মানুষের আনাগোনা বাড়ে আর এক মাঝ রাতে নিয়ে যায় দিবাকরকে।তারপরে রাস্তায় কিংবা গাছতলায় শুয়ে থেকে চিন্তা করা আর ভিক্ষা করা। আর টাকা গুনে-এই হলো এক টাকা-এবার হলো পাঁচ টাকা। খেই হারিয়ে ফেলে-যেমন হারিয়ে ফেলেছে জীবনের। মানুষের অনেক টাকা-যেমন আকাশের অনেক তারা। গুনা যায়না-শুধু দেখা যায় আর আফসোস করা যায়-হাহ আকাশের তারা হলেও আলো দিতে পারতো। মানবজনম। চলতে থাকে দিবাকরের স্বপ্নহীন দিন কিংবা ঘুমহীন রাত।

--------------------------------
দিবাকরের দিবাস্বপ্ন
প্রকাশিতব্য গল্পগ্রন্থ

ছবি
সেকশনঃ গল্প
লিখেছেনঃ অনিমেষ রহমান তারিখঃ 23/11/2016 10:35 PM
সর্বমোট 2511 বার পঠিত
ফেসবুকের মাধ্যমে কমেন্ট করুণ

সার্চ